সিডনী শুক্রবার, ২৬শে ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১৪ই ফাল্গুন ১৪২৭

জেনারেল ওসমানী, মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী : মুহম্মদ সায়েদুর রহমান তালুকদার


প্রকাশিত:
৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ১৩:২৯

আপডেট:
৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ১৪:২৯

ছবিঃ জেনারেল ওসমানী

 

মুক্তিযুদ্ধের প্রাতিষ্ঠানিক অবয়ব ও রাজনৈতিক আবরণ প্রথম বাংলাদেশ সরকার হলেও এর প্রাণ ছিলেন জেনারেল এম এ জি ওসমানী। তাঁর সঠিক নেতৃত্ব এবং সরকারের যথোপযুক্ত দিকনির্দেশনা না থাকলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস হয়তো ভিন্নরকম হতে পারতো। পাকিস্তানতো ভাবতেই পারেনি তাদের দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার ফসল অপারেশন সার্চলাইট এমন বিপর্যয়ের মোকাবেলা করবে কিংবা তাদেরকে এমন সূচনীয় পরিস্থিতির অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হবে। বিপরীতে পূর্ব পাকিস্তান একটি অস্বাভিক পরিস্থিতির আশঙ্কা করলেও আঘাত অতটা ভয়ঙ্কর হবে তাও কল্পনা করেনি।

ভারত সরকারের মানসিক প্রস্তুতি ছিল যদি কোনো অস্বাভাবিক পরিস্থিতির উদ্ভব হয় তাহলে বাংলাদেশের পাশে দাড়ানোর। ভারতের এই মনোবৃত্তির দু’টি কারণ থাকতে পারে। একটি নৈতিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের নিরপরাধ মানুষের পাশে দাঁড়ানো, অপরটি  চিরশত্রু পাকিস্তানের প্রতি প্রতিশোধ নেবার সুযোগ গ্রহণ।                                                               

ভারতীয় ‘ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিস এন্ড এনালাইসিস’ বলেছে, ‘ভারতীয় রাষ্ট্রীয় স্বার্থে পাকিস্তান দ্বিখণ্ডিত ছিল অপরিহার্যভাবে প্রয়োজনীয়।’বিশিষ্ট রাজনীতিক অলি আহাদের বক্তব্যেও এ ধারণা পাওয়া যায়। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের মাটিতে পাক সেনাবাহিনী মুক্ত করিবার নীতিগত কারণ ছাড়াও ভারত নিজস্ব কারণে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। প্রথমতঃ ভারত দ্বিখন্ডিত হইয়া পাকিস্তানী রাষ্ট্রের অভ্যুদয় হইয়াছিল। অখন্ড ভারত বিশ্বাসী ভারতীয় নেতৃবৃন্দ সুযোগের অপেক্ষায় ছিল কখন সাফল্যের সহিত পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় অস্তিত্বের বিলোপ ঘটানো যায়। পাকিস্তানের অস্তিত্ব বিলোপ না হইলেও বরং তাহার রাষ্ট্রীয় অংগচ্ছেদের সুবর্ণ সুযোগই ১৯৭১ সালের এক মহাক্ষণে ভারতের দ্বারপ্রান্থে উপস্থিত হয়।’   

ফ্রান্সের সাংবাদিক বের্নার অঁরি লেভির বক্তব্যেও বিষয়টি এমনই দাঁড়ায়। তিনি বলেন, ‘কারণ পাকিস্তানের সাথে ভারতের অনেক পুরনো হিসাব-নিকাশ ছিল। ভারতীয় সেনাবাহিনী এ হিসাব চুকানোর জন্যে মুখিয়ে ছিল। ভারতের জনগণও সরকারের উপর চাপ দিচ্ছিল বাংলাদেশ সঙ্কটে হস্তক্ষেপ করার জন্যে। পূর্ব পাকিস্তানের শরণার্থীর চাপে ভারতের তখন নাভিশ্বাস অবস্থা। কাশ্মির দ্বন্দ্বের পুরনো আগ্নেয়গিরি তখনও বেশ উত্তপ্ত অবস্থায়, যুদ্ধের কোনো একটা অজুহাত যদি মিলে যেতো, তবে যে কোনো সময় আবার সেই আগ্নেয়গিরি জেগে উঠতে পারতো।’ 

মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সহযোগিতার পেছনে পাকিস্তানের সাথে ভারতের পুরনো বিরোধই যে কেবল সম্পৃক্ত ছিল তা-ই নয়, তাদের প্রখ্যাত কুটনীতিক জে এন দীক্ষিত এরসাথে অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও যুক্ত করেছেন। তাঁর মতে, ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে আমাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশ পশ্চিমবঙ্গের মানুষের প্রতিক্রিয়া ছিল আবেগপ্রসূত। আমরা যদি এই যুদ্ধে সহায়তা না করতাম তাহলে তারা বাঙালি জাতীয়তাবাদের দিকে ঝুঁকত। বাঙালি হিসেবে পরিচিতের আকাঙ্ক্ষা তাদের ভারত থেকে পৃথক হওয়ার পথে নিয়ে যেতে পারত। তাছাড়া ঐ সময় পূর্ব পাকিস্তানকে ব্যবহার করে পাকিস্তান আমাদের পূর্বাঞ্চলে বহু অনিষ্টকর কাজ কর্মের মাধ্যমে আমাদের স্থিতি নষ্ট করছিল। আমাদের দেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে প্রত্যাশা ছিল এই যে, শুধুমাত্র ‘স্বাধীন বাংলাদেশ’ এ জাতীয় সমস্যার সুরাহা করতে পারে।’    

যাহোক, পরম করুণাময়ের কৃপায় ২৫ মার্চের ভয়াবহতার সাথে সাথেই ভারত সরকার কালবিলম্ব না করে বাংলার মানুষকে সহযোগিতার জন্য নিজেদের উদার হস্ত প্রসারিত করে। ভারতীয় জনগণের সমর্থনে মিসেস গান্ধী যদি তাৎক্ষণিক ব্যাবস্থা গ্রহণ না করতেন এবং পরবর্তীতে ডিসেম্বরের শুরুতে স্বীকৃতি প্রদানে গড়িমসি করতেন তাহলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আরো কিছু সময় প্রলম্বিত হতে পারতো, তাতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই।

প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাৎক্ষণিকভাবে তাদের সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দেন পূর্ব পাকিস্তানের পক্ষে সামরিক সহযোগিতা প্রদানের জন্য। ভারতীয় সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল এস এইচ এফ জে মানেকশ’ সঙ্গে সঙ্গে পূর্বাঞ্চলের চিফ অব স্টাফ লে. জেনারেল জে এফ আর জেকব’র সাথে যোগাযোগ করলে তিনি এই মুহূর্তে সেনাবাহিনী সমাবেশ সম্ভব নয় বলে জানান। মানেকশ’ জেকবের সাথে বারবার মতবিনিময় করেও তাঁর সম্মতি না পাওয়ায় সরকারকে তাদের নেতিবাচক মনোভাবের বিষয়টি অবগত করেন। অগত্যা মিসেস গান্ধী প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে সেনাবাহিনীর পরিবর্তে বিএসএফকে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য নির্দেশ প্রদান করেন। বিএসএফ দ্রুত ইস্ট বেঙ্গলের বিদ্রোহী ইউনিটগুলোর সাথে যোগাযোগ করে তাদেরকে সংগঠিত করার কাজে আত্মনিয়োগ করে। পাশাপাশি তারা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সরকার গঠনের উপযোগী ক্ষেত্র প্রস্তুতেও তৎপর হয়। তাদের এই ক্রিয়াকর্মের প্রতিফলন ঘটে পূর্বাঞ্চলের তেলিয়াপাড়ায় অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক সেনাসম্মেলন অনুষ্ঠান, একই সময়ে পশ্চিমাঞ্চলে আওয়ামী লীগের পূর্ব পাকিস্তান শাখার সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদকে দিল্লিতে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাথে বৈঠক আয়োজন এবং ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে বাংলাদেশ সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে সার্বিক সহযোগিতার মাধ্যমে। মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার সীমান্তবর্তী এলাকায় তখনকার যোগাযোগ ব্যবস্থায় শত শত লোক কলকাতা থেকে একসাথে গিয়ে স্বল্প সময়ে শপথ অনুষ্ঠান শেষ করে ফিরে যাওয়া সহজ বিষয় ছিল না। এই সমস্যা সমাধানের জন্য বিএসএফ সাংবাদিকদের জন্য ৫০টি এবং সরকার সংশ্লিষ্টদের জন্য ৫০টি মোট ১০০টি গাড়ি সংগ্রহ করে দেয় এবং সরকারি কাজকর্ম চালানোর জন্য বালিগঞ্জে একটি বাড়ি ভাড়া করে দেয়।

তাৎক্ষণিকভাবে যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নির্দেশের পরও ভারতীয় সেনাবাহিনীর এই নেতিবাচক মনোভাবের কারণে তারা সরকারি মহলে সমালোচিত হয়। এই আচরণের বিষয়ে পূর্বাঞ্চলের চিফ অব স্টাফ লে. জেনারেল জেকব নিজেই বলেন: ‘পরদিন জেনারেল মানেকশ’ আবার ফোন করে বললেন, উচ্চ পর্যায়ের সরকারি আমলারা সেনাবাহিনীকে ‘কাপুরুষ না হলেও অতি-সাবধানী’ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল তখন স্পষ্টতই ক্ষুব্ধ। তিনি বললেন, বিষয়টি আমাদের পুনর্বিবেচনা করা উচিত। আমার দৃষ্টিভঙ্গিতে অবিচল থেকে আমি বললাম যে, তিনি ইচ্ছে করলে সরকারকে জানিয়ে দিতে পারেন, ইস্টার্ন কম্যান্ডই টালবাহানা করছে এবং তারাই এই দেরির জন্য দায়ী। এই কথার ফলে তীব্র অভিযোগের মুখোমুখি হবার একটা আশঙ্কা আমরা সৃষ্টি করলাম। তারপরেও এটা মানেকশ’র কৃতিত্ব ও সাহসিকতা যে, তিনি প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কাছে আমাদের অবস্থান পরিস্কার ভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন।

এর অব্যবহিত পরে আমার সাথে সাক্ষাতের জন্য বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ) এর ডিরেকটর জেনারেল কে রুস্তজীর নেতৃত্বে এক প্রতিনিধি দল ফোর্ট উইলিয়ামে আমার বাসায় আসেন। তাঁর সাথে ছিলেন ডেপুটি ইন্সপেকটর জেনারেল গোলক মজুমদার, মেজর জেনারেল নরসিন্দর সিং। তাঁরা প্রত্যেকেই ছিলেন খুব উত্তেজিত। রুস্তমজী বললেন যে, হাতে বেশি সময় নেই, অথচ করণীয় কাজ প্রচুর। আমি জানতে চাইলাম, তিনি কিসের কথা বলছেন। তিনি বললেন, পাকিস্তানিদেরকে পূর্ব পাকিস্তান থেকে তাড়ানোর কাজটা ইস্টার্ন কম্যান্ড করতে রাজী না হওয়ায় সরকার বিএসএফ-এর ওপরে এই কাজের দায়িত্ব দিয়েছে।’

ভারতীয় সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল শ্যাম মানেকশ’ যুদ্ধ সম্পর্কে প্রথমে তাঁর নেতিবাচক মনোভাবের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, এপ্রিলে মন্ত্রিপরিষদের এক সভায় তাঁকে ডেকে প্রধানমন্ত্রী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার নির্দেশ দিলে তিনি কিছু ব্যবহারিক সমস্যার অজুহাত দিয়ে এক পর্যায়ে উত্তরে বলেন, ‘এর পরেও আপনি যদি বলেন, এগিয়ে যেতে আমি আপনাকে শতকরা ১০০ ভাগ পরাজয়ের নিশ্চয়তা দিচ্ছি। এবারে আপনি আদেশ করুন।’এ অবস্থায় জগজীবন রামও তাঁকে অনুরোধ করেন। তাতেও মানেকশ’ সম্মত হননি। অবস্থার প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী সভা মুলতবী করে মানেকশ’র সাথে একান্তে কথা বলেন। ওই সময় আলোচনান্তে মানেকশ’ যুদ্ধের ব্যাপারে অন্য কারো হস্তক্ষেপ না করার নিশ্চয়তা চাইলে প্রধানমন্ত্রী বলেন,‘ঠিক আছে স্যাম। আপনিই অধিনায়ক এবং কেউ আপনার কাজে হস্তক্ষেপ করবে না।’ ওই দিন মানেকশ’ কৌশলে যুদ্ধের ব্যাপারে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা লাভ করেন। ২৯ এপ্রিল ভারতীয় বাহিনী মুক্তিযুদ্ধের দায়িত্ব গ্রহণ করে।

তেলিয়াপাড়ায় অনুষ্ঠিত ৪ এপ্রিলের ঐতিহাসিক সেনাসভার পূর্বে ২৮ এপ্রিলই বিএসএফ-এর পূর্বাঞ্চলীয় মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার ভি সি পান্ডে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মেজর খালেদ মোশাররফ ও চট্টগ্রামে মেজর জিয়াউর রহমানের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেন। এরপর কর্নেল ওসমানী আগরতলার উদ্দেশ্যে সীমান্ত অতিক্রম করলে ব্রিগেডিয়ার পান্ডে তাঁকে আগরতলা সার্কিট হাউসে নিয়ে সার্বিক পরিস্থিত ও ভারত সরকারের মনোভাব সম্পর্কে আলোচনা করে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করেন। যার প্রেক্ষিতে ৪ এপ্রিল অনুষ্ঠিতব্য সেনাসভায় উপস্থিতির জন্য পান্ডে ও আগরতলার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ওমেস সায়গল ওসমানীকে তেলিয়াপাড়া চা বাগানের বাংলোয় নিয়ে যান এবং সভায় উপস্থিত থেকে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন।  এ সভা থেকেই মুক্তিযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়।

অপরদিকে ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলামকে নিয়ে তাজউদ্দীন আহমদ পশ্চিমাঞ্চলে সীমান্ত অতিক্রম করে পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করলে তাঁকে অভিনন্দন জানান বিএসএফ প্রধান কে রুস্তমজী ও ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল গোলক মজুমদার। তাঁরা তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী মিসেস গান্ধীর সাথে সাক্ষাতের সুযোগ করে দেবার জন্য দিল্লিতে নিয়ে যান। সেখানে ইন্দিরা গান্ধীর সাথে তাজউদ্দীন আহমদের বৈঠকের প্রশ্নে ‘র’ তীব্র বিরোধিতা করে। কিন্তু বিএসএফ সরকার কর্তৃক দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করায় ‘র’-এর প্রয়াশ ব্যর্থ হয়। ৪ ও ৫ এপ্রিল পরপর দুই দিন একান্তভাবে ইন্দিরা গান্ধী ও তাজউদ্দীন আহমদের বৈঠক হয়। উক্ত বৈঠকে বাংলাদেশের জন্য একটি সরকার গঠন ও মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতা সংক্রান্ত বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। ইন্দিরা-তাজউদ্দীন বৈঠক সফল হলে দিল্লিতে বসেই তিনি বিএসএফ-এর মাধ্যমে একই দিনে তেলিয়াপাড়া থেকে কর্নেল ওসমানীর সর্বাধিনায়কত্বে আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর তথ্য অবগত হন। প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ এবং তেলিয়াপাড়ার তথ্যের ভিত্তিতেই তাজউদ্দীন আহমদ পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

ভারতীয় সেনাপ্রধানের নেতিবাচক মনোভাবের কারণে বিএসএফ দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে তেলিয়াপাড়া ও দিল্লিতে যখন বাংলাদেশ সরকার গঠন ও মুক্তিযুদ্ধ শুরুর প্রথম ও সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ সকল কাজ সমাপ্ত করছিল তখন ‘র’ কলকাতায় বসে আওয়ামী লীগের অপরাপর নেতাদের নিয়ে বিপ্লবী কমান্ড কাউন্সিল গঠনের স্বপ্নে বিভোর ছিল। রাজনৈতিক নেতৃত্বে সরকার প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে যুবনেতাদের দ্বারা বিপ্লবী কমান্ড কাউন্সিল গঠন করে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে অনিশ্চিত যাত্রায় ঠেলে দেবার পরিকল্পনায় কলকাতায় অবস্থানরত রাজনৈতিক নেতাদেরকে প্রভাবিত করার আপ্রাণ চেষ্ঠা চালিয়ে যাচ্ছিল। যার প্রেক্ষিতে দিল্লি থেকে কলকাতায় এসে তাজউদ্দীন আহমদ দলীয় নেতাদের নিয়ে সার্বিক পরিস্থিতি আলোচনার সময় সরকার গঠনের বিষয়ে যুবনেতাদের দ্বারা মারাত্মক বাধার সম্মুখীন হন। শেষ পর্যায়ে দলের শীর্ষ নেতারা তাজউদ্দীন আহমদের পরিকল্পনায় সরকার গঠনে সম্মত হন। যুব নেতারা বিচ্ছিন্ন হয়ে ‘র’-এর প্রভাবে এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর তত্ত¡বধানে ও অর্থানুকুল্যে বিএলএফ বা মুজিব বাহিনী গঠন করে মুক্তিবাহিনীর বিকল্প নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার কসরত করেন।

বাংলাদেশ সরকারের অধীনে এবং জেনারেল ওসমানীর সর্বাধিনায়কত্বে মুক্তিবাহিনী তাদের প্রাণ বাজী রেখে পাকবাহিনীর বিপরীতে শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এই প্রতিরোধকেই সর্বাত্মক সহযোগিতা দিয়ে সমাপ্তির সীমানায় নিয়ে যাবার জন্য ভারত সরকার এবং তার রাজনৈতিক নেতৃত্বের মনোভাব ছিল আন্তরিক। অপরদিকে ভারতীয় সেনাবাহিনী বিষয়টিকে পাক-ভারত যুদ্ধের ইতিহাস ও সেনা কমান্ডের প্রটোকলগত উপযোগিতার দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করতে বেশি আগ্রহী ছিল। পাক-ভারত যুদ্ধে পাকিস্তান বাহিনীর শক্তিমত্তা, সাবেক পাকিস্তানী সেনাকর্মকর্তা হিসেবে জেনারেল ওসমানীর প্রতি ক্ষোভ ও বর্তমান যুদ্ধে তাঁর সামরিক পদবীর বিপরীতে সর্বাধিনায়কত্ব পদমর্যাদা প্রভৃতি বিষয় ছিল তাদের মূল্যায়নের ভিত্তি। উল্লেখ্য, মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার-ইন-চিফ বা সর্বাধিনায়ক হলেও তখন জেনারেল ওসমানী সামরিক পদমর্যাদায় ছিলেন একজন কর্নেল এবং ভারতীয় সেনাবাহিনী পরিচালনায় যারা যুক্ত ছিলেন তাঁরা জেনারেল বা মেজর জেনারেল পদমর্যাদার কর্মকর্তা। যাহোক, ভারতের রাজনৈতিক সদিচ্ছার বিপরীতে তাদের সেনাবাহিনীর পর্যবেক্ষণে যে দূরত্ব ছিল রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে তার সংযোগেই গঠিত হয় মিত্রবাহিনী।

এ যুদ্ধ ছিল পাকিস্তানের একাংশের প্রতি অপরাংশের সরকারি বৈষম্য, স্বেচ্ছাচারিতা ও বৈরি মনোভাবজাত প্রতিহিংসার বিপরীতে লড়াই। এর এক পক্ষ সরকার অপর পক্ষ তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তানের সকল জনগোষ্ঠীÑ যার নেতৃত্বে জাতীয়ভাবে নির্বাচিত তাদের প্রতিনিধিগণ। এই প্রতিনিধিদের দ্বারা গঠিত সরকার এবং তদধীন মুক্তিবাহিনীর পক্ষে ভারত সরকার যে নিঃশর্ত সহযোগিতার হাত প্রসারিত করে তারই ফলশ্রুতি মিত্রবাহিনী। এখানে পাকিস্তানের বিপরীতে মূলপক্ষ বাংলাদেশ বা মুক্তিবাহিনী যার সহযোগী ছিল মিত্রবাহিনী। সুতরাং বিধি মোতাবেক মুক্তিবাহিনীর চাহিদা ও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন অর্থাৎ যুদ্ধজয়ের স্বার্থে সকল পর্যায়ে মিত্রবাহিনীর এগিয়ে আসার কথা। কিন্তু কার্যত ভারতীয় সেনাবাহিনী মুক্তিবাহিনীকে সম্পূর্ণরূপে পাশ কাটিয়ে নিজেদের মতো করে পরিকল্পনা গ্রহণ করে।

 

যুদ্ধ পরিচালনায় জেনারেল ওসমানীর বিভিন্ন উদ্যোগ

যুদ্ধের ময়দানে অধিনায়কের স্বাধীনতা না থাকলে শুভ পরিণতি আশা করা যায় না। বিভিন্ন যুদ্ধের অভিজ্ঞতায় জেনারেল ওসমানী এ বিষয়ে খুবই সচেতন ছিলেন। তেলিয়াপাড়া থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে সর্বাধিনায়ক নীতি নির্ধারণী বিষয় ছাড়া সেক্টর কমান্ডারগণকে মাঠ পর্যায়ে বাস্তব অবস্থার প্রেক্ষিতে নিজ নিজ বিবেচনায় যুদ্ধ পরিচালনার জন্য পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়ে ছিলেন। নীতি নির্ধারণী বিষয়ে তিনি কখনও এককভাবে আবার কখনও প্রধানমন্ত্রী এবং কেবিনেট মিটিংয়ের সিদ্ধান্তানুযায়ী কাজ করতেন। একান্তই সামরিক কৌশলগত বিষয়ে তিনি নিজেই সিদ্ধান্ত নিতেন। যে যে বিষয় রাষ্ট্র এবং সরকারের অভ্যন্তরীন নীতি বা স্বার্থ সংশ্লিষ্ট সেসব বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সাথে পরামর্শ করতেন এবং প্রয়োজনবোধে কেবিনেট মিটিংয়ে উত্থাপন করে সিদ্ধান্ত নিতেন।

মুক্তিযুদ্ধের প্রথম শুরুটা ছিল প্রথাগত যুদ্ধের আদলে। ২৬ মার্চ থেকে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বিদ্রোহী বাঙালি ইউনিটগুলো তাদের অবস্থার প্রেক্ষিতে এ যুদ্ধের সূচনা করেন। জেনারেল ওসমানীর নেতৃত্বে তারা একক কমান্ডে এসে সে পদ্ধতিতেই যুদ্ধ চালানোর পাশাপাশি গণবাহিনী গঠন করে হিট এন্ড রান পদ্ধতি আর্থাৎ শত্রুকে অতর্কিতে হামলা করে নিরাপদ এলাকায় সরে যাবার কৌশল গ্রহণ করেন। এভাবেই জেনারেল ওসমানী গেরিলা পদ্ধতির যুদ্ধ শুরু করেন।

মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার ব্যাপারে জেনারেল ওসমানী জানান, ‘সরকার গঠনের আগে আমি সর্বপ্রথমে এই যুদ্ধ পরিচালনা করেছি মুখে বলে, যোগাযোগ করে। তারপর আমি কমাÐারদের আমাদের লক্ষ্য বা অবজেক্টিভ এবং প্রত্যেক সেক্টরে কি ফলাফল অর্জন করতে হবে তা জানিয়েছি। এ জন্যে আমি সাধারণতঃ অপারেশনাল ইন্সট্রাকশন দিতাম। তাতে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের অধিনায়কের উপর দায়িত্ব যথেষ্ট বিকেন্দ্রীকরণ করা হতো। সাধারণ লক্ষ্য ও সেই অঞ্চলের বিশেষ বিশেষ লক্ষ্য ও দায়িত্বের কথা এই হুকুমনামা বা ইন্সট্রাকশনে লেখা থাকতো। এছাড়া আমি একটি জিনিস ব্যবহার করেছিলাম যা নতুন ছিল এবং আমার জানা মতে এর আগে কোন সামরিক বাহিনীতে তা ব্যবহার করা হয়নি। সেটা ছিল অপারেশনাল ডাইরেক্টিভস নির্দেশ এবং উপদেশ। পরিস্থিতি যাচাই ও বিবেচনা করে কি পরিমাণ এই ডাইরেক্টিভস একজন অধিনায়ক অনুসরণ করবেন তা তার উপর ছেড়ে দেয়া হয়েছিল। কারণ তা না হলে আমরা যুদ্ধে এগিয়ে যেতে পারতাম না।’

জেনারেল ওসমানী তাঁর এ পরিকল্পনায় সফল হন। এ ব্যাপারে ভারতীয় বাহিনীর ইস্টার্ন কমান্ডের চিফ অব স্টাফ লে. জেনারেল জে এফ আর জেকব বলেন, ‘সেপ্টেম্বরের মধ্যেই মুক্তিবাহিনীর অপারেশন পাকিস্তানিদের সাহসের ভিত নাড়িয়ে দিতে শুরু করে। ছোটখাট আক্রমণ ও অ্যামবুশ চালাতে থাকে। উড়িয়ে দেয়া হয় কালভার্ট ও ব্রিজ। পাকিস্তানিদের বিশেষত সাধারণ সৈন্যদের যুদ্ধের ইচ্ছা উবে যায়।’ মুক্তিবাহিনীর স্বল্পকালীন প্রশিক্ষণ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘প্রক্ষিণের মেয়াদ আরো কিছুটা বেশি হলে এবং নিম্ন ও মধ্যম পর্যায়ের অধিনায়ক তৈরিতে আরো মনোযোগ দিলে মুক্তিবাহিনী আরো বেশি কৃতিত্ব প্রদর্শন করতে সক্ষম হতো।’    

গেরিলা পদ্ধতিতে যুদ্ধ করে প্রতিপক্ষকে নানাভাবে ব্যাস্ত রাখা, চলাচলে বিঘœ সৃষ্টি করা, অ্যামবুশ ও ছোটখাট আক্রমণের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত করা ইত্যাদি তৎপরতার মাধ্যমে তাদের শক্তিকে দুর্বল এবং বিভক্ত করা গেলেও এর অনেক সীমাবদ্ধতা ছিল। এর মাধ্যমে অর্জিত সফলতা ধরে রাখা যায় না। তাই জয়ের জন্য প্রথাগত যুদ্ধের বিকল্প নেই। মিত্রবাহিনীর পক্ষে প্রচলিত যুদ্ধ ছাড়া গেরিলা কার্যক্রমে শরীক হওয়ার সুযোগ নেই। আর মূলপক্ষ হিসেবে প্রথাগত যুদ্ধ শুরু করতে হলে সে অনুযায়ী সামরিক শক্তি বা জাতীয় সেনাবাহিনী গড়ে তুলতে হবে। জাতীয় সেনাবাহিনী হচ্ছে একটি জাতির সার্বভৌম শক্তির প্রতীক। এসব ভেবে তিনি গেরিলা যুদ্ধের পাশাপাশি প্রথাগত যুদ্ধ পরিচালনার প্রস্ততি হিসেবে ব্রিগেড গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন।

জেনারেল ওসমানী কেবল মাত্র গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন সম্ভব নয় মনে করে রেগুলার ফোর্স বা নিয়মিত বাহিনী গঠনের উদ্যোগ নিলে ভারত এর বিরোধিতা করে। এ ব্যাপারে মেজর জেনারেল (অব.) কে এম সফিউল্লাহ বলেন, ‘এটা জানা ছিল যে, গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে দেশ জয় করা সম্ভব নয়। দেশ জয় করতে হলে আমাদের নিয়মিত বাহিনী দরকার। আমাদের বন্ধুরাষ্ট্র কিন্তু এ ব্যাপারে একমত ছিল না। যদিও এটা তাদের অজানা নয় যে, দেশ জয় করতে হলে রেগুলার ফোর্স-এর দরকার, শুধু গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে দেশ জয় করা যায় না। আমাদের বন্ধুরাষ্ট্র ভারত রেগুলার ফোর্স বা নিয়মিত বাহিনী গঠন করার বিরুদ্ধে এই জন্য ছিল যে তারা হয়ত মনে করত যদি পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধ বেধে যায় তাহলে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান দখল করার সম্পূর্ণ সুনাম যেন তারা নিতে পারে। কিন্তু আমরাও পেশাদার সৈনিক ছিলাম। তাই তাদের এসব পরামর্শে আমরা কখনও কর্ণপাত করিনি এবং আমরা গেরিলা বাহিনীর সাথে সাথে নিয়মিত বাহিনীও গড়ে তুলি।

জেনারেল ওসমানী জুন মাসে তাঁর একক সিদ্ধান্তে ব্রিগেড গঠনের উদ্যোগ নিয়ে জুলাইর শুরুতে মেজর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে ১, ৩ ও ৮ ইস্ট বেঙ্গলের সমন্বয়ে জেড ফোর্স গঠন করেন। তাঁর এ সিদ্ধান্ত সেক্টর কমান্ডারদের জুলাই মাসে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে অনুমোদিত হলে তিনি আগস্ট মাসে মেজর খালেদ মোশাররফের অধিনায়কত্বে ৪ ও নবগঠিত ৯ ও ১০ ইস্ট বেঙ্গলের সমন্বয়ে কে ফোর্স এবং অক্টোবরে ২ ইস্ট বেঙ্গল ও নবগঠিত ১১ ইস্ট বেঙ্গলের সমন্বয়ে মেজর কে এম সফিউল্লাহর অধিনায়কত্বে এস ফোর্স গঠন করেন।

জেনারেল ওসমানী ও তাঁর পরিকল্পনা সম্পর্কে লে. জেনারেল জে এফ আর জেকব বলেন, ‘সামরিক উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে ১৪ এপ্রিল কর্নেল এম এ জি ওসমানীর নিয়োগের সাথে সাথে বাহিনী সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধ হয়। পাকিস্তানের নিয়মিত সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত এই অফিসার ইস্ট বেঙ্গল ব্যাটালিয়নের সাথে আত্মিকভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। নিজেকে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য উৎসর্গ করেছিলেন। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল নিয়মতান্ত্রিক। পাকিস্তানি বাহিনীর সাংগঠনিক কাঠামো ও কৌশল অনুযায়ী তিনি নিজের বাহিনীর বিন্যাস চেয়েছিলেন। গেরিলা যোদ্ধার নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের ব্যাপারে তাঁর দ্বিমত ছিল। (সরকার কর্তৃক গেরিলা নির্বাচন ও প্রশিক্ষণে রাজনৈতিক কর্তৃত্বের ব্যাপারে তাঁর আপত্তি ছিল) মুক্তিবাহিনীর চেয়ে নিয়মিত ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট তৈরিতে তাঁর আগ্রহ ও মনোযোগ ছিল বেশি। ওসমানীর আচরণ ছিল পুরোপুরি সৈনিকসুলভ। ----ওসমানী বিভিন্নভাবে তাঁর পছন্দমতো কাজ করতে সক্ষম ছিলেন। সীমান্তবর্তী অঞ্চলে ফিরে আসা ইস্ট বেঙ্গল ব্যাটালিয়নগুলোকে পুনঃসংগঠিত করা হয়। ১,৩ ও ৮ ইস্ট বেঙ্গল ব্যাটালিয়নকে উত্তর মেঘালয় সীমান্ত অঞ্চলে এবং ২ ও ৪ ইস্ট বেঙ্গল ব্যাটালিয়নকে পূর্ব সীমান্ত অঞ্চলে পাঠিয়ে দেয়া হয়। সদ্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা ও প্রায়-গঠিত একটি আর্টিলারি ব্যাটারি দিয়ে আরো তিনটি ইস্ট বেঙ্গল ব্যাটালিয়ন তৈরির ইচ্ছা ওসমানীর ছিল।’

 

মিত্রবাহিনীর সক্রিয়তা ও রণকৌশল

মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ নাকি ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ উভয় দেশের কোনো কোনো মহল থেকে এমন একটি প্রশ্ন কখনও কখনও উত্থাপিত হয়। মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় বাহিনীকে বাংলাদেশের ইতিহাস মিত্রবাহিনী হিসেবে চিত্রিত করেছে। বিধি মোতাবেক তা সঠিক হলেও ভারত তা মনে করে কিনা সে প্রশ্নও রয়েছে। ভারতের রাজনৈতিক মহল থেকে এ ব্যাপারে কোনো কথা উত্থাপিত না হলেও ভারতীয় কোনো কোনো সামরিক কর্মকর্তার এমন অভিমতে মাঝে মাঝে পত্রিকান্তরে বিতর্কের অবতারণা হয়। এখন পর্যন্ত কোনো সরকারই এ ব্যাপারে কোনো প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেনি।

এ যুদ্ধে বিজয় অর্জনে মিত্রশক্তি হিসেবে ভারতীয় বাহিনীর ইস্টার্ন কমান্ড মুখ্য ভূমিকা পালন করে। এই বাহিনীর চিফ অব স্টাফ লে. জেনারেল জে এফ আর জেকব সারেন্ডার অ্যাট ঢাকা একটি জাতির জন্ম শীর্ষক যে বই লিখেছেন তাতে মুক্তিযুদ্ধের অবতারণা থেকে পরিণতি; স্ট্র্যাটিজি থেকে এর শিক্ষা পর্যন্ত সমস্ত বিষয়ে তাঁর বাস্তবসম্মত অভিজ্ঞতা ও অভিমত প্রতিফলিত হয়েছে। এ থেকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্মতৎপরতা এবং মুক্তিবাহিনীর কিছু কিছু বিষয় সম্পর্কে জানার সুযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিষয়টি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে গ্রন্থনার চেষ্টা করা হয়েছে। 

ইতঃপূর্বে ভারতীয় সরকারের সদিচ্ছার সাথে সেনাবাহিনীর ভিন্নমতের বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। তবে ভারতীয় সরকারের সাথে তাদের সেনাবাহিনীর মতভেদের বিষয়টি বেশি প্রলম্বিত হয়নি। এপিলের শুরুর দিকে সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল এস এইচ এফ জে মানেকশ’ টেলিফোনে পূর্বাঞ্চলের চিফ অব স্টাফ লে. জেনারেল জে এফ আর জেকবকে জানান যে, ‘সরকার চাইছে ইস্টার্ন কম্যান্ড অবিলম্বে পূর্ব পাকিস্তানে প্রবেশ করুক’। এ ব্যাপারে প্রস্তুতির জন্য পর্যাপ্ত সময়ের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে জেকব বলেন, ---জেনারেল মানেকশ’ জানতে চাইলেন কবে নাগাদ আমরা তৈরি হতে পারব। আমি জানালাম, আমাদেরকে পর্যাপ্ত পরিমাণে উপযুক্ত অস্ত্রশস্ত্র ও সাজ-সরঞ্জাম দেয়া হলে ১৫ নভেম্বরের মধ্যে আমরা তৈরি হতে পারব। এর মধ্যে বর্ষার পানি সরে গিয়ে রাস্তাঘাটও চলাচলের উপযোগী হয়ে উঠবে। হতাশ বিরক্ত মানেকশ’ বললেন, এ বিষয়ে পরে তিনি আমার সাথে কথা বলবেন। 

অতঃপর সরকার, সর্বাধিনায়ক মানেকশ’ও পূর্বাঞ্চলীয় চিফ অব স্টাফ জেকব-এর মধ্যে আলোচনাক্রমে অনুকুল সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ‘২৯ এপ্রিল ইস্টার্ন কম্যান্ড সরকারিভাবে বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীকে তাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে সহায়তা করার দায়িত্ব লাভ করে। একই সাথে সীমান্তবর্তী বিএসএফ-কেও ইস্টার্ন আর্মির অধীনে আনা হয়।’সরকারের আগ্রহ ও নির্দেশে ভারতীয় সেনাবাহিনী মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতার দায়িত্ব গ্রহণ করার পর প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা গ্রহণে তৎপর হয়। বাংলাদেশের প্রকৃতি ও আবহাওয়া বিবেচনায় তারা জেনারেল জেকবের নভেম্বর পর্যন্ত প্রস্তুতির গ্রহণের সময়সীমা অপরিবর্তিত রেখেই পরিকল্পনা প্রণয়ন করে।

প্রস্তুতি হিসেবে তারা নাগাল্যান্ড থেকে ৮ মাউন্টেন ডিভিশন, আসাম থেকে ২০ ও ২৩ মাউন্টেন ডিভিশন, মিজোরাম থেকে ৫৭ মাউন্টে ডিভিশন আর্মি হেডকোয়ার্টার থেকে রিজার্ভ ৯ ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশন, ৪ মাউন্টেন ডিভিশন, ৩৪০ মাউন্টেন ব্রিগেড গ্রুপকে সংগঠিত করার উদ্যোগ নেন। এর ভিত্তিতে একটি খসড়া অপারেশন নির্দেশিকা প্রণীত হয়। মে মাসের শেষ নাগাদ প্রথম একটি খসড়া পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন মে. জেনারেল জেকব। আগস্টের শুরুর দিকে ফোর্ট উইলিয়ামে সর্বাধিনায়ক জেনারেল স্যাম মানেকশ’, ডিরেক্টর অব মিলিটারি অপারেশনস মেজর জেনারেল কে কে সিং, জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা ও মে. জেনারেল জেকব এই খসড়া নিয়ে আলোচনা সভায় বসেন। এই শীর্ষ সভায় গৃহীত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে বাংলাদেশের তিনদিকে সৈন্য সমাবেশ ঘটানো ও মুক্তিবাহিনীর কার্যক্রম, পরিকল্পনা বা তাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার কোনো বিষয় স্থান পায়নি। অক্টোবরের প্রথমদিকে খসড়া পরিকল্পনা অনুযায়ী সেনাস্থাপনাগুলো নতুন করে দল ও উপদল গঠন, বিভিন্ন সেনা-ইউনিটের সমাবেশ ঘটানো ইত্যাদি প্রস্তুতিমূলক উদ্যোগ নিতে শুরু করে।

তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মুক্তিবাহিনীকে সম্পৃক্ত করা বা মুক্তিবাহিনীর পরিকল্পনায় তাদের যুক্ত হওয়ার বিষয়ে জেনারেল জেকব তাঁর বইয়ে কোনো কথা বলেননি। তবে তিনি অকপটে স্বীকার করেছেন প্রথাগত যুদ্ধ বা তাঁদের প্রস্তুতি শেষ হওয়ার পূর্বেই মুক্তিবাহিনী পাকিস্তানি বাহিনীর ভিত নাড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিল। জেনারেল ওসমানী ব্রিগেড গঠন করে প্রথাগত যুদ্ধ শুরু করে দিয়েছিলেন।

এ সময়ে তারা যেসব পরিকল্পনা গ্রহণ করে তা তাদের সমাবেশকৃত বাহিনীকে অবগত করানোর ব্যাপারে মে. জেনারেল জেকব বলেন, ‘সমস্ত সেনা-ফরমেশনের কাছে আমাদের কর্ম-পরিকল্পনা বুঝিয়ে দেয়া হয় এবং তা প্রণয়ন করা হয় যে সব কৌশলের ভিত্তিতে, তা হল: (ক) শত্রুসেনাকে সীমান্তের যতটা কাছাকাছি সম্ভব নিয়ে এসে তাদের রিজার্ভ কমিয়ে ফেলতে হবে; (খ) শত্রুদের শক্তিশালী প্রতিরোধ-ব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে তাদের যোগাযোগ-ব্যবস্থার কেন্দ্রগুলোতে আঘাত হানতে হবে; (গ) শত্রুবাহিনীকে নিষ্ক্রিয় করে তাদের কম্যান্ড ও নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র নিশ্চিহ্ন করে দিতে হবে; এবং (ঘ) সুযোগমতো পদ্মা ও মেঘনা পার হয়ে উত্তরদিক থেকে ঢাকাগামী মূল আক্রমণকে আরো শক্তিশালী করতে হবে।’

সারেন্ডার অ্যাট ঢাকা গ্রন্থে মিত্রবাহিনীর পরিকল্পনায় মুক্তিবাহিনীকে সম্পৃক্ত করার একটি তথ্যও রয়েছে। আর সে মুক্তিবাহিনী বাংলাদেশ সরকারের অধীন মুক্তিবাহিনী নয়- তাদের আশীর্বাদপুষ্ট কাদেরিয়া বাহিনী। এর বাইরে সমস্ত বইয়ের কোথাও মিত্রবাহিনীর সাথে মুক্তিবাহিনীর সম্পৃক্ততার কোনো একটি তথ্যও নেই। পরিকল্পনায় ঢাকায় প্রবেশের জন্য ৫০ প্যারাশ্যুট ব্রিগেডের একটি ব্যাটালিয়ন গ্রুপকে টাঙ্গাইলে বিমান থেকে নামানোর সিদ্ধান্ত হয়। বিমান থেকে সেনা অবতরণের সময়ে স্থানীয়ভাবে নিরাপত্তার জন্য তারা এ বাহিনীকে নির্ভর করে পরিকল্পনা গ্রহণ করে।

এ সম্পর্কে মে. জেনারেল জেকব বলেন, ‘টাঙ্গাইলে বাঘা সিদ্দিকীর নেতৃত্বে ২০,০০০ মুক্তিযোদ্ধার এক বাহিনী আছে। প্যারাশ্যুট ব্যাটালিয়নের অবতরণ-এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই বাহিনীকে ব্যবহার করতে হবে।’পরিকল্পনায় বলা হয়, ‘ছত্রীসেনা নামাবার আগে ৫০ প্যারাশ্যুট ব্রিগেডের ক্যাপ্টেন পি কে ঘোষ-এর নেতৃত্বে সিগন্যাল ডিটাচমেন্টসহ একটি অ্যাডভান্স পার্টি টাঙ্গাইলে সিদ্দিকীর সাথে যোগাযোগ করে ২ প্যারা ব্যাটালিয়ন গ্রুপের ছত্রীসেনা অবতরণের জন্য সুবিধাজনক ক্ষেত্র প্রস্তুতের জন্য আমরা পাঠিয়ে দিই। সিদ্দিকীর সাথে ঘোষ যোগাযোগ করেন এবং বিমান থেকে ফেলা সড়ক অবরোধের উপকরণাদি সংগ্রহ করার কাজে তাঁর সাহায্য কামনা করেন। সিদ্দিকীকে আরো বলা হয় যে, যুদ্ধ শুরু হলে তাঁর বাহিনী আমাদের সৈন্যদের সাথে ঢাকার দিকে অগ্রসর হবে। যুদ্ধ শুরু হবার পর ছত্রীসেনা অবতরণে উপযুক্ত সহায়তা করলেও পাকিস্তানি বাহিনীর অপসারণে তাঁর বাহিনী কোনো আক্রমণাত্মক ভূমিকা পালন করেনি। যুদ্ধ থেমে যাবার পর অবশ্য তাঁর বাহিনীর কিছু অংশ ঢাকায় আসে।’

 

মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর পৃথক পথচলা

মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় জেনারেল ওসমানীর পরিকল্পনা যে সঠিক ছিল তা যেমন মে. জেনারেল জেকবের অভিমত থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় তেমনি ভারতীয় বাহিনী যে মুক্তিবাহিনীর সহযোগী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেনি তা-ও তাঁর অভিমত থেকে সুস্পষ্ট বুঝা যায়। আত্মসমর্পণ পর্বে চতুর্দিক থেকে বাংলাদেশ বাহিনীর অধিনায়কগণ মরনপণ যুদ্ধ করে এবং তাদের কেউ কেউ একই সাথে ঢাকায় প্রবেশ করলেও জেনারেল জেকব সে বিষয়টি সতর্কতার সাথে এড়িয়ে গেছেন। তিনি কোথাও বলেননি যে, তাঁরা যৌথবাহিনীর অংশ বা মিত্রবাহিনী হিসেবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। সারেন্ডার অ্যাট ঢাকা’র ভাষ্যমতে ভারত সরকারের নির্দেশে পূর্ব পাকিস্তান থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী হটানোর জন্য ২৯ এপ্রিল থেকে নভেম্বর পর্যন্ত প্রস্তুতি-প্রশিক্ষণ-সমাবেশের পর যুদ্ধ শুরু করে ডিসেম্বরে ভারত বিজয় লাভ করে।

এই সাত মাসের প্রস্তুতির পর ডিসেম্বরে তারা যে বিজয় লাভ করে তাতে মুক্তিবাহিনীর কৃতিত্বের বিষয়টি মেজর জেনারেল জেকবের ভাষ্যে সাবধানে উচ্চারিত হলেও তা ছিল খুবই ক্ষীনকণ্ঠ। এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়কালে মুক্তিবাহিনীর তৎপরতায় পাকবাহিনীর প্রাণ ওষ্ঠাগত না হলে যুদ্ধের সমীকরণ কী হতে পারতো তা তিনি আলোকপাত করেননি। অন্তত এ বিবেচনায় হলেও মুক্তিবাহিনীর সাথে যৌথভাবে মিত্রবাহিনীর যুদ্ধের কথা স্বীকার্য ছিল। কিন্তু তিনি তা করেননি। তাঁদের বাহিনীর বিন্যাস, চুড়ান্ত আক্রমণ রচনা এমনকি আত্মসমর্পণ পর্বেও বাংলাদেশ বাহিনীকে যুক্ত না করে কাদের সিদ্দিকীকে নিয়ে ঢাকায় নিয়াজির দপ্তরে প্রবেশ করে। মন্দের ভাল যে, আত্মসমর্পণের মাত্র তিন-চার ঘণ্টা আগে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে একজন প্রতিনিধি প্রেরণের জন্য অবহিত করে।

ভারতীয় কুটনীতিক জে. এন. দিক্ষীতের বক্তব্যে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়। তিনি বলেন: Despite the overall consensus about supporting and then participating in the liberation struggle of Bangladesh, creation of a joint command become a thorny issue for a brief period in the last week of november, the Indian military command put forward the logical stand from their point of view that it is imperative to have a unified centralised chain of command, particularly because the Indian armed forces would be engaged in a direct military operation. Our armed forces high command was not very happy about the creation of a joint command General (the rank was given to him for the assignment) Osmani being designated as joint Supreme Commander of the forces which would operate in East Pakistan. Prime Minister Tajuddin Ahmed felt that his government political credibility as well as discipline and loyalty of freedom fighter can only be ensured if the joint command is formed in which commanders of the Bangladeshi freedom fighters with Col. (retd.) Osmani at the head have a role to play, ultimately D. P Dhar under direction from Mrs. Gandhi was able to persuade the Indian Military Command to accept a joint Command structure with General Osmani as tha counterpart of general officer Commanding-in-Chief of the Eastern Command, General Jagjit Singh Aurora.

এতে স্পষ্ট যে, ভারতীয় বাহিনী মুক্তিবাহিনীকে পাশকাটিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পরিবেশ সৃস্টি করার চেষ্টায় বিভোর ছিল, যা তারা শেষ পর্যন্ত করতে সক্ষমও হয়েছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ও ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধীর রাজনৈতিক সদিচ্ছায় ভারতীয় বাহিনী শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ বাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল ওসমানীকে যৌথকমান্ডে যুক্ত করে জয়েন্ট সুপ্রিম কমান্ডার করলেও সে ছিল কেবলই মিসেস গান্ধীর সম্মানে আনুষ্ঠানিক সমজোতা। প্রকৃত অর্থে তারা বাংলাদেশ বাহিনীকে পাশকাটিয়েই যুদ্ধ শুরু এবং শেষ করে। এরই প্রতিধ্বনি ঘটেছে আত্মসমর্পণের দলিল। Instrument of Surrender বা আত্মসমর্পণের দলিলের কোথাও ‘যৌথবাহিনী’ শব্দের উল্লেখ নেই। এতে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ‘এই পত্র সাক্ষরের সাথে সাথে পাকিস্তানি পূর্বাঞ্চলীয় কম্যান্ড লেফটেন্যান্ট জগজিৎ সিং অরোরার পরিচালনাধীন হইবে।’

জে. এন. দিক্ষীতের বক্তব্যেও তা-ই প্রকাশ পেয়েছে। তিনি বলেন, It was clearly understood that once the operation started, the command and control would rest with the Indian Military Headquarters at Delhi and in Calcutta. The creation of a Joint Command was essentially a political arrangement respecting Bangladesh’s political status and sensitivities.

জেনারেল ওসমানীর পিআরও’র বক্তব্য থেকে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়। তিনি বলেন, ‘যৌথ কমান্ডে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী প্রতিনিধিত্ব করা সত্ত্বেও কোনো সময় যৌথ কমান্ডের কোনো বৈঠক হতে দেখিনি। কিংবা যৌথ কমান্ডের দুই নায়ককে এতবড় একটা যুদ্ধ পরিচালনার ব্যাপারে একত্রে মিলিত হয়ে পরামর্শ বা আলোচনা করতেও দেখিনি। এমনকি ভারতীয় কেন্দ্রীয় কমান্ডের প্রতিনিধি হিসেবে তাদের পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ড প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল অরোরাকেও কোনো দিন দেখিনি আমাদের সশস্ত্র বাহিনী প্রধান এবং যৌথ কমান্ডের বাংলাদেশের প্রতিনিধি ওসমানী সাহেবের সঙ্গে দেখা করে কোনো বিষয়ে আলোচনা করতে! তবে সকলের অজান্তে কিংবা অতি গোপনে তাঁদের মধ্যে এ ধরনের কোনো বৈঠক কিংবা দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছে কিনা তা অবশ্য বলতে পারবো না। আর দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছে এমন কথাও শুনিনি। ---হয়তো সামরিক প্রটোকলে অবস্থানগত দূরত্বের কারণেই মুক্তিবাহিনীর অধিনায়ক কর্নেল ওসমানী এবং ভারতীয় বাহিনীর প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল মানেকশ, লেফটেন্যান্ট জেনারেল জে. এস. অরোরার মধ্যে কোনো সাক্ষাৎ হয়নি। বুঝতে আমাদের কষ্ট হয়নি যে যৌথ কমান্ডের দুই নেতার বৈঠকে মিলিত হওয়ার মাঝখানে সামরিক প্রটোকলগত এক বিশাল প্রাচীর বিদ্যমান ছিল।’

 

ভারতীয় কর্তৃপক্ষ জেনারেল ওসমানীর নেতৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রয়াশে ‘র’-এর প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ‘মুজিব বাহিনী’ গঠিত করে। এ বাহিনীর সমন্বয়কারী ও প্রশিক্ষক ছিলেন ‘র’-এর কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স বিভাগের মেজর জেনারেল সুজন সিং উবান। তিনি এস এস উবান নামে পরিচিত ছিলেন। এই মুজিব বাহিনীর সদস্যরা কিছুতেই কর্নেল ওসমানীর কমান্ডে না আসাতে তখন প্রভূত সমস্যা হচ্ছিল। জেনারেল উবানের বর্ণনা অনুযায়ী ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল মানেকশ নাকি প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদকে বলেছিলেন যে মুজিব বাহিনীকে তিনি (জেনারেল মানেকশ) গঠন করেছিলেন তাঁর সেনাবাহিনীর হয়ে বিশেষ কিছু অভিযান পরিচালনার জন্য।

একটা গুজব ছিল যে, ‘র’-এর ভুত কোনো কোনো সেক্টর কমান্ডার ও তদোর্ধ্ব সামরিক কর্মকর্তার ঘাড়ে চড়েছে। সেক্টর কমান্ডারগণের মধ্যে ‘র’-এর প্রভাব কতটুকু ছিল কিংবা আদৌ ছিল কিনা সে সম্পর্কে আলোচনা নিষ্প্রয়োজন। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ মুক্তিযুদ্ধ সংগঠন ও পরিচালনায় দৃশ্যমান অশুভ ছায়া দৃষ্টে খুবই মর্মাহত হতেন। তিনি অত্যন্ত ধৈর্য ও দূরদর্শীতার সাথে উদ্ভুত পরিস্থিতি মোকাবেলা করতেন। এসব সমস্যার বিষয়ে বিএসএফ’র তৎকালীন পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের আইজি গোলক মজুমদার বলেন, ‘কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা তাঁর নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ক্রমাগত গোপন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন এবং বিদেশী শক্তির সঙ্গে সহযোগিতা করতে থাকেন। তাজউদ্দীন সাহেব তাঁর সহজ ও সরল যুক্তির জোরে তাঁদের ক্রিয়াকলাপ নিয়ন্ত্রণে রাখেন। কয়েকজন যুবনেতা বিক্ষুব্ধ হয়ে মুক্তিবাহিনীর বিকল্প হিসেবে মুজিব বাহিনী গঠন করেন এবং কিছু দিশেহারা ভারতীয় আমলার সাহায্যে অধিকতর অর্থ ও অস্ত্রশস্ত্র তাঁরা যোগাড়ে সমর্থ হন।’

তথ্যসূত্র: ১. জাতীয় রাজনীতি ১৯৪৫ থেকে ৭৫, অলি আহাদ ২. অবিকশিত জাতীয়তাবাদ ও অঙ্কুরে বিনষ্ট বিপ্লবের পটভূমিতে বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হচ্ছিল, বের্নার-অঁরি লেভি, অনুবাদ ও সম্পাদনা: শিশির ভট্টাচার্য্য ৩. মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান, সালাম আজাদ ৪. সারেন্ডার অ্যাট ঢাকা, লে. জেনারেল জে এফ আর জেকব, অনুঃ আনিসুর রহমান ৫. বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র নবম খÐ ৬. বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র দশম খÐ ৭. বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র পঞ্চদশ খÐ ৮. মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ, মেজর জেনারেল কে এম সফিউল্লাহ বীর উত্তম ৯. বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ ব্রিগেডভিত্তিক ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় ১০. Liberation and Beyond : Indo-Bangladesh relations, J. N. Dixit. ১১. একাত্তরের রণাঙ্গন অকথিত কিছু কথা, নজরুল ইসলাম ১২. ১৯৭১ : ভেতরে বাইরে, এ কে খন্দকার ১৩. বাংলাদেশ সরকার ১৯৭১, এইচ.টি.ইমাম ১৪. তাজউদ্দীন আহমদ-আলোকের অনন্তধারা (প্রথম খণ্ড), সিমিন হোসেন রিমি।

 

লেখক : মুহম্মদ সায়েদুর রহমান তালুকদার, হবিগঞ্জ জেলার ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধে হবিগঞ্জের ইতিহাস, বাংলাদেশের হাওর, মুক্তিযুদ্ধে মাধবপুর প্রভৃতি গ্রন্থ প্রণেতা; সমন্বয়ক (হবিগঞ্জ জেলা): বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ প্রকল্প, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। [email protected]

 

মুহম্মদ সায়েদুর রহমান তালুকদার
হবিগঞ্জ জেলার ইতিহাস, হাওরের ইতিবৃত্ত, প্রসঙ্গ: মুক্তিযুদ্ধে হবিগঞ্জ, মুক্তিযুদ্ধে মাধবপুর প্রভৃতি গ্রন্থ প্রণেতা। সমন্বয়ক (হবিগঞ্জ জেলা): এনসাইক্লোপিডিয়া অব বাংলাদেশ ওয়ার অব লিবারেশন, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি।

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top