সিডনী শনিবার, ২৭শে ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১৫ই ফাল্গুন ১৪২৭


শাম্মী আক্তার : গানে যাঁকে ভালোবাসা'র অনুভুতিতে বাঁচিয়ে রাখবেন চিরকাল : অশ্রু বড়ুয়া


প্রকাশিত:
৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ১২:৫৫

আপডেট:
৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ১৭:৪১

ছবিঃ শাম্মী আক্তার

 

সংগীত পরিচালক সত্য সাহা আর গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ার তখন অবিচ্ছেদ্য অংশ। গান নিয়েই যাঁদের ধ্যানজ্ঞান। ওই সময়টাতে তাঁদের গানে সাবিনা ইয়াসমিন এবং রুনা লায়লা বেশ নিয়মিত।

হঠাৎ একদিন গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ার সত্য সাহা-কে বললেন, আমাদের গানগুলো কেমন যেন এক রকম হয়ে যাচ্ছে; ভিন্নতা দরকার। শিল্পীর ক্ষেত্রেও ভিন্নতা প্রয়োজন। তাঁদের হাতে তখন ছিল ‘অশিক্ষিত’ ছবিটির কাজ। দুজনে সিদ্ধান্ত নিলেন-নতুন কন্ঠ চাই। যেমন কথা তেমন কাজ। ছবিতে নতুন কন্ঠে গাওয়ানো হলো দুটি গান-

 

-আমি যেমন আছি তেমন রব বউ হব না রে

-ঢাকা শহর আইসা আমার আশা ফুরাইছে

 

এই গান দুটি দারুণ জনপ্রিয়তা পেল। গান দুটির জনপ্রিয়তার কারণে তাঁকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। অসম্ভব রকম ফোক মেলোডির মিশ্রনের কন্ঠের এই শিল্পী রাতারাতি পেয়ে গেলেন তারকা খ্যাতি।

বলছি- প্রয়াত গায়িকা শাম্মী আক্তার'র কথা। যিনি চলে গেছেন সব অনুভূতির সীমানা ছাড়িয়ে।  গত ১৬ জানুয়ারি ছিল অত্যন্ত বিনয়ী এবং গুনী এই কন্ঠ সঙ্গীত শিল্পীর তৃতীয় প্রয়াণবার্ষিকী। আজকের এদিনেও তাঁর স্মৃতির প্রতি রইল এক হৃদয়ের নিংড়ানো ভালোবাসা ও বিনম্র শ্রদ্ধার্ঘ্য।

 

স্বাধীন বাংলাদেশের আগেই শিল্পী হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিলেন শাম্মী আক্তার। তখনকার রেডিওতে খুব শোনা যেত তাঁর গান। একটা সময়ে নিজেকে চলচ্চিত্রের গানেই সমর্পিত করেন।

আজিজুর রহমান পরিচালিত 'অশিক্ষিত' ছবির মাধ্যমে চলচ্চিত্রের গানে কণ্ঠ দেয়া শুরু করেন তিনি। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে সিনেমায় গেয়েছেন তিন শতাধিক গান। তাঁর গাওয়া অসংখ্য গান হয়ে আছে কালজয়ী। যে গান আজও শ্রোতাদের মন মাতায়-জাগায় দোলা।

 

ইংরেজি ১৯৫৫ সাল ২২ সেপ্টেম্বর। যশোরের তালতলা গ্রামে নানা বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন শাম্মী আক্তার। শামীমা আক্তারকে পরিবারে আদর করে ‘শাম্মী’ ডাকার ফলে শাম্মী আক্তার নামেই তিনি পরিচিতি লাভ করেন। যশোরে জন্ম হলেও তিনি বেড়ে উঠেছেন খুলনায়। তাঁর বাবা শামসুল করিম, মা রাবেয়া খাতুন। বিশেষ করে মায়ের উৎসাহেই শাম্মীর সংগীত শিক্ষা শুরু হয়। মাত্র ছয় বছর বয়সেই গানের জগতে তাঁর হাতেখড়ি হয় বরিশালের ওস্তাদ গৌরবাবুর কাছে।

বাবা ছিলেন সরকারি চাকরিজীবি। বাবার বদলির সুবাদে দেশের কয়েকটি জেলায় বিভিন্ন শিক্ষকের কাছে সংগীতের তালিম নেওয়ার সুযোগ পান শাম্মী আক্তার। যাঁর মধ্যে রাজবাড়ী ও খুলনায় সংগীত শিক্ষা নেন- বামনদাস গুহ রায়, রণজিৎ দেবনাথ, সাধন সরকার, নাসির হায়দার ও প্রাণবন্ধু সাহার কাছে।

 

ইংরেজি ১৯৭০ সাল। খুলনা বেতারে তালিকাভুক্ত হন-শাম্মী আক্তার। বেতারে আধুনিক গানের পাশাপাশি করতেন নজরুল সংগীতও। প্রথম বেতারের গানে কণ্ঠ দেন-নজরুল সঙ্গীত। গানটি ছিল নজরুলের ‘এ কি অপরূপ রূপে মা তোমায়’।

 

ইংরেজি ১৯৭৪ সাল। বাংলাদেশের ট্রান্সকিপশন সার্ভিস আয়োজিত লোকসংগীত ও উচ্চাঙ্গসংগীত উৎসবে খুলনার আঞ্চলিক গান পরিবেশন করেন শাম্মী আক্তার। এটাই ছিল ঢাকায় তাঁর প্রথম সংগীত পরিবেশনা।

 

ইংরেজি ১৯৭৫ সাল। গান গাওয়ার আমন্ত্রণ পেয়ে খুলনা থেকে ঢাকায় চলে যান শাম্মী আক্তার। নিয়মিত গাইতে শুরু করেন বেতার ও টেলিভিশনে।

 

ইংরেজি ১৯৭৭ সাল, ২২ ফেব্রুয়ারি। শিল্পী আকরামুল ইসলামের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন-শাম্মী আক্তার।

ব্যক্তিজীবন তাঁদের সংসারে কমল ও সাজিয়া নামের দুই সন্তান রয়েছে।

 

ইংরেজি ১৯৮০ সাল। 'অশিক্ষিত' ছবির মাধ্যমেই চলচ্চিত্রে প্লেব্যাকে শাম্মী আক্তার'র অভিষেক ঘটে। অভিষেকেই জোড়া হিট দিয়ে প্লেব্যাকে নিজের আসন পাকা করেছিলেন এই গায়িকা। চলচ্চিত্রের গানে সাফল্য তাঁকে শ্রোতাদের খুব কাছে নিয়ে যায়। চলচ্চিত্রে প্রায় তিনশ গানে কণ্ঠ দেন শাম্মী আক্তার।

মোস্তফা আনোয়ার পরিচালিত নায়ক রাজ রাজ্জাক-কবরী অভিনীত 'কাজল লতা' চলচ্চিত্র। গান লিখলেন-গীতিকার মোহাম্মদ রফিকুজ্জামান।

 

'এই রাত ডাকে এই চাঁদ ডাকে হায় তুমি কোথায়’

 

গানটির সুর ও সঙ্গীতে ছিলেন-খোন্দকার নুরুল আলম। গানটিতে কণ্ঠ দিয়ে তুমুল জনপ্রিয়তা পান শাম্মী আক্তার। এই গানে তাঁর সঙ্গে দ্বৈতভাবে কণ্ঠ দিয়েছিলেন সুবির নন্দী। শাম্মী আক্তার'র গাওয়া চলচ্চিত্রের বেশির ভাগই গানই জনপ্রিয় যা এখনো কালজয়ী হয়ে আছে। শাম্মী আক্তার তাঁর জাদু-মাখা কণ্ঠে ফোক ও মেলোডিকে এত সুন্দরভাবে আয়ত্তে এনেছিলেন যা অন্য শিল্পীদের কাছেও ছিল বেশ ঈর্ষণীয়।

নন্দিত এই কণ্ঠশিল্পী চলচ্চিত্রের গান গেয়েই পেয়েছেন অসামান্য খ্যাতি। তাঁর মিষ্টি সুরেলা কণ্ঠে কালজয়ী হয়েছে অনেক গান। তাঁর গাওয়া জনপ্রিয় উল্লেখযোগ্য কিছু গান।

 

১. ঢাকা শহর আইসা আমার আশা পুরাইছে

২. ভালোবাসলে সবার সাথে ঘর বাঁধা যায় না

৩. ঐ রাত ডাকে ঐ চাঁদ ডাকে হায়রে তুমি কোথায়

৪. বিদেশ গিয়া বন্ধু তুমি আমায় ভুইলো না

৫. মনে বড় আশা ছিল তোমাকে শুনাবো গান

৬. ভালোবাসলেই সবার সাথে ঘর বাঁধা যায় না

৭. আমার মনের বেদনা বন্ধু ছাড়া বুঝে না

৮. আমি তোমার বধূ তুমি আমার স্বামী

৯. আমি যেমন আছি তেমন রবো বউ হবো না রে

১০. আমার নায়ে পার হইতে লাগে ষোল আনা

১১. ঝিলমিল ঝিলমিল করছে রাত

১২. চিঠি দিও প্রতিদিন চিঠি দিও

১৩. খেলিব প্রেমের পাশা

১৪. নেও গো আমারে কাছে ডেকে নেও

১৫. তুমি আমার বন্ধু

 

ইংরেজি ২০১০ সাল। জাকির হোসেন রাজু পরিচালিত ও শাকিব খান-রোমানা অভিনীত ‘ভালোবাসলেই ঘর বাঁধা যায় না’ ছবির শিরোনাম সংগীতে কণ্ঠ দেন শাম্মী আক্তার। গীতিকার মাহফুজুর রহমান মাহফুজের কথায় শেখ সাদী খানের সুর ও সঙ্গীতে 'ভালোবাসলেই সবার সাথে ঘর বাঁধা যায় না’ গানটির জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছিলেন শাম্মী আক্তার। এছাড়াও তাঁকে ‘চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ডস’-এ আজীবন সম্মাননা দেওয়া হয়।

 

চলচ্চিত্রের গান ছাড়া রেডিও-টেলিভিশনের জন্যও বেশ কিছু গান রেকর্ড করেন কন্ঠশিল্পী শাম্মী আক্তার। তন্মধ্যে- প্রখ্যাত গীতিকার নজরুল ইসলাম বাবু'র লেখা এবং বরেণ্য সুরকার শেখ সাদী খান'র সুর ও সঙ্গীতে-

 

'আমি বৃষ্টিতে ভেজা রজনীগন্ধা'

আধুনিক এই গানটি শুদ্ধ সঙ্গীত শ্রোতামহলে বেশ প্রশংসার দাবি রাখে।

নিভৃতচারী গুণী মানুষ ছিলেন শাম্মী আক্তার। গান গাওয়াটাকেই জীবনের ধ্যান ও জ্ঞান হিসেবে নিয়েছিলেন তিনি। আমার চোখে যেটুকু মনে হয়েছে-প্রচার, চাকচিক্য কোনোদিন তাঁকে টানেনি। অন্তত আমি তাঁকে যেভাবে দেখেছি, খুবই সাধারণ মানুষ হিসেবেই তিনি ধরা দিয়েছেন। যা তাঁর প্রতি আরও শ্রদ্ধাশীল করেছে আমাকে।

পুরোদস্তুর একজন গানের মানুষ হলেও চলচ্চিত্রের সেন্সর বোর্ডের একজন সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি।

 

ইংরেজি ২০১২ সাল। ক্যানসারে আক্রান্ত হন শাম্মী আক্তার। তারপর কেটে গেছে ছয়টি বছর। ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার পর অন্তরালে চলে যান শাম্মী আক্তার। শেষ বয়সে দুই নাতি আর্শ ও আরিবের সঙ্গেই সময় কাটতো শাম্মী আক্তারের।

 

২০১৮ সাল, ১৬ জানুয়ারি। পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে ক্যান্সারের সঙ্গে যুদ্ধ করছিলেন শাম্মী আক্তার। তবুও ছেড়ে যায়নি মরণব্যাধী ক্যানসার। শেষ রক্ষা হলো না কিছুতেই। শেষতক চিরতরেই কেড়ে নিলো তাঁর প্রাণ। মাত্র ৬২ বছর বয়সেই শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন এই শিল্পী।

শাম্মী আক্তার চলে গেছেন সব অনুভূতির সীমানা ছাড়িয়ে। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া গান তাঁকে ভালোবাসা'র অনুভূতিতে বাঁচিয়ে রাখবেন চিরকাল।

 
 
অশ্রু বড়ুয়া
গীতিকবি, সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক
বাংলাদেশ টেলিভিশন
 


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top