সিডনী শুক্রবার, ৩০শে জুলাই ২০২১, ১৫ই শ্রাবণ ১৪২৮

চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ও অবহেলিত জীবন : অনজন কুমার রায়


প্রকাশিত:
২০ জুলাই ২০২১ ০২:১০

আপডেট:
৩০ জুলাই ২০২১ ১৬:৪১

 

পিঠে কাপড়ের থলে, ভেতরে চা-পাতার কুঁড়ি। পাহাড়ের ঢালু বেয়ে নামতে থাকে দলবদ্ধ ভাবে। এদের বেশির ভাগই নারী। রোদ কিংবা বৃষ্টিতে হার মানতে শিখেনি। তবে, কষ্টের জীবনে ছোটবেলা থেকে হার মানতে শিখেছে। তাই, দু:খের জীবনটাই যেন বার বার হাতছানি দেয়। কেননা, এদেশে তাদের জীবন যাত্রাই শুরু হয়েছিল দু:সহ যাতনার মধ্য দিয়ে। তবে তাদের আছে নিজস্ব ভাষা, আছে আলাদা জীবনধারা ও সংস্কৃতি। বলছিলাম চা-শ্রমিকের দু:খ গাঁথা জীবনী।
ড: সুকুমার বিশ্বাস রচিত "আসামে ভাষা আন্দোলন ও বাঙালী-প্রসঙ্গ ১৯৪৭-১৯৬১” গ্রন্থ থেকে জানা যায়, ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষে শে^তাঙ্গ চা-করেরা যখন চা-বাগান প্রতিষ্ঠা শুরু করেন তখন স্থানীয়ভাবে শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছিল না। ব্রিটিশরা বিহার, উরিষ্যা, অন্ধ্র প্রদেশ, উত্তর প্রদেশসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর লোকজনকে কাজের প্রতিশ্রæতির বিনিময়ে চা-বাগানে নিয়ে আসে। শুরু হয় চা চাষ। শ্রমিকদের শীর্ণ পিঠে চড়ে কারখানায় যায় চা-পাতার বোঝা। এভাবেই ১৮৫৪ সালে সিলেটের মালনীছড়ায় প্রথম বাণিজ্যিকভাবে চা-উৎপাদন শুরু হয়। বর্তমানে ১৬৭ টি চা-বাগানে প্রায় ১ লক্ষ চা শ্রমিক নিয়োজিত আছে। তাদের মাঝে নারী শ্রমিকের সংখ্যাই বেশি।
দেড়শত বছরের অধিক সময়ে অনেক কিছু পরিবর্তন হয়েছে। তবে চা শ্রমিকদের ভাগ্য পরিবর্তনে ছোঁয়া লাগেনি। কষ্টে ভরপুর জীবনে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে কাজ করে গেলেও অনেক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। টিলায় টিলায় পাতা তুলেই পার করে দেয় বছরের পর বছর। তবুও তারা কাক্সিক্ষত সুবিধা ভোগ করতে পাওে না। মাটির তৈরি ছোট ঘওে গাদাগাদি করে জীবন অতিবাহিত করে। যার দু:খ-দুর্দশার করুণ চিত্র "টু লিভস এ্যাÐ এ বাড ”- উপন্যাসে আমরা দেখতে পাই। উপন্যাসে লেখক মুলক রাজ আনন্দ ইংরেজ সাহেব কর্তৃক নির্যাতীত এবং নিষ্পেষিত সমাজের বাস্তবচিত্র আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। যদিও উপন্যাসে চা-কে অলঙ্কৃত কওে বলা হয়েছে 'দু'টি পাতা একটি কুঁড়ি'!
প্রতিবাদ করলেও তাদের দিন বদলের হাওয়া লাগেনি। আজ থেকে শতবর্ষ আগে শোষণের প্রতিবাদে জেগে উঠেছিল। ১৯২১ সালের ২০ মে শোষিত শ্রমিকরা "মুল্লুকে চল”ডাক দিয়ে চা-বাগান ছেড়ে চাঁদপুরের মেঘনা ঘাটে জড়ো হয়েছিল। তাদের উপর নির্বিচারে গুলি চালায় ব্রিটিশ সেনারা। মেঘনার জলে ভাসতে থাকে নিরপরাধ চা শ্রমিকের শত শত লাশ। যারা পালিয়ে বেঁচে যায় তাদের উপর নেমে আসে চরম নির্যাতন। তারপর, প্রাপ্য সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত কওে তাদেরকে আরো কোণঠাসা কওে রাখা হয়। গড়ে উঠে মলিনতায় ভরপুর এক শোষিত সমাজ। যেন দু:খ তাদের জীয়নকাঠি।
১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে চা-বাগানগুলো বিধ্বস্ত হয়ে যায়। স্বাধীনতার পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুরর হমান পরিত্যক্ত চা-বাগানগুলো পুনর্গঠনের চেষ্টা করেন। তাই "বাংলাদেশ টি ইÐাস্ট্রিজ ম্যানেজমেন্ট কমিটি(ইঞওগঈ)” গঠন কওে মালিকদের নিকট হস্তান্তরের ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। এছাড়াও চা শ্রমিকদের বিনামূল্যে বাসস্থান, বেবি কেয়ার সেন্টার, রেশন প্রদান, প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতকরণ, এমনকি সুপেয় পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করেন। অবহেলিত চা শ্রমিকদের ভোটাধিকার প্রয়োগের অধিকারও দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। কিছুকাল অতিবাহিত হবার পর আবারও অবহেলিত গোষ্ঠীতে পরিণতহয়। সেখানে যেমন রয়েছে সুপেয় পানির অভাব, তেমনি স্যানিটেশনের দুরাবস্থা, রয়েছে স্বাস্থ্যের ঝুঁকি। ২০১৮ সালে সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন এ্যাÐ রিসার্চ বাংলাদেশ(ঈওচজই) চা-শ্রমিক নারীদের সমীক্ষায় প্রায় ১৫ শতাংশ নারী জরায় ুক্যান্সারে আক্রান্ত। শিক্ষা নিয়ে ভাবার ফুরসত তাদের নেই। তাই, পারিবারিকভাবে স্বাবলম্বি হবার জন্য শিশুরা স্কুলে যাবার বদলে শিশুশ্রমে জড়িয়ে পড়ে।
বাংলাদেশ চা বোর্ডের তথ্যমতে, ২০১৯ খ্রিস্টাব্দে রেকর্ড পরিমাণ ৯৬.০৭ মিলিয়ন কেজি চা উৎপাদিত হয়। ২০০৯ সালে যেখানে চায়ের উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ৫৯.৯৯ মিলিয়ন কেজি। দিন দিন চায়ের উৎপাদন বাড়লেও শ্রমিকদের মজুরি সে হাওে বাড়েনি। অথচ তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমেই সমৃদ্ধ হতে থাকে আমাদের চাশিল্প। ১৯৮৯ সালে চা উৎপাদনে সারা বিশে ১২তম অবস্থানে ছিল। ২০১৯ সালে নবম স্থান অর্জন করে। যা আমাদের চা শিল্পে সোনালী অর্জন। সে অর্জনটুকু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র হাতে গড়া চা শ্রমিকদেরই অর্জন। তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে সম্ভাবনাময় চা শিল্প দেশের জিডিপি'তে অবদান রাখে।
চা শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণে চা বাগানের মালিকপক্ষের সংগঠন(ইঞঅ) এবং চা শ্রমিক ইউনিয়নের মধ্যে চুক্তি সম্পাদিত হয় প্রতি দুই বছর পর পর। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৭ সালে মজুরি নির্ধারিতহয় ৩২ টাকা পঞ্চাশ পয়সা। ২০০৯ সালে ৪৮ টাকা, ২০১৩ সালে ৬৯ টাকা এবং ২০১৫ সালে ৮৫ টাকা। ২০১৮ সলের চুক্তি অনুযায়ী ৮ ঘন্টা শ্রমের বিনিময়ে শ্রমিকদের মজুরি ১০২ টাকা নির্ধারণ করা হয়। নির্ধারিত ২৩ কেজি চা পাতার চেয়ে কম পাতা উত্তোলন করলে প্রতি কেজি হিসেবে টাকা কর্তন করা হয়। ২০২০ সালের ১৩ অক্টোবর অপর একটি চুক্তি সম্পাদিত হয়। সে চুক্তি অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ১ জানুয়ারী থেকে এ ক্লাস বাগানে দৈনিক ১২০ টাকা, বি ও সি ক্লাসে যথাক্রমে ১১৮ এবং ১১৭ টাকা নির্ধারিত হয়। চুক্তির মেয়াদ গত বছরের ৩১ ডিসেম্বরে শেষ হয়ে যায়। গত ১৪ জুন চা- শ্রমিকদের দৈনিক ন্যূনতম মজুরি ১১৭ টাকা নির্ধারণে সুপারিশ কওে নিম্নতম মজুরী বোর্ডেও ওয়েবসাইটে প্রজ্ঞাপনে প্রকাশ করা হয়। যা থেকে চা শ্রমিকদের মাঝে অসন্তুষ্টি দেখা দেয়। শ্রমিকরা দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা করার দাবি জানিয়েছে। তাদের মতে, ১৮৫৪ সালে এদেশে চা চাষ শুরু হলে বর্তমানে চা শিল্পের বয়স ১৭২ বছর। অথচ তাদের দৈনিক মজুরি ১৭২ টাকাও হয়নি।
কষ্টে যাদের জীবনধারা চালিত হয় স্বপ্ন তাদের বাঁচতে শেখায়। যারা স্বপ্নই বুনন করতে জানে না তারা 'বেঁচে' থাকার মাঝেই সার্থকথা খুঁজে নেয়। আর, বেঁচে থাকার জন্য প্রতি মুহূর্তে জীবন যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হয়। তাই, জীবন-যাপনের মান, মুদ্রাস্ফীতি, দ্রব্য মূল্যেও কথা বিবেচনায় নিয়ে দৈনিক মজুরি প্রদান করলে তাদের সহায়ক হবে। না হয় নির্ধারিত মজুরির বিনিময়ে তাদের জীবনযাত্রার সাথে খাপ খাওয়ানো কষ্টকর হবে।

 

অনজন কুমার রায়
ব্যাংক কর্মকর্তা ও লেখক

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top