সিডনী সোমবার, ১২ই এপ্রিল ২০২১, ২৯শে চৈত্র ১৪২৭

ওমা, ডাক্তার কই? এ তো মেয়ে গো : অনজন কুমার রায়


প্রকাশিত:
৮ মার্চ ২০২১ ১৩:০৩

আপডেট:
৮ মার্চ ২০২১ ১৪:৫২

 

'জি বাংলায়' একটি সিরিয়ালের বিজ্ঞাপণ আমাকে অনেক বেশি প্রভাবিত করে। যদিও সিরিয়ালের মাধ্যমে অতীতের কোন বিশেষ মুহূর্তকে আমাদের সামনে তোলে ধরতে চেয়েছে। বিজ্ঞাপণটি এমন, বাড়ির আদরের সন্তান অসুস্থ। অসুস্থ সন্তানের চিকিৎসার জন্য ডাক্তার গাড়িতে চড়ে আসছে। ডাক্তারের গাড়িটি বাড়িতে প্রবেশ করা মাত্রই কয়েকজন বলে উঠল, " ডাক্তার এসে গেছে গো "। কিন্তু, গাড়ির ভেতর একজন নারী চোখে পড়তে সবাই একযোগ বলে উঠল, " ওমা, ডাক্তার কই? এ তো মেয়ে গো! "-কথাটির অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ভাবিয়ে তোলে।

 

তখনকার সময়ে ডাক্তার বলতে পুরুষ মানুষকেই বুঝাতো। ডাক্তার হিসেবে নারীদের সেথায় সমাজ কোনকালে বিবেচনায় নেয়নি। সেই সমাজের সঙ্গে অসমভাবে লড়ে নিজেকে ডাক্তার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারা শুধু কঠিন নয় কষ্টসাধ্য ব্যাপারও বটে। সে অসাধ্য কাজটুকু পূর্ণ করে দেখিয়েছেন যে নারী তিনি হলেন 'কাদম্বিনী বসু'। শিক্ষাক্ষেত্রে পুরুষদের পাশাপাশি কাদম্বিনী সমকক্ষতা লাভে উদ্যমী হয়। কাদম্বিনীর জন্ম সেই সময়ে যখন বাংলার লোক সকল মেনে নিল মেয়েদের লেখা-পড়া মনে হয় আর ঠেকানো গেল না। কাদম্বিনী প্রমাণ করল, নারী মনোবিকারে স্তব্ধ হয়ে গেলেও জেগে উঠতে পারে। দাঁড়ানোর শত চেষ্টায় সমাজে এগিয়ে চলে। সংসারের শ্রীবৃদ্ধি ঘটাতে কখনো অন্দরে, কখনো ঘরের বাইরে তাদের বিচরণের আঙিনা। স্নিগ্ধতার মিশেলে বেড়ে উঠে জগতকে আপন করে নিতে জানে।

 

সেই সময় কাদম্বিনী এবং চন্দ্রমুখী বসু অনেক বাঁধা ডিঙিয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাশ করেন। যদিও তখনকার সময়ে নারীদের পাঠ চলতো অন্দর মহলে। পড়াশুনা চলতো ধর্মতত্ত্ব, দর্শন ও কলাবিদ্যার মতো বিষয়ে। তারপরও কাদম্বিনী মেডিক্যাল কলেজ থেকে ডাক্তারী পেশা সম্পন্ন করেন। মূলত তাদের হাত ধরেই সমাজে মেয়েদের শিক্ষার দ্বার উন্মোচিত হয়।

 

উপনিবেশিক যুগে পাশ্চাত্য শিক্ষা বিস্তারের সঙ্গে স্ত্রী শিক্ষারও প্রসার ঘটে। ঊনিশ শতকে পাশ্চাত্য শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রভাব পড়লে নারী শিক্ষার পথ আরো সুগম হয়। বদলে যায় নারী শিক্ষার চরিত্র। তখন থেকেই শুরু হয় নারীর শৃঙ্খল মোচনের অধ্যায়। তবে শৃঙ্খল মুক্তি সম্ভব হয়েছিল কয়েক জনের হাত ধরেই। সেই অন্দর মহলের দ্যুতি বাইরের জগতে ছড়িয়ে দিতে যারা এগিয়ে আসেন তারা হলেন রাজা রাম মোহন রায়, ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর, মদন মোহন তর্কালঙ্কার প্রমুখ। নারীমুক্তি আন্দোলনের নিমিত্তে রাজা রামমোহন রায় পাশ্চাত্য শিক্ষার ভাল দিকগুলো সমাজে তোলে ধরার চেষ্টা করেন। ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর স্ত্রীশিক্ষা প্রসারে দীর্ঘদিন প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখেন। সে উদ্দেশ্যেই ১৮৫৭ সাল থেকে বিভিন্ন জায়গায় ৩৫ টি বিদ্যালয় স্থাপন করেন যা নারী শিক্ষা প্রসারে অনন্য ভূমিকা পালণ করে। তাছাড়াও কৈলাস বাসিনী দেবী, বামা সুন্দরী দেবী, কামিনী সুন্দরী দেবী নারী শিক্ষা প্রসারে গিয়ে আসেন।

 

তখনকার জোড়া সাঁকোর ঠাকুর পরিবারের নারীদেরকেও স্ত্রীশিক্ষা আন্দোলনে ব্রতী হতে দেখা যায়। ঠাকুর বাড়ির মহর্ষি কন্যা স্বর্ণকুমারী দেবী সাহিত্যে যার সর্বক্ষেত্রে বিচরণ বলা চলে। তিনি প্রায় এক যুগ ধরে ভারতী পত্রিকা সম্পাদনা করেন। ফলে বাংলা সাহিত্যের মননশীলতায় নারীদের যথেষ্ঠ প্রভাব বিদ্যমান থাকে। তারই ধারাবাহিকতায় শিক্ষা বিস্তারের পাশাপাশি নারীরা সাহিত্যে মনোনিবেশ করে। নারী শক্তির প্রতিভা স্ফূরণ ঘটে বিভিন্ন সাহিত্যের কর্মকাণ্ডের চেতনায়। তাদের লেখার মাঝে উঠে আসে ধারাবাহিক সাহিত্যচর্চা। স্বদেশপ্রীতি, প্রকৃতিপ্রেম এবং আবেগের মিশেলে অনিন্দ্য সাহিত্য রচনায় পারদর্শী হয়ে উঠেন সেকেলের নারীরা। ফলে নারী শিক্ষা প্রসারের ক্ষেত্র আরও গতিময় হয়ে উঠে। যার ফলে সমাজে মুল্যবোধের আমুল পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়।

 

অন্যদিকে নারী শিক্ষার মাধ্যমে সমাজকে বিকশিত করতে চেয়েছিলেন বেগম রোকেয়া। সে উদ্দেশ্যে ১৯০১ সাল স্বামীর মৃত্যুর পর একটি বালিকা বিদ্যালয়ও প্রতিষ্ঠা করেন। সমাজে অবহেলিত ও পিছিয়ে পড়া নারীদের নিয়ে নারী শিক্ষায় ব্রতী হন। তাঁর অসামান্য দুরদৃষ্টি দেখতে পাই তাঁর লেখা সাহিত্যের ভেতর দিয়ে। 'সুলতানার স্বপ্ন' গ্রন্থে নারীকে বিজ্ঞান মনষ্কতার মাঝে টেনে নিয়ে এসেছেন। সেখানে নারীকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে চেয়েছেন।

 

তারই ধারাবাহিকতায়, বর্তমান সমাজে আমাদের নারীদেরকে আলোকিত জীবন বাঁকে খুঁজে পাই। আজকের সমাজের নারীরা অন্দরে বসে থাকে না। নিজেরাই নিজেদের প্রত্যাশা পুরণে এগিয়ে চলে। তাই আমরা সহস্র কাদম্বিনীকে অন্তর থেকে মূল্যায়ন করতে শিখি। হাজারো ইতিহাস থেকে উৎসারিত হবে দ্যুতি ছড়ানো কাদম্বিনীর মতো নারীরা। স্বপ্ন দেখি আমাদের সমাজের নারীরা বীর দর্পে এগিয়ে যাবে। নিজের স্থানটুকু ধরে রাখতে লড়ে যাবে। অধিকার আদায়ে সর্বদা তৎপর থাকবে। তারাও ভাল কিছু গড়তে জানে, আমাদের উন্নয়নে এগিয়ে চলে। স্নিগ্ধ পরশে আঁচলখানি বিছিয়ে দেশের তরে কাজ করে।

 

সংসারের প্রতিটি কাজের নিদর্শনে থাকে নারীদের শৈল্পিক ছোঁয়া। অর্ধেক আকাশে তাদেরকে কল্পনা করি। সে অর্ধেক আকাশটুকুতেই থেকে যায় চাওয়া-পাওয়ার সম্ভার। নারী; শিল্পিত মনে কখনো সাজিয়ে তোলে, আবার নিজ গুণে কখনো গুণান্বিত হয়ে থাকে। ঐতিহ্য ধরে রাখা যে ঐতিহ্যের ছোঁয়া। কল্পিত মনে একে যায় রঙিন ছবি। পটে থাকে ভালবাসার দ্যোতনা। সবকিছু সামলে নারীর দৃপ্ত পথচলা। বন্ধুরতার পথকে সামলে নিয়ে এগিয়ে চলে। স্নিগ্ধ আবেশে যাদের মুল জগৎটাই হয়ে উঠে ভালবাসার সঞ্জীবনী শক্তি।

 

অনজন কুমার রায়
 ব্যাংকার ও লেখক

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top