সিডনী বৃহঃস্পতিবার, ৬ই মে ২০২১, ২৩শে বৈশাখ ১৪২৮

বঙ্গবন্ধুর চোখে মানিক মিয়া : এস ডি সুব্রত


প্রকাশিত:
৩ মে ২০২১ ১৪:০৪

আপডেট:
৬ মে ২০২১ ০৬:৩৭

ছবিঃ তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান

 

তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া ১৯১১ সালে পিরোজপুর জেলার ভাণ্ডারিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এবং মৃত্যু বরন করেন ১৯৬৯ সালের ১ জুন পাকিস্তানের রাওয়াল পিণ্ডিতে। দৈনিক ইত্তেহাদ পত্রিকার মাধ্যমে মানিক মিয়া গণমাধ্যমের সাথে যুক্ত হন। পরবর্তীতে তার সম্পাদনায় সাপ্তাহিক ইত্তেফাক পত্রিকা দৈনিক "ইত্তেফাক "এ রুপান্তরিত হয় ‌‌‌‌‌তার প্রতিষ্ঠিত আরও দুটি পত্রিকা "ঢাকা টাইমস" ও "পূর্বাণী"। ১৯৬৩ সালে তিনি আন্তর্জাতিক প্রেস ইনস্টিটিউট এর পাকিস্তান শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন।

শেখ মুজিবের রহমানের রাজনৈতিক গুরু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। বঙ্গবন্ধু সোহরাওয়ার্দীর পর যাকে রাজনৈতিক গুরু সিংহ মানতেন তিনি হলেন মানিক মিয়া। মানিক মিয়া কে অত্যন্ত শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধুর মতে পূর্ব বঙ্গ তথা আজকের বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সোহরাওয়ার্দীর থেকে মানিক মিয়ার অবদান বেশি।

১৯৬২ সালে র আগে মানিক মানিক মিয়া ও বঙ্গবন্ধু দুজনেই জেলে। দুজনই আলাদা সেলে। তবে মাঝে মধ্যে সাক্ষাৎ হতো। বঙ্গবন্ধু তার স্মৃতি কথায় লিখেছেন একদিন এক সাক্ষাৎকালে মানিক ভাই জানালেন সরকার পক্ষ মানিক ভাই কে আপষ করার অনুরোধ জানিয়েছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, 'আপনি কি বলছেন’? মানিক ভাই উত্তর দিলেন, ‘চৌদ্দ বছর জেল খাটতে হয় সেও কবুল। কিন্তু নীতির প্রশ্নে আপস চলে না। একথাই ওদের জানিয়ে দিয়েছি।' আসলে কি জানেন, ওরা আপনার উপর অত্যাচার চালাচ্ছে। কেননা তাদের ধারণা আপনার উপর বাংলার মানুষের অগাধ বিশ্বাস।কোন ক্রমে আপনাকে শেষ করা গেলে সব ঝামেলাই শেষ হবে। তারপর নিজেই আবার ভরসা দিয়ে বললেন, অবশ্য এতে ঘাবড়ানোর কিছু নেই, সফল আপনি হবেনই।' 

 

 

১৯৪৯ সালের পর মানিক মিয়া যখন কলকাতা ছেড়ে ঢাকায় এসেছিলেন এবং কি কষ্টে ছিলেন তা নিয়ে স্মৃতি কথা তে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন........"সকলেই জানেন আইয়ুবের শাসনামলে আমাকে বারবার জেলে যেতে হয়। ফলে এক সময় এমন অবস্থা সৃষ্টি হয় যে ভয়ে বন্ধু বান্ধব দের অনেকেই আমার পরিবারের খোঁজ নেয়ার সাহস হারিয়ে ফেলেন। কিন্তু কোন অবস্থাতেই যিনি ভয় পাননি এবং আমার অবর্তমানে আমার পরিবারের পেছনে পাহাড়ার মতো যেয়ে দাঁড়াতেন তিনি হলেন মানিক ভাই‌। তাই আমার কারাজীবন কালে মানিক ভাই যদি বাইরে থেকেছেন তাহলে পরিবার সম্পর্কে আমি অনেকটা নিশ্চিত থাকতে পেরেছি।" 

ইত্তেফাক প্রকাশে মানিক ভাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন সে সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। ইত্তেফাক প্রসঙ্গ গুরুত্বপূর্ণ কারন স্বাধীকারের প্রশ্নে ইত্তেফাক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। "একদিন ভাসানী সাহেব ও আমি কোর্টে মেয়ে দেখি মানিক ভাই দাঁড়িয়ে আছেন আমাদের সাথে দেখা করার জন্য। মানিক ভাই বললেন নানা অসুবিধায় আছি। আমাদের দিকে খেয়াল করার কেউ নেই। আমি একটা চাকরি (ডিপুটি সেক্রেটারির) পেয়েছি। করাচীতে চলে যেতে হবে। আপনারা কি বলেন? আমি বললাম, মানিক ভাই আপনিও আমাদের জেলে রেখে চলে যাবেন? আমাদের দেখবার বোধ হয় কেউ থাকলনা।" আমি জানতাম মানিক ভাই চারটি ছেলে মেয়ে নিয়ে খুবই অসুবিধায় আছেন। ছেলে মেয়েদের পিরোজপুর রেখে একলা আছেন ঢাকায়। মানিক ভাই কিছু ক্ষণ চুপ থেকে আমাদের বললেন, না যাব না আপনাদের জেলে রেখে।

 

মাওলানা ভাসানী ইত্তেফাক কাগজের বের করেছিলেন। কয়েক সপ্তাহ বের হওয়ার পর টাকার অভাবে তা বন্ধ হয়ে যায়। তখন ভাসানী সাহেব মানিক ভাই কে বললেন কাগজটা তো বন্ধ হয়ে গেছে। যদি পার তুমিই চালাও। মানিক ভাই বললেন, টাকা কোথায়? কিভাবে চালাব? তখন আমি আমার এক বন্ধুর কর্মচারীর কথা বললাম। তিনি কলকাতায় চাকুরী করতেন। আমার কথা বললে তিনি আপনাকে সাহায্য করতে পারেন। আমাকে খুব ভালবাসতেন। পরের মামলার তারিখে মানিক ভাই বললেন, তিনি কাগজ চালাবেন। আমাকে জানালেন টাকা যোগাড় হয়েছে। নিজেরও যা কিছু ছিল এই কাগজের জন্যই ব্যয় করতে লাগলেন। তারপর ইত্তেফাক প্রকাশিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধু যখন ছয়দফা আন্দোলন শুরু করেন তখন তাকে শুধু আটক নয়, ইত্তেফাক প্রেস বাজেয়াপ্ত করা হয়। মানিক মিয়া ও ইত্তেফাক সম্পর্কে বলতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেন ...... ‌"পাকিস্তানে বিশেষ করে পূর্ব বাংলার জনগণের জন্য ইত্তেফাক যা করেছে তা কোন খবরের কাগজই দাবি করতে পারে না। এদেশ থেকে বিরুদ্ধ রাজনীতি উঠে যেত যদি মানিক মিয়া এবং ইত্তেফাক না থাকত। ১৯৫৮ সালে মার্শাল ল জারির পর থেকে হাজার রকমের ঝুঁকি লইয়াও তিনি এদেশের মানুষের মনের কথা তুলে ধরেছেন।" 

ছয়দফার সফলতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেন.... "ছয়দফা আন্দোলন যে এত তাড়াতাড়ি গণ আন্দোলনে পরিনত হয়েছে এখানেও মানিক ভাইয়ের লেখনী না হলে তা সম্ভব হতো কিনা তাহা সন্দেহ। আমি যাহা কিছুই করিনা কেন তাহাই মানিক ভাইয়ের দোষ। সরকারের এটাই ভাবনা।" 

মানিক মিয়ার হঠাৎ মৃত্যু বঙ্গবন্ধু কে খুব নাড়া দিয়েছিল। তিনি মনে করতেন তাঁকে মেরে ফেলা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন....."সে মানিক ভাই আজ নেই। যদিও মৃত্যু সম্পর্কে আজো আমি সন্দিহান।আজো মনে পড়ে আমার সে রহস্যময়  চিঠির কথা। আপনারা রাওয়াল পিণ্ডি বা করাচী  আসবেন না। আপনাদের মেরে ফেলা হবে।"

প্রায় প্রতিদিনই ঘুম থেকে উঠে সকালে লুঙ্গি পড়েই আমি মানিক ভাইয়ের বাসায় চা খেতে যেতাম। সেদিন চা খাচ্ছি আর আলোচনা করছি দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে। হঠাৎ মানিক ভাই বললেন," পিন্ডি থেকে একটা চিঠি পেলাম। প্রেরকের ঠিকানা বলা নেই। তবে এতে বলা আছে আমি এবং আপনি যেন পিন্ডি বা করাচী না যাই।গেলেই আমাদের মেরে ফেলা হবে।"  তারপর হেসে তিনি নিজেই বললেন,আমাকে কে মারবে? আর মারবেই বা কেন? মারলে বরং আপনাকে ই মারতে পারে।" আমি বললাম, " তবু কি দরকার , যাওয়ার, না গেলেই কি নয় ,মানিক ভাই?"মানিক ভাই বললেন ... দেখেই আসিনা। তাছাড়া ওরাও খবর পাঠিয়েছে।দুএক দিনের মধ্যেই ফিরে আসব ইনশাল্লাহ।মানিক ভাই গেলেন কিন্তু ফিরে আসলেন নিষ্প্রাণ দেহে ।মনে হয় শহীদ সাহেব কে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে , পিন্ডি র ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে রহস্যজনক ভাবে ডেকে নিয়ে হয়তো মানিক ভাই কে হত্যা করা হয়েছে সেভাবেই।

   মাঝে মাঝে তাদের মধ্যে মতান্তরের কথা স্বীকার করে বঙ্গবন্ধু  লিখেছেন...."  আমার প্রতি মানিক ভাইর ভালবাসা ও আস্থা যে কত গভীর তা যেন তখন আরও স্পষ্ট ভাবে অনুভব করি।অথচ অনেকেই জানত না এ কথা।জানত না মানিক ভাই আমাকে কত ভালবাসতেন। তাই ক্ষণিকের বিভ্রমের মতো যখন আমাদের মধ্যে মান অভিমান দেখা দিয়েছে তখন অনেকেই গেছেন নিজ নিজ উদ্দেশ্যে মানিক ভাই কে প্ররোচিত করতে । কিন্তু তাদের নিরাশ হতে হয়েছে।আমার বিরুদ্ধে বলে যারা মানিক ভাই এর প্রিয় হতে গেছেন তাদের মধ্যে অনেক সম্মানিত ব্যক্তিকেও মানিক ভাই সোজাসুজি ঘর থেকে বের করে দিতে দ্বিধা করেন নি।

 ১৬ জুন ১৯৬৬ সালে যখন তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া কে জেলে নেয়া হয় তখন তাকে ১০ নং সেলে রাখা হয়। বঙ্গবন্ধুর ভাষায়..... " আমার মনে ভীষণ আঘাত লাগল খবরটায় ।এরা মানিক ভাইকেও ছাড়ল না? এরা কতদূর নেমে গেছে। পাকিস্তানের সাংবাদিকদের মধ্যে তার স্থান খুব উচ্চে।তার কলমের কাছে বালার খুব কম লেখকই দাড়াতে পারে। বিশেষ করে রাজনৈতিক সমালোচনার তুলনাই হয় না।তার লেখা "রাজনৈতিক মঞ্চ " পড়লে দুনিয়ার অনেক দেশের অবস্থা বুঝতে সহজ হয়।সাধারন লোকেরও তার লেখা বুঝতে কষ্ট হয় না। তাকে এক অর্থে শ্রেষ্ঠ কথা শিল্পী বলা যেতে পারে। তিনি সক্রিয় রাজনীতি করেন নাই।সত্য কথা বলতে কাহাকেও তিনি ছাড়েন না। আইয়ুব খান সাহেবও তাকে সমীহ করে চলতেন। তিনি মনে্য মধ্যে এক কথা আর মুখে আরেক কথা বলেন না।

মানিক মিয়া বঙ্গবন্ধু কে কতটা ভালবাসতেন তা বঙ্গবন্ধুর কথা থেকে বুঝতে পারা যায়।........" অনেক সময় আমার সাথে তার মতের অমিল হয়েছে। গালাগালি ও রাগারাগী করেছেন। কিন্তু অন্য কেউ আমাকে কিছু বললে তার আর রক্ষা নেই। ঝাঁপাইয়া পড়েন। আমাকে তিনি অত্যধিক স্নেহ করতেন।" 

বঙ্গবন্ধু মানিক মিয়া কে বড় ভাইয়ের মতো শ্রদ্ধা করতেন। মানিক মিয়াও বঙ্গবন্ধু কে যুক্তি পরামর্শ দিতেন, সঠিক পথ দেখাতেন। বুদ্ধি দিতেন। বঙ্গবন্ধুর ভাষায়......." আমি তাকে বড় ভাইয়ের মতো শ্রদ্ধা করি। কোন কিছু তে আমি সিদ্ধান্ত নিতে না পারলে তার কাছে ছুটে যাই । তিনি আমাকে সঠিক পথ দেখাইয়া দেন। সোহরাওয়ার্দী সাহেবের মৃত্যুর পর তার কাছ থেকেই বুদ্ধি পরামর্শ নিয়ে থাকি।" 

বঙ্গবন্ধু ও মানিক মিয়া সোহরাওয়ার্দী সাহেবের নেতৃত্ব মেনে চলতেন। অনেকেই সোহরাওয়ার্দী সাহেবের সাথে বেঈমানি করেছেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু ও মানিক মিয়া তা করেননি।আজীবন সোহরাওয়ার্দী র পাশে ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ভাষায়........" আমার দরকার হলে তার কাছে যাই পরামর্শের জন্য। তিনি কখনো গায়ে পড়ে পরামর্শ দিতে চেষ্টা করেন নাই।তার সাথে আমার মনের মিল আছে , থাকবে। পঁচিশ বছর যাবত সোহরাওয়ার্দী  সাহেবের নেতৃত্ব মেনে এসেছি দুজনে।অনেকো সোহরাওয়ার্দী সাহেবের সাথে বেঈমানি করেছেন। কিন্তু আমরা দুজন একদিনের জন্যও তার কাছ থেকে দূরে সরে যাই নাই।" 

 

এস ডি সুব্রত
কবি ও প্রাবন্ধিক
সুনামগঞ্জ, বাংলাদেশ

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top