সিডনী সোমবার, ১২ই এপ্রিল ২০২১, ২৯শে চৈত্র ১৪২৭

নারী দিবস শুধু কাগজ কলমে পালন করা হয় : বটু কৃষ্ণ হালদার


প্রকাশিত:
৮ মার্চ ২০২১ ১৪:০৪

আপডেট:
৮ মার্চ ২০২১ ১৪:১৬

 

নারী সম্বন্ধে কোন কিছু বলতে গেলেই কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার লাইনের এই উক্তিটি বিশেষ ভাবে উপলব্ধি করার প্রয়োজন তাহলো,_"এ পৃথিবীর যা কিছু মহান চির কল্যাণকর/ অর্ধেক তার করিয়াছে নারী,অর্ধেক তার নর"। তবুও নারীর জীবনের দুঃখের কালো মেঘ আজও পুঞ্জিভূত হয়ে রয়েছে।একটা হাসপাতালে গিয়ে দেখলে উপলব্ধি করা যায় যে গর্ভবতী নারীর জীবন কতটা কষ্টের। আমরা একটু বেশী খাবার খেলেই,বা সকালে ঠিক মত প্রাতঃক্রিয়া না হলে শরীরটা কেমন অস্থির হয়ে ওঠে। অথচ নারী দশ মাস দশ দিন একটা জীব কে নিজের শরীরের মধ্যে ধারণ করে। যুগের পর যুগ সমাজ পক্রিয়ার ধারা কে বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে দায়িত্ব সহকারে। গর্ভবতী কালীন নারীদের বিশেষ যত্নের প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে পুষ্টি কর খাওয়া, প্রয়োজনীয় বিশ্রাম। নারী সন্তান সম্ভবা হলে শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়ে,সব সময় ঘুম ঘুম পায়। কিন্তু বেশির ভাগ নারীর কপালে জোটে চরম চরম দুর্ভোগে। কারো কপালে একটু খাবার জুটলে ও বিশ্রাম করলে শশুর বাড়িতে শুনতে হয় নানান কটু কথা। হাসপাতালে গিয়ে ও ঘণ্টার পর ঘন্টা লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। কারণ আমাদের দেশের সরকারী স্বাস্থ্য কেন্দ্রর পরিকাঠামো আজও বিশ বাঁও জলে।

যাই হোক তবুও একটা সন্তানের  আশায় বুক ভাসায় মা।গর্ভে সন্তান আসার পর বহু স্বামী-শাশুড়ির মুখ থেকে শোনা গেছে, আমার কিন্তু একটা নাতি বা পুত্র সন্তান চাই। সেবা-শুশ্রূষার অভাবে বহু মা সন্তান জন্ম দেওয়ার আগেই চিরতরে পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। রাস্তায় যেতে যেতে অনেক মা সন্তান প্রসব করে ফেলে। এমন কি হাসপাতালে সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে বহু মা প্রাণ হারান। তাতেও কুছ পরোয়া নেহি। শুধুমাত্র মা ডাক শোনার আকুতি সবকিছুকে উপেক্ষা করে দেয়। কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়। হাজারো প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে যখন একটা মা কন্যা সন্তানকে জন্ম দেয়, তখন সমাজের বহু কন্যা সন্তান ও প্রসূতির জীবনে নেমে আসে আমফানের মত দুর্বিষহ ঝড়। এমনও দেখা গেছে অনেক মা কন্যা সন্তানকে হাসপাতালে ফেলে পালিয়ে গেছে। আবার বহু কন্যাসন্তানের ঠাঁই হয় হোম,নোংরা আবর্জনা মধ্যে নয়তো ডাস্টবিনে। কখনো কখনো শুনশান বড় রাস্তার ধারে, নয়তো রেললাইনের পাশে কন্যা সন্তানদের পড়ে পড়ে থাকার খবর প্রকাশ্যে আসে সংবাদমাধ্যমগুলোতে।

একটা মা দশ মাস দশ দিন সন্তান গর্ভে ধারণ করে কখনোই এমনভাবে নিজের সন্তানকে ফেলে পালিয়ে যেতে পারে না। এমন মর্মান্তিক ঘটনা গুলো আমাদের সমাজের বিবেককে নাড়া দেয়। আমরা সবাই দোষারোপ করি সেই মা কে, যারা কন্যা সন্তান গুলোকে ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। অথচ আমরা একবারও ভেবে দেখি না সেইসব মায়েদের কথা,কন্যা সন্তান জন্ম দেওয়ার যাদের ঠাঁই হয় বাপের বাড়িতে, শ্বশুর বাড়ীর দরজা চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। কন্যা সন্তানদের প্রতি এমন অবহেলার ফলে সমাজের বুকে বেড়ে চলেছে নির্মম, অত্যাচার, অবিচার, ধর্ষণ। শিশু কন্যা সন্তান বিক্রি করে দেয়ার প্রবণতা বেড়েছে। চলছে অবাধে শিশু, নারী, পাচার। আবার পণ প্রথায় বহু নারী প্রাণ হারান এই ভারত বর্ষে। বিয়ের আগে মেয়ে দেখতে গিয়ে শ্বশুরবাড়ির লোকজনের মুখ থেকে শোনা যায়, এ শুধু আমার ছেলের বউ নয়, আমার এক মেয়ে। অথচ বিয়ের পরের দিন সেই শাশুড়ির কিংবা শ্বশুরবাড়ির লোকজনদের কাল কেউটের আসল রূপ বেরিয়ে আসে। ফুলশয্যার রাত পেরোতেই, সেই বউয়ের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয় ঝাঁটা কিংবা কলসি। বাবা মায়ের কাছে আদরের দুলালী হয়ে যায় অলক্ষী কিংবা কাম চোর।

শুধু তাই নয়, রূপে লক্ষ্মী গুণে সরস্বতী আদর্শ নারীর সংজ্ঞা। নারীদের ক্ষেত্রে রুপ আর গুণের মধ্যে এই বিভেদ রেখা কেন? পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারী আজ জল স্থল অন্তরীক্ষে সমানতালে পাল্লা দিয়ে চলেছে। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করে প্রমাণ করেছে যে তারা এ সমাজে পুরুষদের চেয়ে কোন অংশে কম নয়। প্রাচীন পৌরাণিক যুগে আমরা সীতা, দ্রৌপদী, সাবিত্রীর মত সতী নারীদের কথা জানতে পারি। প্রাচীন ইতিহাসে ঘোষা, লোপামুদ্রা, গার্গী,মৈত্রীর মত জ্ঞানী নারীরা জন্ম নিয়েছিলেন।

১৮৭৬ সালে যে সময়, নারী শিক্ষার কথা ভাবা যায় না, নারীদেরকে রাখা হতো পর্দার আড়ালে, পুরুষরা মাটিতে দাগ কেটে পড়াশোনা করতেন, সে সময়েও নিজের ইচ্ছা শক্তির জোরে পড়াশোনা করে রাসসুন্দরী দেবী "আমার জীবন"নামক দুই খণ্ডের আত্মজীবনী প্রকাশ করেছিলেন। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে ঝাঁসির রানী লক্ষ্মীবাঈ, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, মাতঙ্গিনী হাজরা রা হাসতে হাসতে প্রাণ দিয়েছিলেন। তবু কেন এত ভেদাভেদ? শুধু নারীরা নয়,এ সমাজের বুকে কন্যা শিশুরা আজও সুরক্ষিত নয়। সময় পরিবর্তনশীল। বিশ্ব আজ তালুবন্দি। আধুনিক সভ্যতার ছোঁয়ায় সভ্য সমাজের সুষম বিকাশ ঘটেছে।অথচ উত্তরাখণ্ডের এক গ্রামে গত ছয় মাসে একটা শিশুকন্যা জন্মায়নি। কন্যাভ্রূণ নির্মূলন যজ্ঞে যোগ দিয়েছেন অজাত শিশুর পরিবার, শিক্ষিত ডাক্তারবাবুরা এবং আইনের মুখে ছাই দেওয়া প্রশাসন। জন্মাবার আগেই গর্ভপাতের প্রবণতা বেড়েছে। অথচ আমাদের ভারতবর্ষের বুকেই আইন রয়েছেন লিঙ্গ নির্ধারণ আইনত অপরাধ।অথচ জন্মের লগ্নেই ১০০০ শিশুপুত্রের তুলনায় ১০৪ জন মেয়ে কম জন্মায় আমাদের দেশে। পৃথিবীর আলো দেখার আগেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় ফুলের কলিরা। জন্ম থেকে ছয় বছর পর্যন্ত কন্যা ও পুত্র সন্তান অনুবাদ কমে চলেছে ১৯৪১ সাল থেকেই। কন্যাভ্রূণ নির্মূলনে চলে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা। পিছিয়ে নেই কলকাতার শিক্ষিত উচ্চ-মধ্যবিত্ত অঞ্চল গুলো।

জেনারি বর্তমান সমাজে জল স্থল অন্তরীক্ষে সমানতালে পাল্লা দিয়ে ও নিজেদেরকে বারবার প্রমাণ করার চেষ্টা করছে যে এই সমাজে তাদের গুরুত্ব কোন অংশে কম নয়। আমরা এযাবত দেখে আসছি সুবিচারের আশায় নারী আইনের দরজায় কড়া নেড়ে আসছে।প্রাচীন যুগে দুই সতী সীতা ও দ্রৌপদী উপেক্ষিত। আধুনিক যুগে নারী ভোগ্য, পণ্য, আমদানী, রপ্তানি বিলা, বৈভবে চিহ্নমাত্র। দিল্লির নির্ভয়া থেকে কামদুনি, আসিফা, পূজা ধর্ষণ কান্ড চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে নারী তুমি যতই মেরি কম, হিমা দাস হয়ে ওঠো তবু ও তোমাদের জীবনের মূল্য এক আনা পয়সার থেকে ও কম। যারা ধর্ষনের মত এমন বর্বর জঘন্যতম অপরাধ করছে তারা রাজনৈতিক প্রশ্র য়ে বুক ফুলিয়ে সমাজের বুকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বর্তমানে পশ্চিমবাংলা ও উত্তর প্রদেশ ধর্ষণ কাণ্ডে প্রথম সারিতে উঠে এসেছে। এ সমাজের বুকে দুধের শিশু, নাবালিকা, মাঝবয়েসী এমনকি ষাটোর্ধ্ব নারীও আজ বেআব্রু। তবুও যুগের পর যুগ ধরে ঘটা করে কুমারী পূজা বরণ করা হয়। এটা কি সমাজের বুকে প্রহসন নয়?

সমাজের শিক্ষিত বুদ্ধিজীবীরা কথায় কথায় মোমবাতি মিছিল নিয়ে আন্দোলন করে। কিন্তু এই ভিড়ের মাঝে ও লুকিয়ে থাকে শিকারির নীল চোখ। শিক্ষিত সমাজের অর্জুন রাজ নির্বিকার অবিচল। এই আধুনিক যুগে এসেও পণপ্রথায় আত্মহুতি হয় বহু নারীর। অ্যাসিড হানার তীব্র যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে থাকতে হয় অনেককেই। কন্যা সন্তান বাড়ির বাইরে গেলে বাড়িতে অসহায় বাবা মারা হৃদপিণ্ড চেপে ধরে বসে থাকে, মেয়েটা আজ আমার সুরক্ষিত অবস্থায় বাড়িতে ফিরবে তো? কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার নারীদের জন্য কন্যাশ্রী, বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও এর মত বহু প্রকল্প এনেছে। কিন্তু নারী সুরক্ষা কোথায়? প্রতিবছর ৮ ই মার্চ বিশ্ব নারী দিবস পালন করা হয়। এই নারী দিবস শুধুমাত্র কাগজে-কলমে পালন করা হয় সে বিষয়টা কিন্তু আজ জলের মত পরিষ্কার। আজও আমরা নারীদেরকে মা-বোন সন্তান বলে ভেবে উঠতে পারিনি। সমাজের বুকে দেশের নেতা মন্ত্রীরা এই নারী দিবস উপলক্ষে ভাষণ দেন। আর রাতের বেলায় তাদের দ্বারা নারী হয় বেআব্রু। তাই কোন প্রকল্প বা নারী দিবস পালন নয়। বর্তমানে নারীদের সুরক্ষার কথাটা সরকারের ভাবা উচিত।

 

বটু কৃষ্ণ হালদার
কবরডাঙ্গা, কলকাতা

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top