সিডনী শুক্রবার, ২৪শে সেপ্টেম্বর ২০২১, ৮ই আশ্বিন ১৪২৮

নেতারহাটঃ কুইন অফ ছোট নাগপুর : ডঃ সুবীর মণ্ডল


প্রকাশিত:
২৫ আগস্ট ২০২১ ১৪:৪৫

আপডেট:
২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১ ০০:২৯

 

নেতারহাট, কুইন অফ ছোটনাগপুর, প্রাকৃতিক দৃশ্য এবং আবহাওয়া এক কথায় অপূর্ব, এখানে সারাবছর হালকা শীত থাকে, বিদ্যালয়ের দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্র-ছাত্রী সহ আমরা কয়েকজন শিক্ষক বেশ কয়েক বছর আগে বড় দিনের সময় গিয়েছিলাম।

খাতড়া মহকুমা শহর থেকে একটি লাক্সারি বাস ভাড়া করে, পুরুলিয়া জেলার জয়পুর, ঝালদা ছুঁয়ে রামগড় জেলা দিয়ে রাচীতে পৌঁছলাম। দূরত্ব ২৪৫ কিমি। শহর ছাড়িয়ে চলেছি জঙ্গল মহলের মসৃণ রাস্তা দিয়ে। পাল্টে যেতে লাগলো প্রকৃতি। পুরুলিয়া জেলায় সামান্য কিছু টিফিন সেরে পুনরায় যাত্রা শুরু করলাম। একের পর এক জনপদভূমি ছুঁয়ে ছুঁয়ে পৌঁছলাম মুরি সীমান্ত শহর। পুরুলিয়া-ঝাড়খণ্ডের সীমান্ত শহরে। গাড়ি চলেছে দু'চোখ ভরে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি দেখছি। হঠাৎ চোখের সামনে ভেসে উঠল স্বর্ণালী সন্ধ্যায় সুবর্ণ রেখার বুকে সূর্যাস্তের অপূর্ব মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। অতুলনীয় অসাধারণ দৃশ্য। বহুদিন মনে থাকবে। কিছু বাদে পৌঁছলাম রামগড় জেলার হিডেন জেমস-এ। এ-এক স্বপ্নের সবুজ উপত্যকা। অনেক গুলো রাস্তা পাহাড়ে উঠে আবার নীচেয় নেমে এসেছে। প্রথমে ভাবলাম, এটা কি করে সম্ভব, ড্রাইভার ভাই বললেন একটিই রাস্তা। স্বপ্নমাখা এক সবুজ উপত্যকার অনিন্দ্যসুন্দর রাস্তা দিয়ে আমরা এগিয়ে চলেছি রাঁচীর দিকে। অবশেষে পৌঁছলাম তখন ঘড়িতে দেখলাম প্রায় সন্ধ্যা ৬-৩০ টার কিছু বেশি। রাস্তা ভালো হওয়ায় বেশ কিছু আগেই পৌঁছেছি, এরপর রাঁচি শহর ছাড়িয়ে চলেছি জঙ্গল ভরা নেতারহাটের দিকে। রাত বাড়ছে ক্রমশ, থাকার জন্য নেতারহাট রেসিডেনসিয়াল স্কুল। ফলে চিন্তা ভাবনা ছিল না এত রাত্রেও। এখানকার স্কুলে থাকার সুযোগ পেয়েছিলাম একজনের সহযোগিতায়, যিনি এই বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র, এখন বিদেশে থাকেন। সাধারণত বাইরের মানুষ এখানে থাকতে পারে না।

পাহাড়ের গা বেয়ে  বেয়ে  ঘুরে ঘুরে (ঘাটি) কোয়েল নদী পেরিয়ে যখন নেতারহাট পৌঁছোলাম তখন গভীর রাত  নেমে এসেছে। রাঁচি থেকে নেতারহাটের দূরত্ব ১৪৫ কিমি। সময় লাগলো তিন ঘন্টার কাছে। রাত তখন দশটার বেশী। শীতের হিমেল হাওয়া জানান দিচ্ছে বাইরে বেশি সময় থাকা ঠিক হবে না। আমারা ফোন করলাম নেতারহাট স্কুলের প্রিন্সিপাল সাহেবকে। যাত্রার শুরুতে খাতড়া থেকে ফোন করেছিলেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। ফোন করে বলে ছিলেন আমাদের যাওয়ার কথা তাই নেতারহাট স্কুলের গেস্ট হাউসএর দুজন কর্মী আমরা যাওয়ার সাথে সাথে আমাদের নিয়ে গেল সুন্দর গেস্টহাউসে, ভীষণ সুন্দর বাংলো টাইপের ও ছাত্র-ছাত্রীদের আলাদা থাকার বেশ কয়েকটি সুন্দর ঘরের ব্যবস্হা করলেন। সেখানে রান্নার লোক, কেয়ার টেকার সব আছে তাদের সবার  কি মার্জিত ব্যবহার  প্রথমেই  আমাদের সবার মন জয় করে নিল, রাতে ডিম-ভাতেও সব্জি দিয়ে খেয়ে দেয়ে কম্বল চাপা দিয়ে অনেকেই শুয়ে পড়ল, আমি ঘুমিয়ে পরতে পারলাম না। ছোট্ট ব্যালকোনিতে বসে রাতের নেতারহাটের আরণ্যক সৌন্দর্য উপভোগ করতে চেষ্টা করলাম। নৈসর্গিক সৌন্দর্যের শোভা দেখাতে লাগলাম, সৌভাগ্যবশত দিনটা ছিল পূর্ণিমা রাত। ফলে চাঁদের আলোয় উদ্ভাসিত চরাচর নতজানু হয়ে আমি মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে আছি নিসর্গ প্রকৃতির দিকে। মন ভরে গেল।

পরদিন ভোর বেলা সূর্যোদয় দেখতে গেলাম সবাই, পালামু ডাক বাংলো, সেখান থেকে ফিরে জলখাবারে লুচি তরকারি/ ব্রেড টোস্ট খেয়ে বেরিয়ে পরলাম লোধ ফলস্ দেখতে,  লোধ ফলসে যাবার রাস্তা খুব উঁচু-নীচু কিন্তু সুইফ্ট ডিজায়ার গাড়ীর গ্রাউন্ড ক্লিয়ারেন্স কম তাই যেতে পারবে না, সেজন্য আমরা কয়েকটি বোলেরো ভাড়া করলাম, এবার চললাম লোধ ফলসের উদ্দেশ্যে ....দুর্দান্ত দৃশ্য নেড়া পাহাড় মাঝে মাঝে সরু সরু ঝর্ণা তিরতির করে বয়ে যাচ্ছে, কখনও তার ওপর দিয়ে টুরিস্টদের গাড়ি পেরিয়ে যাচ্ছে, আমাদের গাড়ি থেকে নামতে হলো যেখানে, সেখান থেকে সামনেই দেখলাম অনেকগুলো সিঁড়ি সেই সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেলে লোধ ফলস দেখা যাবে, আমরা যাত্রা শুরু করলাম অনেকটা ওঠার পরে দেখা গেল বহু দূর থেকে বইছে জলের ধারা পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসছে, এবার আরও একটু যাই আরও ভালো করে দেখবো, আরও  সিঁড়ি, এদিকে আমাদের দম শেষ আর পারছিনা কিন্তু লোভ সামলানো যাচ্ছে না, অগত্যা আরও হেঁটে চললাম, অবশেষে পৌঁছোলাম, তীব্র গতিতে প্রচুর জলরাশি নিয়ে চওড়া হয়ে বয়ে যাচ্ছে কি তার শব্দ দূর থেকে শোনা যায়, দুচোখ ভরে শুধু দেখছি আর প্রাণভরে উপলব্ধি করছি, আহা এমন মোহময়ী ঝর্ণা আগে কখনও দেখেছি বলে মনে পড়ে না, অনেকক্ষণ থাকার পরে ফেরার পালা, এদিকে খিদে পেয়েছে ব্যাপক,  যাবার সময় ৪০ জনের রান্নার জন্য একটি হোটেলে বলে গিয়েছিলাম। মেনু ডাল- ভাত-ডিম খাওয়ার কথা, ফেরার পথে সেখানেই খেলাম গরম ভাত, ডাল, ভাজা, নিরামিষ সব্জি। মাছ, মাংস সব সময় থাকে না কারণ সব কিছু পাহাড়ের নীচে গিয়ে আনতে হয় (ওখানে কোন বড় রেস্টুরেন্ট নেই) বাংলোতে ফিরে একটু রেস্ট নিয়ে আবার গেলাম সানসেট দেখতে ম্যগনোলিয়ান পয়েন্ট। এই জায়গাটি বারবার দেখলেও আশ মেটে না। তাই আমরা কয়েকজন শিক্ষক বেশ কিছু সময় কাটানোর পর ফিরলাম গেস্টহাউসে। ফেরার আগে আর একবার নয়নভরে ম্যাগনোলিয়া পয়েন্ট দেখার ইচ্ছা রইলো।
পর দিন সকালেই বেরোলাম নেতারহাট স্কুল পরিদর্শনে, সাধারনত স্কুলের ভিতরে কাউকে ঢুকতে দেয় না, আমাদের সাথে ছিল ঐ স্কুলের কৃতি প্রাক্তনীর একটি চিঠি। তাই আমাদের ভীষণ খাতির করে ভেতরে নিয়ে গেল, পুরো নেতারহাট পাহাড়ের ওপরে ছড়িয়ে আছে স্কুলটি, বিশাল বড়ো প্রার্থনা ঘর সব চেয়ার পাতা আছে, মঞ্চের ওপর প্রিন্সিপাল এবং আরও কয়েকজন টিচাররা ও আছেন, সেই মঞ্চে আমাদের বসানোর ব্যবস্থা করলেন, (খুব শান্ত পরিবেশ) সেখানে ছাত্রদের চরিত্র গঠনের শিক্ষা দেওয়া হয়, আমাদের মধ্যে যিনি ছিলেন বয়সে প্রবীণ  সুবীর বাবু, ওনাকে কিছু বলার জন্য অনুরোধ করাতে তিনি তাঁর অসাধারণ বক্তব্য রাখলেন এই চরিত্র গঠনের ওপর, ঠিক যেভাবে তিনি তার নিজের বিদ্যালয়ের শিক্ষায় নিজেকে তৈরি করেছেন, স্কুলের প্রতিটি ছাত্র অসম্ভব মেধাবী ও মার্জিত, এখানে পড়াশোনা করতে চাইলে খুব কঠিন প্রবেশিকা পরীক্ষা দিয়ে ঢুকতে হয়, পুরোস্কুল ও ছাত্রদের থাকার জায়গা, ওয়ার্কশপ, বিশাল বিশাল লাইব্রেরি, বহু মূল্যবান বই, দেশ -বিদেশ থেকে অনেক প্রাক্তনী ছাত্ররা ভালোবেসে বইপত্র উপহার হিসেবে পাঠিয়ে দেন বিদ্যালয়কে, লাইব্রেরি সম্ভার দেখে মুগ্ধ হলাম, না দেখলে বুঝতেই পারতাম না যে আমাদের দেশে এতো সুন্দর একটি বিদ্যালয় আছে। যেখানে শুধু পুঁথিগত শিক্ষাই নয় আদর্শ চরিত্র গঠনের শিক্ষা দিয়ে অত্মনির্ভর, সহমর্মিতা, ও আত্মমর্যাদা বোধ বাড়িয়ে তোলা হয়।

নেতারহাটে একটি ড্যাম আছে সেখান থেকে সারা বছর জল সরবরাহ হয় পুরো নেতারহাটে। একটা আশ্চর্যের ব্যাপার যে এখানে কোন কিছু চুরি /ছিনতাই এর ভয় নেই, কখনও শোনাও যায়  নি। মহুয়া ডাঁর নামে অনেকদূরে একটি জায়গায় ছোটমতো। নানান ধরনের ভাবনা ও স্মৃতি রোমন্থন করতে করতে গেস্টহাউসের বেশ কিছু দূরে চলে আসলাম। একা সামনে নেতারহাটের অনিন্দ্যসুন্দর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। এক নির্জন মায়া মাখানো স্বপ্নময় পথ ধরে এগিয়ে চলা। বেশ ভালো লাগলো। একটুখানি দূরে ছোট জনপদভূমি পেলাম। কিছু প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষের সহজ-সরল জীবন যাপন দেখলাম। জীবনের চাহিদা কত কম? কোন ভোগবিলাসের জন্য ঈর্ষা নেই। হৃদয় ছুঁয়ে গেল। ওদের আন্তরিকতা ও অমলিন হাসি আমাকে মুগ্ধ করলো। আমাকে আপ্যায়ন করলো যে ভাবে, তা  কোন সভ্য সমাজের কাছে থেকে পাইনি। শিক্ষককে এত সমাধার কখনো ভাবিনি। পুঁথিগত বিদ্যা নেই অথচ সামাজিক শিক্ষায় কত শিক্ষিত! আসলে প্রকৃতির পাঠশালায় শিক্ষিত মানুষগুলো যে শিক্ষা লাভ করেছে তা আমরা হয়তো কোন দিন লাভ করতে পারব না। ভাবতে খারাপ লাগছিল, আর! কত দিন? এই মানুষ গুলোকে শোষিত হতে হবে ? খুব কষ্টকর জীবন যাপন হলেও অপার্থিব সুখ আছে ওদের ঘরজুড়ে। এদের অর্থনৈতিক অবস্থা মোটেও ভালো নয়। উন্নয়নের ছিঁটেফোটা দেখতে পেলাম না। তবু কোন ক্ষোভ নেই,এটা বুঝে গেছে এই জীবনই তাদের ভবিতব্য। আশেপাশের এলাকায় ঘুরে এলাম। নেতারহাটের ভৌগোলিক অবস্থান অসাধারণ। নির্মল প্রকৃতি।নগর জীবনের কোলাহল মুক্ত সবুজের সমারোহে সবুজ উপত্যকা। কয়েক দিন কাটিয়ে দিতে পারতাম কিন্তু সেটা হলো না। হাতে সময় খুব কম। নেতারহাট ঝাড়খণ্ডের বর্তমান লাতেহার জেলার একটি নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি ও একটি পাহাড়ি শহর। অনেককেই কাছে ছোট নাগপুরের রানী। পরতে সবুজের মেখলা। ফিরে এসে গেস্টহাউসে বারান্দায় বসে বসে মনে হল যেন‌ শাল-শেগুন-মহুয়ার আলো-ছায়ার মায়াময় অন্য এক পৃথিবীতে এসে পড়েছি, যেখানে নিস্বব্ধতাকে চূর্ণ -বিচূর্ণ করার একমাত্র অধিকার কেবল বিচিত্র পক্ষীকুলের। ভ্রমণ মানেই এক টুকরো মুক্ত, অপার মুগ্ধতার স্বাদনিতে নেতারহাটের জুড়ি মেলা ভার।

পরের দিন (তৃতীয়দিন) আবার পথ চলা, এবার আমরা পঞ্চপান্ডব চলেছি কাকভোরে বেশ কিছু দূরে, শহর ছাড়াতেই চারপাশের পরিবেশ মুহূর্তে বদলে গেল, কখনও পথের দুপাশে বিস্তীর্ণ আগের বাগান কিংবা দিগন্ত বিস্তৃত সর্ষেখেত আবার কখনো ছোট-বড় পাথুরে টিলা অতিক্রম করে ক্রমশ গহন অরণ্যের মধ্য দিয়ে পাকদণ্ডী বেয়ে গাড়ি এগিয়ে চলতে লাগলো গন্তব্যের দিকে। দুপুরের খাওয়া পর্ব সারলাম পথের একটি ছোট্ট হোটেলে। খাওয়া পর্ব সেরে বেরিয়ে পড়লাম ম্যাগনোলিয়া সানসেট-পয়েন্টে। আজ থেকে বহু বছর আগে ম্যাগনোলিয়া নামে এক ব্রিটিশ তরুণী অপূর্ণ ভালোবাসার  যন্ত্রণায় এখান থেকেই গভীর খাদের বুকে মরণ-ঝাঁপ দিয়েছিল। এখানকার লোককথা ও কাহিনি জুড়ে আজো জীবন্ত হয়ে গেছে। বেশ কিছুক্ষণ কাটিয়ে আরো দূরে চললাম। জঙ্গল ঘেরা নীল পাহাড়ের পশ্চিমদিগন্তে চোখ পড়তেই যেন‌ মনে হল বেলাশেষের রবি "দিনের শেষনৈবেদ্যের সোনার ডালি নিয়ে সূর্যাস্তের শেষ আভা নক্ষত্রলোকের পথে নিরুদ্দেশ হল।"

আমরা কয়েকজন গেস্টহাউসে না ফিরে রাত্রে কোয়েল নদীর তীরে একটি নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ভরা জায়গায় থাকার ব্যবস্থা করলাম। ফোনে অন্য শিক্ষকদের জানিয়ে দিলাম। ছাত্র -ছাত্রীদের নিয়ে আমাদের কয়েক জন স্যার ঘুরতে গেছেন নতুন নতুন জায়গা য়।ফলে খারাপ কিছু ভাববেন না। মনের  মধ্যেজেগে ওঠা দুঃচিন্তা দূর হল। পরিকল্পনা ছিল রাত্রে ওখানকার অজানা পরিবেশে থেকে সারাদিন ঘুরে ফিরে যোগ দেব অন্যদের সঙ্গে। কুয়াশা ক্রমশ গোধূলির বুকে বাসাবাধতেই ফিরে এলাম ছোট্ট তাঁবুতে, উঁচু টিলার উপরে। রাতের তারাভরা নীলাকাশের নির্জনতার মাঝে রাতের খাবার পর্ব সারলাম রাজকীয় মর্যাদায়। ধূমায়িত দেশি মুরগির ঝোল সহ দুধসাদা ভাত।যেন অমৃত। প্রবাদে, গন্ধে অনন্য। দেশি মুরগির ঝোল রান্নার মধ্যে ছিল এক অদ্ভূত ঝাড়খণ্ডী করোনা। মুখে হয়ত বহুদিন সেই স্বাদ লেগে থাকবে। খাওয়া পর্ব সেরে বেরিয়ে এলাম নদীর তীরে অবস্থিত একটি টিলার উপরে। টিলার উপরে বসে নক্ষত্রখচিত আকাশের পানে অবাক বিস্ময়ে চেয়ে কেটে গেল বহুক্ষণ।রাত বাড়ছে ক্রমশ, চলে এলাম তাঁবুতে। এমন মহাজাগতিক স্বর্গীয় সৌন্দর্যকে উপেক্ষা করার সাহস কারই বা থাকতে পারে! ঘুমের রাজ্যে পাড়ি দিলাম সকলেই। পরেরদিন শীতের সকালে পাখিদের বাঁকে ঘুম ভাঙ্গলো। কাঠের আগুনের উত্তাপ আর ধূমায়িত চায়ের মাধ্যমে একটুখানি তাজা হয়ে বেরিয়ে পড়লাম একদম কাছে একটি সানরাইজ পয়েন্টে। পৌঁছে দেখলাম চোখের সামনে দিগন্ত জুড়ে শুধুই রঙের খেলা। সে-এক অন্যভুবন। শুধুই মুগ্ধতার আবেশ। হালকা বেগুনি রঙের আভা ধীরে ধীরে যেই কমলাটে হতে শুরু করেছে, মনে হলো যেন  প্রকৃতির অদৃশ্য হাত পাহাড়ের পিছনে থেকে তুলে ধরল তার রাজমুকুটটি। এতক্ষণ বুঝতে পারলাম কেন নেতার হাটকে সবাই "ছোট নাগপুরের রানী" বলে। সোনার থালার মতো সূর্য পুব আকাশে রাজকীয় মর্যাদায় উদিত হয়ে বুঝিয়ে দিল সে কথা। এরপর সকালের টিফিন পর্ব সারলাম এবং এবারের গন্তব্যস্হল আপার-ঘাগরি জলপ্রপাত। পাহাড়ি রাস্তা ধরে এগিয়ে যেতে লাগলাম। এক মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে পৌঁছে গেলাম আপার-ঘাগরাতে। সকালে ৮টা বাজে তখন। পৌঁছনোর রাস্তার পথে প্রথমেই পড়ল বাদকা-বাঁধ, ঘননীল আকাশের প্রতিফলনে স্ফটিকের মতো পরিস্কার বাঁধের জলকে গাঢ় নীলাভ করে তুলেছে, সেই সঙ্গে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বন্য গাছপালা ও নিরিবিলি কিছু মূহুর্ত আমাদের আবিষ্ট করে রাখলো। কিছু দূরে এগোতেই চোখে পড়লো সারিবাঁধা পাতা--ফুলহীন গাছের দল দেখে বোঝা গেল সংরক্ষিত চাষের এলাকা। স্হানীয় মানুষের কাছে জানলাম ওগুলো ন্যাসপতির বাগান। বেলা বাড়ছে ক্রমশ, জঙ্গল ঘেরা আপার ঘাগরিতে গিয়ে পৌঁছলাম। গিয়ে দেখলাম, এ-এক অন্যজগৎ,নির্মোহ প্রকৃতির বুকে জায়গা করে নেওয়া ছোট্ট একটি ঝর্না সুমধুর ছন্দে ঝরে পড়ার শব্দে দিবানিশি পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে অরণ্য। মনের মণিকোঠায় বেঁধে নিলাম সেই অপার্থিব সুর, যার  জন্য ত্যাগ করা যায় যে কোন পার্থিব সম্পদকে।

ফেরার পথে কিছু সময় কাটালাম কোয়েল নদীর তীরে।মনে পড়ে গেল বুদ্ধদেব গুহর সাড়া জাগানো উপন্যাস "কোয়েলের কাছে"। আজ নিজের চোখে দেখলাম কোয়েলের নিজস্ব রুপমাধুরী। মুগ্ধ হলাম। নির্জন প্রকৃতির বুকে চিরে বয়ে চলেছে নিজের খেয়ালে। পাহাড়ি চঞ্চল বালিকা যেন। শীতে নদীর চলার পথ ক্ষীণ হলেও তার সামগ্রিক সৌন্দর্যে কোন একচুলও ভাঁটা পড়েনি, মুহূর্তরা থেমে গেল পাথরের উপর বসে নদীর জলে পা ডুবিয়ে যখন চেয়ে রইলাম অপলক দৃষ্টিতে সেই স্নিগ্ধ মায়াবী প্রকৃতির দিকে, তাকে পরম মমতায় বুকে আগলে রেখেছে সবুজের-দল ! না জানি কত হাজার বছর ধরে! আর কিছু দূরে এগিয়ে খুঁজে পেলাম এক অন্য পৃথিবী। সুসজ্জিত এক দুধ-সাদা গির্জা দাঁড়িয়ে আছে অতীতের যোগসূত্র স্থাপন করে। সে ইতিহাস আজ নীরব, হলুদ পাতায় সংরক্ষিত। বড়দিনের সকালটা কাটলো একটু অন্যভাবে। স্হানীয় মানুষের ঢল নেমেছে। তাঁরা পরম মমতা ও ভালোবাসার সঙ্গে যিশুর বন্দনাগীতি করছে। আমরাও সমিল হলাম। শহুরে কোলাহলের অনেক দূরে অজানা সেই প্রত্নভূমির বিরল স্মৃতি রোমন্থন করতে করতে ফেরার পথে পাড়ি দিলাম। মন জুড়ে একটা মুগ্ধতা সেই সঙ্গে চিরবিদায়ে সকরুন সুর বাজছে। যেতে নাহি দিব, তবু যেতে হবে! কয়েক দিনের বর্ণিল স্মৃতি বুকে নিয়ে ফিরলাম নিজের চেনা শহুরে কোলাহলের কেজো পৃথিবীতে।

 

তথ্যসূত্রঃ কোলকাতা থেকে দূরত্ব ৩৫০কিমি।ট্রেনে অথবা বাসে রাঁচি। রাঁচি থেকে গাড়ি ভাড়া করে নেতারহাট সহ বিভিন্ন স্থানে যেতে হবে।নেতারহাটের হোটেল ওহোম স্টের সংখ্যা কম। বর্তমানে কিছুটা বেড়েছে। রাঁচিতে থাকার জন্য নানান ধরণের হোটেল ও লজ সহজেই পাওয়া যায়। অনলাইনে বুকিংয়ের জন্য ঝাড়খণ্ডের ট্যুরিজম সার্সকরলে সব মুশকিল আসান। হাওড়া স্টেশন থেকে ট্রেন জনশতাব্দি এক্সপ্রেস ভালো। এছাড়াও হাওড়া-রাঁচি  ইন্টারসিটি এক্সপ্রেসে যাওয়াও ভালো। নেতারহাট রেসিডেনসিয়াল স্কুলের অধ্যক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা যেতে পারে। তবে বাইরের কাউকে থাকতে দেয়না।

 

ডঃ সুবীর মণ্ডল
লোক গবেষক, প্রাবন্ধিক, লেখক, চিত্রনাট্যকার
পশ্চিমবঙ্গ, ভারত

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা


বিষয়:


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top