সিডনী বৃহঃস্পতিবার, ৯ই ডিসেম্বর ২০২১, ২৫শে অগ্রহায়ণ ১৪২৮


বাংলাদেশের রবীন্দ্রকন্যা: ডঃ সনজিদা খাতুন : ডঃ সুবীর মণ্ডল


প্রকাশিত:
১৮ নভেম্বর ২০২১ ১৫:৪৬

আপডেট:
৯ ডিসেম্বর ২০২১ ১৯:৩৮

ছবিঃ ডঃ সনজিদা খাতুন

 

কবি শঙ্খ ঘোষ একবার তাঁর সম্পর্কে লিখেছিলেন, “গান তাঁর জীবিকা নয়, গান তাঁর জীবন, চারপাশের মানুষজনের সঙ্গে মিশে যাওয়া এক জীবন। ধর্মতলা স্ট্রিটের প্রথম পরিচয়ে জেনেছিলাম যে দেশের আত্মপরিচয় খুঁজছেন তিনি রবীন্দ্রনাথের গানে, আর আজ জানি যে সে-গানে তিনি খুঁজে বেড়াচ্ছেন নিজেরই আত্মপরিচয়।” একুশে ভাষা এসেছিল তাঁর মননে, একাত্তরে সুরের আগুন কন্ঠে উঠেছিল তাঁর, বৃহত্তর বাঙালি জীবনের বৌদ্ধিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে সর্বতোভাবে জড়িয়ে থেকে বহু মানুষের কাছে হয়ে উঠেছেন বড়ো আপনজন, ছায়ানটের ‘মিনু আপা’ থেকে শান্তিনিকেতনের ‘মিনুদি’। সাতচল্লিশের দেশভাগ, দাঙ্গা ও রক্তপাতের সাক্ষী বাঙালির সাহসী সাংস্কৃতিক অভিযাত্রার অবিসংবাদী সারথি এই মানুষটির আজ গৌরব-দীপ্ত জীবনের অষ্টাশিতম বসন্ত পূর্তি।
জীবনভর অশুভের বিরুদ্ধে উচ্চারণ করেছেন কল্যাণের কথা। মানবিক ও মুক্ত সমাজ বিনির্মাণে রেখে চলেছেন অনন্য ভূমিকা। সংস্কৃতিকে সঙ্গী করে দীর্ঘ কাঁটা বিছানো পথ হেঁটেছেন সম্প্রীতির পথে। সুরকে হাতিয়ার করে আজও লড়াই করছেন সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে। সম্প্রীতি ও প্রগতির দেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে কেটে যায় তার প্রতিটি দিন। তিনি হলেন ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানটের সভাপতি ড. সনজিদ খাতুন।
কিছু দিন আগে এক মঙ্গলবার এই রবীন্দ্র গবেষক, সঙ্গীতজ্ঞ, সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব ও লেখিকার ৮৫তম জন্মদিন উপলক্ষে নানা কর্মসূচি পালন করা হয় । ১৯৩৩ সালে ঢাকায় জন্মগ্রহণ করে তিনি। তবে নিভৃতে কাজ করে যাওয়া এ মানুষটির জন্মদিনে নেই কোন বিশেষ আয়োজন। একান্তই পারিবারিকভাবে উদযাপন হবে তার জন্মদিন। তবে তার বাড়ির দরজা খোলা থাকবে দিনভর। ফুল নিয়ে যে কেউ ছুট যেতে পারেন তার কাছে, জানাতে পারবেন জন্মদিনের শুভেচ্ছা।জন্মদিনের আগের দিন সোমবার বিকেলে ছায়ানট ভবনে আপন অনুভূতি ব্যক্ত করেন সনজিদা খাতুন। সংবাদকর্মীদের সঙ্গে কথোপকথনে উঠে আসে আপন ভাবনার কথা। জন্মদিন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জন্মদিন উদযাপন প্রসঙ্গে আমার নিজের কোন আগ্রহ নেই। আমার কাছে মানুষের জন্মদিনকে একটি জৈবিক ব্যাপার মনে হয়। তাই আমার কাছে জন্মদিনের অর্থ হচ্ছে বেশি বুড়ো হয়ে যাওয়া। আর আমার ৮৫তম জন্মদিনের চেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে এ বছর রমনা বটমূলের বর্ষবরণের আয়োজনটি পদার্পণ করবে ৫০ বছরে। আমি সারাটি জীবন সংস্কৃতির শুদ্ধতাকে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছি। কারণ, সংস্কৃতি মানুষের মনকে সুন্দর করে তোলে। তাই নিজে মঞ্চে উঠে গান গাওয়ার পরিবর্তে সংগঠকের ভূমিকাটাকেই বড় করে দেখেছি। প্রতিদানে কিছুই চাইনি। সব সময় সংস্কৃতির আলোয় মানুষের মনের কথাটি বলতে চেয়েছি। মুসলমানিত্বের চেয়ে বাঙালীত্বের গৌরববোধকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করেছি। মানুষের মানবিক হয়ে ওঠাকে গুরুত্ব দিয়েছি।"
জাতীয় অধ্যাপক ও লেখক ড. কাজী মোতাহার হোসেনের মেয়ে সনজিদা খাতুন। এর বাইরে তিনি খ্যাতিমান লেখক কাজী আনোয়ার হোসেনের বোন এবং রবীন্দ্রসঙ্গীত বিশেষজ্ঞ, সাংবাদিক ও ছায়ানটের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ওয়াহিদুল হকের স্ত্রী। তিনি ১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে সাম্মানিকসহ স্নাতক এবং ১৯৫৫ সালে ভারতের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর করেন। ১৯৭৮ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘রবীন্দ্রসঙ্গীতের ভাবসম্পদ’ গবেষণাপত্রে পিএইচডি লাভ করেন। সনজিদা খাতুনের কর্মজীবন শুরু হয় শিক্ষক হিসেবে। শান্তিনিকেতন থেকে স্নাতকোত্তর লাভের পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক হন। দীর্ঘদিন অধ্যাপনা করে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা থেকে অবসরগ্রহণ করেন।এসব বাক্য সনজিদা খাতুনের কীর্তির কাছে ম্লান। তিনি সর্বদাই প্রতিকূল অবস্থায় দাঁড়িয়ে বাঙালীত্বের বোধ সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে কাজ করেছেন। নিজের বিশ্বাসের প্রতি অটল এই মানুষটি রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির আলোয় পৃথিবীর মুখ দেখার স্বপ্ন বাঁচিয়ে রেখেছেন। সংগঠক হিসেবে পেয়েছেন ঈর্ষণীয় সাফল্য। সবকিছু ছেড়েছুড়ে এখনও তিনি আঁকড়ে আছেন প্রিয় প্রতিষ্ঠান ছায়ানটকে। এখনও নিয়মিত ছুটে যান সেখানে, অনুজদের কাছে ডেকে ভালবেসে কবিগুরুর সুর তুলে দেন কণ্ঠে। কর্মময় জীবনের স্বীকৃতিস্বরূপ সনজিদা খাতুন অর্জন করেছেন একুশে পদক, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, বেগম জেবুন্নেছা ও কাজী মাহবুবউল্লাহ জনকল্যাণ ট্রাস্টের স্বর্ণপদক ও সম্মাননা, সা’দত আলী আখন্দ পুরস্কার, অনন্যা পুরস্কার, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির সম্মানজনক ফেলোশিপ, বাংলা একাডেমির রবীন্দ্র পুরস্কারসহ গুরুত্বপূর্ণ নানা স্বীকৃতি। তার কীর্তি ছড়িয়ে ওপার বাংলাতেও। তার কর্মময়তার স্বীকৃতি হিসেবে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় সনজিদা খাতুনকে তাদের সর্বোচ্চ সম্মান ‘দেশিকোত্তম’ প্রদান করেছে। এছাড়াও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের ‘রবীন্দ্রস্মৃতি পুরস্কার’, কলকাতার টেগোর রিসার্চ ইনস্টিটিউট থেকে ‘রবীন্দ্রতত্ত্বাচার্য’ উপাধি জীবনভর অশুভের বিরুদ্ধে উচ্চারণ করেছেন কল্যাণের কথা। মানবিক ও মুক্ত সমাজ বিনির্মাণে রেখে চলেছেন অনন্য ভূমিকা। সংস্কৃতিকে সঙ্গী করে দীর্ঘ কাঁটা বিছানো পথ হেঁটেছেন সম্প্রীতির পথে। সুরকে হাতিয়ার করে আজও লড়াই করছেন সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে। সম্প্রীতি ও প্রগতির দেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে কেটে যায় তার প্রতিটি দিন। তিনি হলেন ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানটের সভাপতি ড. সনজিদ খাতুন। কিছু দিন আগে এক মঙ্গলবার এই রবীন্দ্র গবেষক, সঙ্গীতজ্ঞ, সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব ও লেখিকার ৮৫তম জন্মদিন উপলক্ষে নানা কর্মসূচি পালন করা হয়। ১৯৩৩ সালে ঢাকায় জন্মগ্রহণ করে তিনি। তবে নিভৃতে কাজ করে যাওয়া এ মানুষটির জন্মদিনে নেই কোন বিশেষ আয়োজন। একান্তই পারিবারিকভাবে উদযাপন হবে তার জন্মদিন। তবে তার বাড়ির দরজা খোলা থাকবে দিনভর। ফুল নিয়ে যে কেউ ছুট যেতে পারেন তার কাছে, জানাতে পারবেন জন্মদিনের শুভেচ্ছা।
বাংলাদেশে ধারাবাহিকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছিল রবীন্দ্র সংগীত৷ সে বাধা ভেঙেছিলেন যাঁরা, সনজীদা খাতুন তাঁদের অন্যতম৷ বাংলাদেশে রবীন্দ্রচর্চার আদিপর্ব নিয়ে তাঁর ভাষ্য৷রবীন্দ্র সংগীতের চর্চা আজকের বাংলাদেশে পৌঁছে গেছে মফঃস্বল শহরগুলোতে৷ রবীন্দ্রনাথের গান এখন আর রাজধানী ঢাকা কেন্দ্রিক নয়৷ অথচ সাবেক পূর্ব পাকিস্তানে রবীন্দ্রনাথের ওপর তোলা হয়েছিল নিষেধের বেড়া৷ সেই বেড়া ভাঙতে সক্রিয় ছিলেন রবীন্দ্র অনুরাগীরা৷ সহায়ক হয়েছিল ১৯৬১ সালের রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ পালন৷ বাংলাদেশে রবীন্দ্রচর্চার গোড়া থেকেই এর প্রতিটি পর্যায়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে আছেন সনজীদা খাতুন - শিল্পী, প্রশিক্ষক, অধ্যাপক এবং সংগঠনকারী হিসেবে৷ স্বাধীনতাপূর্ব বাংলাদেশে রবীন্দ্র সংগীত চর্চার প্রাথমিক পর্বটা কেমন ছিল? তিনি জানালেন, ‘‘৪৭ সালে পাকিস্তান হবার পরপর আব্দুল আহাদ (প্রখ্যাত সংগীতকার) ঢাকায় আসেন৷ তিনি তো শান্তিনিকেতনে শিক্ষিত৷ তিনি এসে রেডিওতে কাজ আরম্ভ করেন৷ রেডিওতে উনি রবীন্দ্র সংগীত শেখাতেন৷ অতি সুন্দর করে ভাব বিশ্লেষণ করে শেখাতেন৷ আমরা খুব আনন্দের সাথে গান শিখতাম৷ তাছাড়া আব্দুল আহাদ যখনই রবীন্দ্র জন্মবর্ষে বা মৃত্যুদিনে অনুষ্ঠান করতেন, যারা ঢাকায় রবীন্দ্র সংগীত গাইতেন তাদের সবাইকে ডেকে খুব সুন্দর করে অনুষ্ঠানগুলো করতেন৷ উনি রেডিওতে যে মান বজায় রেখেছিলেন সেটা ছিল খুবই ভাল৷ কিন্তু ক্রমে ক্রমে একটা সময় এল যখন আমরা দেখতে পেলাম পাকিস্তান সরকার ঠিক চাইছেনা যে রবীন্দ্র সংগীত এখানে প্রচার হোক৷ রেডিওতে শুধু না, বাইরেও গাওয়া হোক এটা তারা চাইছিল না৷ কিন্তু সেটা যে তারা খুব স্পষ্ট করে বলতো এমনও নয়৷ কিন্তু বুঝতে পারতাম যে মানুষের মধ্যেও একটা অন্য চাহিদা এসেছিল৷ বড় জোর গিটারে রবীন্দ্র সংগীত বাজালে লোকে শুনত৷ কিন্তু আমাদের গান গাইবার সুযোগ খুব একটা মিলত না৷'' ব্যক্তিত্ব, প্রয়াত কাজি মোতাহার হোসেন ছিলেন অত্যন্ত উদার স্বভাবের৷ এবং রবীন্দ্রভক্ত৷ ফলে বাবার কাছ থেকে উৎসাহের অভাব ছিলনা কন্যা সনজীদার জন্য৷ রবীন্দ্র সংগীত শিখেছেন, গেয়েছেন৷ পরবর্তীকালে শিখিয়েছেন, গড়ে তুলেছেন ‘ছায়ানট' প্রতিষ্ঠান৷ অল্প বয়স থেকেই অনুষ্ঠানে গান করেছেন সনজীদা৷ পঞ্চাশ দশকের একটি অনুষ্ঠানের কথা স্মরণ করলেন তিনি বিশেষভাবে, ‘‘পঞ্চাশ দশকে একবার - আমার খুব ভাল করে মনে আছে - কার্জন হলে একটা অনুষ্ঠান হচ্ছিলো৷ আমাকে গান গাইতে বলা হয়েছিল৷ আমি খুব বিস্মিত হয়ে গেলাম গান গাইতে৷ কী গান গাইবো? এমন সময় দেখা গেল সেখানে বঙ্গবন্ধু৷ তখন তো তাঁকে কেউ বঙ্গবন্ধু বলে না - শেখ মুজিবুর রহমান৷ তিনি লোক দিয়ে আমাকে বলে পাঠালেন আমি যেন ‘সোনার বাংলা' গানটা গাই - ‘আমার সোনার বাংলা'৷ আমি খুব ঘাবড়ে গেলাম৷ এত লম্বা একটা গান৷ তখন তো আর এটা জাতীয় সংগীত নয়৷ পুরো গানটা আমি কেমন করে শোনাবো? আমি তখন চেষ্টা করে গীতবিতান সংগ্রহ করে সে গান গেয়েছিলাম কোনমতে৷ জানিনা কতটা শুদ্ধ গেয়েছিলাম৷ কিন্তু তিনি এইভাবে গান শুনতে চাওয়ার একটা কারণ ছিল৷ তিনি যে অনুষ্ঠান করছিলেন, সেখানে পাকিস্তানিরাও ছিল৷ তিনি দেখাতে চেষ্টা করছিলেন তাদেরকে ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি' কথাটা আমরা কত সুন্দর করে উচ্চারণ করি৷ এই সমস্ত গানটার ভিতরে যে অনুভূতি সেটা তিনি তাদের কাছে পৌঁছাবার চেষ্টা করেছিলেন৷ এবং আমার তো মনে হয় তখনই তাঁর মনে বোধহয় এটাকে জাতীয় সংগীত করবার কথা মনে এসেছিল৷ বায়ান্ন সালে যখন আমরা রবীন্দ্র সংগীত চর্চা করি তখন আমরা কিন্তু ঐ বায়ান্নর পরে পরে শহীদ মিনারে প্রভাতফেরিতে আমরা রবীন্দ্র সংগীত গাইতাম৷ এবং এইভাবে রবীন্দ্র সংগীত কিন্তু তখন বেশ চলেছে৷ আরো পরে কেমন যেন একটা অলিখিত বাধা এলো৷ পাকিস্তান আমলের পরে রবীন্দ্র সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা' যখন জাতীয় সংগীত হল, তার কিছুকাল পরে দেখা গেল - নানা ধরনের ওঠাপড়া চলছিল তো - সেই সময় গানটা না করে শুধু বাজনা বাজাবার একটা রেয়াজ শুরু হল৷ আমার মনে হয় এর মধ্যে সেই পাকিস্তানি মনোভাবটা কাজ করেছে৷''পেতে থাকে৷ সনজীদা খাতুনের ভাষ্য: ‘‘৬১ সালে যখন রবীন্দ্র শতবর্ষ হল, ততদিনে আমি সরকারি কলেজের অধ্যাপিকা৷ কাজেই আমার পক্ষে গান গাওয়া খুব কঠিন হয়ে গিয়েছিল বাইরের অনুষ্ঠানে৷ রেডিওতে গাইতাম৷ শতবর্ষ উপলক্ষে ‘তাসের দেশ' নাটক করা হচ্ছিল মঞ্চে৷ গান গাইতে হবে৷ আমি গান গাইতে বসে গেলাম৷ কিন্তু মুখের মধ্যে একটা রুমাল পুরে দিয়ে আমি গান গেয়েছিলাম৷ কারণ আমার গলা চিনে ফেললে আমার সরকারি চাকরিতে অসুবিধা ছিল৷ এই অনুষ্ঠানে গানটা গেয়ে আমি বেরিয়ে আসছি, আহাদ সাহেব আমাকে জিজ্ঞেস করছেন, ‘‘কে গাইলো বলতো? ভালই তো লাগলো৷'' আমি তাড়াতাড়ি পালিয়ে গেলাম সামনে থেকে৷ কারণ আমি গেয়েছি এটা যদি প্রচার হয়ে যায় তাহলে আমার চাকরিতে অসুবিধে হবে৷ এইসব দিন তখন আমরা পার করেছি৷ ৬১ সালে যখন আমাদের অনুষ্ঠান সব পরপর হয়ে গেল, সরকারের লোক এসে সামনে বসে থাকতো চেয়ারে৷ দেখতো আমরা কী করছি৷ কিন্তু আমরা অনুষ্ঠান করে গিয়েছি৷ তারও পরে যেটা হয়েছিল শেষ দিকে, মোনেম খাঁর (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের আইউব-অনুগত গভর্নর) লোকজন বাধা দেবার জন্য এসেছে৷ এবং কৌশলে আমাদের সেখান থেকে পালিয়ে যেতে হয়েছে৷ সবাই আমরা দ্রুত সেখান থেকে চলে গিয়েছি৷ পরে মোনেম খাঁর পুত্র এবং অন্যরা এসে ভাঙচুর করেছে৷ কিছু ফুলের টব ভেঙে চলে গেছে৷ কাজেই এই বাধাগুলো আমরা দেখেছি৷''সনজীদা খাতুনের লেখার এক বড় অংশ জুড়ে আছেন রবীন্দ্রনাথ। আজকের বাংলাদেশ আর প্রাক্‌-একাত্তর পাকিস্তান-পর্বে রবীন্দ্রনাথকে ব্যাপক পরিসরে জনমানসে পৌঁছে দেওয়ার কাজে ঐতিহাসিক ভূমিকায় ছিলেন তিনি। বিশিষ্ট রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী সনজীদা এবং তাঁর সহযোদ্ধাদের অবিস্মরণীয় কীর্তি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ছায়ানট’, যা কিছু কাল আগে ভারত সরকারের রাষ্ট্রীয় সম্মানেও ভূষিত। তবে শুরুর দিকে সম্মান ও স্বীকৃতির চেয়ে আঘাত ও বিরোধিতাই ছিল প্রবল। পূর্ববাংলায় গত শতকের ষাটের দশকে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের আগ্রাসী সাংস্কৃতিক নীতির বিপরীতে দাঁড়িয়ে রবীন্দ্র-নজরুল এবং আবহমান বাংলার মানবতাবাদী-সমন্বয়ী ভাবধারাকে আশ্রয় করে ‘ছায়ানট’ ঢাকার রমনার বটমূলে শুরু করে বাংলা বর্ষবরণ আয়োজন।ছায়ানট তো নয়, ‘জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ’, ‘ব্রতচারী আন্দোলন’, আবৃত্তিচর্চার সঙ্ঘ ‘কণ্ঠশীলন’ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অধ্যাপনা— সব জায়গাতেই সনজীদা খাতুনের উদ্ভাবনময়তা, শ্রম, মেধা ও মনীষার ছাপ। তিনি শান্তিনিকেতনের ছাত্রী। কলকাতা থেকে তাঁর একাধিক বই এবং গানের অ্যালবাম বেরিয়েছে বহু আগেই। একাত্তরের কলকাতাবাসে তিনি ‘রূপান্তরের গান’ এবং ‘মুক্তিসংগ্রামী শিল্পী সংস্থা’র হয়ে সাংস্কৃতিক লড়াই চালিয়ে গিয়েছেন।
সনজীদা খাতুনের ৮৭ বছরের জন্মদিন উপলক্ষে আবুল আহসান চৌধুরী ও পিয়াস মজিদের সম্পাদনায় প্রকাশিত হল বড়ো বিস্ময় লাগে হেরি তোমারে: সনজিদা খাতুন সম্মাননা-স্মারক গ্রন্থটি। আটটি বিভাগে প্রায় ৬০ জনের লেখা তাঁর বর্ণাঢ্য জীবনের নানা দিক। অগ্রজের অভিনন্দন-লেখনের সঙ্গে আছে তাঁর স্বপ্ন ও সংগ্রামের নিগূঢ় বিশ্লেষণ। গায়কসত্তার পাশাপাশি শিক্ষক হিসেবে অনন্যতা আলোচিত হয়েছে। আছে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ বইগুলির আলোচনা। প্রিয় বন্ধু স্বপ্না দেবের সঙ্গে একটি কৌতূহলোদ্দীপক পত্রালাপ এবং তাঁর প্রামাণ্য জীবনী ও গ্রন্থপঞ্জি আছে।
লেখকদের মধ্যে আছেন সদ্যপ্রয়াত তিন বিশিষ্ট জন—আনিসুজ্জামান, দেবেশ রায় ও অরুণ সেন। আছেন শঙ্খ ঘোষ, হাসান আজিজুল হক, সরদার ফজলুল করিম, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, সুধীর চক্রবর্তী, গোলাম মুরশিদ, হায়াৎ মামুদ, সেলিনা হোসেন, সুতপা ভট্টাচার্য, মতিউর রহমান, হুমায়ুন আজাদ, আবুল হাসনাত, মফিদুল হক, দাউদ হায়দার, সুভাষ চৌধুরী, সমীর সেনগুপ্ত, ইফফাত আরা দেওয়ান, শান্তা সেন, বিশ্বজিৎ ঘোষ প্রমুখ।শঙ্খ ঘোষ লিখেছেন, দেবেশ রায় সনজীদার কণ্ঠে গান শোনার প্রসঙ্গে লিখেছেন, “সনজীদা দুই বাংলারই সেই বিরলতম গায়িকা, যিনি গান না গাইলেও শুধু মননচর্চার সুবাদেই মান্য হয়ে থাকতেন।” আনিসুজ্জামানের ভাষায়, “তাঁকে অভিনন্দন এক সৃজনশীল জীবন যাপনের জন্য। তিনি বেঁচে থাকবেন তাঁর কীর্তির মধ্যে, তাঁর অনুরাগীদের ভালোবাসায়। জয় হোক তাঁর।”

 

ডঃ সুবীর মণ্ডল
পশ্চিম বঙ্গ, ভারত

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top