সিডনী সোমবার, ১২ই এপ্রিল ২০২১, ২৯শে চৈত্র ১৪২৭

মান্যবর নেতা-মন্ত্রী, আমরা সাধারণ জনগণ বলছি : তন্ময় সিংহ রায়


প্রকাশিত:
৮ এপ্রিল ২০২১ ১৩:১৯

আপডেট:
৮ এপ্রিল ২০২১ ১৫:০৬

 

সমাজের ভালো করার অধিকার কার বেশি?  আর তা করতে গিয়ে, কোন দলের'ই বা অর্জন করা উচিৎ শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা?  এই প্রমাণ করতে বিশেষত ভোটের সময় দিবারাত্র প্রচার বৈচিত্রতার মধ্যে দিয়ে দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে বড় এবং বহুমূল্যবান শব্দের গুলি ছুঁড়তে যেমন ভীষণ ব্যস্ত সম্মানীয়/য়া নেতা-মন্ত্রীরা, ঠিক তেমন'ই বিরোধী পক্ষের ইমেজকে যথাসম্ভব অন্ধকার ও নিষিদ্ধ জগতে তাচ্ছিল্যে ছুঁড়ে ফেলতেও সমান ব্যস্ততার জঙ্গলে মরিয়া তাঁরা।

বলাবাহুল্য এই আক্রমণ ও প্রতি আক্রমণের জোয়ারে প্রায় প্রতিটা দলের ভিতরেই বারে বারে ভেসে উঠছে দুর্নীতি, দুর্বলতা ও ব্যর্থতার কদর্য সেই দেহগুলো, যা আপামর জনসাধারণের দৃষ্টির মাধ্যার্ষণে মুহুর্তে ধরা পড়ছে প্রত্যেকবারেই নিখুঁতভাবে! 

আদি-অনন্তকাল থেকেই এ যেন আজ পরিণত হয়েছে গতানুগতিক এক System-এ, আর যুগের পর যুগ ধরে দু'চোখের পাতায় রঙিন স্বপ্নগুলোকে যত্নে সাজিয়ে সাধারণ মানুষগুলো গুনতে থাকে শুধু অপেক্ষার প্রহর, 'এবারে বুঝি হবে আমাদের ভালো, এই বুঝি পেলাম দেখতে সুখের সুশ্রী বদন'খানা!'

হঠাৎ'ই এক Tornado মুহুর্তেই নির্দ্বিধায় ও নৃশংসভাবে যেন থেঁতলে দিয়ে যায় সেই তিলে তিলে সাজানো স্বপ্নগুলোকেই!

তাঁরা আবার সাজায় স্বপ্ন, আবার তা ভাঙে, আবার দেয় জন্ম , আবারও সেই ঘুর্ণিঝড়! আর এভাবেই জীবন যেন তাঁদের আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়ে আছে শ্যাওলা ও আবর্জনা পড়ে থাকা এই System -এর গোড়াতেই!

এখন মনের জরায়ুতে সদ্যজাত যে প্রশ্ন তা হল এই যে, সমাজ ও সামাজিক জীবরূপে সাধারণ মানুষের দিনের পর দিন ধরে প্রকৃত ভালো হচ্ছে ঠিক কতটুকু?

বিশ্বাসের মূলে বারংবার কুঠারাঘাতের পরিণাম হিসেবে কোনো একদিন সংঘবদ্ধ জনগণ যদি করে বসে প্রশ্ন যে, 'আমাদের রাজ্য বা রাষ্ট্রে ও বৈদেশিক লেন-দেনে ব্যবহৃত সমস্ত অর্থের খতিয়ান প্রতিবছর আমরা চাই, প্রার্থী নির্বাচিত হতে গেলে সাধারণ মানুষের মতন তাঁদেরকেও দিতে হবে Preliminary, Main ও Interview  অথবা অন্য আরো কিছু?' জনগণের গণতন্ত্রের প্রতিনিধি হয়ে ঠিক কি চিত্রটা উঠবে প্রকট হয়ে ভেসে সমাজের সেই Canvas -এ?

 

পুঁজিপতিরা ক্রমশই স্পর্শ করতে চলেছে হিমালয়ের চূড়া, আর এদিকে বেকারত্বের জ্বালা'র স্ফুলিঙ্গ আজ দাবানলে রূপান্তরিত হয়ে দাউ দাউ করে ঝলসে চলেছে লক্ষ-লক্ষ ঘরের অসহায় ও নির্দোষ শরীরগুলো!

এদিকে 'মড়ার উপরে খাঁড়ার ঘা'-এর মতন করোনা অতিমারিতে দেশের আর্থিক অবস্থা তায় আবার রাজপথে দুমড়ে-মুষড়ে একেবারে পড়েছে মুখ থুবড়ে!

চতুর্দিকে কর্মহীনদের হাহাকার আকাশে বাতাসে হচ্ছে প্রতিধ্বনিত, তবুও লক্ষ-কোটি টাকা অপচয় করে নির্বাচনী প্রচার ছুটে চলেছে বিদ্যুৎ গতিতে, আর অন্য অন্যগুলো না হয় আজ থাক। 

এসব দেখে কোনোভাবেই বোঝার উপায় নেই যে , রাজ্য বা দেশের আর্থিক অবস্থাটা আজ I C U তে! 

 

বিশেষত 'West Bengal Board of Primary Education', 'পশ্চিমবঙ্গ মধ্য শিক্ষা পর্ষদ' ও 'West Bengal Board Of Higher Secondary Education' এর শিক্ষাব্যবস্থায় এ প্রকারের আধুনিকিকরনে বর্তমানে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের ছাত্র-ছাত্রীরূপী ছেলেমেয়েগুলো উপকৃত হচ্ছে তো ঠিকই, কিন্তু কতটা?  বা আদৌ পাচ্ছে তাঁরা কতটুকু মানসিক ও বৌদ্ধিক পুষ্টি?

এদিকে শিক্ষাদানের এ হেন পদ্ধতিকে কেন্দ্র করে কেমন হচ্ছে তৈরি ছাত্র-ছাত্রীদের ভবিষ্যৎ জীবনের ক্যারিয়ারের ভিত, কিংবা ছাত্র-ছাত্রীরা কি শুধুই অর্জন করছে ডিগ্রি, না হচ্ছে প্রকৃত শিক্ষিতও? নোটবন্দী ছেলেমেয়েদের জ্ঞানের পরিধিও ক্রমশঃ যেন পরিণত হচ্ছে আজ বিন্দুতে! পাশ-ফেল প্রথার মৃত্যুতে সমাজে প্রতিবছর জন্ম নিচ্ছে লাখো-লাখো অশিক্ষিত গ্র‍্যাজুয়েট!

মাটি যখন নরম থাকে, কব্জি অথবা আঙুলের চাপে সেটাকে তথাকথিত বোকা বা মূর্খ চতুষ্পদী গাধা নামক প্রাণীকে যেমন তৈরি করা যায়, আবার বানানো সম্ভব কোনো বিজ্ঞানীর অবয়বও।

এখন দিনের পর দিন ধরে সিংহভাগ বিশ্বাসী রাজ-কারিগরদের (শিক্ষক-শিক্ষিকা) পাখির চোখ যদি হয় শুধু কতকগুলো কাগুজে গান্ধীজির অবিরাম গৃহপ্রবেশ-এর স্বপ্নে বিভোর থাকা, আর সাথে যুক্ত হয় 'No proper inspection' নামক তিনটে ইংরিজি শব্দ, তো সোনায় সোহাগা তো শুধুমাত্র কারিগরেরই, সেখানে না রাজ্যের অধিকাংশ দরিদ্র সম্প্রদায়ের মানুষের ছেলেমেয়েদের, আর না রাজ্যসরকারের আছে কোনো লাভই, বরং সেক্ষেত্রে উল্টে ক্ষতির কর্তৃত্বটাই ওঠে হয়ে মূখ্য! এই বিষয়টার মর্মান্তিক ভবিষ্যৎ পরিণামের প্রতিবিম্ব, কর্তৃপক্ষের রেটিনায় দুর্ভাগ্যবশতঃ যথাশীঘ্র যদি গঠন না'ই হয়, তো ভবিষ্যতে এ হেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে ভেজাল তৈরির আদর্শ কারখানা হিসেবে প্রতিষ্ঠা অর্জন যে করবেনা'ই, তা নিশ্চিত করে বলা বোধহয় সম্ভব নয়।

আর বলাবাহুল্য, রাজ্য সরকারের সমস্ত Primary, Upper Primary ও Higher Secondary -র শিক্ষক-শিক্ষিকা অপেক্ষা সাধারণ মানুষের ভোটগুলোও তো সেখানে থাকে বসে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ঝলমলে আসনে।

 

সরকারী স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের নিজেদের স্কুলের প্রতিই নেই কোনো আস্থা বা আশা-ভরসা, ওনাদের ছেলেমেয়েদের সিংহভাগই পড়া-লেখা করে Private school -এ, আর বিষয়টা যেন আজ হয়ে দাঁড়িয়েছে এমন যে, এই School গুলোতে পড়ে থাকে শুধুমাত্র অসহায় এবং দরিদ্র সম্প্রদায়ের মানুষের বাধ্য

ছেলেমেয়েগুলো!

এদিকে কষ্ট করে একবার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারলেই, এই আরামদায়ক পরিবেশে নেচে-গেয়ে বা ঘুমিয়ে এবং প্রয়োজনাতিরিক্ত অর্থ প্রাপ্তিতে কারিগরেরা ক্রমশই উঠবে বা উঠছে প্রায় কর্মহীন প্রতিবন্ধী ও ভোগী হয়ে, আর পরীক্ষা না দিয়েই কোনোভাবে যদি হয়ে যায় চাকরি, তো সে ক্ষেত্রেও বিষয়টা হয়ে দাঁড়ায় একই!

বিশেষত প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত এ হেন শিক্ষাদানের গতিশীলতায় ২০২১-এর শিক্ষক নিয়োগে রাজ্য সরকার নির্ধারিত Basic Salary যদি ২৮, ৯০০ অর্থাৎ প্রায় ৩০, ০০০ টাকার কাছে হয়, তো বছরের পর বছর লক্ষ-কোটি পরীক্ষার্থী তো হুমড়ি খাবেই।

মানসিক ও দৈহিক পরিশ্রম ছাড়া বা আদৌ না খেটে ওজনে বেশ ভারী অঙ্কের এই অকল্পনীয় ও সুস্বাদু কাগজের টুকরোগুলো পাকস্থলীর কোনো যান্ত্রিক গোলোযোগ ছাড়াই আজ হজম করতে কে না চায়, আর তা যদি আবার হয় একেবারে নিশ্চিত জীবন সুরক্ষার মতন ব্যাপার।  

 

নবম ও দশম শ্রেণীর ইতিহাস শুরু ইউরোপীয় ইতিহাসের চাষ দিয়ে। যেটা অন্তত আমার কাছে নিতান্তই অযৌক্তিক। 

ভারতীয় বিশেষত বাঙালি ছাত্র-ছাত্রীরা, ভারতের যথাসম্ভব ইতিহাস জানতে পারবে না তা কেমনভাবে সম্ভব?

সেখানে এই সমস্ত ক্লাস থেকেই ইউরোপের ইতিহাসকে এত প্রাধান্য দেওয়ার পিছনে রহস্যটাই বা কি?

আর এই সমস্ত শ্রেণীর মানুষদের ছেলে-মেয়েদের বেশিরভাগই, নানান কারণবশত বোধকরি পারেওনা যেতে ইতিহাসের সেই উচ্চতায়, ফলতঃ প্রায় আজীবন'ই ভারতীয় ইতিহাসের আসল-নকলটা চাপা পড়ে থাকে অন্ধকার কালকুঠুরিতে, আর কবর দেওয়া ইতিহাস তো দিলাম ছেড়েই।

একজন ভারতীয় শিক্ষিত নাগরিক হয়ে, সম্পূর্ণ না হলেও, অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি কমপক্ষে ভারতের ইতিহাসটা ভালোভাবে জানাটা বোধহয় বেশ জরুরী।

পঞ্চম থেকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পাশ-ফেল প্রথা না থাকার ভিত নিয়ে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণীতে গিয়ে নন্দলাল বসু'র 'The Place of Art in Education' ও রাশিয়ান লেখক Leo Tolstoy-এর The 'Three Questions' অধিকাংশ ছাত্র-ছাত্রীদের কাছেই যেন এক অকারণ শাস্তি হিসেবে প্রতিপন্ন! 

তাহলে এ ধরণের Education System -এর নৌকায় ভেসে সিংহভাগ সরকারী স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের ভবিষ্যৎ কি Black Hole -এ? 

সংবিধানের সংশোধন বা সংযোজন হতে পারলে, এও বোধহয় সম্ভব যে , রাজ্য ও সর্বোপরি কেন্দ্রের মান্যবর সমাজসেবীরা শপথগ্রহণে সাধারণ জনগণের দুঃখ-সুখে যথাসাধ্য পাশে থাকার যে প্রতিশ্রুতি বর্ষণ করেন, সব গুরুমস্তিষ্কে রেখেই আর্থিক অবস্থা মন্দার কারণে লক্ষ-কোটি বেকারদের চাকরি দিতে না পারার কারণে  যদি হন একান্তই চিন্তিত, তো উঁচু সরকারি চাকরিজীবী ও বিশেষতঃ নিজেদের প্রতি মাসের বেতন থেকে কম করে হাজার দুই টাকা গ্রহণ না করে সেই টাকাগুলোর সংযোজনে অন্তত সমাজের কমপক্ষে কিছুজনের হলেও চাকরির অবিলম্বে ব্যবস্থা করে ফেলার আন্তরিক প্রচেষ্টায় রত হোক তাঁরা?

 

প্রয়োজনাতিরিক্ত অর্থ মানেই তো বিলাসপূর্ণ এক জীবন, সেখানে বিলাস-ব্যসন আগে, না আগে হওয়া উচিৎ জীবন-মৃত্যু সমস্যার সমাধান? আর ভোট দিয়ে রাজা বানায় বা ভবিষ্যতে বানাবে তো তাঁরাই? এক্ষেত্রে শিল্পপতি ও ধনী ব্যবসায়ীদের নয় রাখা যাক ব্র‍্যাকেটেই। মান্যবর নেতা-মন্ত্রী, বিনম্র শ্রদ্ধার সাথে জানাই, আমরা সাধারণ জনগণ আজও আছি বসে সেইসব স্বপ্ন নিয়েই, যা অতি যত্নে সাজিয়ে দেন আপনারাই, আর অকারণে স্বপ্ন পুড়লে, দহন হয় হৃদপিণ্ডেই!

 

আপনারা তো আমাদের'ই আপনজন?

 

তন্ময় সিংহ রায়
কোলকাতা, পশ্চিম বঙ্গ, ভারত

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top