সিডনী শুক্রবার, ৩০শে জুলাই ২০২১, ১৫ই শ্রাবণ ১৪২৮

মায়ের খোঁজে : ফারুক নওয়াজ


প্রকাশিত:
২১ জুন ২০২১ ১৪:৫৬

আপডেট:
২১ জুন ২০২১ ১৪:৫৯

 

সবুজ পাহাড়। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা ঢালুপথ এঁকেবেঁকে নেমে গেছে উত্তরের মহুয়া বনে। বনের মাঝের সরু পায়েচলা পথ। পথটা গিয়ে শেষ হয়েছে নীলহ্রদের শাপলাফোটা ঘাটে।
লোকে বলে পাখির ঘাট। হেমন্ত শেষ না হতেই দূরদেশের পাখিরা ডানামেলে উড়ে আসে এই হ্রদে। নানা রঙের, নানা নামের, নানা ডাকের হাজারো পাখি। বেশির ভাগ আসে  হাঁসজাতীয় পাখি। সারা শীত এরা এই হ্রদেই কাটিয়ে দেয়।
একেবারে জনবসতির বাইরে, এমন  নিরাপদ শিকারিমুক্ত হ্রদ দেশের আর কোথায় নেই। দিনভর পাখিরা জলে—ডাঙায় খাবার খুঁজে খুঁজে খায়, জলে শরীর ভেজায়, ডানা ঝাড়ে, ইচ্ছে হলে ডানা মেলে দূরে কোথায় ঘুরতে যায়। ক্লান্ত হলে হ্রদের মাঝখানের জেগে ওঠা চরে বিশ্রাম নেয়।
সন্ধ্যা নেমে এলে কিছুক্ষণের জন্য নীরবতা নেমে আসে হ্রদ জুড়ে। তবে রাত যত বাড়তে থাকে ওদের কলকাকলি আর ডানা ঝাড়ার শব্দ অনেক দূরের জনবসতিতে ভেসে যায়।  
দেশিপাখিরাও মিশে যায় বিদেশি অতিথিদের সঙ্গে। মধুর সখ্য গড়ে ওঠে ওদের মধ্যে।
কী এক নিবিড় বন্ধন। এই মায়ার বাঁধনে কিছু কিছু বিদেশি পাখি বাঁধা পড়ে আর ফিরতে চায় না নিজেদের দেশে। এদেশেই কাটিয়ে দেয় আরো কয়েক শীত। সোনালি ঠোঁটের সাদা—কালো ডানার একজোড়া সুন্দর হাঁস। তারাও পড়ে যায় সেই মমতার বাঁধনে।
ওদের সঙ্গীরা, যারা উড়ে এসেছিলো একসাথে শত নদী, বিল—ঝিল, হাওর—বাওর, বন—জনপদ, পাহাড়—সাগর পেছনে রেখে; তারা চলে গেছে। ওরা দুজনই শুধু এই নীলহ্রদ আর এদেশি পাখিবন্ধুদের ভালোবেসে থেকে গেল।
শীত গিয়ে গিয়ে বসন্ত এলো। দূরের মহুয়া বনে তখন মনকাড়া ফুলের মৌসুম। মহুয়ার মধুগন্ধ বাতাসে ভেসে আসে নীলহ্রদের পাখির ঘাটে।
অন্য পাখিদের সঙ্গে সোনালি ঠোঁটের বিদেশি হাঁসজোড়াও মহুয়াবনের টানে উড়ে যায় সেখানে। আবার সাঁঝ নামলে ডানায় শব্দ তুলে চলে আসে নীলহ্রদে।
এদেশে থাকতে পেরে সোনালি হাঁসদুটো ভারি খুশি।
কত কথা বলে ওরা, আনন্দে কত ডাকাডাকি করে, ডানা নেড়ে  কত যে মনের খুশিভাব প্রকাশ করে! তা নীলহ্রদের তিরতির ঢেউ আর অন্য পাখিরা জানে।  
তা বসন্ত গিয়ে গ্রীষ্ম এলো।
এরপর  বর্ষা শেষে শুভ্র শরত এলো। শরতের আকাশে রঙের মেঘ খেলা করে। হঠাত বৃষ্টি আসে টিপটিপ—রিমঝিম ছন্দ তুলে। আবার খানিক পর মিষ্টি রোদ ছড়িয়ে সাতরঙের সাঁকোর মতো অপরূপ রঙধনু ওঠে আকাশের মাঝ খানে। আহা এমন দৃশ্য দেখে মন ভরে যায়।
রাতে কী সুন্দর গোল চাঁদ ওঠে। ভোরে কোত্থেকে ভেসে আসে শিউলিফুলের মনকাড়া সুগন্ধ। বিদেশি হাঁসদুটোর মন যেনো এতো সৌরভ আর প্রকৃতির অপরূপ শোভা দেখে বিদেশী হাঁসদুটো আনন্দে নেচে ওঠে। আবেগে ভাসে যায়।
খুব ভালো আছে ওরা। খুশিতে সাঁতার কাটে ঝিলে। ডাকে অদ্ভুত মিস্টি গলায়। তা হলো তো অনেক দিন। এর মধ্যে হাঁস—মা তিনটে ডিম পাড়ল ঝিলপাড়ে ঢোলকলমির ঝোপে।  
ওরা দুজনি খুব খুশি যে অচিরেই ওদের ছানারা জন্মাবে। হাঁস—মা দিনভর ডিমে তা দেয়। বাবা—হাঁস বিলে—ঝিলে, ঝোপে—ঝাড়ে খোঁজে খড়—কুটো, আর খুদ—দানা, ছোট পোকামাকড়।
কারণ, বাচ্চারা জন্মালে ওদের ঠাণ্ডা যাতে না লাগে সেজন্য খড়—কুটো দিয়ে বাসাটা আরো গরম করতে হবে। আর ওদের উপযোগী খাবারও লাগবে। নরম—সুস্বাদু খাবার।
তা এক দিন—দু দিন—তিন দিন করে আরো কটা দিন গড়িয়ে গেলো। মা বলে কথা। বাবা হাঁস বাচ্চাদের জন্য যতকিছুই আনুক, মা বোঝে বাচ্চারা কি খেতে পছন্দ করবে।
তাই বাবা—হাঁসের সঙ্গে মা—হাঁসও সেদিন গেলো ঝিল পেরিয়ে দুবলার চড়ে। সেখানে পাখিশিশুদের উপযোগী রকমারি খাবার পাওয়া যায়।
গেল ওরা সূর্য ওঠার আগেই। যাওয়ার আগে মা—হাঁস ডিমগুলো শুকনো খড়—কুটো দিয়ে ঢেকে দিলো। আর বাবা—হাঁসকে বলল, বুঝলে, আজকেই মনে হয় আমাদের সোনার ছানারা পৃথিবীর আলো দেখতে পাবে। বাবা—হাঁস খুশিতে ডাকল বার—দুয়েক। এরপর বলল, শোনো, তবে তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে আজ। নইলে ওরা ডিম থেকে বের হয়ে আমাদের না দেখে ভড়কে যাবে।
মা—হাঁস পিক—পিক করে আনন্দে কি যেন বলল। তারপর ওরা দুলতে—দুলতে দুবলাবনের দিকে যাত্রা করল।
ভোরের আলোয় নীল হ্রদের চারদিক ঝিলকে উঠলো। চারদিকে পাখিদের কলকাকলি, হ্রদের তিরতির স্রোত রোদের ঝলকে চিকচিক করছে।  
সকাল পেরিয়ে এলো দুপুর। মাঝদুপুর হলো। এখনো হাঁস—দুটো ঘরে ফেরেনি। ওড়া জানে যে ওদের তিনটি ফুটফুটে ছানা ডিম থেকে বের হয়ে এদিক—ওদিক পিটপিট করে তাকাচ্ছে।
তা আর কতক্ষণ! ওরা ওদের মা—কে দেখতে পাচ্ছে না। খিদেও লেগেছে খুব। কী করে ওরা এখন? ভাবতে—ভাবতে ওরা ঘর ছেড়ে পাখির ঘাটের পথ ধরে হাঁটতে লাগল।
ওরা যেতে লাগল সেই দুবলা বনের দিকেই। ওদের মন বলছে ওদিকে ওদের মায়ের দেখা পেতে পারে।
তা হাঁস—ছানারা ছোট্ট—ছোট্ট পায়ে এগিয়ে চলেছে।
যেতে—যেতে যেতে—যেতে... হঠাত পথে একটা বিড়াল—মায়ের সঙ্গে দেখা। ওরা ভাবল বোধহয় এটাই তাদের মা। তাই সোনালি ঠোঁটের মাঝের হাঁস—ছানাটা চি—চি করে জানতে চাইলো, ওগো, তুমিই আমাদের মা বুঝি!
বিড়াল—মা মিউ—মিউ করে ঝারি দিয়ে উঠল, এই আমি হচ্ছি বাঘের মাসি বিড়াল। তোমরা হচ্ছো কোথাকার কোন হাঁসের ছানা। আমি কেন তমাদের মা হতে যাবো? আমার ছানারা নাদুশ—নুদুশ এবং সুন্দর দেখতে। একেবারে আমার মতোই। যাও ভাগো! হাঁস—ছানারা ভদ্র বেশ। তারা বলল, ক্ষমা করবেন, আমরা আমাদের মা—যে দেখতে কেমন তা জানি না।এরপর হাঁটতে—হাঁটতে পথে একটা কুকুর—মায়ের দেখা পেল। তাকে সাদা—কালোয় ছোপ—ছোপ হাঁস—ছানাতা বলল, এই যে, শোনো, তুমি কি আমাদের মা?
রেগে টং কুকুর মা। বলল, সাহস তো তোমাদের কম না দেখছি! আমি হচ্ছি শেয়ালের যম বাঘী কুকুর। আমার বাচ্চারা আমার মতোই সাহসী এবং দেখতে বড়সড়।


যাও এখান থেকেÑ পিচ্চি হাঁস—ছানারা। তোমাদের মা তোমাদের মতোই ডানাওলা এবং কণ্ঠস্বরও তোমাদের মতোÑ চিচি—প্যাকপ্যাক মার্কা।  
হাঁস—ছানারা বুঝে গেল ওদের মা ওদেরই মতো দেখতে এবং কথাবলার ঢং ওদেরই মতো।
এবার হাঁস—ছানারা ভুল করতে চায় না। তারা পথে দেখল একটা কাঠবেড়ালিকে। তাকে কিছুই জিগ্যেস করল না।
যেতে যেতে এরপর দেখল একটা হরিণ—মা আর তার দুটো ছানাকে। পেছনে পেছনে হাঁটা হাঁস—ছানাটা আস্তে—আস্তে বলল, ওটা আমাদের মা নয় তো! মাঝের ছানাটা ওকে বোঝালো, না, কক্ষনো না। আমাদের মা আমাদের মাতো। ওটা অন্য কোনো প্রাণী।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল আসি—আসি। নিকেল করা রোদে চারদিক কেমন সোনালি হয়ে উঠেছে। এমন সময় হাঁস—ছানারা দেখতে পেলো এক—জোড়া তাদের মতোই এবং দেখতে বড় দুটো প্রাণীকে। তারা এদিকেই আসছে। মুখে করে কীসব নিয়ে আসছে।
তাদের দেখে খুশিতে মাঝের ছানাটা চি—চি করে বলল, ওই যে আমাদের মা আসছে। মুখে করে বোধয় আমাদের জন্য মুখরোচক খাবার নিয়ে আসছে।
দুজনকে দেখছি, তাহলে কি দুজনই আমাদের মা? ডানপাশের ছানাটা প্রশ্ন করল।
বাম পাশের ছানাটা বলল, বোকা কোথাকার, মা কি দুজন হয়?
তবে অন্যটা কে? ডানপাশেরটা আবার জানতে চাইল।
মাঝের সুন্দর ছানাটা বলল, অন্যটা মনে হয় আমাদের বাবা।
ছানারা আর না হেঁটে পথের পাশে দাঁড়িয়ে থাকল।
হাঁস—মা আর হাঁস—বাবা প্রায় কাছাকাছি এসে গেছে। ছানারা দেখতে খুব ছোট বলে ওরা দূর থেকে আগে ওদের দেখতে পায়নি। কাছে আসতেই হাঁস—ছানারা চি—চি করে ডেকে উঠল। চি—চি শুনে মা—হাঁস আর বাবা—হাঁস এদিক—ওদিক তাকাতে লাগল। হাঁস—ছানারা ছুটে গিয়ে একসঙ্গে চেঁচিয়ে বলে উঠল, চিনেছি—চিনেছি তোমরাই আমাদের বাবা—মা।
আহ! আমাদের সোনামানিক, তোমরা তাহলে পৃথিবীর আলোতে এসে গেছো! হায়, তোমরা জন্ম নিয়েই আমাদের খুঁজতে বেরিয়েছো? যদি পথে কোনো দুষ্টু প্রাণী তোমাদের ধরে নিয়ে যেত! মা—হাঁসের আদুরে কথায় ছানারা তার ডানার নিচে ঢুকে পড়ল।
বাবা—হাঁস বলল, এসো, একজন আমার ডানায় চড়ে বসো। দুজন মায়ের ডানায় চড়ো। আমরা উড়তে পারি। খুব শিগ্রি বাসায় পৌঁছে যাবো।
একটা ছানাও বাবার ডানায় চড়তে চাইল না। তারা মাকে ছেড়ে যাবে না। বাবা—হাঁস কি আর করবে। বলল, তিনজনকে ডানায় নিয়ে উড়তে কষ্ট হবে তোমাদের মায়ের। মা—হাঁস বলল, কষ্ট হবে না। আমি ওদের মা। মা সব কষ্টই সহ্য করতে পারে। এসো আমার সোনামুখো ছানারা। চড়ে বসো আমার ডানায়। বাবা—হাঁস আগে—আগে উড়ে যাচ্ছে। আগে গিয়ে বাসাটা ছানাদের থাকার জন্য আরো আরামপ্রদ করতে হবে। আর মা—হাঁস পেছন—পেছন তিন ছানাকে নিয়ে উড়ছে। মা—হাঁসের ডানা কেমন এপাশ—ওপাশ করছে। কষ্ট হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু মুখে তার আনন্দের হাসি। ছানারাও খুশিতে চি—চি করেই চলেছে।
ওরা যাচ্ছে ওদের বাসায়। সুন্দর আরামের বিছানায় ওরা শোবে। ওদের জন্য অনেক সুস্বাদু খাবারের আয়োজন করেছে বাবা—মা।

সবাই ওদের দেখছে। গাংচিলরা ট্যাঁ—ট্যাঁ করে ডেকে ডেকে ওদের অভিনন্দন জানাচ্ছে। কালো লেজ—ঝুলঝুল ফিঙে, সবুজ সুঁইচোরা, লাল মাছরাঙা আর সাদা বকরা ওদের দেখে খুশিতে ডাকতে শুরু করেছে নিজেদের মতো করে।
ওরা একটু পরেই নিজেদের বাসায় চলে আসবে। কী মজা! ওরাও একদিন বড় হবে। ওদের ডাকে, পাখনার শব্দে নীল হ্রদের পানি তির—তির করে কাঁপবে।

(একটি বিদেশি গল্পের ছায়া অবলম্বনে) 

 



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top