সিডনী শুক্রবার, ২২শে অক্টোবর ২০২১, ৬ই কার্তিক ১৪২৮

সাগরের গহীনে : আসিফ মেহ্‌দী


প্রকাশিত:
১১ অক্টোবর ২০২১ ১৩:৪৬

আপডেট:
২২ অক্টোবর ২০২১ ০০:৫২

 

এক.

আকাশভরা তারা। এত তারা রাফি আগে দেখেনি। রাফির কাছে জীবন হলো এক বিস্ময়ভ্রমণ। কতবার যে কতভাবে সে বিস্মিত হয়েছে বা হচ্ছে-তার হিসেব নেই। মাঝেমাঝে তার মনে হয়, বিস্মিত হওয়ার জন্যই মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে। অবাক বিস্ময়ে সে ভাবে, এত বৈচিত্র্য, এত রং-রূপ-রস, এত এত এত কেন!?

একপাশে গহীন বন। রাতের অন্ধকারে মনে হচ্ছে পাহাড়সমান লোমশ কোনো জন্তু শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে। তার নিঃশ্বাসের শব্দ নেই, নড়াচড়ায় আগ্রহ নেই। এই বিশালতার নীরবতার আতংকিত রূপটি রাফিকে বেশ ভীত করে তুলেছে। নৌকার ইঞ্জিনের ভটভট শব্দ নীরবতায় চিড় ধরাচ্ছে ঠিকই কিন্তু তাকে ছাপিয়ে উঠতে পারেনি। রাফি যে ভয় পেতে শুরু করেছে, তা ভ্রমণসঙ্গী কোনোভাবে টের পেলেই তার ওপর চড়াও হবে। তখন হয়তো রাফিকে ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবে। বিস্ময়ভ্রমণের এ জীবনপথে রাফি ফিরে যাওয়ার মানুষ না। সুতরাং ‘ভয়’কেই তার ফেরাতে হবে।

আর কদিন বাদেই অর্থাৎ চৈত্রের মাঝামাঝি সুন্দরবনে মধু সংগ্রহ করতে ছুটবে বলে প্রস্তুতি নিচ্ছিল রাজেশ মণ্ডল। ‘সাজুনী’ বা দলের প্রধান হওয়ায় তার কাঁধে বিশাল দায়িত্ব। এর মধ্যেই উটকো ঝামেলাসহ এই ছোকরার আবির্ভাব। ছেলেটিকে না করতে পারল না রাজেশ। নিজের পরিশ্রমের টাকায় কেনা নৌকা নিয়ে এত রাতে অরণ্য ও সমুদ্রের সঙ্গমপথে যাত্রা করতে তার মন চাইছিল না। তবে সে তো আর কাঠের তক্তার মতো জড়বস্তু না যে রাফির মোটা অঙ্কের টাকার লোভ ফিরিয়ে দেবে। লোভ ফেরাতে না পারায় এই নিকষ আঁধারে তার নৌকা ভেড়াতে হবে মোটামুটি দূরের এক দ্বীপে।

সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী গ্রামের বাসিন্দা রাজেশ মণ্ডল। কিছুদিন ধরেই দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপের জন্য তার মন পুড়ছিল। সুন্দরবনের বুনো সবুজের মতোই কাছে টানার আশ্চর্য সম্মোহনী ক্ষমতা আছে দ্বীপটির। থাকবেই বা না কেন-দ্বীপটি যে এক টুকরো সুন্দরবন। সারিসারি কেওড়াগাছ, পাখপাখালির ওড়াউড়ি, সঙ্গে বনের বুনো ঘ্রাণ আর দ্বীপের ঐন্দ্রজালিক আবহের মাখামাখি! তবে তার মনের বাসনা এভাবে পূরণ হবে, তা কল্পনাও করেনি রাজেশ।

রাতবিরাতে গহীন বনের পাশ দিয়ে যাওয়া রাজেশের জন্য ভয়ের কিছু না। কোস্টগার্ডের গ্রেপ্তারের ভয় তার মধ্যে নেই। জলদস্যুর আক্রমণের আতংকও তাকে ভীত করে না। সে তো যে-সে মানুষ না। বাঘের ডেরায় ঘুরেঘুরে মধু সংগ্রহ করা মানুষ। তাই তার সাহস আকাশসমান। তার কাছে জীবন মানে সংগ্রাম। এই সংগ্রামে সাহস ও শক্তি যার নেই, তার বেঁচে থাকার অধিকার নেই। চোখের সামনে কত সঙ্গীকে সংগ্রামে হেরে গিয়ে বাঘের পেটে যেতে দেখেছে। শুধু বাঘেই তার ভয়। ভয় খালি নিজের জন্য না, নিজের পরিবারের জন্যও। যেসব মহিলার স্বামীকে বাঘে মেরেছে, তাদেরকে এনজিও-র স্যার-ম্যাডামরা বলেন ‘টাইগার উইডো’। এলাকার লোকেরা তাদেরকে অপয়া ভাবে, বাচ্চাকাচ্চাসহ একঘরে করে ফেলে। রাজেশ চায় না, তার পরিবারের কখনো এমন করুণ পরিণতি হোক।  

রাজেশ এই অন্ধকারেও অনেক দূর পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছে। যে চোখজোড়া ‘ভারী পোকা’র গতিপথ দেখে মৌচাক খোঁজে গহীন বনে, সেই দৃষ্টি তীক্ষ্ম হওয়াই স্বাভাবিক। মৌমাছির মধুগ্রন্থি যখন মধুরসে পূর্ণ থাকে, তখন তাকে মৌয়ালরা বলে ‘ভারী পোকা’। এই ভারী পোকা এদিক-ওদিক ছোটাছুটি না করে ধীরগতিতে মৌচাকের দিকে যায়। তাই মধুর খোঁজে ছোটা মৌয়ালদের চোখ থাকে ভারী পোকার ওপর।

রাজেশ ও রাফি যে দ্বীপে যাচ্ছে, সেখানে বাঘের ভয় নেই। তারপরও আজ সারাদিনই রাজেশের পরিবার নানা কুসংস্কারের মধ্যে আবদ্ধ ছিল। তার স্ত্রী-মেয়ে আজ তেল বা সাবান ব্যবহার করেনি। বাড়ি থেকে দূরে কোথাও যায়নি; শুধু প্রতিবেশীর ঘর থেকে খাবার এনেছে। কারণ, এ বাড়িতে আজ চুলায় আগুন দিলে যে অমঙ্গল হবে। রাজেশের এবং প্রতিবেশীর পরিবারের খাবারের খরচাপাতি রাফিই দিয়েছে। রাজেশও মেনে চলেছে ঢের; যেমন: সারাদিন কোনো মিথ্যা বলেনি, কারও সঙ্গে ঝগড়া করেনি, অন্যায় করেনি। সবই কুসংস্কার; তবু এগুলো পালিত হয়েছে যাত্রার মঙ্গলের জন্য। 

রাফির ভয় কিছুটা কমে এসেছে। ইঞ্জিন নৌকার আওয়াজ হয়তো এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করেছে। জীবনের আরেক নাম কলরব-কোলাহল, অন্যদিকে নীরবতা মৃত্যুর নামান্তর। তাইতো জন্মের পরই শিশু সরব হয়ে ওঠে। জীবন্ত শরীরের ভেতরে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সরবতা ধরা পড়ে স্টেথোতে বা ইকোতে। অন্যদিকে, মৃত্যুতে নেমে আসে পরিপূর্ণ নীরবতা। এই মুহূর্তে এই বিশালতাকে একেবারে নীরব-ভয়ংকর-মৃত মনে হচ্ছে না রাফির। ভয়কে জয় করে এই বিশ্বাস পর্যন্ত পৌঁছতে রাফি এতক্ষণ মনেমনে নিজের সঙ্গে নানাভাবে যুদ্ধ করেছে।

রাফি চারপাশে তাকাল। তারপর তাকাল আকাশের অপরিমেয় নক্ষত্রের দিকে। এই মহাবিশালতার মাঝেই তার হারিয়ে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে এখন। প্রকৃতির ভয়াবহ আকর্ষণ ক্ষমতা আছে-গহীন বন মানুষকে টানে; সুউচ্চ পর্বতমালা মানুষকে টানে; সীমাহীন জলরাশি মানুষকে টানে; অনন্ত নক্ষত্রবীথি মানুষকে টানে। প্রকৃতিকে এত ভালোলাগার কারণ রাফির জানা নেই। শুধু এটুকু অনুভব করতে পারে, মানুষ ‘প্রকৃতি’কে যতটা ভালোবাসে, ‘মানুষ’কে ততটা ভালোবাসলে এই পৃথিবী হতো আবারিত সুখস্থান।

বুকভরা ভালোবাসা আর আবেগ নিয়ে জন্মেছে রাফি। ছোটবেলা থেকেই সে কারও দুঃখ-কষ্ট সহ্য করতে পারে না। কাউকে দুখী দেখলে তার মন খারাপ হয়ে যায়। মানুষের দুঃখ যে মেনে নিতে পারে না, সে কীভাবে দেশে-দেশে সংঘাত সহ্য করবে? বিভিন্ন দেশে বোমা মেরে মানুষ মারা হচ্ছে-এসব দেখে রাফির হৃদয় গুমড়ে ওঠে। বোমার আঘাতে রক্তাক্ত ছোট্ট শিশুর আর্তনাদ শুনে একাই হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। যখন ফুলের মতো শিশুর লাশের ছবি অনলাইনে দেখে, তার হৃদয় চিড়ে যেন রক্ত ঝরে। এসবের সমাধান হয়তো রাফি কোনোদিনই করতে পারবে না; তবে আজ সে এমন কিছু করতে যাচ্ছে, যা দুটো দেশের ঝগড়া বন্ধ করে দেবে চিরতরে।  

 

দুই.

নৌকা ভিড়েছে দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপে। রাজেশ আগে এ দ্বীপে বহুবার এলেও রাফির প্রথম আসা। নৌকা যেপাশে ভিড়েছে, সেপাশ দেখে বোঝার উপায় নেই যে এটি দ্বীপ। চোখের সামনেই ঘনকালো গহীন বন দেখতে পাচ্ছে রাফি। দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপের এ পাশে এলে সুন্দরবনের স্বাদ পাওয়া যায়; গা ছমছম করে। রাতের আঁধারে দ্বীপে আসার জন্য নয়; বরং অন্য কোনো কারণে প্রকৃতির এ অসম্ভব সুন্দর দ্বীপটির প্রতি রাফির কোনো আকর্ষণ নেই। দ্বীপের প্রতি এই অনাগ্রহের কারণ দ্বীপটিকে নিয়ে দু’দেশের ঝগড়া! 

১৯৭০ সালের নভেম্বরে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের পর পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার জানায়, চব্বিশ পরগনা জেলার হাড়িয়াভাঙ্গা নদীর মোহনায় একটি নতুন দ্বীপের উৎপত্তি হয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার সীমানায় অবস্থিত এ দ্বীপের মালিকানা দাবি করে এর নাম দেওয়া হয় ‘দক্ষিণ তালপট্টি’। কারণ, দক্ষিণ তালপট্টির সরাসরি উত্তরে বাংলাদেশের মূল ভূখন্ড তালপট্টি। অন্যদিকে, ভারতও নিজেদের মানচিত্রে এর অধিকার দাবি করে নাম দেয় ‘পূর্বাশা’ বা ‘নিউ মুর’। তারপরের ইতিহাস দ্বীপটি নিয়ে প্রতিবেশী দুই দেশের খুনসুটির ইতিহাস। দুই দেশের মাঝের এই কষ্টকর সম্পর্ক মেনে নিতে পারছে না রাফি। আপনমনে গবেষণা কাজে ডুবে থাকে যে ছেলে, সেই ছেলে আজ ছুটে এসেছে এই দ্বীপে-কষ্ট কমাতে: নিজের কষ্ট, দু’টি দেশের কষ্ট! 

দশ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই দ্বীপ প্রায় গোলাকার। ভাটার সময় সমুদ্রের পানি নেমে গেলে এটিকে দেখতে অনেকটা অর্ধচন্দ্রাকৃতির মনে হয়। নৌকায় বসে এসব বোঝার উপায় নেই। কিন্তু রাফির আজকের কাজ নৌকায় বসেই। তাই দ্বীপে ভেড়ার পরও নৌকা থেকে নামল না সে। দ্বীপে নেমেছে রাজেশ। হাঁটু পর্যন্ত কাদায় সেঁধে গেছে তার দুই পা। তবে গামবুট পরে এসেছে সে। দ্বীপে পা নামিয়ে রাফির নির্দেশনার অপেক্ষা করছে রাজেশ। তার মাথায় কিছুই ঢুকছে না। এই আগন্তুক ছোকরা একটি বাক্স দ্বীপের যেকোনো গাছের সঙ্গে বেঁধে রেখে যেতে চায়। কীসব গবেষণার জন্য নাকি এটা প্রয়োজন! রাজেশ যতটুকু বোঝে, গবেষণার কাজ হলো ভালো কাজ। সেই ভালো কাজ দিনের আলোয় না করে রাতের আঁধারে কেন করা হচ্ছে, তা রাজেশের মাথায় ঢুকছে না। 

রাফির হাতে ওয়াটার প্রুফ একটি ব্রিফকেস। ব্রিফকেসটি খুলে তার মধ্যে রাখা যন্ত্রের দিকে মনোযোগ দিল সে। রাতের আঁধারে কাজ করার জন্য যন্ত্রটির সঙ্গেই আলোর ব্যবস্থা রেখেছে রাফি। কিছুক্ষণ কয়েকটি বাটন এদিক-ওদিক নাড়াচাড়া করে যন্ত্রে কিছু একটা সেট করল সে। তারপর কোনো একটি ‘সংখ্যা’ মেলাল পকেটে রাখা কাগজে লেখা সংখ্যার সঙ্গে। এই সংখ্যাটি কোনো সাধারণ সংখ্যা নয়। একটি ভয়ংকর সংখ্যা! ভয়ংকর বলার কারণ, সংখ্যাটি ঘটাতে পারে প্রলয়ংকারী কাণ্ড!

ভয়ংকর সংখ্যাটি পাওয়ার জন্য রাফিকে বুড়িগোয়ালিনী গ্রামে আগেও একবার আসতে হয়েছে। সেটি অবশ্য রাজেশের অজানা। সেবার রাফি বেশ কিছুদিন ছিল অন্য এক পরিবারের সঙ্গে। নীরবে নিভৃতে গবেষণাকাজ সেরে ফিরে গেছে; সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিল এই ভয়াবহ সংখ্যা।

সংখ্যাটি যন্ত্রে সেট করার পর স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেলল রাফি। খুব সাবধানে যন্ত্রটা ওয়াটার প্রুফ ব্রিফকেসে আটকে রাজেশ মণ্ডলের হাতে দিল। রাজেশকে আগেই সব নির্দেশনা দেওয়া আছে। তবু আরেকবার বলল, সতর্কতার সঙ্গে ব্রিফকেসটি কাছের কোনো একটা গাছে লটকে দিতে। পনেরো-বিশ কদম এগোলেই গাছ। গাছ বললে ভুল হবে; আস্ত বন। তারা ইচ্ছে করেই ঘন জঙ্গলের দিকটায় নৌকা থামিয়েছে।

এলাকার সবাই যতদূর জানে, এই দ্বীপের বনে বাঘ নেই। তারপরও রাজেশের গা কেমন যেন ভয়ে শিউরে উঠছে। মনে হচ্ছে, হঠাৎ যদি তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে দ্বীপে স্বেচ্ছায় নির্বাসিত কোনো রয়েল বেঙ্গল টাইগার। রাফির দেওয়া ব্রিফকেসের মধ্য থেকে মৌমাছির ঝাঁকের গুনগুন শব্দের মতো শব্দ ভেসে আসছে বিরামহীনভাবে। সেইসঙ্গে ব্রিফকেস মৃদু কম্পনে কেঁপেই চলেছে। কিছুটা ভয় পেলেও অন্যদিনের মতো কষ্ট রাজেশের আজ নেই। আগে যতবার এই দ্বীপে এসেছে, তীরঘেঁষে খালি পায়ে হাঁটতে তার কষ্টই লেগেছে। থকথকে কাদায় পা লেপ্টে আটকে যেতে চায়। রাফির বদান্যতায় আজ সে পায়ে পরেছে গামবুট। এখন থেকে মধু সংগ্রহের সময়ও কাদার জায়গাগুলো বেশ আরামে সে পার হতে পারবে।

ধীরেধীরে রাজেশ এগিয়ে গেল বনের দিকে। এদিকটায় কেওড়াগাছই বেশি। বনাঞ্চলের সবচেয়ে উঁচু গাছগুলোর মধ্যে কেওড়াগাছ অন্যতম। দড়ি সঙ্গে করেই এনেছে রাজেশ। মোটামুটি হাতের নাগালে পাওয়া যায় এমন একটি ডালে দড়ি বেঁধে দড়ির অপরপ্রান্ত বাঁধল ব্রিফকেসের হ্যান্ডেলে। ব্রিফকেসটি একটি কেওড়াগাছের ডালে ঝোলানোর দৃশ্য অদূরে নৌকায় বসেই দেখতে পেল রাফি। এখন শুধুই পরিণতি দেখার অপেক্ষা!

 

তিন.

পানিতে ভয় নেই রাজেশের। কিন্তু আজ তার মনে হচ্ছে, জলরাশি যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে; আষ্টেপৃষ্ঠে আঁকড়ে ধরতে চাইছে রাজেশদের নৌকা। ফুলেফেঁপে ওঠা পানির ওপর তাল হারিয়ে তাদের নৌকা হঠাৎ উল্টে যেতে পারে। জলস্তম্ভের এমন দম্ভভরা আচরণে চারপাশের প্রকৃতিও নিশ্চয়ই স্তম্ভিত। জোয়ারের সময়ও তো এমন পরিস্থিতিতে কখনো পড়েনি রাজেশ। জীবনে এই প্রথমবারের মতো পানিকে ভীষণ ভয় পাচ্ছে সে। এই মুহূর্তে তার মনে হচ্ছে, পানির তলার বিশাল আকৃতির কোনো জলদানবের মাথায় পড়ে গেছে তাদের নৌকা। রাজেশের ভীত অবস্থা টের পেয়ে রাফি তার পিঠে হাত রেখে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করল। পাশার দান যেন উল্টে গেছে; ভীত অবস্থা রাফিকে ছেড়ে ভর করেছে রাজেশের ওপর। 

প্রকৃতির প্রতিটি বস্তুর একটি নির্দিষ্ট ‘অনুনাদ কম্পাঙ্ক’ আছে। অনুনাদ কম্পাঙ্কে যেকোনো বস্তু সবচেয়ে বেশি জোরে আন্দোলিত হয়। এমনকি কোনো বস্তুকে তার অনুনাদ কম্পাঙ্কে কিছুক্ষণ কাঁপানো গেলে সেটি লণ্ডভণ্ড হয়ে যেতে পারে। যেমন: ১৮৫০ সালে ফ্রান্সের অ্যাঙ্গারস ব্রিজের ওপর দিয়ে যাওয়া সৈন্যদের মার্চপাস্টের ফলে সৃষ্ট অনুনাদে ব্রিজটি ভেঙে পড়েছিল এবং দুইশ সৈন্য মারা গিয়েছিল। এমনকি ১৯৪০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ট্যাকোমা ন্যারোজ ব্রিজটি প্রবাহিত বাতাসের সৃষ্ট অনুনাদে ভেঙে পড়ে। রাফির উদ্ভাবিত যন্ত্রটি মূলত বাতাসে বিভিন্ন কম্পাঙ্ক সৃষ্টি করতে পারে। যন্ত্রটি আকারে ছোট হলেও সেটির শক্তি পরিবহন ক্ষমতা অত্যধিক। আজ রাফি যন্ত্রটিতে যে ‘সংখ্যা’ সেট করেছে, সেটি মূলত সাগরের পানির ‘অনুনাদ কম্পাঙ্ক’! যন্ত্র বাতাসকে সেই কম্পাঙ্কে কম্পিত করায় তার আবেশে সাগরের পানিতে তৈরি হয়েছে অনুনাদ। ফলে পানিতে আলোড়ন তৈরি হয়ে পানির উচ্চতা বিশাল এলাকাজুড়ে অনেকখানি বেড়ে গেছে। তবে পৃষ্ঠটান গুণের কারণে পানির আলোড়ন বেপরোয়া হতে পারেনি; বরং বিস্তৃর্ণ অঞ্চলব্যাপী তার উচ্চতা বেড়েছে সুষমভাবে। আর দ্বীপটি বেশি উঁচু না হওয়ায় ফলাফল হিসেবে তা পানির নিচে চলে গেছে! যন্ত্রটার দম ফুরোনোর আগ পর্যন্ত এই কম্পন তৈরি হতেই থাকবে। ততদিনে বালুর দ্বীপটি সমুদ্রতলেই ক্ষয়ে নিঃশেষ হয়ে বিলীন হয়ে যাবে! ফলে দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপ আবার ভেসে ওঠার সম্ভাবনা ক্ষীণ।

 

চার.

পরদিন দেশবিদেশের গুরুত্বপূর্ণ গণমাধ্যমগুলোতে ব্রেকিং নিউজ হিসেবে দেখা গেল, ‘দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপ হারিয়ে গেছে সমুদ্রগর্ভে।’

সমাপ্ত

 

আসিফ মেহ্‌দী
কথাসাহিত্যিক ও প্রকৌশলী

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top