সিডনী বৃহঃস্পতিবার, ৯ই ডিসেম্বর ২০২১, ২৫শে অগ্রহায়ণ ১৪২৮

আওয়ামী লীগের শত্রু এখন আওয়ামীলীগ : মাহবুবুল আলম


প্রকাশিত:
২২ নভেম্বর ২০২১ ১২:৩২

আপডেট:
২২ নভেম্বর ২০২১ ১২:৩৪

ছবিঃ : মাহবুবুল আলম

 

আওয়ামী লীগের শত্রু এখন বিএনপি জামায়াত বা অন্য কোন দল নয়! আওয়ামী শত্রু এখন আওয়ামী
লীগই। চলমান ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে এমনই একটি চিত্র ফুটে ওঠেছে। এপর্যন্ত যতটা ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন হয়েছে এর মধ্য বেশির ভাগ ইউপিতেই আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরা জিতেছে। বিএনপি, জামায়াত বা অন্যান্য দলের স্থানীয় পর্যায়ের নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অনেক ইউপিতে জয়লাভ করেছে। যদিও দলীয় বা জোটগতভাবে তারা নির্বাচন বয়কটের কথা বলে আসছে। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে কিন্ত এ বয়কটের কোন প্রতিফল দেখা যাচ্ছে না; স্থানীয় পর্যায়ের নেতারা নির্বাচনে যেমন অংশগ্রহণ করছে এবং যেখানে এমন প্রার্থী নেই সেখানে আওয়ামী লীগের নৌকা মার্কার প্রার্থীকে হারানোর জন্য আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীকে ভোট দিচ্ছে। পত্রিকায় প্রকাশিত দ্বিতীয় ধাপের কয়েক কিছু ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের ফলাফলের দিকে তাকালেই সারাদেশের এ নির্বাচনের হালচাল স্পষ্ট হয়ে যাবে। আসুন এখন কয়েকটি ইউপি নির্বাচনের ফলাফলের দিকে চোখ বুলিয়ে নেয়া যাক।
খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার রঘুনাথপুর ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী মনোজিৎ বালা ৬ হাজার ৬০৩ ভোট পেয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী একই দলের আরেক বিদ্রোহী এএম আমিনুর রহমান। তিনি পেয়েছেন ৪ হাজার ৬২২ ভোট। এ দুই বিদ্রোহী প্রার্থীর দাপটে কোণঠাসা আওয়ামী লীগের প্রার্থী খান সাকুর উদ্দীন ভোট পেয়েছেন মাত্র ১ হাজার ৫৯১। এখানে নৌকা মার্কার প্রার্থী জামানত হারিয়েছে।
পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার বুড়াবুড়ি ইউপি নির্বাচনে ৩ হাজার ৩১৫ ভোট পেয়ে দ্বিতীয়বারের মতো চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী মো. তারেক হোসেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের আরেক বিদ্রোহী কামারুজ্জামান কামু ভোট পেয়েছেন ২ হাজার ৮৬৬টি। আওয়ামী লীগের প্রার্থী মো. শেখ কামাল এতই কম ভোট পেয়েছেন যে, তিনিও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আসতে পারেননি। এমনকি জামানতও রক্ষা করার মতো ভোটও পাননি।
১৩৮টি ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে প্রতিযোগিতায় আসতে পারেননি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা। এসব প্রার্থী এতই কম ভোট পেয়েছেন যে তারা দ্বিতীয় অবস্থানও অর্জন করতে পারেননি। এই ১৩৮টি ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে দুটিতে জাতীয় পার্টি ও বাকি ১৩৬টিতে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ভোট পাওয়ার দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বেশিরভাগই শাসক দলের মনোনয়ন না পেয়ে বিদ্রোহী হিসাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এখানে ২০২টি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা। দ্বিতীয় ধাপের ফল ঘোষিত ৮৩৩টির মধ্যে ৩৪৮টি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে হেরে গেছেন আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ৭৭ জনসহ ৪৮৫টিতে জয় পেয়েছেন। দ্বিতীয় ধাপে স্বতন্ত্ররা ৩৩০, জাতীয় পার্টি ১০, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ৪ ও অন্য চারটি রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা একটি করে ইউনিয়নে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন।

এমন ধরণের ফলাফলে আ. লীগের তৃণমূলে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাথে কথা বলতে গিয়ে তারা প্রার্থী মনোনয়নে "মনোনয়ন বাণিজ্য’কে দায়ী করেছেন। তারা মনে করছেন চলমান ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মনোনয়নে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তুলে বলেছেন,' টাকার বিনিময়ে মনোনয়ন পাইয়ে দেওয়ার বিষয়টির জন্য স্থানীয় সংসদ সদস্যরাই বহলাংশে দায়ী। তারা আরও বলছেন, দলের পুরনো ও যোগ্য নেতাদের বাদ দিয়ে টাকার জোর আছে এমন নেতাদের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। এ কারণে অনেক ইউপিতে ক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা নৌকার বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন। ফলে দ্বিতীয় ধাপের ইউপি নির্বাচনে ৪২ শতাংশ ইউনিয়ন পরিষদে নৌকা পরাজিত হয়েছে।
এ ব্যাপারে সাবেক ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম এক টিভি সাক্ষাৎকারে বলেছেন, "মনোনয়ন বানিজ্য এভাবেই পরাজিত হোক জয় বাংলা। ধন্যবাদ তাদের যারা আজীবন আওয়ামীলীগ করা ত্যাগী জনপ্রিয় প্রার্থীকে জয়ী করেছেন।আপনারাদের দ্বারাই বন্ধ হবে মনোনয়ন বানিজ্য। কিছু নেতার বানিজ্য আপনার আদর্শকে ভূ লুন্ঠিত করেছে। আপনার সেই দলকে বিব্রত করেছে। দলকে ভালোবাসি, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ লালন করি মনে প্রাণে - তাই চুপ থাকতে পারি না।দেখেও না দেখার ভান করতে পারি না। আপনারা ,যারা এভাবে দলকে অপমান করলেন , তাদের ক্ষমা নেই।অর্থের কাছে বিক্রি করলেন প্রার্থীতা ! দলের জয় পরাজয় ! আপনারা আর যাই হোন-কখনো দলকে ও বঙ্গবন্ধুকে ভালোবেসেছেন -এ কথা বলবেন না।"
এখানেই শেষ নয় এনির্বাচনের বাকি যে কয়টি ধাপ রয়েছে সেখানেও স্থানীয় পর্যায়ে আওয়ামীলীগ আওয়ামী লীগে মারদাঙ্গা, হামলা-মামলা, দলাদলি রেসারেসি পুরনো বিভেদ মাথাচারা দিয়ে ওঠেছে। এরই মধ্যে অনেক আহত নিহতের খবরও আছে। "ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের মাঠপর্যায়ে একধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। কোনোভাবেই বিদ্রোহী প্রার্থীদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। মনোনয়ন–বাণিজ্য নিয়ে দলের সব পর্যায়েই এখন আলোচনা হচ্ছে। ভোটের মাঠে আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ হয়ে উঠেছে আওয়ামী লীগ। অবৈধ অস্ত্র ব্যবহারের পাশাপাশি সংঘাত, হানাহানি ও প্রাণহানির ঘটনা বেড়ে গেছে। দলীয় প্রতীকে এ নির্বাচন হলেও এখন আওয়ামী লীগের ভেতর থেকেই ইউনিয়ন পরিষদের ভোট দলীয়ভাবে না করার দাবি জোরালো হচ্ছে। নৌকা প্রতীকের প্রার্থীকে হারাতে দলের ভেতরেই একটি অংশ উঠেপড়ে লেগেছে। এমন পরিস্থিতিতে দলের নীতিনির্ধারকেরা বিব্রত। কিন্তু কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাবে, সে বিষয়ে করণীয় ঠিক করতে হিমশিম অবস্থায় পড়েছেন দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব।"
(দৈনিক প্রথম আলো)
শেষ করতে চাই এ বলেই যে, দেশের সর্ববৃহৎ প্রাচীন দল আওয়ালীগে ইউপি নির্বাচন নিয়ে যে আত্মঘাতি
খেলা শুরু হয়েছে, এ নিয়ে দলটিতে যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়ে তা নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারলে তা বর্তমান শাসকদল আওয়ামিলীগের জন্য কতটা সংকট বয়ে আনবে তা বলা খুব কঠিন কিছু নয়। তাই বলতে হচ্ছে "সাধু সাবধান"!

 

মাহবুবুল আলম
কবি-কথাসাহিত্যিক, কলামিস্ট ও গবেষক



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top