সিডনী সোমবার, ১৮ই জানুয়ারী ২০২১, ৫ই মাঘ ১৪২৭

যে দুই বিজ্ঞানীর গবেষণায় করোনা ভ্যাকসিন আবিষ্কার : মু: মাহবুবুর রহমান 


প্রকাশিত:
২৪ নভেম্বর ২০২০ ১৬:০১

আপডেট:
২৪ নভেম্বর ২০২০ ১৬:০৮

ছবিঃ উগার শাহিন ও ওজলেম তুরেসি

 

পুরো বিশ্ব যখন করোনা আক্রান্ত, একমাত্র রাশিয়ার স্পুটনিক ভ্যাকসিন ছাড়া যখন অন্য কোনো করোনা ভ্যাকসিনের সুখবর পাওয়া যাচ্ছিলো না, ঠিক সেই মুহূর্তে পুরো বিশ্বকে নতুন টেকনোলজিতে অতি দ্রুত সময়ে করোনা ভ্যাকসিন উদ্ভাবন ও সফলতার খবর শুনিয়েছিল বিশ্বখ্যাত ওষুধ কোম্পানি ফাইজার ও তার সহযোগী সংস্থা বায়োএনটেক। প্রকৃত অর্থে মার্কিন ওষুধ কোম্পানি ফাইজারের  জার্মান অংশীদার সংস্থা বায়োএনটেকে পরিচালিত হয়েছিল এ টিকা উৎপাদনের মূল গবেষণা। আর এ গবেষণায় নেতৃত্ব দিয়েছেন দু'জন মুসলিম বিজ্ঞানী, যারা সম্পর্কে স্বামী-স্ত্রী। যারা হলেন উগার শাহিন ও ওজলেম তুরেসি। 

মুসলিম দম্পতি উগার শাহিন ও ওজলেম তুরেসি দুজনই পেশায় চিকিৎসক ও গবেষক । ক্যান্সার গবেষণার লক্ষ্যে ২০০১ সালে দুজনে মিলে জার্মানিতে গড়ে তুলেন গানিমেড ফার্মাসিউটিক্যালস। তবে ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠানটি বিক্রি করে দেন তারা। এরই মাঝে ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠা করেন বায়োএনটেক কোম্পানিটি। তাঁদের প্রতিষ্ঠিত এ কোম্পানিতে বর্তমানে ১ হাজার ৪০০ গবেষক কর্মরত আছেন বলে জানা গেছে। 

ইউরোপে খুব একটা পরিচিত না হলেও করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন আবিষ্কার করে বিশ্বখ্যাত হয়ে উঠেছে বায়োএনটেক কোম্পানি। তাদের আবিষ্কৃত ভ্যাকসিনের সফলতার খবরে বায়োএনটেকের শেয়ার দর বেড়ে ২৫ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ডলারে দাড়িয়েছে। এর মাধ্যমে উগার শাহিন ও ওজলেম তুরেসি দম্পতি ইতোমধ্যে জার্মানির শীর্ষ ১০০ ধনীর তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন।  

তবে জীবনের শুরুতে কিন্তু উগার শাহিন ও ওজলেম তুরেসির অবস্থা অতটা ভালো ছিলো না।  তাঁরা দুজনেই অভিবাসী পরিবারের সন্তান। তুরস্কের ইস্কেন্দেরুন শহরে জন্মগ্রহণ করেন ৫৫ বছর বয়স্ক ড. উগার শাহিন। মাত্র ৪ বছর বয়সে অভিবাসী হিসেবে পরিবারের সঙ্গে জার্মানিতে আসেন। তার বাবা জার্মানিতে এসে অভিবাসী শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেন। আর ওজলেম তুরেসির জন্ম জার্মানিতে হলেও তার বাবা ছিলেন তুরস্কের নাগরিক। তবে ওজলেমের বাবা ছিলেন শল্যচিকিৎসক। 

ক্যানসারের চিকিৎসায় একটি ওষুধ তৈরি প্রকল্পে কাজ করতে গিয়ে জার্মানির হামবুর্গের সারল্যান্ড ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে উগার শাহিন ও ওজলেম তুরেসির প্রথম সাক্ষাত হয়। গবেষণায় আগ্রহের জায়গা থেকে দুজনে একত্রে ক্যান্সার বিষয়ক গবেষণা শুরু করেন। তারপর বিয়ে। এমনকি তারা তাদের বিয়ের দিনটিও শুরু করেছিলেন ল্যাবে কাজ করার মাধ্যমে। 

এ বছরের শুরুতে চীনের ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাস নিয়ে একটি গবেষণাপত্র পড়ার পরই এমআরএনএ ভিত্তিক ভ্যাকসিন গবেষণার পরিকল্পনা করেন এ দম্পতি। ভ্যাকসিন গবেষণা প্রকল্পে নিয়োগ দেন ৫০০জন কর্মী। মার্চেই বিনিয়োগকারী হিসেবে ফাইজারের সঙ্গে যাত্রা শুরু হয় বায়োএনটেকের। সেই এমআরএনএ ভিত্তিক ভ্যাকসিনের ট্রায়ালে ৯৫ শতাংশ কার্যকারিতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। 

করোনা সংক্রমণের বিরুদ্ধে ৯৫ শতাংশ কার্যকারিতা প্রমানের পর, ফাইজার ও তার জার্মান অংশীদার সংস্থা, বায়োএনটেক, ২০শে নভেম্বর ভ্যাকসিনটির জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহারের অনুমোদন পেতে যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন, এফ ডি এ  (FDA) 'র নিকট আবেদন করেছে I 

উগার শাহিন ও ওজলেম তুরেসি দম্পতির গবেষণালব্ধ ফাইজার এবং বায়োএনটেকের এই ভ্যাকসিনটি উচ্চ সংক্রমণ হারের বিভিন্ন দেশের প্রায় ৪৪ হাজার স্বেচ্ছাসেবকের ওপর পরীক্ষা চালানো হয়েছে। ভ্যাকসিটির তৃতীয় পর্যায়ের পরীক্ষার ফলাফলে দেখা গেছে, দ্বিতীয় ডোজ দেয়ার এক  সপ্তাহের মধ্যে শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠে। ভ্যাকসিনটির ট্রায়ালের ফলাফল ঘোষণা দেওয়ার সময় বায়োএনটেকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) উগার শাহিন বলেন, কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন আবিষ্কারের ফলে থমকে যাওয়া পৃথিবী আবার সচল হবে, স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফিরে আসবে। 

উগার সাহিন ও ওজলেম তুরেসির গবেষণা দলকে বলা যায় স্বামী-স্ত্রীর এক স্বপ্নের দল। করোনা মহামারির এই সময়ে সারা বিশ্বের মানুষের জন্য আশার আলো দেখাচ্ছেন তাঁরা। উগার শাহিন ও ওজলেম তুরেসি দম্পতি মানবতার সেবায় আত্মনিয়োগ করা বিজ্ঞানী। বিজ্ঞান ও মানুষের সেবায় তাঁরা নিবেদিত। এই দম্পতির প্রতিষ্ঠিত বায়োএনটেকের মূল্য এখন প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি – তবুও উগার সাহিন রোজ অফিসে আসেন একটি বাইকে চড়ে। অর্থ ও প্রতিপত্তি যথেষ্ট পরিমাণে অর্জন করা সত্ত্বেও এই দম্পতি এখনও সাধারণ জীবনযাপন করতেই পছন্দ করেন বলে জানা গেছে । 

 

মু: মাহবুবুর রহমান 
নিউজিল্যান্ডের মেসি ইউনিভার্সিটির পিএইচডি গবেষক

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top