সিডনী শনিবার, ২৭শে ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১৫ই ফাল্গুন ১৪২৭

মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট ও চেতনার উন্মেষ : মুহম্মদ সায়েদুর রহমান তালুকদার


প্রকাশিত:
৭ জানুয়ারী ২০২১ ১৬:২৬

আপডেট:
২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ১৯:০৪

ছবিঃ মুহম্মদ সায়েদুর রহমান তালুকদার

 

মুক্তির অন্বেষা মানুষের আজন্ম প্রয়াশ। মাতৃজটরের গভীর অন্ধকারে যে ভ্রুনটি তিলে তিলে বেড়ে ওঠে, পূর্ণতাপ্রাপ্তির সাথে সাথেই সে অপার্থিব সেই পরিবেশকে লাথি মেরে আলোর জগতে বেরিয়ে আসতে চায়। যে শিশুটি মায়ের বকুনি খেয়ে শান্তনা খুঁজে সেই মায়েরই আঁচলে সে মুক্তি চায় তার শাসন থেকে; কৈশোরে পরিবার থেকে আর যৌবনে সৃষ্টিসুখের উল্লাসে মুক্তি চায় সে পারিপার্শ্বিক পরিবেশ থেকে। বার্ধক্যে স্বপ্ন আর বাস্তবতার বৈরিতায় সে-ও মুক্তি চায় নশ্বর পৃথিবী থেকে। কিন্তু মুক্তি কি মিলে ?

এখানে পৃথকভাবে কোনো ব্যক্তির মুক্তির কথা বলা হচ্ছে না। ব্যক্তি-সমাজের কথাই এ পর্বের প্রতিপাদ্য বিষয়। মূলত আর্থ-সামাজিক মুক্তির বিষয়টিই এখানে গুরুত্ব পেয়েছে। এখানে সেই সমাজের কথা বলা হচ্ছে - যারা প্রাগৈতিহাসিক কালেই বার বার বিজাতীয় আগ্রাসনের শিকার হয়ে সঙ্কর সম্বন্ধীয় এক অভিনব জাতিতে পরিণত হয়েছিল। ইতিহাসকালেও যারা নানা জাতি, নানা ধর্ম ও নানা বর্ণের শাসন-শোষন-নিষ্পেষণ হজম করে বিবর্ণ পোড়ামাটির রূপ ধারণ করেছিল।

প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ পর্যন্ত সময়-সমুদ্রের বিভিন্ন পর্যায়ে এ আগ্রাসনের অক্টোপাশ থেকে এরা মুক্তির প্রত্যাশায় প্রহর গুণেছে - কিন্তু মুক্তি কখনো পায়নি। প্রতিবারই তাদেরকে ব্যর্থতার গ্লানি হজম করতে হয়েছে। মিশ্র জাতিসত্ত্বার কারণেই হোক আর নিয়তির নির্মম পরিহাসেই হোক তারা যে কেবলই বিদেশী-বিজাতীয় আগ্রাসনেই নিষ্পেষিত হয়েছে তা কিন্তু নয়; স্বজাতীয়-স্বগোত্রীয়দের দ্বারাও প্রতারিত ও শোষিত হয়েছে বহুবার। তবু তারা আশায় বুক বেধেছে - স্বপ্ন দেখেছে মুক্তির। ভয়াল একাত্তরে যে সমাজের একাংশ নয় মাসের শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি মোকাবেলা করে স্বাধীনতা নামের লাল সূর্যটাকে হাতের মুঠোয় নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিল - এখানে পোড়ামাটিসম সেই শোষিত-বঞ্চিত বাঙালি জনসমাজের মুক্তির কথা বলা হয়েছে।

অতীতে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে তারা বার বার মুক্তির সংজ্ঞা খুঁজেছে; কিন্তু উত্তর পায়নি। মুক্তি আসলে কি ? বিজাতীয় আগ্রাসন থেকে নিষ্কৃতি - নাকি স্বজাতীয় অপশাসন থেকে অব্যাহতি; আর্থ-সামাজিক দৈন্যদশা থেকে সর্বসাধারণের উত্তরণ - নাকি ক্ষমতাবানদের ভাগবাটোয়ারার অবাদ অধিকার প্রতিষ্ঠা; ভারসাম্যহীন ধর্মীয় স্বরাজ প্রতিষ্ঠা - নাকি সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা; ন্যায়নীতিভিত্তিক ভাব প্রকাশের অধিকার প্রতিষ্ঠা - নাকি ক্ষমতাসীন চক্রের দূরভিসন্ধি চরিতার্থ করার লক্ষ্যে সামাজিক অবক্ষয় তরান্বিত করা; সম্মিলিত স্বজাতীয় সংস্কৃতির আদর্শ চর্চা - নাকি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিহীন উগ্র-আধুনিকতার পৃষ্টপোষকতা; ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর খণ্ডিত স্বার্থ সংশ্লিষ্ট অধিকার - নাকি সার্বজনীন স্বাতন্ত্রভিত্তিক অধিকার প্রতিষ্ঠা; অন্যের অধিকার ক্ষুন্ন করে স্বীয় স্বার্থ হাসিল - নাকি অপরের অধিকার সমুন্নত রেখে নিজের ইচ্ছা পূরণের চেষ্টার নাম মুক্তি ? আসলে মুক্তির গান যারা চীৎকার করে গেয়ে থাকেন তাদের দর্শন-চিন্তা আর কর্ম-প্রয়াসের মধ্যবর্তী পর্বতপ্রমাণ ব্যবধান সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা আর প্রাপ্তিকে এক হতে দেয়নি কখনো। তাই তারা যখন যে ডাল ধরেছে সে ডালই ভেঙ্গে গেছে। তবু তারা আশায় বুক বেধেছে নিরাশার বালুচরে।

 

বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সুদূর অতীত থেকে এর একটি ধারাবাহিকতা আছে। এ ধারাবাহিকতায় ইতিহাসের কোনো বাঁককেই উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। রাজতান্ত্রিক আস্তাবলের ছত্রছায়ায় জমিদারী শাসনের উৎপীরণে মানুষ যখন দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য তখনই গোদের উপর বিষফোঁড়া হয়ে আসে কোম্পানি শাসনের খড়গ। ঐতিহাসিক পলাশী প্রান্তরে দেশীয় শাসন অবসানের মঞ্চায়ন হওয়ার পর ব্রিটিশ বেনিয়াদের শোষণ-শাসনে সর্বস্তরের মানুষ বেশী করে তাদের অসহায়ত্ব উপলব্ধি করতে পারে। প্রতিনিয়ত বহিরাগতদের আচরণে সর্বস্তরের মানুষের মনে একটি ক্ষোভ ক্রমেই পুঞ্জিভূত হতে থাকে। তাদের উৎপীড়নে যখন আপামর জনতার অন্তরাত্মা ক্ষত-বিক্ষত হচ্ছিল; কলুর বলদের মতো অবিরাম খেটেখুটেও মানুষ যখন পাচ্ছিল চরম বৈষম্যমূলক আচরণ আর নির্যাতন, তখন থেকেই আমাদের চেতনা মুক্তির প্রত্যাশায় ব্যাকুল হয়ে ওঠে। শ্রমের মূল্য আর সম্পদের হিস্যা হয়ে উঠে আরাধ্য। নেতৃত্ব পর্যায় থেকে জনমনে এ ধারণা প্রচারে ব্যাপক জনসমাজ উদ্বুদ্ধ হতে থাকে। এক সময় গোটা উপমহাদেশে এ চেতনার বিস্তৃতি ঘটে। ফোঁসে উঠতে থাকে জনমানস। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, তখন থেকেই আশা জাগানিয়া জনসমর্থনের চোরাগলিতে ধর্মীয় গোড়ামীভিত্তিক হীনম্মন্যতাও হানা দেয়। অলক্ষ্যে মৌলিক অধিকারকেন্দ্রীক জাগরণের জোয়ারে ধর্মীয় জাতীয়তাভিত্তিক অনুভূতিরও অঙ্কুরোদ্গম ঘটে।

১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর প্রান্তরে বাংলার স্বাধীনতা সূর্য অস্তমিত হওয়ার পর থেকে ব্রিটিশ বেনিয়ারা বৃহৎ বাংলা শাসন করতো কলিকাতা থেকে। তাই বাংলার যেটুকু উন্নয়ন কর্মকান্ড সম্পাদন হতো তা ছিল কলকাতাকেন্দ্রীক। পূর্ব বাংলা তখন পশ্চাৎভূমি হিসেবে পরিগণিত হয়। রাজনৈতিক তৎপরতায় পূর্ব বাংলা এবং পশ্চিম বাংলার মধ্যে উন্নয়ন বৈষম্যের একটি চিত্র ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠে। পূর্ব বাংলার সচেতন মানুষ এ বিষয়টি নিয়ে ভাবতে গিয়ে দুই বাংলার ব্যবধানের সাথে ধর্মীয় অনুভূতিভিত্তিক একটি বৈষম্যচিত্র আবিস্কার করে। মুসলিম সংখ্যাধিক্যপূর্ণ পূর্ববাংলার অর্থনীতি সম্পূর্ণ কৃষিভিত্তিক আর হিন্দু সংখ্যাধিক্যপূর্ণ পশ্চিম বাংলার অর্থনীতি কৃষির পাশাপাশি শিল্প-বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়। পূর্ব বাংলায় উৎপাদিত পণ্যের বাজার হয় পশ্চিম বাংলায়। তখন পূর্ব বাংলার মানুষ দারুণভাবে একটি উন্নয়ন বৈষম্যের শিকার হয়ে পড়ে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের পথ খুঁজতে গিয়ে পৃথক প্রাদেশিক শাসন ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়।

বিষয়টি ইংরেজ শাসক গোষ্ঠীও অনুভব করে। তবে তারা এর পাশাপাশি বাংলার আয়তনগত দিকটাকেও বিবেচনায় নেয়। বৃহৎ বাংলা একত্রে শাসন করা ইংরেজদের কাছে কিছুটা সমস্যাসঙ্কুল বলে মনে হয়েছিল। এ সমস্ত কারণে বড়লাট লর্ড কার্জনের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে ব্রিটিশ সরকার বাংলাকে বিভক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়। এর ভিত্তিতে ব্রিটিশ সরকার পূর্ববাংলাকে আসামের সাথে সংযুক্ত করে একটি নতুন প্রদেশ গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে তা কার্যকর হয়। কিন্তু বাংলার এ বিভক্তি হিন্দু সম্প্রদায় মেনে নিতে পারেনি। বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে হিন্দু নেতৃবৃন্দ স্বদেশী আন্দোলনের ব্যনারে সোচ্চার হয়ে উঠলে বাদ-প্রতিবাদের ঝড় উঠে। এ ঝড়ে সর্বসাধারণের মনে এ ধারণার সৃষ্টি হয় যে, সবাই বাঙালি হলেও হিন্দু ও মুসলমান দু’টি স্বতন্ত্র জাতি। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি, আশা-আকাঙ্খা, ধর্ম-কর্ম, সমাজ-সংস্কৃতি, রাজনীতি ও অর্থনীতির গতিধারা পৃথক। বস্তুত এ চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়েই ১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দে মুসলিম প্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে পৃথক নির্বাচনের দাবি উত্থাপিত হয়। তবু হিন্দু নেতৃবৃন্দের দ্বারা সৃষ্ট স্বদেশী আন্দোলনের প্রেক্ষিতেই শেষ পর্যন্ত ১৯১১ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গভঙ্গ রদ হয়।

 

যাহোক ধর্মীয় স্বাতন্ত্রভিত্তিক আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পূর্ব বাংলা মুসলিম সংখ্যাধিক্যের ভিত্তিতে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখে। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার মুসলিম সংখ্যাধিক্যের ভিত্তিতে কেবল একটি রাষ্ট্র সত্ত্বার স্বীকৃতি দিতে সম্মত হওয়ায় পরিস্থিতিগত কারণে শেষ পর্যন্ত এদেশের মানুষকে একটি নজিরবিহীন অসম্ভব রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হতে হল। পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গের অর্থনৈতিক বৈষম্য-বঞ্চনার সূত্র ধরে সে সময়ে ধর্মীয় চেতনার যে উন্মেষ ঘটে তারই প্রেক্ষিতে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগষ্ট থেকে সেই অসম্ভব রাষ্ট্র পাকিস্তানের আনুগত্য মেনে নেয় এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষ। আর তাই এ অঞ্চল পূর্ব বাংলার পরিবর্তে পূর্ব পাকিস্তানে পরিণত হয়।

পাকিস্তানের যাত্রা শুরু হওয়ার পর পরই মানুষ তাদের ভুল বুঝতে শুরু করে। পাকিস্তানের নেতৃত্ব প্রধানত পশ্চিম পাকিস্তানীদের হাতে থাকায় প্রথম থেকেই তাদের স্বরূপ উন্মোচিত হতে থাকে। মানুষ বুঝতে পারে, কেবলমাত্র ধর্মীয় চেতনার ভিত্তিতে সম্পূর্ণ ভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি ও ভৌগোলিক দিক থেকে পৃথক জাতিসত্ত্বার ভিত্তিতে সৃষ্ট রাষ্ট্র ব্যবস্থার পরিণাম কি হতে পারে। পাকিস্তান প্রমাণ করল রাষ্ট্র গঠনের জন্য ধর্মীয় অনুভূতির চাইতে সাংস্কৃতিক প্রভাব এবং তদবিষয়ে আপোষকামিতা অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্রকে উপেক্ষা করে ধর্মের অন্তর্নিহীত উদার চেতনাকে পাশ কাটিয়ে ব্যবহারিক স্বরূপকে প্রশ্রয় দিলে যথাযথ সুফল পাওয়া যায় না। ঠিক এ কারণেই এদেশের মানুষের মনে বঞ্চনার চেতনায় জন্ম নেয়া বঙ্গভঙ্গের ক্ষত থেকে যে পাকিস্তান রাষ্ট্রের আবির্ভাব ঘটালো তার পরিণতি শুভ হতে পারেনি।

শাসক চক্রের অপরিনামদর্শী আচরণে দ্রুতই আশাহত মানুষের মনে চৈতন্যোদয় হয়। ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ভাষা আন্দোলনের কারণ ও পরিণাম এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। মানুষের সহজাত প্রবৃত্তিকে রোধ করার প্রবণতা এবং এর প্রতিবাদে অকাতরে বুকের রক্ত ঢেলে দেয়ার যে অবিস্মরণীয় উদাহরণ সৃষ্টি করে এদেশের মানুষ তা বিশ্বের ইতিহাসে নজীরবিহীন ঘটনা। এ পর্যায়েই পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ ধর্মীয় চেতনার চাইতে ভাষা ও সংস্কৃতিজাত চেতনার গুরুত্ব উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়। নিজেদের স্বাতন্ত্র রক্ষায় রুখে দাঁড়ানো মানুষের আপোষহীন অবস্থানের বাস্তবতা মেনে নিতে ওরা বাধ্য হয়।

তখন থেকেই এদেশের মানুষের চেতনার দিক পরিবর্তন ঘটে। অর্থনৈতিক বঞ্চনার সূত্র ধরে ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দে সাধারণ মানুষের মনে ধর্মীয় চেতনার ভিত্তিতে স্বাতন্ত্র বা স্বাধীনতার যে বীজ প্রোথিত হয়, পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের মাধ্যমে প্রথমে তা পূর্ণতা পায়। কিন্তু ’৫২-এর ভাষা আন্দোলনে ধর্মীয় চেতনা ভাষা ও সংস্কৃতি চেতনার কাছে হার মানে। অতঃপর শাসক চক্রের অর্থনৈতিক আগ্রাসন আমাদের স্বাধীনতার চেতনাকে নতুন করে শাণিত করে। বঞ্চনার প্রতিটি ক্ষেত্র নগ্নভাবে গোটা জাতিকে উপহাস করতে থাকে। তাই আমাদের স্বাধীনতার চেতনা তখন ধর্মীয় চেতনার আক্টোপাশমুক্ত হয়ে ভাষা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে আকড়ে ধরে।

এরই ধারাবাহিকতায় এ অঞ্চলের গণমানুষের রাজনীতি মুসলিম লীগ থেকে আওয়ামী মুসলিম লীগ হয়ে আওয়ামী লীগের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। বস্তুতঃ তখন আওয়ামী লীগের সকল প্রকার প্রচার-প্রপাগান্ডা ও কর্মসূচী এদেশের মানুষের বিবেককে সঠিক পথে পরিচালিত করতে সক্ষম হয়। তাই এক পর্যায়ে আওয়ামী লীগের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান এদেশের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে ‘বঙ্গবন্ধু’ খেতাবে আপামর জনতার হৃদয়ে স্থান করে নেন।

এ কথা অস্বীকার করার কোনোই সুযোগ নেই যে, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ এদেশের সর্বস্তরের মানুষকে মুক্তির মহামন্ত্রে উদ্দীপ্ত করে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের আপামর জনতা অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং বিজাতীয় ভাষা-সংস্কৃতির আগ্রাসন থেকে মুক্তির প্রত্যাশায় প্রহর গুণে এবং সত্তর এর নির্বাচনের মাধ্যমে তার চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটায়।

নির্বাচনপূর্ব কালে ইয়াহিয়ার নেতৃত্বাধীন পাকিস্তানের সামরিক সরকার পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক আন্দোলনের তীব্রতা অনুভব করলেও আওয়ামী লীগের পক্ষে এমন সংখ্যাগরিষ্টতা আসবে ভাবতে পারেনি। যে কারণে আন্দোলন দমনের উদ্দেশ্যে সাধারণ নির্বাচন দিলেও এর ফলাফল মেনে নিতে পারেনি। স্বাভাবিক নিয়মে নির্বাচনে বিজয়ী দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করার কথা থাকলেও তারা তা না করে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতাকে পদদলিত করে সামরিক শাসন জারি করে। ফলে এ দেশের স্বাভাবিক রাজনীতি কুচক্রীদের দ্বারা ধর্ষিত হয়। এই রাজনৈতিক ধর্ষণ থেকেই পাকিস্তানের বিভক্তি এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। স্বাভাবিক রাজনীতিকে পদদলিত করার সময়ে শাসক চক্রের ধারণায়ও আসেনি যে, এ অঞ্চলের মুক্তিপাগল মানুষ তাদের স্বতঃষ্ফুর্ত রায় বাস্তবায়নের জন্য এমন বেপরোয়াভাবে অকাতরে বুকের রক্ত ঢেলে দিতে পারে।

 

মুহম্মদ সায়েদুর রহমান তালুকদার
হবিগঞ্জ জেলার ইতিহাস, হাওরের ইতিবৃত্ত, প্রসঙ্গ: মুক্তিযুদ্ধে হবিগঞ্জ, মুক্তিযুদ্ধে মাধবপুর প্রভৃতি গ্রন্থ প্রণেতা। সমন্বয়ক (হবিগঞ্জ জেলা): এনসাইক্লোপিডিয়া অব বাংলাদেশ ওয়ার অব লিবারেশন, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি।

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top