সিডনী বৃহঃস্পতিবার, ৬ই মে ২০২১, ২৩শে বৈশাখ ১৪২৮

টিকা আতঙ্কের নেপথ্য কাহিনী : সাইফুর রহমান


প্রকাশিত:
২১ এপ্রিল ২০২১ ১৫:১৪

আপডেট:
২১ এপ্রিল ২০২১ ১৫:২২

ছবিঃ সাইফুর রহমান

 

যদিও কলেরা, পোলিও, ওলাওঠা বসন্ত প্রভৃতি মহামারিগুলো ভারতবর্ষের এই অঞ্চলগুলোতে দাঁপিয়ে বেড়িয়েছে দির্ঘ্যদিন ধরে। কিন্তু সত্যিকার অর্থে মহামারির বড় ধরনের আঘাতের কথা যদি বলতে হয় তবে সেটা ছিল ইংরেজি ১৮৯৮ সালের প্লেগ। এই প্লেগ মহামারির মধ্যেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, তার ভাইপো অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, স্বামী বিবেকানন্দ ও তাঁর সহ সন্ন্যাসীরা সেবা করেছিলেন পীড়িতদের। ভগিনী নিবেদিতা মৃত্যুভয় তুচ্ছ করে ঝাপিয়ে পড়েছিলেন ব্যধিগ্রস্থদের মৃত্যুমুখ থেকে বাঁচিয়ে তুলতে। সে কথা আমি আমার গত কিস্তির লেখা “মানুষের জন্য মানুষ”-এ বিস্তারিত লিখেছি। ১৮৯৮ সালের প্লেগ রোগটি আসলে শুরু হয়েছিল মুম্বাই শহরে এবং ক্রমশ এর ঢেউ আছড়ে পড়ে এই বাংলায়। পরবর্তীতে সেটা মহামারির আকার ধারণ করে। এই মহামারির বিশদ বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেছেন বাংলা সাহিত্যের যশস্বী লেখক প্রেমাঙ্কুর আতর্থী তাঁর “মহাস্থবির জাতক” গ্রন্থে। সমকালিন পাঠকবৃন্দের অনেকেরই হয়তো অজানা কী এক অসামান্য উপন্যাস এই “মহাস্থবির জাতক”। প্রবীণ পাঠককূলের মধ্যেও কেউ কেউ হয়তো বিস্মৃত হয়েছেন এই গ্রন্থটি সম্পর্কে। প্রায় ৭০০ পৃষ্ঠার বিশাল এই উপন্যাসখানার প্রকাশকাল ১৯৪৫-৪৭। সেকালে উপন্যাসখানা এতোটাই জনপ্রিয় হয়েছিল যে, সেসময়কার লেখকদের অনেকের হৃদয়েই সেটা গভীরভাবে রেখাপাত করেছিল। বর্তমান সময়ের কিংবদন্তিতূল্য সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় কথা প্রসঙ্গে একদিন আমাকে বলেছিলেন- কৈশোরে এই উপন্যাসটি নাকি পড়ে তিনি দারুনভাবে আলোড়িত হয়েছিলেন। ওটা তখন ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছিল কোন একটি পত্রিকায়। সেসময় তিনি অধির আগ্রহে অপেক্ষা করতেন পরবর্তী কিস্তি পড়ার জন্য। সেসময়কার মহামারির বিশদ বর্ণনা প্রেমাঙ্কুর আতর্থী লিপিবদ্ধ করেছেন তাঁর এই “মহাস্থবির জাতক” উপন্যাসটিতে। যে সময়ের কথা লেখক লিখেছেন সে সময় তিনি বালক মাত্র। কিন্তু স্মৃতি থেকে তিনি যে বর্ণনা দিয়েছেন তা ভয়াবহ। মহাস্থবিরের ভাষ্য অনুযায়ী প্লেগ ঠেকাতে সেসময় কর্পোরেশন থেকে বিনামূল্যে টিকা প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে টিকার জন্য জনসাধারণের কোন পয়সা খরচ করতে না হলেও সহজে কেউ টিকা নিতে চাইতো না। বর্তমান সময়ের মতো সেসময়ও ভয়ভীতি ও গুজব নানা ডালপালা বিস্তার করেছিল- এই টিকা নিলে অচিরেই নাকি মানুষের মৃত্যু ঘটবে। এর ফলে যা ঘটার তা-ই ঘটে। রোগটি দ্রুত বিস্তার লাভ করে চারদিকে। সেকালে শিক্ষাদিক্ষা জ্ঞানবিজ্ঞানে হিন্দু ও মুসলমানদের চেয়ে এগিয়ে ছিল ব্রাহ্মসমাজ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রাজা রামমোহন রায় প্রভৃতি আলোকিত মানুষগুলো ছিলেন ব্রাহ্মসমাজের প্রতিভূ। ফলশ্রুতিতে দেখা গেল ব্রাহ্ম ধর্মাবলম্বী মানুষজনই সর্বপ্রথম টিকা নিতে এগিয়ে আসেন।

করোনা রোগটির প্রাদুর্ভাব শুরু হয়েছিল প্রায় ১৪ মাস পূর্বে। তখন পৃথিবীর তাবদ লোকজন কায়মনো বাক্যে শুধু কামনা করতো কবে আবিস্কৃত হবে একটি কার্যকরী টিকা। টিকার জন্য মানুষের হা হুতাসের কোন সীমাপরিসীমা ছিল না। অথচ প্রায় বছরখানেক পরে যখন একটি দুটি নয় পরপর বেশকটা টিকা আবিস্কৃত হলো ঠিকই কিন্তু দেখা যাচ্ছে অনেকের মধ্যেই টিকা নেয়ার প্রতি রয়েছে কিছুটা অনিহা ও আস্থার অভাব। যেহেতু আমার কিছুটা ইতিহাস চর্চা আছে সেজন্য আমি জানি যে, নতুন যে কোন জিনিসের প্রতি-ই মানুষের ঈষৎ ভয় ও অনিহা কাজ করে আর সবসময়। সে কারণেই আমি বিখ্যাত লেখক প্রেমাঙ্কুর আতর্থীর ‘মহাস্থবির জাতক’ উপন্যাসটি থেকে ১৮৯৮ সালে মানুষের টিকা নেয়ার ঘটনাটি এখানে তুলে ধরেছি। তবে আমার কেন জানি মনে হচ্ছে একশ বছরের বেশী সময় পরেও বেশীরভাগ মানুষের মনমানসিকতার আসলে তেমন একটা পরিবর্তন হয়নি।

তবে এ কথাও সত্য যে এতোগুলো মানুষের ভয়ভীতি ও অনিহাকেও এক ফুৎকারে উড়িয়ে দেয়া যায় না। আমি অনেক ভেবে চিন্তে টিকা আতঙ্কের কিছু কারণ খুঁজে পেয়েছি। কারণগুলোর মধ্যে প্রথমত, সাধারণ মানুষ এটা খুব ভালো করেই জানে যে, যে কোন একটি টিকা আবিস্কার বেশ কিছুটা সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। একটি টিকা সাধারণত দু’তিন বছরের আগে তৈরি করা বেশ দুরুহ। কোন কোন টিকা আবিস্কারে তো দশ বিশ বছর সময়ও লেগে যায়। কিন্তু কোভিড ১৯এর ক্ষেত্রে বছর ঘোরার আগেই ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ভাল করে শেষ হতে না হতেই টিকা তৈরি। বর্তমানে বাংলাদেশে যে টিকাটি দেয়া হচ্ছে সেটার নাম অ্যাষ্ট্রাজেনেকা আর এটার আবিস্কারক অক্সফোর্ডের বিজ্ঞানী ড. সারাহ গিলবার্ট। সারাহ এর নেতৃত্বে অক্সফোর্ডের একদল বিজ্ঞানী জানুয়ারি মাস থেকেই ভ্যাকসিন তৈরির কাজ শুরু করেছিলেন। সারাহ ও তাঁর দলের সংক্রমণজনিত রোগের ভ্যাকসিন তৈরির পূর্ব অভিজ্ঞতা রয়েছে। বিশেষ করে এই টিকা আবিস্কারের পূর্বে ইবোলা রোগের টিকাও তিনিই আবিস্কার করেছিলেন। কিন্তু ইবোলা রোগের টিকা আবিস্কারেও তার দু’বছর সময় লেগেছিল।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ব্রিটিশ সরকার ও ব্রিটেনের কয়েকটি দাতব্য সংস্থার অর্থায়নে ২০০৫ সালে গড়ে তোলা হয় জেনার ইনস্টিটিউট। উদ্দেশ্য সংক্রমণজনিত রোগ নিয়ে গবেষণা আর টিকা তৈরি। এডওয়ার্ড জেনারকে বলা হয় ভ্যাকসিনের জনক। প্রায় ২০০ বছর আগে গুটি বসন্তের টিকার অন্যতম আবিষ্কারক ছিলেন বিজ্ঞানী জেনার।

এই মুহুর্তে আমার আরেক প্রাতঃস্মরণীয় বিজ্ঞানীর নাম মনে পড়ছে যিনি দু’দুটি টিকা আবিস্কার করে লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন। ঊনিশ শতকের শেষ ভাগে ওয়ালডেমার মোরডেকাই হাফকিন প্যারিস ও ভারতবর্ষে গবেষণা চালিয়ে কলেরা ও প্লেগ রোগের প্রথম ভ্যাকসিন তৈরি করেছিলেন কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে বসন্তরোগের টিকা আবিষ্কারক ডা. এডওয়ার্ড জেনার কিংবা তারপরে পোলিও রোগের ভ্যাকসিন আবিষ্কারক জোনাস সাল্কর মতো ওয়ালডেমার হাফকিন ভারতে কিংবা ইউরোপে তেমন একটা পরিচিতি পাননি। দির্ঘ্যদিন কলেরায় জীবাণু নিয়ে কাজ করা বিজ্ঞানী হাফকিন প্যারিসে গিনিপিগের ওপর পরীক্ষায় সাফল্যের পর খরগোশ ও কবুতরের ওপর একই ধরণের পরীক্ষা চালান। এরপরও সম্পূর্ণরূপে সন্তুষ্ট হলেন না হাফকিন। ১৮৯২ সালের ১৮ জুলাই ইনজেকশনের মাধ্যমে নিজের দেহে সেই ভ্যাকসিন প্রয়োগ করেন তিনি। এই কাজ করতে গিয়ে তিনি প্রায় মরতে বসেছিলেন বলাচলে। সম্ভবত ডোজের পরিমাণ বেশি হয়েগিয়েছিল। প্রচন্ড জ্বর নিয়ে বেশ কয়েকদিন শয্যাশায়ী ছিলেন। পরে অবশ্য সেরে ওঠেন।

যুগে যুগে নানা ধরনের টিকা আবিস্কারের ফলে কোটি কোটি মানুষের জীবন রক্ষা পেয়েছে, একথা যেমন সত্য ঠিক তেমনি ভুল টিকা আবিস্কার কিংবা প্রয়োগের ফলে নিশ্চিত মৃত্যু ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শত সহ¯্র সাধারণ জনগণ। বড় ধরনের টিকা বিপর্যয়ের ইতিহাস পাওয়া যায় আমেরিকায়, ১৯৭৬ সালে। সেসময় সোয়াইন ফ্লু বিস্তার রোধে যে টিকা দেওয়া হয়েছিল সেটা ছিল ত্রুটিযুক্ত। সেসময় প্রায় সাড়ে চার কোটি লোককে টিকা দেওয়া হয়েছিল। তাদের মধ্যে ৪৫০ জন মানুষ “গুইলাইন ব্যারে সিনড্রম” (Guillain-Barre Syndrome) এ আক্রান্ত হয়েছিলেন। অনেকে হয়তো ভাবছেন এই গুইলাইন ব্যারে সিনড্রম আবার কি বস্তু! এটা হলো এমন এক রোগ যা একজন মানুষের নার্ভ সিষ্টেম কে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেয়। ফলশ্রুতিতে সোয়াইন ফ্লু টিকা নেয়া মানুষগুলো পক্ষাঘাতে (Paralysis) আক্রান্ত হয়েছিল। প্রতি একলাখ রোগির মধ্যে একজন করে এই রোগে আক্রান্ত হয়েছিল। এর পূর্বেও যে টিকা বিপর্যয়ের কথা জানাযায় সেটা হলো “দ্য কাটার ইনসিডেন্ট”। পলিও এই টিকাটি তৈরি হয়েছিল ক্যালিফোনিয়ার কাটার ল্যাবরেটরিতে। ১৯৫৫ সালের এপ্রিল মাসে আমেরিকার পশ্চিম ও মধ্য পশ্চিমাঞ্চলে প্রায় দু’লক্ষ শিশুদের এই কাটার পলিও টিকা দেয়া হয়। কিন্তু এই টিকাটি এতোটাই ত্রুটযুক্ত ছিল যে, এই দু’লক্ষ শিশুর মধ্যে চল্লিশ হাজার শিশু পলিওতে আক্রান্ত হয়েছিল। দু’শতাধিক শিশু পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয় ও দশটি শিশু মৃত্যুবরণ করে।

এছাড়াও এইতো সেদিন ২০০৯ সালে হিনি (Hini) নামের একটি ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা প্রয়োগের ফলে বেশ কিছু রোগির ক্ষেত্রে দেখা গেছে যে তারা পরবর্তীতে নারকোলেপসি তে আক্রান্ত হয়েছে। নারকোলেপসি অর্থ হচ্ছে সময় অসময়ে নিদ্রাভাব কিংবা ঝিমুনী।

অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় টিকা শুধু ত্রুটিমুক্ত হওয়াটাই যথেষ্ট নয় এর সুষ্ঠ সংরক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণও পর্যাপ্ত গুরুত্ব বহন করে। তা না হলে যে কোন সময় যে কোন দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। হাফকিনের কথা আমি পূর্বেই বলেছি যিনি কলেরা ও প্লেগের দু’দুটি রোগের টিকা আবিষ্কার করেছিলেন। তো হয়েছে কি সেই হাফকিন মহাশয়ের টিকা নেয়ার পর ভারতের পাঞ্জাব রাজ্যের মালকোয়াল গ্রামে ১৯০২ সালের মার্চ মাসে ১৯ জন মানুষ ধনুষ্টংকারে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারায়। যেসব সাক্ষ্য প্রমাণ পাওয়া যায় তা থেকে জানা যায় যে পারেল গবেষণাগারে ৪১ দিন আগে তৈরি একটি বিশেষ বোতলের ভ্যাকসিন নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। এ বিষয়ে ভারত সরকার একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে। তারা দেখতে পায় যে বোতল শুদ্ধি করার জন্য কার্বলিক অ্যাসিড ব্যবহার না করে তাপ প্রয়োগের মাধ্যমে তা বিশুদ্ধ করা হয়েছিল। আর এটা করা হয়েছিল মি. হাফকিনের নির্দেশে। কারণ, এইভাবে বেশি সংখ্যক বোতল দ্রুততম সময়ে বিশুদ্ধ করা যেত। এই তাপমাত্রা প্রয়োগের পদ্ধতি তার দু’বছর আগে অর্থাৎ ১৯০০ সাল থেকেই বিশ্বখ্যাত লুই পাস্তুর ইন্সটিটিউটে ব্যবহার হয়ে আসছিল। কিন্তু ব্রিটিশ সরকারের তা অজানা ছিল। তদন্তের পর মি. হাফকিনকে প্লেগ গবেষণাগারের প্রধানের পদ থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয় এবং ভারতীয় সিভিল সার্ভিস থেকে তাকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়। পরবর্তীকালে প্রতিবেদনের দলিল-দস্তাবেজ ঘাটাঘাটি করে লন্ডনের কিংস কলেজের অধ্যাপক ডাব্লু. জে. সিম্পসন ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নালে লেখা এক চিঠিতে যুক্তি তুলে ধরেন যে ভ্যাকসিনের বোতলটি পারেল গবেষণাগারে নষ্ট হয়নি। সেটি নষ্ট হয়েছিল পাঞ্জাবের সেই গ্রামে যেখানে টিকা কর্মসূচি চলছিল।

টিকা গ্রহণকারি জনসাধারণের মধ্যে আরো কয়েকটি বিষয়ে বেশ ধ›দ্ব রয়েছে। কারণ কোন টিকা প্রস্তুতকারি প্রতিষ্ঠানই স্পষ্ট করে বলছে না তাদের এই টিকাগুলো আসলে কতটা সময় কার্যকর থাকবে। ছ’মাস, একবছর, দুবছর। কোন কোন প্রতিষ্ঠান বলছে কমপক্ষে এই টিকা ছ’মাসের জন্য কার্যকরি হবে আর এজন্যই বোধহয় আমার এক বন্ধু পরিহাস করে আমাকে একদিন বললেন- তাহলে কি আমরা এখন টিকা পকেটে নিয়ে ঘুরবো। এ পর্যন্ত আবিস্কৃত চারটি টিকা বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। অক্সফোর্ড আষ্ট্রাজেনেকা, ফাইজার বায়োএনটেক, মর্ডানা টিকা ও সর্বশেষ যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক কোম্পানি নোভাভ্যাক্সের টিকা। কিন্তু তাদের মধ্যে কেউই জোর গলায় বলছে না যে এটা শতভাগ কার্যকরী। কেউ বলছে ৯০% কার্যকর আবার কেউ বলছে ৯৫% কার্যকরী। এই বিষয়গুলোও মানুষের মধ্যে টিকা না নেয়ার বিষয়ে কাজ করছে। দেশের জনসাধারণ এটাও জানে যে এতো হৈ চৈ, ঢাকঢোল পিটিয়ে টিকা দেয়ার আয়োজন করলেও এর পেছনে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ওৎপেতে আছে কিভাবে এই টিকাকে পুঁজি করে নিজের ধনসম্পদ আরো বহুগুণে বৃদ্ধি করা যায়। যেমন ধরুন পূর্বে যে বিজ্ঞানী টিকা আবিস্কার করতো টিকাটি সাধারণত তার নামে হতো, যেমন সাল্ক ভ্যাকসিন, জেনার ভ্যাকসিন ইত্যাদি কিন্তু বর্তমান সময়ের টিকাগুলোর নাম সব বহুজাতিক কোম্পানীর নামে।

বিশ শতকের মাঝামাঝি জোনাস সাল্ক আবিষ্কার করে ফেললেন পোলিয়োর টিকা। মানবসভ্যতায় চিকিৎসাবিজ্ঞানের সে এক যুগান্তকারী অবদান। সাল্ককে যখন জিজ্ঞেস করা হল, টিকাটির পেটেন্ট কার? উত্তরে সাল্ক বলেছিলেন- জনগণের। অর্থাৎ, কোনও পেটেন্ট নেই। সূর্যের কী পেটেন্ট নেওয়া সম্ভব? ফোর্বস ম্যাগাজিনের ২০১২ সালের এক নিবন্ধে হিসেব কষে দেখানো হয়েছে, পোলিয়ো টিকার পেটেন্ট না নিয়ে সাল্ক হারিয়েছেন প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার!

টিকা আতঙ্কের আরেকটি প্রধান কারণ “সূচভিতি” যেটাকে ইংরেজিতে নিডেল ফোবিয়া বলে (Needle Fobia)। আমি বেশ ভালো করে লক্ষ করে দেখেছি বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের মধ্যেই এই সূচআতঙ্ক প্রকট ভাবে কাজ করে। গ্রাম অঞ্চলের মানুষদের মধ্যে এ ধরনের ভয় আরো অধিক। এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনার কথা মনে পড়ল। ঘটনাটি পশ্চিমবঙ্গের একজন বিশিষ্ট লেখক সচ্চিদানন্দ দত্ত রায়ের লেখা “পুরানো বালাম চালের ভাত” গ্রন্থটিতে আমি পড়েছিলাম বেশ কিছু বছর আগে। লেখকের আদিবাড়ি বাংলাদেশের বরিশাল জেলায়। তিনি লিখেছেন- মনে আছে, একবার এত বেশি ইলিশ মাছ উঠতে লাগল যে ইলিশ মাছই লোজনের প্রধান খাদ্য হয়ে উঠল। ফলে, পেট ছেড়ে দিল। কলেরায় মানুষের অবস্থা করুন। খবর পেয়ে থানা (হিজলা) থেকে ইনস্পেক্টর সাহেব সাইকেলে পাইক পেয়াদা নিয়ে বাজারে ঢোল শহরত দিয়ে ইলিশ মাছ বিক্রি কয়েকদিনের জন্য বন্ধ করে দিলেন আর বাজারের সব মাছ মাটিতে পুঁতে দিলেন। কলেরার ইঞ্জেকশন দিতে আরম্ভ হতেই লোকজনের ইলিশ কেনায় ভাঁটা পড়ল। কেউ ‘টু’ শব্দটি করলেন না, সবাই মেনে নিলেন। সুঁচের ফোঁড় না ইলিশ? ফোঁড়ের ভয়ই জয়ী হল।

হাস্যকর হলেও সত্য যে পশ্চিমাদেশগুলোতেও এই সূচভিতি মানুষের সংখ্যা অনেক। একটি জরিপে দেখা গেছে আমেরিকার দশ শতাংশ মানুষ সূচভিতি আতঙ্কে ভুগেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য হলো এই সংখ্যা নাকি আরোও অধিক। আপনাদের মধ্যে অনেকেই হয়তো হলিউডের বিখ্যাত অভিনেতা জাকিচ্যান কে চেনেন। তো হয়েছে কি, একবার অভিনয়ের অংশ হিসেবে ষ্টান করতে গিয়ে তার একটি আঙ্গুল ভেঙ্গে যায়। ভাঙ্গা আঙ্গুল ঠিক করতে হাত অবশ করা প্রয়োজন আর সেজন্য ডাক্তার যেই না জাকিচ্যানের শরীরে ইনজেকশন পুশ করতে উদ্দত হয়েছেন ওমনি জাকিচ্যান ভয়ে কুঁকড়ে বললেন- দাঁড়ান ইনজেকশন দিতে হবে না। আমি নিজেই ভেঙ্গে উল্টে যাওয়া আঙ্গুল স্বস্থানে ফিরিয়ে আনছি। এই বলে ভেঙ্গে যাওয়া আঙ্গুলটি মুঠো করে ধরে স্বজোরে ঘুরিয়ে স্বস্থানে ফিরিয়ে আনলেন।

উল্টে যাওয়া আঙ্গুল স্বস্থানে ফিরিয়ে আনাতে তার কি পরিমাণ ব্যাথা হওয়ার কথা একটু ভেবে দেখুনতো। কিন্তু তারপরও সুইয়ের অল্প একটু ব্যথা সহ্য করার মতো ক্ষমতাও তার নেই।

তবে এর উল্টোচিত্রও আছে। শাওতাল কিংবা যে কোন আধিবাসিরা ইনজেকশন নেয়ার সময় ব্যথা না পেলে নাকি তারা মনে করে সে ঔষধের কোন কার্যক্ষমতা নেই। ১৯৭৩ সালে আমার শশুর সদ্য ডাক্তারী পাশ করে সিলেটের জাফলং অঞ্চলে বদলি হয়েছেন। সেখানে অনেক শাওতাল ও উপজাতিদের বসবাস। আমার শশুরের এমন হাতযশ যে তিনি ইনজেকশন পুশ করলে কেউ ব্যাথা পায় না। একদিন এক শাওতাল মহিলা আমার শশুরকে বলল- আপনার ঔষধের মনে হয় কোন কার্যক্ষমতা নেই। আমার শশুর অবাক হয়ে বললেন- আপনার কেন মনে হল যে আমার ইনজেকশনে কার্যক্ষমতা নেই?

তখন সেই শাওতাল মহিলাটি বললেন- আপনি যখন ইনজেকশন দেন একটু ব্যাথাও পাইনা। অথচ আপনার অমুক ডাক্তার বন্ধু যখন ইনজেকশন দেয় প্রচন্ড ব্যাথা পাই আর তাতেই মনে হয় যেন উনার ইনজেকশন বেশি কার্যকরী। শাওতাল ওই মহিলার কথা শুনে আমার শশুর মশাই তো বেশ অবাক! বলে কি মেয়েটি! একদিন কাছে পেয়ে আমার শশুর যখন তার সেই সতীর্থ ডাক্তার বন্ধুকে জিজ্ঞেস করলেন- কিরে ইনজেকশন দিতে গিয়ে রোগি ব্যাথা পায় কি করে? আমার শশুরের সেই বন্ধুটি তখন বলল- কি করব হুমায়ুন, ইনজেকশন দিতে গিয়ে ব্যাথা না পেলে ওরা মনে করে যে এই ঔষধের কোন কার্যকারিতা নেই। সেজন্য ইনজেকশন দেয়ার পূর্বে সুচের ডগাটি মেঝেতে ঘষে খানিকটা অমসৃণ করে নেই। একথা শুনে আমার শশুরতো বিস্ময়ে একেবারে থ।

আমার ধারণা বাঙালিদের চেয়ে শাওতাল, খাসিয়া, মগ, মুরং প্রভৃতি উপজাতিগুলো বেশি সচেতন কারণ যে বছর মি. হাফকিন কলকাতার বস্তিতে তার টিকার সফল পরীক্ষা চালিয়ে দিলেন, তার পরের বছর আসামের চা বাগানের মালিকরা তাকে আমন্ত্রণ জানান সেখানে গিয়ে বাগানের শ্রমিকদের ওপর তার ভ্যাকসিন প্রয়োগ করতে। তিনি সেখানে হাজার হাজার শ্রমিককে টিকা দেন।

টিকাদানে উৎসাহিত করার জন্য দেশের বড় বড় সব হোমরা চোমরাদের টিকা দেয়ার ছবি টেলিভিশন ও সোস্যাল যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে বেশ ফলাও করে প্রচার করা হচ্ছে। এটি বেশ ভালো টেকনিক। সেকালে মি. হাফকিনও একই কৌশল অবলম্বন করেছিলেন। তিনি ব্রিটিশ শ্বেতাঙ্গ ডাক্তারদের বাদ দিয়ে কলকাতার সব বড় বড় স্থানীয় লোকজন যেমন- ডা. চৌধুরী, ডা. ঘোষ, ডা. চ্যাটার্জি এবং ডা. দত্তদের মতো ভারতীয়দের সাথে নিয়ে কাজ করতেন। তিরি আরও একটা কৌশল অবলম্বন করলেন সেটা হলো, তার উদ্ভাবিত টিকা জনসমক্ষে তিনি নিজের দেহে প্রয়োগ করতেন। উদ্দেশ্য এটা দেখানো যে এটা নিরাপদ।

টিকা প্রদান কর্মসূচি সফল করতে হলে সরকারকে আরো সচেতন হতে হবে। টিকা সম্পর্কে সম্পূর্ণ ও বিস্তারিত তথ্য জনগণকে জানাতে হবে। সেই সঙ্গে হতে হবে আরো বেশি আন্তরিক। সেই হাফকিনের কথাই ঘুরে ফিরে আসে- ভারতীয় ডাক্তারদের সাথে নিয়ে তিনি দিনরাত বস্তিতে বস্তিতে ঘুরতেন। বস্তির মজদুররা কাজে বেরুনোর আগে তিনি তাদের টিকা দিতেন। সন্ধ্যায় ঘরে ফেরার সময়েও লোকজন দেখতে পেত যে মি. হাফকিন তেলের বাতি জ্বালিয়ে বস্তিতে এক মনে কাজ করে যাচ্ছেন।

 

সাইফুর রহমান
গল্পকার ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top