সিডনী বৃহঃস্পতিবার, ৬ই মে ২০২১, ২৩শে বৈশাখ ১৪২৮

ছাদ ও মুখোশ : আসিফ মেহ্দী


প্রকাশিত:
১৪ মে ২০২০ ১৫:২২

আপডেট:
১৪ মে ২০২০ ১৫:২৬

 

(১)
‘অই ড্রাইভার, মনে হচ্ছে রাস্তা ঝাড়– দিতে দিতে যাচ্ছিস!’
বিরক্ত এক যাত্রী চেঁচিয়ে উঠলেন। একটু বেশিই থামাচ্ছে বাসটা। অফিস থেকে বাসে করে বাসায় ফিরছে খালেদ। সেও একদফা চেঁচাল। এক বিশেষ কারণে আজ ভীষণ অস্থিরতা তার মধ্যে। খালেদ অফিসে একঘণ্টা আগে যায়, ফিরে একঘণ্টা আগে। এভাবেই প্রতিষ্ঠানের মালিকের কাছ থেকে অনুমোদন নেওয়া। এটির কারণ-তার প্রবল ছাদপ্রীতি। মানুষ সূর্যাস্ত দেখতে যায় সমুদ্রসৈকতে, খালেদ সূর্যাস্ত দেখে ছাদের কিনারা থেকে! বাসার ছাদ তার ভীষণ প্রিয়। বিশেষ করে বিকেলবেলায় ছাদে ঘুরঘুর করলে তার ফুরফুরে লাগে। সেসময়ে আকাশ ধীরেধীরে রং পাল্টায়, বাতাসের গন্ধ বদলে যেতে থাকে, আশপাশের ছাদগুলোতে দেখা যায় নানা রঙের মানুষ।
খালেদ যে বাড়িতে থাকে, সেই বাড়ির ছাদের একপাশ ঘেঁষে কৃষ্ণচূড়া গাছ। গাছটি ফাগুনে আগুন হয়ে উঠেছে। অবশ্য আগুনরঙা ফুলের চেয়ে খালেদকে বেশি টানে ডালে বসে থাকা একটি পেঁচা! ঝিম মেরে পড়ে থাকে সেটি। খালেদ হাঁটাহাঁটি করে ছাদের একপাশ থেকে আরেকপাশে যায়, পেঁচার মাথা কম্পাস-কাঁটার মতো তাকে নির্দেশ করে নড়তে থাকে! মাঝেমধ্যে পেঁচার দিকে তাকিয়ে খালেদ বিভিন্ন ভঙ্গিতে মাথা নাড়ায়। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, তা দেখে ভূতের মতো প্রাণিটা একই ভঙ্গিতে মাথা নাড়াতে থাকে! মাথা নাড়ানোর খেলা খেলতে খেলতে দুটো প্রাণের মধ্যে এক অলিখিত সখ্যতা গড়ে উঠেছে।
ছাদের একটি পাশে রাস্তা; অন্য দু’পাশে অন্যান্য বাড়ির ছাদ। একটি ছাদ তো একদম এই বাড়ির ছাদঘেঁষা। এই ঘেঁষে থাকা ছাদে গতদিন আবির্ভূত জনৈকা রূপবতী আগন্তুক সারারাত খালেদকে নির্ঘুম রেখেছে! অফিস না থাকলে তাকে আরেকটিবার দেখার জন্য নির্ঘাত সে ছাদ কামড়ে পড়ে থাকত। হতে পারে নতুন ভাড়াটিয়া কিন্তু অন্তর জাগানিয়া! ঘাটতিও যে বাড়তি সৌন্দর্য সৃষ্টি করতে পারে, তার প্রমাণ ওই অচেনা তরুণী। মেয়েটির মুখে ফেসিয়াল মাসলের ঘাটতি; খালেদের চোখে এই টোলই বাড়তি সৌন্দর্যের কারণ। ছাদকন্যার মুখের টোলে জনমভর ডুবে থাকতে চায় খালেদ! রাতভর এমন উদ্ভট চিন্তাভাবনা তাকে ঘুমাতে দেয়নি।

(২)
আজকে ছাদে এসে খালেদ দেখতে পেল, টোলকন্যা পাশের ছাদে একটি মোড়ায় বসে বই পড়ছে। ছাদ দুটো এত কাছে যে বইয়ের নামটি পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে, ‘কাদম্বরীদেবীর সুইসাইড-নোট’। খালেদ কিঞ্চিৎ বিরক্ত। ছাদে এসেও মানুষ বইয়ের মধ্যে ডুবে থাকে কীভাবে! তাছাড়া এই বয়সে মেয়েটির পড়া উচিত মোটিভেশনাল-নোট; তা না পড়ে পড়ছে সুইসাইড-নোট! খালেদ জানার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠল, অপরিচিতার মনে কী এমন দুঃখ যে সুইসাইডাল পত্র পাঠ করছে। মনেমনে সংকল্প করে ফেলল, সে বীরের বেশে মেয়েটির মনের সব হতাশা দূর করে তাকে সুইসাইডাল কর্মকা- থেকে ফিরিয়ে আনবে!
ছাদে বসার ব্যবস্থা অনেকদিন আগেই করেছে খালেদ। সিমেন্ট নির্মিত চেয়ার। সেখানে বসে চানাচুরের ডিব্বা থেকে সে চানাচুর খায় আর প্রতিবেশি ছাদগুলোতে ঘুরেবেড়ানো নানা রঙের মানুষ দেখে, আকাশে ভেসে বেড়ানো নানা ঢঙের মেঘ দেখে, সূর্যের চলে যাওয়া দেখে, চাঁদের জেগে ওঠা দেখে। যখন চারপাশের কর্মব্যস্ততা থেমে যায়, অনেক সময় তখনও খালেদের চানাচুর খাওয়া থামে না। জন্মসূত্রে সে বিশিষ্ট চানাচুরখোর। এজন্য তার ভোগান্তিও কম না। লোকে বলে গ্যাস্ট্রিক, খালেদ বলে জ্বালা। অবশ্য আজকের জ্বালা চানাচুর বাধায়নি; আজকের জ্বালার কারণ টোলকন্যা। অন্তর্জ্বালা পুষে খালেদ কথা বলার তাড়না নিয়ে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে ছাদে।
খালেদ নিজেকে আর সংবরণ করতে না পেরে কথা বলে উঠল। হঠাৎ নীরবতা ভাঙায় গলার স্বর স্বাভাবিক মনে হলো না; যেন সে চেঁচিয়ে বলল, ‘দেখুন।’ বইয়ের মধ্যে ডুবে থাকা বর্ণা তাকাল। খালেদ আঙ্গুল দিয়ে নির্দেশ করল কৃষ্ণচূড়া গাছটি। বর্ণা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতেই আবার চিৎকার, ‘দেখুন, পেঁচা!’ শহরের মধ্যে পেঁচা! বর্ণা তাকিয়ে দেখল কৃষ্ণচূড়ার ডালে বিজ্ঞের মতো বসে আছে পেঁচামশাই। পেঁচা শান্তিতে বসে আছে। এ নিয়ে গল্পপেঁচানোর কী আছে, ভেবে খানিক বিরক্ত বর্ণা। গতকাল ঢাকা শহরে এসেছে বর্ণার পরিবার। বাবার বদলির সুবাদে অন্য শহর ছেড়ে ঢাকায়। ছাদে বসে বইপড়া বর্ণার প্রিয় শখ। কিন্তু পেঁচাকাহিনি নিয়ে হাজির হওয়া এই আগন্তুক নিয়মিত বিরক্তি উৎপাদন করবে বলে মনে হচ্ছে।
খালেদ থেমে নেই। কথা চালানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বলল, ‘আমি যা করি, পেঁচাটা কিন্তু তা-ই করে!’ পাশাপাশি ছাদ; যেন বাড়ি আর উঠান। তাই কথার উত্তর না দিয়ে থাকা সম্ভব না। মনেমনে বর্ণা বলল, ‘তাই নাকি, একটু ভ্যা-ভ্যা করে কাঁদুন তো! দেখি পেঁচা ভ্যা-ভ্যা করে কিনা।’ অবশ্য মুখে এসব বলল না। বর্ণা মুখে বলল, ‘তথ্যটা জেনে খুশি হলাম। ধন্যবাদ।’
‘ছাদ বুঝি আপনার ভালো লাগে?’
‘জি না।’ আসলে বর্ণার প্রিয় স্থান ছাদ। কথা বলতে ইচ্ছা করছে না বলেই এভাবে বলা।
‘অ্যাই, আপনি তো দেখি বিপদের মধ্যে আছেন!’ হঠাৎ খালেদের এমন কথায় ঘাবড়ে গেল বর্ণা। পেঁচার মতো মুখ গোমড়া করে বিরক্তি নিয়ে বলল, ‘কী বিপদ?’
‘আপনার গালে টোল পড়ে! যেকেউ তো প্রেমে পড়ে যাবে।’
চূড়ান্ত বিরক্ত বর্ণা। এমন হিন্দি সিরিয়াল করার কোনো মানে হয় না। অন্যদিকে, সারাদিন ধরে অনুশীলন করা কথাগুলো বলতে পারায় খালেদ আনন্দে ফুলছে। ভূমি থেকে ভূমিতে নিক্ষেপযোগ্য মরণাস্ত্রের মতো হৃদয় থেকে হৃদয়ে হরণাস্ত্র নিক্ষেপ করতে পারার সাফল্যে খালেদ বিগলিত! তবে সেই বিগলিত ভাব বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। বর্ণার কাছেও আছে কথার অস্ত্র। খানিক কথা ছুড়েও দিল, ‘আপনিও তো বেশ বিপদের মধ্যে আছেন?’
‘কী বিপদ!’
‘ছেলেদের মাসল হয় হাতে আর আপনার তো পেটে হয়েছে!’
ভূঁড়ি নিয়ে এমনিতেই অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে আছে খালেদ, এভাবে সম্মান বেচাকেনা ডট কমে উঠে যাবে, তা কে জানত! হাত-পা লুকানো সম্ভব, ভুড়ি কি আর লুকানো সম্ভব? ভাগ্যিস, কথাটুকু বলেই বর্ণা বইপড়ায় মনোযোগী হলো। খালেদ পাংশুমুখে সিমেন্টের চেয়ারে বসল। ফ্যালফ্যাল করে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। একসময় মেঘের রাজ্যে হারিয়ে গেল। স্বপ্নে দেখল, মেঘের রাজ্যে বিশাল কাঁসার থালায় বর্ণা আর সে চানাচুর মাখাচ্ছে! একসময়ে দেখল দুটি ভিন্ন ছাদের বাসিন্দা একই ছাদের তলায় চানাচুর মাখাচ্ছে! সিমেন্টের চেয়ারে আপত্তিকর ভূঁড়ি এলিয়ে ঘুমিয়ে পড়া খালেদের যখন ঘুম ভাঙল, তখন বেশ রাত।

(৩)
পরদিন খালেদ ছাদে এল ঢিলেঢালা জামা গায়ে চাপিয়ে-দুরন্ত ভূঁড়িকে লুকানোর সুতীব্র প্রচেষ্টা। সঙ্গে নিয়ে এসেছে এ যুগের মহাঅস্ত্র-ডিএসএলআর ক্যামেরা। উদ্দেশ্য-প্রকৃতির ছবি তোলার ভান করে মেয়েটার ছবি তোলা! ছবি তোলার অসিলায় একটুসখানি কাছে বসা, একসঙ্গে চানাচুর খাওয়া। কারণ, এক ছাদের তলায় থাকার লক্ষ্য অর্জন না হওয়া পর্যন্ত যে তার ঘুম আসবে না। কৃষ্ণচূড়া গাছের ডালের পেঁচার সঙ্গে খালেদের এখন আর কোনো পার্থক্য নেই। সেটি সারারাত জেগে থাকে গাছের ডালে আর খালেদ জেগে থাকে বিছানায়। একেই তো জ্ঞানীগুণীরা বলেছেন আসল স্বপ্ন, যা ঘুমাতে দেয় না। খালেদ তার জীবনের আসল স্বপ্নের খোঁজ পেয়েছে।
আজ বর্ণার হাতে মোপাসাঁর বই। সুইসাইড নোট এত তাড়াতাড়ি শেষ হওয়ার কথা না; তবে কি বর্ণা বুঝতে পেরেছে যে খালেদ তার হাতে ওই বই পছন্দ করেনি। কল্পিত আত্মতৃপ্তি নিয়ে পরিকল্পিত কর্মতালিকা অনুযায়ী খালেদ আকাশ-বাতাসের ছবি তোলায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল। এভাবে প্রকৃতির অবলোকন সে কখনোই করেনি। এতদিন প্রকৃতি আস্বাদন করেছে হৃদয় নিংড়ে; তবে আজকের উদ্দেশ্য নায়িকা-পটানো! কিন্তু বর্ণার এদিকে বিন্দুবৎ ভ্রƒক্ষেপ নেই দেখে খালেদের অস্থিরতা বাড়ছে। হৃদয়ের অস্থিরতা শরীরে সঞ্চারিত হচ্ছে। একবার দৌড়ে সে যাচ্ছে ছাদের ওপাশে, আরেকবার আসছে এপাশে, অস্থিরভাবে তুলছে স্থিরচিত্র।
ছবি তুলতে গিয়ে খালেদের হাত কেঁপে উঠল যখন সে অপর ছাদ থেকে মেয়েটির ডাক শুনল, ‘আপনি কি আচার খাবেন?’
খালেদ তাকাল হৃদয়হরণকারীর দিকে। হেসে জানিয়ে দিল, সে খেতে চায়। একসঙ্গে চানাচুর খাওয়ার সাধ আপাতত আচারে মেটাতে তার আপত্তি নেই। ও ছাদ থেকে এ ছাদে সহজেই আচার পাচার করা সম্ভব। এই সম্ভবকে খালেদ সম্ভাবনার পথে নিতে চায়। অন্যদিকে, বর্ণার অন্তরের চাওয়া-পাওয়া তার মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই।
আচার মুখে পুরে খালেদ বলল, ‘আচার কি আপনি বানিয়েছেন?’
‘না, আমি ওসব রান্নাবান্না পারি না। আচার বানিয়েছেন মা।’
‘চমৎকার হয়েছে! আমি কিন্তু রান্নাবান্না বেশ ভালো পারি। এটা আমার কথা না, অফিস কলিগরা বলেন।’
‘অফিসে আবার কেউ রান্না করে খাওয়ায় নাকি?’
‘না, মানে, সবাই জোর করল একদিন, তাই...’
‘ওসব জোরজার আমার পছন্দ না। সবাই বললেই যে গাধার খাটুনি খাটতে হবে, তা ঠিক না।’
‘জি, ঠিক বলেছেন।’
খালেদের নিজের রন্ধনগুণের কথা বলে পটানোর চেষ্টা শুরুতেই এভাবে বোল্ড আউট হলো। বর্ণা বিষয়টিকে খুব একটা গুরুত্ব দিল বলে মনে হলো না। রান্নার বিষয়ে হয়তো তার আগ্রহই নেই। তাই প্রসঙ্গ পাল্টাল খালেদ। কথার এক পর্যায়ে সে বর্ণার ছবি তুলে দিতে চাইল। বর্ণা রাজি হলো না; তবে শোনাল মহা আশার বাণী। আজ যথাযথ মুড না থাকায় আগামীকাল ছাদে ছবি তুলবে। সুযোগ পেয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষ (বর্ণা) বরাবর খালেদ পেশ করল আরেকটি আবদার। ফটোসেশন একটি ছাদে হলেই ভালো হয়। তাই ছবির স্বার্থে বর্ণাদের ছাদে খালেদের অবতরণ বিশেষভাবে প্রয়োজন-বিষয়টির গুরুত্ব সে বোঝাতে সক্ষম হলো।

(৪)
আজকের বিকেল ভিন্ন আমেজের। এতটা আবেশিত অবস্থায় খালেদ জীবনে কখনো ছিল বলে মনে পড়ছে না। ছবি তুলতে খানিক হাত কাঁপছে বললে ভুল হবে না। অথচ পরিচিতমহলে ছবি তোলা ও রান্নাতে তার বেশ সুনাম। বর্ণা একেকটি ছবি তোলার পর উচ্ছ্বসিত হয়ে বলছে, ‘দেখি, কেমন হলো?’
খালেদ সাগ্রহে বাড়িয়ে দিচ্ছে ক্যামেরা এবং নিজের পুরো শরীর! ছবির কোয়ালিটি পরীক্ষার জন্য বর্ণা এতটা কাছে চলে আসছে যে তার নিঃশ্বাসের বাতাস খালেদের বুঁকে কাঁপন ধরিয়ে দিচ্ছে। হৃদয়ের ভেতরে যে স্বপ্নটা বপন হয়েছে তিনদিন আগে, বুকের কাঁপনে সেটির অঙ্কুরোদগম হচ্ছে। স্বপ্নটি বাড়তে বাড়তে একসময় হয়তো হৃদয়াকাশ ছাপিয়ে যাবে। সারা বিকেল রাঙিয়ে শেষলগ্নে একটি ছবি বর্ণার খুব মনে ধরল। ছবিটা তার প্রয়োজন। বর্ণার যেকোনো প্রয়োজন মেটাতে খালেদ সদা প্রস্তুত। জানিয়ে দিল, কালকে অফিস থেকে ফেরার পথে ছবি প্রিন্ট করে নিয়ে আসবে।
ছবি প্রিন্ট করতে গিয়ে পরদিন খানিক দেরি হলো খালেদের। বর্ণাদের ছাদে পৌঁছানোর কিছুক্ষণের মধ্যে সন্ধ্যা নামল। সন্ধ্যা হওয়ামাত্র বর্ণা ঘরে ফেরে। আবেদন জানিয়ে আরেকদিন ছাদে বসে গল্প করার আমন্ত্রণ জোগাড় করল খালেদ। তারপর সেই একটি দিন হলো দু’টি দিন, তিনটি দিন, ক্রমে দিনের পর দিন।
প্রতি বিকালে নানা অজুহাতে খালেদ হাজির হয় বর্ণাদের ছাদে। খালেদ কথা বলতে থাকে আর বর্ণা শুধু শুনেই যায়। একসময় বর্ণাও নিজেকে প্রকাশ করা শুরু করে। দুজনের কথা যেন ফুরায় না। আশপাশের প্রকৃতি ও জীবন মিস করতে থাকে তাদের অকৃত্রিম আপনজন খালেদকে, যে শুধু তাদেরকে সময় দিত ও অবলোকন করত, তাদের সঙ্গে কথা বলত, তাদেরকে নিয়ে ভাবত। খালেদ খেয়াল করল, একটি কাক বিদ্রোহী হয়ে উঠেছে। কোনো এক বিচিত্র কারণে খালেদ-বর্ণার আলাপচারিতার সময় সে বিশ্রিসুরে কা-কা করেই চলে। খালেদ মাঝেমাঝে বিরক্ত হয়ে উঠে যায় দুষ্ট কাক শায়েস্তা করতে কিন্তু ডানাওয়ালা প্রাণির সঙ্গে না পেরে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসে।
একই মোহাচ্ছন্নতায় কেটে যাওয়া প্রতিটি দিনের মধ্যে একটি দিন প্রতিভাত হলো একদম আলাদা রূপে। বিকেল আর সন্ধ্যার মিলনক্ষণে নির্জন ছাদের ওপর খালেদ আর বর্ণা হাতে হাত রেখে কথা দিল, পৃথিবীগ্রহের এক জীবনের পথ তারা একসঙ্গে পাড়ি দেবে। যদি কখনো আকাশ কালো করে মেঘ জমে, ঝড় এসে ল-ভ- করে দেয় বসতঘর; তবু কেউ কাউকে ছেড়ে যাবে না। প্রতিজ্ঞার সেই ক্ষণেও ছাদের পাশের ইলেকট্রিক তারের ওপর বসে বিকটভাবে চেঁচাতে থাকল সেই অলক্ষুণে বিদ্রোহী কাক।

(৫)
আজ খুব অদ্ভুত একটি দিন। খালেদের কানে আসছে সেই কাকের ডাক। কী আশ্চর্য, আজ মনে হচ্ছে মুখোশহীন এই কাকটিই তার সবচেয়ে বড় বন্ধু! এতদিন তার সতর্ক করার প্রচেষ্টা খালেদ বুঝতে পারেনি। প্রকৃতির এসব জীবন রহস্যময়; হয়তো অনেক কিছুই জানে, জানাতে চায়। আকাশ, মেঘমালা, কৃষ্ণচূড়া গাছ ও তাতে বসা পেঁচা তাদের বন্ধুটিকে ফিরে পেয়ে যেন আনন্দিত। অথচ রূপ পাল্টে ফেলেছে খালেদের সবচেয়ে প্রিয় স্থান ছাদ! পাশের ছাদটি মুখোশ পরেছে। সেই মুখোশের আড়ালে আছে একটি নির্মম গল্প। এক তরতাজা প্রাণের সমাধির গল্প। আজ বর্ণার বিয়ে। তাই তাদের বাসার পুরো ছাদজুড়ে প্যান্ডেল টাঙানো হয়েছে। এইতো কদিন আগে মেয়েটি হাত ছুঁয়ে প্রতিজ্ঞা করেছিল এক জীবন একসঙ্গে হেসেখেলে কাটানোর। কে জানত, তার হেসেখেলে জীবনযাপন আরেকজনের মৃত্যুর নামান্তর। প্রতিজ্ঞার পর হঠাৎ যোগাযোগ একদম বন্ধ করে দেওয়ায় অজানা আশংকায় খালেদের বুক কেঁপে উঠেছে বারবার। হয়তো খালেদের হাতে তোলা ছবিই বায়েডাটাতে সেঁটে বর্ণার পরিবার খুঁজেছে পাত্র।
রাত হয়ে গেছে। বন্ধু কাকটি ফিরে গেছে বাসায়। শুধু পাশের ছাদে মুখোশের আড়ালে কিছু মুখোশ শোরগোল করছে। খালেদ তীব্রভাবে অনুভব করছে, জগৎ ও জীবনে কেবল মানুষ ও ছাদই মুখোশধারী। হঠাৎ ছাদকে খুব ভয় পাচ্ছে খালেদ। এতটা ভয় সে কখনো আঁধারকেও পায়নি। ছাদের প্রতি তার ভালোবাসা আর কখনো ফিরে আসবে কিনা, জানা নেই। অন্ধকার আকাশের অনন্ত নক্ষত্রবীথির দিকে তাকিয়ে খালেদ প্রথমবারের মতো দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তা দেখে কৃষ্ণচূড়ার ডালে বসে থাকা বিজ্ঞ পেঁচা যেন একই ভঙ্গিতে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।

***

লেখক: আসিফ মেহ্দী
কথাসাহিত্যিক ও প্রকৌশলী

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top