সিডনী বৃহঃস্পতিবার, ৬ই মে ২০২১, ২৩শে বৈশাখ ১৪২৮

কপি-রাইটার (রম্য গল্প) : সত্যজিৎ বিশ্বাস


প্রকাশিত:
১২ এপ্রিল ২০২১ ১৩:৩৭

আপডেট:
৬ মে ২০২১ ০৬:৫৩

 

বাল্যকাল হইতেই লেখালিখিতে আমি পটু। বাংলা, ইংরেজী অক্ষর সমূহের সাথে পরিচিত হইবার পর হইতে আর কিছুই আমাকে শিখাইয়া দিতে হয় নাই। নিজে নিজেই আয়ত্ব করিয়া নিয়াছি। বিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিতে বসিয়া বিন্দুমাত্র মাথা না ঘুরাইয়া চোখের কারিশমায় পাশের ছাত্রের লেখা হুবহু কপি করা ছিল আমার কাছে জলভাত। অধিকাংশ ছাত্রেরই যেখানে না পড়িয়া, না জানিয়া এক লাইন লিখিতে কলম কাঁপে, সেখানে আমার কলম বেঞ্চ কাঁপাইয়া তরতরাইয়া আগাইয়া চলে। খালি দুই/তিন ফুট দূরত্বের মধ্যে কাহারো কলম চলিলেই হইল। আমাকে থামাইবে কার  সাধ্যি! চিতা বাঘ যেইরূপ শিকারের সাথে গতির পাল্লা দেয়, আমিও তদ্রূপ ক্ষিপ্র গতির ফাইটার রাইটার।

সেই কারণে বাল্যকাল হইতে সহপাঠী এমনকি শিক্ষকদেরও ঈর্ষার পাত্র হইয়া উঠিয়াছিলাম। ঈর্ষার মাত্রার পরিমাণ কতখানি, তা একখানা উদাহরণ দিলেই বুঝিতে পারিবেন। পরীক্ষার সময় এক বেঞ্চে দুইজন করিয়া পরীক্ষা দেওয়ার নিয়ম যেখানে সর্বজনবিদিত, আমার বেলায় তার প্রয়োগ কই? একই বেঞ্চিতে আমার পাশে কোন ছাত্রকে বসিতে দেওয়া হইত না।  উপরন্তু আমার দৃষ্টি প্রতিভা টের পাইয়া স্যারেরা আমার নাম রাখিলো ‘শনির দৃষ্টি’!         

এ তো গেল স্কুলের পাঠ্যপুস্তক লইয়া পড়ালেখার কথা। এসব ছাড়াও আমি কিন্তু কবিতা লিখিতাম, গল্পও লিখিতাম। এটা তো হইতেই পারে, সেই মতো লেখা পূর্বেই কেউ লিখিয়া গিয়াছেন। এ   পৃথিবীতে কোটি কোটি মানুষ। কবি, সাহিত্যিকও কি কম? সবাই যে একখানা করিয়া গল্প, কবিতা, উপন্যাস রচনা করিয়াই ক্ষান্ত দিয়াছেন, তা তো নয়।  শতক, হাজারের মাইল ফলকও অনেকে পার  করিয়াছেন। কাজেই ভাবনার মিল তো হইতেই পারে। মিল হইলেই বা কী? আমি যে লিখিতাম, তাহা তো আর মিথ্যা নহে।   

ঠোঁট আর নাকের মধ্যবর্তী স্থানে যখন দু’চারটে করিয়া কালো রেখা দেখা দিলো, আমার খাতায়ও দেখা দিলো নাটক লেখার প¬ট। বিখ্যাত কপি রাইটার হিসাবে স্কুল পাস দিয়া কলেজে পা রাখিলাম। গালে দাড়ি গজাইবার সাথে সাথে প্রবন্ধ, উপন্যাসও গজানো শুরু করিয়া দিলো। বিদেশ হইলে আমাকে নিয়া নিশ্চিত হইচই পড়িয়া যাইতো। এমন এক পোড়া কপালের দেশে জন্মাইয়াছি, এ দেশের মানুষ মাছ, মুরগী পোড়ার মূল্য দিতে জানে, প্রতিভার মূল্য দিতে জানে না। আমার প্রতিভা দেখিয়া নিন্দুকেরা যেন বিনা আগুনে জ্বলিয়া পুড়িয়া গ্রীল হইতে লাগিল।  সংবাদ সংস্থা রয়টার-এর ন্যায় প্রকাশ্যেই তাহারা দিকে দিকে রটাইতে লাগিল, প্রতিটা লেখা কপি করা এমন কপিবাজ রাইটার নাকি ইতিহাসে বিরল!        

অনুকরণ, অনুসরণ করা বুঝি গর্হিত কর্ম? নানান রঙের বর্মে জড়াইয়া এই কর্ম কে করে না  শুনি? মা-বাবাকে দেখিয়া সন্তান করে না? শিক্ষককে দেখিয়া ছাত্ররা করে না? প্রয়াত, বয়ঃবৃদ্ধ, জনপ্রিয় অভিনেতা-অভিনেত্রীদের অভিনয় অবলোকন করিয়া ইন্ডাস্ট্রিতে আসা নতুন নায়ক- নায়িকারা করে না? একজনের গানের কথা, সুর আরেকজন কপি করে না? বব ডিলনের গানের কথা কপি করিয়া সুমন চট্টোপাধ্যায় গান করে না? সাহিত্য রাজ্যে কপি-বিদ্যা তো রাজ-বিদ্যা। এমনকি ধরা পড়িলেও। কালের গর্তে গত হওয়া সাহিত্য রাজ্যের বড়ো বড়ো মন্ত্রী, সেনাপতিরাও এই কাজ  করিতেন, বর্তমান সময়ের জনপ্রিয়রাও বিমলানন্দে করিয়া যাইতেছেন। কেহ ধুমাইয়া,  কেহ বা কমাইয়া। সেক্সপীয়ার হইতে রবীন্দ্রনাথ কে করেন নাই শুনি? রাইটিং-এ যাহার প্রবল আগ্রহ ফাইটিং তো সে করিবেই। আর কে না জানে, যুদ্ধে সকল কৌশলই গ্রহণযোগ্য।

লেখালিখিতে যাহার প্রবল তৃষ্ণা, সেই কপি করিতে সাহস করে। কারণ সে-ই পরের জিনিসকে সম্পূর্ণরূপে আপন করিয়া লইতে জানে। অন্যের জিনিস ভ্যানিস করিয়া নিজের বলিয়া ভাবিতে হিম্মত লাগে, সেই হিম্মত সবার থাকে না। এইসব কথা কাকে বুঝাইব? আমার চারপাশে যাহাদের বিচরণ তাহাদের আচরণ দেখিয়া মনে হয়, কপি মানেই কপি। কপি করা রাইটারের মূল্য তাহাদের চোখে নিচু পর্যায়ের ভারবাহী প্রাণীর বুদ্ধির সমান।

কলেজের ফাইনাল পরীক্ষা দিয়া তাই পণ করিলাম, আপন সবার কাছ হইতে গোপন হইয়া কপিবিহীন একখানা আনকোরা উপন্যাস রোপণ করিয়া সাহিত্য জগতে কাঁপন ধরাইয়া তবেই ফিরিব।   

যেই কথা, সেই কাজ। নির্জন ঘরে কখনো চিত হইয়া, কখনও বা কাত হইয়া গল্পের প¬ট ভাবিতে শুরু করিলাম। শুনিয়াছি বড় বড় লেখকদের নিকট নাকি গল্পের চরিত্ররা চুপিচুপি আসিয়া দরজায় খটখটাইতো, জানালায় উঁকি দিতো। দিনের পর দিন, রাত্রির পর রাত্রি চিত-কাইতে অপেক্ষার পরও কোন চরিত্র উঁকি দিয়া ঝুঁকি নিতে আসিল না। তাই দেখিয়া নিজেই বাহির হইলাম গল্পের প্লট আর চরিত্রের সন্ধানে।

রাজপথে, চিপা গলিতে, পার্কে, চায়ের টং দোকানে কত কিছুই যে দেখি আর ভাবি। রাজপথে যানবাহনের ভিড় দেখিতে দেখিতে ভাবি, পার্কের বেঞ্চে শুইয়া আকাশ দেখিতে দেখিতে ভাবি, খিদায় পেট মোচড় দিয়া উঠিলে বাড়ি ফিরিতে ফিরিতে ভাবি। ভাবিতে ভাবিতে খাই, ভাবিতে ভাবিতে হাই তুলি, ভাবিতে ভাবিতে ঘুমাইতে যাই। সকালে ঘুম হইতে উঠিয়া আবার ভাবিতে বসি। ভাবিতে ভাবিতে গল্পের লাইন যে মাথায় ভর করে না, তাহা নহে। সমস্যা হইল, যে লাইনগুলো আমাকে ভর করে, সেই লাইনগুলো বিখ্যাত লেখকদের মাথায় ইতিপূর্বেই ভর করিয়াছিল। লিখিলেই তো হেটার্সরা আবার হইহই করিয়া উঠিবে।   

 

অবশেষে একদিন অপরাহ্নে আনকোরা একখানা প্লট আসিতেছে আসিতেছে করিয়া মনের দরজায় নক করিল, খট-খট-খট। চমকাইয়া উঠিলাম। স্পষ্ট যেন শুনিলাম দরজায় শব্দ। দুই সেকেন্ড বিরতিতে আবারও, খট-খট-খটৃ ভালো করিয়া লক্ষ্য করিয়া বুঝিলাম, শব্দ হইতেছে বটে তবে মনের  দরজায় নয়, ঘরের দরজায়। ঘটনার আকস্মিকতায় তব্দা খাইয়া বন্ধ দরজা খুলিতেই মা জননী ঝড়ের বেগে প্রবেশ করিল। চোখ গোলা পাকাইয়া মুখ ঝামটা দিয়া কহিল, ওহে গুনধর কপিরাজ, তোমার পরীক্ষার ফল বাহির হইয়াছে। প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় কোন বিভাগেই তোমার নাম পাওয়া যায় নাই। ওই যে তোমার পিতৃদেব, চেলাকাঠ লইয়া এদিকেই আসিতেছে।       

 

একদিকে লেখা আসিতেছে, অন্যদিকে পিতৃদেব। হায়রে আমার কপাল! যে মহাকাব্য লেখার কথা ছিল, তা বুঝি আর লেখা হইল না। চেলাকাঠ গায়ে ছুটিয়া আসিবার পূর্বেই ক্ষিপ্র চিতার বেগে নাক বরাবর ছুটিলাম। ছুটিতে ছুটিতেই বলি, আপনারা কিন্তু মহাকাব্য না পাইয়া হতাশ হইবেন না। এই দিন দিন নাৃ দিন নিশ্চয়ই ফিরিবে। আমিও ফিরিব।

 

সত্যজিৎ বিশ্বাস
রম্য লেখক ও শিশু সাহিত্যিক
* রম্য বিভাগীয় সম্পাদক- কিশোর বাংলা
* নির্বাহী সম্পাদক- কিশোরকাল

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top