সিডনী বৃহঃস্পতিবার, ২১শে অক্টোবর ২০২১, ৬ই কার্তিক ১৪২৮

স্বর্গে জমজমাট সভা (রম্য গল্প) : সত্যজিৎ বিশ্বাস


প্রকাশিত:
১১ অক্টোবর ২০২১ ১৪:২৮

আপডেট:
১২ অক্টোবর ২০২১ ১৫:৫২

 

স্বর্গের মিটিং রুমের সামনে লাল বাতি জ্বলে গেছে। ভেতরে শুরু হয়ে গেছে রূদ্ধদ্বার বৈঠক।
আজকের বিষয়ঃ করোনাক্রান্ত লগ্নে এবারের পূজায় করণীয় কি?

হোস্ট মা দুর্গাঃ ফেসবুকিং, চ্যাটিং, নেটফ্লিক্স, টিকটক, গেমস খেলা এসব কিছুক্ষণের জন্য বন্ধ করে মন দিয়ে আমার কথা শোন সবাই। আজকের মিটিংটা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা নিশ্চয়ই বলে দিতে হবে না। আমাদের হাতে একদম সময় নেই। ড্রোন পাঠিয়ে অনেক ভিডিও ফুটেজ এনেছি। মর্ত্যে খালি ‘করোনা, করো না’ হা হুতাশ।
কি করব, কি করব না, করলেও এখন করব টা কি, না করলে করব না কি? - সেটাই বুঝতে পারছি না। অথচ সিদ্ধান্ত যা নেওয়ার এখনই নিতে হবে। তোমরা ঝটপট করে তোমাদের ব্যক্তিগত মতামত পটপট বলে ফেল। কে আগে বলবে?

সরস্বতীঃ এখানে বলাবলির কি আছে, বুঝলাম না মা? মর্ত্যে যাবার জন্য সেই কবে থেকে লাগেজ গুছিয়ে বসে আছি। এখন রওনা দিলেই তো হয়।

গণেশঃ এটা কি বললে দিদি? মর্ত্যের খবর জানো? লাগেজ গোছালেই হবে, গেজ করেছ ওখানকার অবস্থা? ডেইলি কত মানুষ লাশ হচ্ছে, সে হিসাব আছে তোমার কাছে?

সরস্বতীঃ ওরা সতর্কতা অবলম্বন করেছে না বলে মরছে। আমরা তো পিপিই+মাস্ক+হ্যান্ড গ্লাভস+ফেস শিল্ড পড়ে, হাতে হ্যান্ড স্যানিটাইজার নিয়ে স্প্রে করতে করতে যাবো। আমাদের ভয় কি?

গণেশঃ তুমি তো শুধু নিজের কথাটাই ভাবলে। আমার কথাটা একবার ভেবে দেখেছ? আমি মাস্কটা কোথায় পড়ব শুনি? মা, আমি বলি কি, এবার মামা বাড়ি না গেলে হয় না?

কার্তিকঃ মোটেও না। বছরে একবার সবাই মিলে মামা বাড়ি যাই। ওটা ক্যানসেল হওয়া চলবে না। কত কত ভক্ত আমাদের অপেক্ষায় দিন গুনছে, তাদের আশাহত করলে চলবে? ভক্তের মুখের হাসি, দেখতে ভালবাসি।

গণেশঃ উই মা, যা একটা পাঞ্চ লাইন ছুঁড়লে না দাদা। ওসব ছেড়ে আসল কথাটা বলছ না কেন? মর্ত্যের রমণীকূলের ভালবাসা পাবার আশায় তোমার আর তর সইছে না। তবে শুনে রাখো, মর্ত্যে গেলেও তোমার উদ্দেশ্য সফল হবে না। এবার পাবলিক গেদারিং বন্ধ। সামাজিক দূরত্বের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। বেশি হুজ্জোতি দেখলে লকডাউনও দিয়ে বসতে পারে রাষ্ট্রীয় সরকার।

অসুরঃ আমিও গণেশ দাদার সাথে একমত। প্রতিবারের মতো এবারের অবস্থা তো আমাদের অনুকূলে নয়। মা, আমার মনে হয়, মর্ত্যে যাওয়াটা এবার মারাত্মক রিস্কের ব্যাপার হয়ে যাবে। আমরা সবাই প্রটেকশন নিলে হবে কি, মর্ত্যের মানুষেরা তো কিচ্ছু মানে,টানে না। এদের অসীম সাহস। মাস্ক না পরে মরবে, তবু নাক ঢাকবে না।

লক্ষ্মী কে বলেছে এসব কথা? কেউ কেউ ঢাকে না, সে ঠিক আছে কিন্তু যারা একটু সচেতন তাঁরা ঠিকই মাস্কে মুখ ঢাকে। টিভির খবরে দেখি না বুঝি?

অসুরঃ ক্ষমা করো দিদি। তুমি যা দেখ, তা তো অর্ধ সত্য। প্রথম, প্রথম যাও পড়ত এখন হাটে, মাঠে, ঘাটে ক’জন মাস্ক পরে বলো? লকডাউনের জায়গাগুলোতে লক আর নেই। কবে ডাউনে চলে গেছে। যারাও বা মাস্ক পরে, কেউ লটকায় কপালে, কেউ ঝুলায় থুতনিতে। তারা এক মাস্ক কতবার রি-উইজ করে, তা জানো? সেই মাস্কের গন্ধে ভূত পর্যন্ত জ্ঞান হারায়। এরা যখন পূজা মন্ডবে এসে সেই মাস্কসমেত নাক ঘষাঘষি করে প্রণাম করবে তখন তোমাদের জ্ঞান কে ফেরাবে শুনি?

লক্ষ্মী ওমা, এসব কী লক্ষ্মীছাড়া কথা গো! তাহলে এবার কি হবে মা?

মা দুর্গাঃ সেই তো, কিছুই তো বুঝতে পারছি না। অসুরের কথা তো ফেলে দেবার মত নয়। নাচতে নাচতে মর্ত্যে গিয়ে মরতে মরতে ফিরব নাকি? তাছাড়া করোনা আক্রান্ত হয়ে যদি স্বর্গে আসি, কেলেংকারী হয়ে যাবে না?

অসুরঃ মা দূর্গতিনাশিনী, শুধু কি তাই? আমাদের দূর্গতি নাশ করবে কে তখন? স্বর্গের দ্বাররক্ষী কি স্বর্গে প্রবেশ করতে দেবে আমাদের? ওদিকে নারোদ তো তৈরী হয়েই আছে এর কথা ওকে লাগানোর জন্য। ব্যাটা কোথায় কার কাছে কী কথা লাগিয়ে, আমাদের কি অবস্থা করে, কে জানে?

কার্তিকঃ অসুর, তোমার সমস্যাটা কি বলতো, শুধু শুধু মাকে পেইন দিচ্ছো কেন শুনি? তুমি কী করে ধরে নিলে করোনা আমাদের হবেই? দরকার হলে আমরা অস্র না নিয়ে দু’হাত গ্লাভসে ঢুকিয়ে হ্যান্ড স্যানিটাইজার নিয়ে মর্ত্যে যাব।

অসুরঃ তাতেও কী পার পাবে দাদা? ধরে নিলাম, আমাদের কেউ আক্রান্ত না হয়েই সুস্থভাবে ফিরলাম। তারপরেও কি স্বর্গে ফিরে চৌদ্দ বছরের কারাবাস থুক্কু চৌদ্দ দিনের হোম কোয়ারেন্ট ভোগ করতে হবে না?

লক্ষ্মী হোম কোয়ারেন্টে থাকতে হলে থাকব। সেজন্য মর্ত্যে কেন যাব না? এত এত ভক্তবৃন্দের প্রণাম, প্রণামী কেন হাতছাড়া করব? এমনিই মর্ত্যে সারাটাক্ষণ চলে অসুর বন্দনা। আমরা সবাই মিলে বছরে একবার গিয়ে ঝেঁটিয়ে বিদায় করে আসি ওসব। মানুষ ভয়ে থাকে অপরাধ করতে, দূর্নীতি করতে। এবার যদি না যাই, মানুষ কি ভাববে বলো তো? পৃথিবীটা ছেয়ে যাবে না দূর্নীতি আর অশান্তিতে? আজীব লাগে, আমাদের সাথে থেকেও তোমার স্বভাব পাল্টালো না! খালি ঘিরিঙ্গি বুদ্ধি! অসুর, এখনও সময় আছে, তোমার সুর চেঞ্জ করো।

অসুরঃ দিদি, আমাকে এভাবে ভুল বুঝলে? আচ্ছা, একটা কথার জবাব দাও তো, প্রতি বছরই তো যাও মর্ত্যে। তাতে কি কোন কাজ হয়? দিনের পর দিন কি বেড়েই চলছে না অপরাধ, দূর্নীতি, অশান্তি? আমি তো তোমাদের সেফটির কথা ভেবেই বলেছি এসব কথা। নাহলে, আমার কী? মনুষ্যকূল তোমাদের সবার পা ছুঁয়ে প্রণাম করবে, আমাকে তো আর করবে না। মর্ত্যে গিয়ে আয়েশ করে শুয়ে থাকব না হয় হাঁটু গেড়ে বসে থাকব। করোনা আমাকে পাবেও না, ছোঁবেও না। তোমরা সবাই যেতে চাইলে আমার তো কোন অসুবিধা নেই। ওখানে বরং আমার চ্যালা চামুন্ডাই বেশি। ওদের সাথে কতদিন পরে দেখা হবে।

গণেশঃ কী হলো মা? সেই তখন থেকে ভেবেই যাচ্ছ, ভেবেই যাচ্ছ। সবার কথাই তো শুনলে। এবার তোমার সিদ্ধান্ত তো জানাও।

মা দুর্গাঃ হুম, অনেক ভেবে দেখলাম, যেতে আমাদের হবেই। তবে পূজা মন্ডবে যাবার আগে সবার আগে যাবো চীন। ওখান থেকে সবাই ভ্যাকসিন নিয়ে তবেই উঠব পূজা মন্ডবে। পুরোনো সব অস্র যাদুঘরে রেখে যাব এবার। ওগুলো তো আর আজকের না, এক্সপেয়ার ডেট পেরিয়ে এন্টিক হয়ে গেছে সেই কবেই। এবার আমার গ্লাভস পড়া দশ হাতে থাকবে সেরা দশ ব্রান্ডের হ্যান্ড স্যানিটাইজার। মুখে থাকবে এন নাইটি ফাইভ মাস্ক। তার উপর ফেইস শিল্ড, তার উপর পিপিই। তোমরাও এই যুদ্ধাস্র পরিধান করেই যাবে।

সরস্বতীঃ বলো কি মা? তাহলে তো গরমে, দম বন্ধ হয়ে মারা যাব। করোনা হলে তো তবু বাঁচার আশা থাকে, দম বন্ধ হয়ে গেলে তো আর কোন আশা নেই।

মা দুর্গাঃ খুবই ভাইটাল পয়েন্ট নিয়ে কথা বলেছ তো। গুড, ভেরি গুড। কার্তিক, ল্যাপটপটা খুলে নোট নাও। যে কয়দিন আমরা থাকব মন্ডবে ঠান্ডা হাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে, কারেন্ট চলে গেলেও ব্যাকআপ যেন থাকে। সামাজিক দূরত্ব মেনে পূজা দেখতে আসতে হবে, অসামাজিক ঠেলাঠেলি, ভীড় বাট্টা চলবে না- এসব পয়েন্ট উল্লেখ করে একটু কড়া ডোজের মেইল করে দাও সব মন্ডবে। মেইলের সিসিতে তোমার বাবাকে রেখো।

কার্তিকঃ ইয়ে মা, আমি? ইদানিং আমার হাত দুটোতে যেন কী হয়েছে, কোন কাজই করতে পারছি না। প্রেসার দিলেই হাত ব্যথা করে। ফিজিও থেরাপিস্টের কাছে যাবো ভাবছি। একটা কাজ করলে হয় না মা? অসুরটা তো সারাদিন ঝিম মেরে বসেই থাকে। ওকে বরং এ দায়িত্বটা দিয়ে দাও।

অসুরঃ এ কি অত্যাচার? এ কি অবিচার? আমি কেন? আমি বলছি না, আমি লিখতে পারিনা। আমি বলছি না, আমার হাতের লেখা ভাল না। আমি শিক্ষিত, আমার হাতের লেখাও ভাল। কিন্তু আমি বলতে চাই, লিখতে গিয়ে যদি ব্যাকরণজনিত ভুল হয় কিংবা বানান ভুল হয় অথবা অশুদ্ধ বাক্য গঠন হয়, সে ভুলের দায় কে নেবে? তাই বলছিলাম, এসব লেখাপড়ার কাজের সেকশনটা যার আই মিন সরস্বতী দিদিকে দায়িত্বটা দিলে হয় না?

সরস্বতীঃ কাজের কথা বললেই ঢপ মেরে বেড়ানোর স্বভাবটা গেল না, না? ঠিক আছে, আমিই লিখে দিচ্ছি। মা, তুমি শুনে দেখ তো, ঠিক আছে কীনা?
‘বিশেষ ঘোষণা পত্র’
মন্ডবে উপস্থিতি মাত্রই যে মন্ডবে এসি কিংবা বড় বড় সিলিং ফ্যান চব্বিশ ঘন্টা সার্ভিস দেবে না, সেই সব মন্ডব আমরা বয়কট করব। পূজা মন্ডবে অতি অবশ্যই সামাজিক দূরত্ব মেনে অবস্থান করতে হবে সবার। এবার কোন ছোঁয়াছুঁয়ি চলবে না। তিন ফুট দূর থেকে প্রণাম করেই চলে যেতে হবে।
[বিঃদ্রঃ অনিবার্য/নিবার্য কোন কারণেই মন্ডবে কারেন্ট না থাকার অজুহাত গ্রাহ্য করা হবে না। অতি অবশ্যই জেনারেটারের ব্যবস্থা থাকতে হবে। শো পিছ হিসাবে শুধু জেনারেটার থাকলেই চলবে না, কারেন্ট চলে যাওয়া মাত্রই সেটা চালু হয়ে যেতে হবে।]
আদেশক্রমে
দুর্গতিনাশিনী দেবী মা দুর্গা
আর কিছু শর্ত কি জুড়ে দেব মা?

দেবী দুর্গাঃ না, না এতেই চলবে। কারেন্টের বিলের যে রেট, এর বেশি শর্ত দিলে ওরা না আবার আমাদেরই বয়কট করে বসে। এটাই মেইল করে দাও মর্ত্যের মন্ডবে মন্ডবে। দেখি, কী রিপ্লাই আসে। এবার তাহলে মিটিং শেষ করি। বাচ্চারা সবাই, তোমরা তাহলে প্রস্তুতি নিতে থাকো, মর্ত্যে যাবার।
---

 

সত্যজিৎ বিশ্বাস
রম্য লেখক ও শিশু সাহিত্যিক

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top