সিডনী সোমবার, ১২ই এপ্রিল ২০২১, ২৯শে চৈত্র ১৪২৭

রুচি বদলে গেছে : ফাতিমা আফরোজ সোহেলী 


প্রকাশিত:
৮ এপ্রিল ২০২১ ১২:১৮

আপডেট:
১২ এপ্রিল ২০২১ ১৩:৪৮

ছবিঃ ফাতিমা আফরোজ সোহেলী 

 

রুচি এমন এক জিনিস যা সবার একইরকম থাকেনা। রুচি চাইলেই বদলেও ফেলা যায়না। যদি কারো রুচি আমূল বদলে যায়, তখন একে ভয়াবহ ব্যামোই আখ্যা পেতে হয়।

বেশ কিছুদিন থেকে সৌম্যরও ঠিক এই রোগটাই হয়েছে। চেনা চাওমিন খেতে পারছেনা। চেনা পথে হাটছেনা। পরিচিত দু' একজন বন্ধু ছাড়া যে গত সাত/আট বছরে মেশেইনি কারো সাথে, সেই নাকি ওই কলেজ পাড়ার ভীড়ে আড্ডা দিচ্ছে নিয়মিত।

কেউ অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেই বলছে, "রুচি বদলে গেছে।"

শীত কিংবা গ্রীষ্মে আগে তার পোশাক বলতেই ছিলো ফুল শার্ট আর প্লেইন প্যান্ট।সে এখন দিব্যি পাঞ্জাবী, ফতুয়া আর জিন্স পড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। নিজ হাতে ক্লিন শেইভ ছাড়া যার দিনের শুরু হতনা; সেই নাকি দাড়ি-গোঁফে মুখ ভরিয়ে পাড়ার সেলুন থেকে ট্রিমিং করে নিচ্ছে।

ভালো গান গাইত সৌম্য, যদিও নির্দিষ্ট কিছু গৎবাঁধা ক্লাসিক গান। সেও যেন অসহ্য ঠেকছে তার আজকাল। পারছে না আর গাইতেও। কেউ সেধে পরে শোনাতে চাইলেও বলছে, 

"বাদ দাও বাপু ওই সব। নতুন কিছু শোনাও বুঝলে, রুচি বদলে গেছে!"

সে যতটা সহজে বলছে বটে -রুচি বদল হয়েছে, বিষয়টা ততটা সহজে নিতে পারছেনা, পাড়াতো খুড়তুতো পিসতুতো কেউই।

কি করে নেবে?! কেবল পড়াশোনা, বিলিতি কবির বই আর লন্ডন গিয়ে পিএইচডির করতে স্কলারশিপের ফর্ম ফিলাপ, এই ছিলো যার ধ্যান জ্ঞান; সেই এখন পাড়ার লন টেনিস ক্লাবে নাম লিখিয়েছে!? রাত করে বেশ নাইট ক্লাবেও যাচ্ছে আজকাল, গোবেচারা টাইপের কবি কবি মুখের সোম্য ব্যানার্জী। 

আমি সৌম্যকে চিনি সেই স্কুলের সময় থেকেই। ওর স্বভাবের কিছু গোঁয়ার্তুমির দিকও তাই জানি। ভীষণরকম বন্ধু বৎসল উচ্ছল স্বভাবের এই ছেলেটি খুব সামান্যতেই করো সাথে কথা বন্ধ করে দিত । একবার জ্যামিতির ক্লাসে অজয়ের কাছে পেন্সিল চাইলো। বাড়তি থাকা স্বত্বেও অজয় তা না দিয়ে উলটো বললো, " তুই নিয়ে এলিনা কেন?" 

ব্যাস, কথা বন্ধ। স্কুল মাঠে টিফিন বিরতিতে খেলতে গিয়ে ক্লাসে নতুন আসা দীপক, সৌম্যকে কে বৌম্য বলে ডেকে মজা করেছিল; সেই কথা বন্ধ। মনে পড়ে, দীপক এরপর টানা তিন মাস প্রতিদিন

 "সৌম্য ভুল হয়ে গেছেরে ক্ষমা করে দে' লেখা চিরকুট আমাকে দিয়ে যেতো সৌম্যকে দিতে। 

কিন্তু তাও গলেনি ওর মন তিনদিনের জ্বরে ভুগে দীপক যেদিন মারা যায়, সেদিনও সৌম্য   বেশ নির্লিপ্তভাবেই বলেছিলো, "এত হতেই পারে!" 

তাই বন্ধ হওয়া কথাযে কোনোভাবেই  চালু হবার নয় তা আমি জানতাম। আমি বুঝতে পেরেছিলাম ওর মনের কোনে যদি কোনোভাবে আঘাত লাগে, তবে কোনোরকম বাকবিতন্ডা ছাড়াই সে দূরে সরে যায়। এমনই ছিল সৌম্য । 

সেই সৌম্যই দিনে দিনে প্রিয় বন্ধু হয়ে উঠলো আমার। অবশ্য ঠিক বন্ধু নয়, আমিই যেন হয়ে উঠেছিলাম, ওর সহচর। মিথ্যে বলবোনা, ওর সংগ আমার ভালো লাগত। ওর গানের গলা, যখন তখন জীবনানন্দ, সুকান্তর কবিতা মুখস্ত আওড়ে যাওয়া খুব টানত আমাকে। ওই টানেই হয়তো, সৌম্যর  সব কাজেরই  একনিষ্ঠ ভক্ত এবং সাপোর্টার ছিলাম আমি। 

তখন সবে স্কুল ছেড়েছি, নতুন গোঁফের লজ্জাও কাটিয়ে উঠেছি। একসাথে মুখে খুরও চালাই, কালে ভাদ্রে বিশুদার সেলুনে বসে। নিজেদের বেশ বীর বীর ঠেকে। বিশেষ করে যখন বাবার বেনসন সিগারেট চুরি করে, কলেজ ক্যান্টিনের চাতালের পেছনে দাঁড়িয়ে আদিম পুরুষ হবার সুখে নেশারটান দিতাম; তখন আমাদের চোখে- মুখে থাকত নিষিদ্ধ বিশ্ব জয়ের আনন্দ! 

 

সৌম্যর মধ্যে, ব্যতিক্রম হবার একটা সুপ্ত ইচ্ছের বাস ছিলো। কিন্তু সরকারী বড় কর্মকর্তা বাবার অবাধ্য হবার মতো  সাহস ওর ছিলনা, সেটা আমি টের পেতাম। 

 

তাও, বিভিন্নভাবে ওকে উৎসাহিত করাই ছিলো আমার ব্রত। চল ঘুড়ি উৎসব করি, চল এবার দোলে যাত্রা নামাই, চল বিতর্ক প্রতিযোগিতায় নাম লিখাই,, এর সব কিছুই ছিলো ওকে ঘিরে থাকার বলয়। সেই বলয়েও একদিন ফাটল ধরলো। জোয়ার এলো প্রেমের এবং অবশ্যই সৌম্যর বুকে। 

 

যেদিন আমাদের উত্তর ২৪ পরগনার ছোট্ট এই পৌরসভা, হালিশহরে পাহাড়ের পাদদেশ সেই শিলিগুড়ি থেকে  থানার বড়কর্তা বাবার সাথে এলো একমাত্র রাজকন্যা জয়তী। সেকি তার উচ্ছল ঝর্ণার মত চলন আর উদ্ভাসিত আচরণ! আহ;

এখনো মনে পড়ে সেই দিনটি, সাইকেল চালিয়ে এসে যেদিন হঠাৎ শব্দ করে আমাদের সামনে ব্রেক করে বললো,

 "এই তোদের এখানের ক্যারাটের কোচিংটা কোথায়রে?" 

নাম জিজ্ঞাসা নয়, পরিচয়ের সৌজন্য পর্ব নয়, একেবারে সোজা তুই তোকারি, আর ক্যারাটে! ছোটো ববছাটা চুলে, সোনালী মুখের জয়তিকে মেয়ের চেয়ে বেশি আফ্রোদিতিই মনে হচ্ছিলো। টিকালো নাকের ধারের ঘামগুলো ছোটো ছোটো ফোটায় মুক্তোর ঝিলিকে চোখ ধাঁধাচ্ছিল। ঘোর নাকি স্বপ্ন তাতেই থেকে যেতাম, যদিনা আমরা দুজনই আমতা আমতা করছি দেখে, জয়ীতাই ধমকে না উঠত, 

"কি হলো, তোরাকি কথা বলতে জানিস না? নাকি তোরাও নতুন এখানে? ও এনি ওয়ে, আমি.." 

বলেই হাত বাড়িয়ে দিল আমাদের দিকে আর তখনই ওই বাড়িয়ে দেয়া হাত দ্রুতই ছুয়ে, ওকে থামিয়ে দিয়ে, সৌম্য নিজেই বলে উঠলো 

"জয়ী, তুমি জয়ীতা। "

 

"হ্যাঁ,,  বাবা তাই ডাকে, তবে ওই নাম আমার তেমন একটা পছন্দ নয়। "

"জয়ী..." বলে ডাক এলো হঠাৎই পাশ থেকে। 

ওর সামনে পরে কেউই খেয়াল করিনি, কখন থানার বাবুর গাড়িটা আমাদের ক্রস করে রাস্তার বা ঘেসে দাঁড়িয়েছে। না সেদিন আর কথা হলোনা, জয়ী "জি বাপি"

 বলে সাড়া দিয়েই, সাইকেলের ব্রেক উল্টো ঘুরিয়ে আমাদের দিকে মুখ করে বলে গেল, 

"যাইরে, তোরা কিন্তু ক্যারাটের খবরটা নিয়ে রাখিস।"

 

তখনও সাদা রঙের Mahindra TUV300 সিরিজের গাড়িটার পেছনে পেছনে ঝলমলে জয়ীতার চলে যাওয়া দেখছিল সৌম্য। আমি গলায় একটু শব্দ দিতেই, সে ফিরে তাকিয়ে বললো,

 'কি?" চোখে লাজুক হাসি।

আর আমিও সেই হাসিতে সায় দিয়ে বললাম,

 "বৌদী!" 

তারপর দু'জনেই হেসে ফেললাম জোরে।

এরপরের গল্পগুলো খুবই সাধারণ। সৌম্য আলাদা হতে থাকলো, জয়ীর হতে থাকলো, আর আমি অপেক্ষার হতে থাকলাম। 

 

একটা বিস্ময় আমার কিছুতেই কাটছিলো না। সচরাচর মেয়েলি স্বভাব বর্জিত জয়ী কি করে, সৌম্যকে একেবারে ছকে গড়া আদর্শ প্রেমের মূর্তি গড়ে নিল!?

আগেকার কিছুই আর নেই তখন তার স্বভাবে। শুধুই কালেভাদ্রে আমার সাথে গোল্ড ফ্লেক লাইট টানা ছাড়া। ওই ব্যান্ডটাই আমাদের দুজনেরই ভালো লাগত। তারও এলো বিপত্তি। 

দূর্গাপূজোর অষ্টমী সেদিন। গড়িয়াহাটের মোড়ে সন্ধ্যে ছ'টায় জয়ীর আসার কথা, আমি যথারীতি সৌম্যকে সংগ দিচ্ছি। 

বলাইবাহুল্য আমার নিত্য সৌম্যকে ঘিরে থাকাযে জয়ীর বিশেষ পছন্দ নয়, তা আমি বুঝতে পারি। সৌম্যটা যদিও কিছু প্রকাশ করেনা, কিন্তু প্রকাশের দায়িত্বটা জয়ীই নিয়ে নিল সেদিন৷ 

 

আলিগড় জুয়েলার্সের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে দুজন গোল্ড ফ্লেক লাইট টানছিলাম। তখন তেমন আর ভয় ডরও নেই। কিছুটা বয়সেওত বেড়েছি। এমন আত্মবিশ্বাসের ঘোরে যখন দুজনই ভাসছি তখনই হঠাৎ ঘটে গেল ঘটনাটা। কোথা থেকে অকস্মাৎ ধুম করে একটা ধাক্কা লাগলো বুকে। ছিটকে পড়ে গেল হাতের ধোঁয়া। হঠাৎ সব ঝাপসা লাগলো। সৌম্য আর্ত চাপা কন্ঠে 

'আহ; কি হচ্ছে; "

বলতেই খেয়াল করলাম সামনে জয়ী রুদ্র মূর্তি রুপে দাঁড়িয়ে এবং একের পর এক ক্যারাটের পাঞ্চ দিয়ে যাচ্ছে আমার চোখে মুখে বুকে। সোনালী রঙের তসর সিল্ক পরে সেই শেষ বিকেলের আলোয় সেদিনও ওকে দেবীর মতোই লাগছিলো। আর পুঁজোর বাজারের ভীড়ের মাঝেই কিছু উৎসুক লোক আমাদের তিনজনকে ঘিরে ধরে কি ঘটনা তাই বোঝার চেষ্টা করছিল।

 কেউ কেউ প্রশ্ন করছে, 

 

" কি হয়েছে দিদি ভাই? গায়ে হাত দিয়েছে?" আরেকজন আরও বেড়ে বললো  

 

" আরে সাহেব প্রশ্ন করছেন কি? বোঝেন না ভীড়ের সুযোগে ঠিক জায়গামতো ঠুকে দিয়েছে!" 

 

"বলুন দিদি, শালাকে একেবারে ছেঁচে দিই।" 

দু একজন তেড়েও এলো। ঘটনার আকস্মিকতা কাটিয়ে দেখি জয়ী বলে চলেছে,

 "হাউ ডেয়ার ইউ! এই, তোকেনা বলেছি পরিতোষের পেছনে সারাক্ষন লেগে থাকবিনা। কি আস্পর্ধা এখানে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাওয়াচ্ছিস!? ইউ ডার্টি ফেলো! তুই জানিস সৌম্য কার ফিয়ন্সে? তোর সাথে ওর যায়!? "

 

সৌম্য বার বার বলে চলেছে,

 "আহ কি হচ্ছে!"

তাতে জয়ী আরও রেগে গিয়ে বলে যাচ্ছে...

 'কি হচ্ছে মানে কি? তোমাকে কতবার বলেছি আমি, এই সমস্ত ছোটো লোকদের সাথে চলবেনা।  ওর ছোটো ভাই পাড়ায় মাস্তানি করে বেড়ায়। বোনটা সেই ক্লাস সেভেনে কার সাথে পালিয়েছিল, বারো ঘাটের পানি খেয়ে ওদের ঘাড়েই বসে আছে আর নটংকী করে বেড়াচ্ছে।"

 

 সৌম্য চাপা স্বরে আরও কি বলে যেন ওকে থামাতে যাচ্ছিলো কিন্তু দিদির প্রসংগ আসায় আমিই আর চুপ থাকতে পারলাম না, মুখে কিছু না বলে হাতেই একটা চড় বসিয়ে দিলাম জয়ীর নরম আবীর মাখা গালে। জয়ী কয়েক সেকেন্ড ফ্রিজ হয়ে গেলো, ভীড়ের হট্রগোলও হকচকিয়ে গেল যেন। পরক্ষনেই জয়ী খামচে ধরলো আমার পাঞ্জাবীর বুক। ছিড়ে দিল টেনে বোতাম আরো কিছু অংশ। একই পাঞ্জাবি সেদিন সৌম্যও পরেছে, আর বানিয়েছে আমারই দিদি। যে আমার মতোই সৌম্যকে নিজের ভাই মনে করে। ভাইফোটায় আমারই পাশে সৌম্যর আসনটাও পাতে! 

 

আমি তখন একদৃষ্টে তাকিয়ে সৌম্যর দিকে, ও কয়েক মুহুর্ত আমার চোখে চেয়ে থেকেই কি আবিষ্কার করলো জানিনা, তবে জয়ীকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে ওর নিজের দিকে ফিরিয়ে বলতে থাকল…

 "আমি চিনিনা ওকে, অনিরুদ্ধ কে আমি চিনিনা। প্লিজ, ভুলে যাও, প্লিজ চলে এসো। "

 

জয়ীও হঠাৎ শান্ত তখন, 

"তুমি ঠিক বলছ!! " 

"হ্যাঁ বলছি, তোমায় ছুয়েই বলছি, আমার পাশে আর দেখবেনা ওকে।" 

এই শেষ কথাটা সৌম্য এতটা জোরে বললো, যেন ও কথাটা আমাকেই শোনালো এবং নিজেকেও।

 

কতক্ষন ওখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম জানিনা। চোখে শুধু ভাসছে আমাকে পেছন করে ওদের ভীড়ের মাঝে হারিয়ে যাওয়া। সৌম্যর শেষ কথাগুলোই অনবরত চলছিলো, আর কিছু প্রশ্ন! কেন?  শুধুই সিগারেটের জন্য!? নাকি আমার ভাই মাস্তানি করে ওর বাবার পাড়ার দোকান থেকে চাঁদা তোলায় বাঁধা দেয় বলে!? আর দিদি, ছি ছি দিদিকে ও কোথায় নামিয়ে...! দিদিই প্রতিবছর কুমারী পূঁজোয় ওকে কাপড়ের গয়না তৈরী করে উপহার দেয়। কিসে ওর রাগ!? হ্যাঁ, তেমন স্বচ্ছল নই আমরা, কিন্তু সরকারি স্কুল থেকে রিটায়ার্ড করেও বাবা এখনো সম্মানের সাথে ছাত্র পড়ান। এখনও গণিত আর ইংরেজির পরিতোষ স্যারের অনেক শ্রদ্ধা তাঁর হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীর কাছে। দিদি একটা ভুল করে ফেলেছিলো ঠিকই, তাই বলে দিদি ফিরে এলে তাকে মনোবল দিয়ে ভালো রাখার শিক্ষাটা আমরা বাবার কাছেই পেয়েছি। ঠিক কি আক্রোশে আজ জয়ী! আমার ভাবনা ঘুর্ণিপাকে স্থির করে দিলো আমাকে। ঠিক কতক্ষন জানিনা ঠায় দাঁড়িয়ে ছিলাম ওখানেই।

তারপর বৃষ্টি এলো, এরও কিছু পর ভাই এলো, কোথাও থেকে কিছু শুনেই হয়তো।

"দাদা, বাড়ি চল।" 

ঝাপ্সা চোখে তাকাই; চিনতে পারছিলাম না ধীরাজকেই, আবার বললো 

"বাড়ি চল দাদা। অনেক পূঁজো দেখলি।" 

তখনই সম্বিত ফিরে এলো আমার, মাথা নামিয়ে 'হুম চল' বলে ফিরে এলাম বাড়ি। 

 

না, আমাকে কোনো প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়নি। চুপ করেই ছিলাম অস্বস্তির স্বস্তিতে। তা কাটাতে কিংবা বাড়াতে প্রশ্নই করেনি কেউ আর, না ঘরে না বাইরে।

 

শুধু নিজেই নিজেকে দুষে চলেছি, কেন আমি সৌম্যকে ছেড়ে দিইনি সে সময় স্বাধীনতায়। সৌম্যর আমাকে বলতে না পারার যন্ত্রণা, আমি নিজ থেকে সরে গিয়েইত কমিয়ে দিতে পারতাম। 

 

আজ দীর্ঘদিন পর এসে বুঝি, প্রেমের শুরুতে মেয়েরা চায়ই তার প্রেমিক শুধুই তার হোক। আজ আমিও বিবাহিত। যদিও প্রেমের নয়, কিন্তু, স্বামীকে একটু একা না পেলে অপ্রেমের বউও ক্ষেপে যায়, তা ভালোই বুঝি। 

 

এ কয়দিন ধরে, দূর থেকে সৌম্যর বদলে যাবার খবর শুনছি শুধু। যদিও, কেউ আমাদের আলাদা হওয়া নিয়ে কোনো প্রশ্ন না করলেও, কোনো না কোনো ভাবে সৌম্যর সব খবর আমি পেতাম।

 

আর আমি!? গলির যেখানটায় দাঁড়ালে সৌম্য বাড়ি থেকে বেরিয়েই ডানে মুখ করে আমাকে দেখেই মাথা নেড়ে এগিয়ে আসত, সেখানটাতেই নিয়ম করে দাঁড়াই। শুরুতে প্রতিদিন, আর এখন শুধুই বন্ধের দিনগুলোতে।  

সৌম্য? না একদিনের জন্যেও আর বাড়ি থেকে বেরিয়েই ডানের গলিতে মুখ ফেরায়নি। এদিকটাতে এলেও, আমাকেই পাশ কাটিয়ে গেছে এমনই ভাবে যেন, আমিই গলির দেয়াল, কিংবা পলেস্তারা পরা পোস্টার। 

 

হুম এই কারণেই কমিয়ে দিয়েছি দাঁড়ানো। আমাকে পোস্টার ভাবার এই কষ্টটা ওকে দিতেও আমার অস্বস্তিকর মনে হয়েছে। 

 

কিন্তু আজ সকাল থেকেই মন তৈরী ছিল, এখানে আসতে হবে। সৌম্যর দেখা পেতেই হবে আজ। এইসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতেই ছোড়া'দার ঝুপড়ি দোকান থেকে সিগারেট নিয়ে টানতে টানতে যখন এগুচ্ছি, সামনেই দেখি জিন্স টিশার্ট পড়ে সানগ্লাস কপালে তুলে সৌম্য এদিকেই এগিয়ে আসছে। আমি ঠিক কি করবো যখন ভাবছি, তখনই ওর চোখে চোখ পড়লো, দীর্ঘ সাত বছর পর। এখনো সেই লাবন্য মুখে ওর, শরীর অনেক সুঠাম, কিন্তু বুদ্ধিদীপ্ত মুখে একটা অন্যমনস্কতা আমার দৃষ্টি এড়ায় না। দু'ভ্রুর ভাঁজে চামড়ার একটা ছোট্ট ফাটলই বলে দিচ্ছে, কি ভীষণ এক ভাবনা ওকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। চোখ যেমন পড়ল তেমনই সরে গেলো এবং আমাকে পাশ কাটিয়ে ও যখন চলে গেলো তখনও আমি ওর ভ্রর ফাটলেই আবদ্ধ ছিলাম।  

"দে" শুনেই সামনে দেখি সৌম্য। কখনযে আমারই কাছে ফিরে এসেছে  সেই বিস্ময় কাটার আগেই হাত বাড়িয়ে আমার সিগারেট নিয়ে টানতে শুরু করলো সেই আগেরই মতো সাহসী ভঙিমায়। 

"গোল্ড ফ্লেক কিংস ধরেছিস?" 

বললাম, "হুম, একটু চেঞ্জ।" 

বললো " ভালো, আমিও এটাই৷ নিচ্ছি।" ডান পায়ে শরীরে বেশিরভাগ ভর দিয়ে একটু ঝুঁকে একেকটা টান দিচ্ছে আর দৃঢ হয়ে মুখটা খানিক উঁচিয়ে কয়েক সেকেন্ড নিয়ে ধীরে ধীরে বিজ্ঞের মতো ধোঁয়া বাতাসে ছেড়ে ডানে বায়ে গভীর চিন্তার দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে। 

মনে পড়ে আমি বলতাম, 

“তোর এই ধুমপানের আয়োজন দেখেই মেয়েরা তোর প্রেমে পড়বে।" 

সে বলত, "নারে দোস্ত ছেড়ে দেবো, ছেড়ে দেবো।" 

" কখন দিবি? "

"এইতো প্রেমটা এলেই ছেড়ে দেবো। "

 তারপর দুজনই গলা ফাটিয়ে হাসতাম। আজ সময়টা ভিন্ন। ও ডানে বায়ে তাকিয়েই আবার মাটির দিকে তাকিয়ে স্থির হয়ে যাচ্ছে। আবার টানছে আবার একই রকম ভাবছে। এভাবে গুনে গুনে পাঁচবার করার পর সরাসরি তাকালো আমার দিকে। তারপর হাজার বছরের বুক চাপা বাষ্প দীর্ঘ শ্বাসে বের করে বললো, "রুচি বদলে গেছে।" 

বল্লাম "জানি।'

"জানিস!?" কিছুটা আশ্চর্য হয়ে। দেখলাম ভ্রুর ভাঁজটা আরও গাঢ় হয়ে, আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেলো।

হুম। রুচিরা ব্যানার্জি জয়ীতাকে সৌম্য ভালোবেসে রুচি বলেই ডাকে সে আমি শুরু থেকেই জানি। সৌম্য স্বভাবের বিরুদ্ধাচারণ করে বেশ শান্ত স্বরে বলল 

"এটাকি জানিস, আমাকে ওর আদর্শ স্বামী তৈরী করা রুচি, ওরই রুমমেট দিপালী বসুর সাথে লিভটুগেদার করছে? জানিস তোদের মারদাঙা জয়ীতা লেসবিয়ান?

আমিই এখন চুপ। 

মনে মনে আমি বিবেকের ঝড়ের মুখোমুখি। কি বলতে এসেছি আজ ওকে? তাকি বলব?

 

সব আক্ষেপ ঝেরে সৌম্য মাথাটা নিচু করে কি ভাবলো, সিগারেটটা ফেলে পায়ে দলে এগিয়ে গেলো কিছুটা। পরক্ষনেই, যেন কি মনে পড়েছে এমন ভঙিতে ফিরে এলো দ্বিতীয় বার। এবার বেশ ব্যস্তভাবে বললো "খেলার ইন্সট্রুমেন্ট বিক্রি করে যে সোনাদা, উনার দোকানটা চিনিস?"

 বললাম "হ্যাঁ, কেন?"

"চল, ভালো ব্যাট লাগবে বুঝলি, লন টেনিসটা শুরু করেছি আবার৷"

 বলেই হাটছে, আর আমিও সেই আগের মতোই ওর পাশে পাশে, ও বলেই চলেছে, আর আমি ভাবছি...

 রুচি বদলে গেছে এই গল্পটা থাকুকই না হয় সৌম্যর কাছে এমনই হয়ে। বেঙালুরু থেকে গতকালের ডাকে আমারই নামে আসা রুচিরার পাঠানো চিঠিতে, ওর বদলে যাবার আসল কারণ নয় রয়েই গেলো আমার বুক পকেটে, একে দ্রুতই নষ্ট করে দিতে হবে। 

একটি অজানা গোপনের বিনিময়ে সৌম্যর এই রুচি বদলের অধ্যায় হয়ে যাক রুচিরার ইচ্ছেমতন শেষ অধ্যায়।

সবাই জানুক "সৌম্যর রুচি বদলে গেছে"।
আমিতো জানি, "ও নিজ রুচিতেই ফিরেছে”।

 



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top