সিডনী রবিবার, ৩রা জুলাই ২০২২, ১৯শে আষাঢ় ১৪২৯

স্বপ্ন পদ্মা সেতু : কাইউম পারভেজ


প্রকাশিত:
২২ জুন ২০২২ ০৯:০১

আপডেট:
৩ জুলাই ২০২২ ১৪:৩১

ছবিঃ : কাইউম পারভেজ

 

গল্পটা শুনেছিলাম চরমপত্রখ্যাত লেখক সাংবাদিক এম আর আখতার মুকুলের কাছ থেকে। একাত্তরের উত্তাল মার্চের গল্প। পঁচিশে মার্চের পর ঢাকা শহরে ঘন ঘন কারফিউ জারি করা হচ্ছে। মানুষ সব আতঙ্কিত এবং বিরক্ত। পুরোন ঢাকায় এক চা দোকানে একজন ঢাকাইয়া রিক্সাওয়ালা বিরক্ত হয়ে বলছেন – হালায় হালায় কারফিউ দিয়া ডর দেহায়। কারফিউর মাইদ্যে মাইয়া হইলো মহল্লার মাইনসে জিগাইলো মাইয়ার নাম কি রাখছো। ক্যান নাম তো রাখছি কারফিউ বিবি। আবে হালায় মাইয়ার নাম ভি রাখছি কারফিউ বিবি আর হেরা আমগো কারফিউ দিয়া ডর দেহায়।
( আসছে ২৬ জুন এম আর আখতার মুকুলের ১৮তম প্রয়াণ দিবস। তাঁর প্রসঙ্গটা আসাতে তাঁর প্রয়াণ দিনের এ কথাটিও মনে হলো। করুণাময় আল্লাতায়ালা তাঁকে জান্নাতবাসি করুন – আমিন )
তাঁর এ গল্পটা মনে পড়লো সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের গৃহবধু এ্যানি বেগমের একসঙ্গে তিন শিশু জন্ম দেয়ার ঘটনা এবং তাদের নাম করণ করাকে নিয়ে। হাসপাতালে যখন এ্যানি বেগমের একটি সুস্থ সবল পুত্র এবং দুটি কন্যা সন্তান জন্ম নিলো তখন উপস্থিত ডাক্তার নার্স এবং শিশুদের বাবা আশরাফুল ইসলাম অপুসহ সবাই আনন্দে বিভোর। কি নাম হবে শিশু গুলোর? দেশের আইকন স্বপ্নের পদ্মা সেতুর উদ্বোধন ২৫ জুন তা নিয়ে সবাই যখন দারুণ এক উত্তেজনায় অস্থির তখন ডাক্তার দুষ্টুমী করে বললেন পদ্মা সেতুর উদ্বোধনের মাসে হইছে তাই ওগো নাম হইবো স্বপ্নের পদ্মা সেতু। মা এ্যানি আর বাবা অপুর কাছে দুষ্টুমীটাই যেন তাঁদের মনের কথা হয়ে গেল। প্রাণের মাঝে এক হিন্দোল খেলে গেল। আবেগে আপ্ল‍ুত হয়ে দু’জনেই বলে উঠলেন – ঠিকই কইছেন আমাগো পোলার নাম হইবো স্বপ্ন আর এক মাইয়ার নাম পদ্মা আর আরেক মাইয়ার নাম হইবো সেতু। স্বপ্নের পদ্মা সেতুর বাস্তবায়নের আবেগ নিয়ে উপস্থিত সবার মধ্যে যেন খুশীর বন্যা বয়ে গেল।
যে সময়ে নিন্দুকরা সুশীলরা আর বিরোধী রাজনীতিবিদরা এখনো নিয়মিত পদ্মা সেতুর বাস্তবায়ন নিয়ে নিন্দা কুৎসা এবং অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে সে সময়ে এ্যানি বেগম আর অপু দম্পতির এ যেন তাদের গালে এক চপেটাঘাত। আমার কানে বাজছে তাঁরা যেন সেই ঢাকাইয়া কারফু বিবির পিতার মত করেই বলছেন – আবে হালায় বেউকুফের দল পদ্মা সেতু লইয়া আজাইরা ফাল পাড়স – হালায় নিজের ঘরের মাইধ্যেই স্বপ্নের পদ্মা সেতু রাইখা দিছি – তোরা আমগো পদ্মা সেতু লইয়া কথা হুনাস।
আহা কি আবেগ কি ভালবাসা কি দেশাত্ববোধ – এগুলোই থাকে সাধারণ মানুষের মাঝে যারা রাজনীতি বোঝে না আঁতলামী বুঝতে চায় না। এরা বোঝে অন্ন বস্ত্র চিকিৎসা শিক্ষা বাসস্থান নিরাপত্তা আর সহনীয় জনজীবন। এরা পদ্মা সেতুতে দেখছে উন্নত জনজীবন – দেখছে ব্যবসা, চাকরী সহজ পরিবহন। দেখছে দ্রুত যাতায়াত। দেখছে টাইম ইজ মানি। গোটা দেশের মানুষের মাঝে এক অভূতপূর্ব প্রাণচাঞ্চল্যতা। ১৬ই ডিসেম্বরের বিজয়ের মত আর এক বিজয়ের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে দেশ ২৫শে জুনের অপেক্ষায়।
দেশের ভয়াবহ বন্যায় যদিও মানুষের মনে সেই উত্তেজনা একটু ম্রীয়মান তবে পরিস্থিতি এমন থাকবে না। সরকারসহ সবাই এই বন্যা মোকাবেলা করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। তবুও সরকাররের কাছে আবেদন পদ্মা সেতুর আসন্ন উদ্বোধন অতিমাত্রায় জাঁকজমক করার কথা না ভেবে বরং সেটা বন্যার্তদের সাহায্য সহযোগীতায় নিবেদিত হোক। সেটাই তাদের কাছে আরেকটি পদ্মা সেতু পাওয়ার আনন্দ বিবেচিত হবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সাধুবাদ তাঁর সাহসিকতার জন্য যা অনেকের নেই। বিশ্ব ব্যাংক যখন পদ্মা সেতুর অর্থায়ণের জন্য মিথ্যা ষড়যন্ত্রের অজুহাতে মুখ ফিরিয়ে নিলো তখন কোত্থেকে এই দুর্মর সাহস তাঁর উপর ভর করলো – তিনি বলে বসলেন নিজেদের টাকায় আমরা পদ্মা সেতু বানাবো ইনশা আল্লাহ। তিনি বানিয়ে দেখিয়েছেন। অনেকেই অনেক কথা বলেছেন এবং এখনো বলছেন। শেষমেশ হয়তো তাঁরা বলবেন পদ্মা ব্রীজে কোন বরকত নেই। পাঠক ভাবছেন এটা আবার কি বললাম। পদ্মা ব্রীজে কোন বরকত নেই। মানে কি? নিচের গল্পটা এ বিষয়টাকে খোলাসা করে দেবে আশা করি।
দুই প্রতিবেশী কিন্ত দারুণ রেশারেশি। তার উপর কম্পিটিশন আর পরশ্রীকাতরতা। এদের এটা হলে ওদের ওটা আরো ভাল হতে হবে – এমন সব ব্যাপার। তো দুই বাড়ীর দুই ছেলে শ্যামল আর কমল। শ্যামল লেখাপড়ায় খুব ভাল ওদিকে কমলের ক্লাস আর এগোয় না। ঘুরে ফিরে একই ক্লাসে বছরের পর বছর। একদিন কমলের মা কমলের বাবাকে বলছে শুনেছো ওদের বাড়ীর ছেলেটা নাকি ম্যাট্রিক পাশ করেছে। তোমারটা তো এখনো চারবার একই ক্লাসে। কমলের বাবা বলছে আরে রাখো তোমার ম্যাট্রিক পাশ অমন ম্যাট্রিক পাশ হাজারে হাজারে রাস্তায় ফ্যাঁ ফ্যাঁ করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ওই পর্য্যন্তই। আর পাসটাশ হবে না। এরপর একদিন কমলের মা বললো – শুনেছো ওই শ্যামল বিএ পাশ করেছে। আরে বিএ পাশ করলে কি হবে কোন চাকরী পাবে না। একদিন শ্যামলের চাকরী হলো। শুনে কমলের বাবা বললেন আরে চাকরী পেলেই হলো – দেখো না মাইনে পায় কিনা।
আরেকদিন বিকেলে প্লেটে করে কয়েকটা মিষ্টি এনে কমলের বাবাকে খেতে দিলেন ওর মা। কমলের বাবা জিজ্ঞেস করলেন এ কিসের মিষ্টি? তুমি না বলেছিলে শ্যামল চাকরী পেলেও মাইনে পাবে না। প্রথম মাইনে পেয়ে মিষ্টি পাঠিয়েছে। নাও এবার গ্যেলো। মিষ্টি খেতে খেতে কমলের বাবা বলছেন – আরে ও মাইনেতে কোন বরকত নেই।

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top