সিডনী শুক্রবার, ৩০শে জুলাই ২০২১, ১৫ই শ্রাবণ ১৪২৮

কোরবানিতে মামুন সাহেব ও গরু : সত্যজিৎ বিশ্বাস


প্রকাশিত:
১৯ জুলাই ২০২১ ১৬:৩৪

আপডেট:
১৯ জুলাই ২০২১ ১৭:২৭

ছবিঃ : সত্যজিৎ বিশ্বাস

 

দিন দিন জিনিসপত্রের দাম যেভাবে বেড়ে চলেছে আজকাল আর কেউ বাজারমুখো হতে চায় না। ব্যাজার মুখো হয়েই থাকে। ল্যাপটপে বিভিন্ন জাতের গরুর দাম দেখে দম বন্ধ হয়ে যাবার আগেই মামুন সাহেব বারান্দায় ছুটে এলেন মুক্ত হাওয়ার আশায়। আকাশের দিকে তাঁকিয়ে মানুষ ছাড়া আর সব জিনিসের দামের আকাশ পাতাল ফারাকের কথা হাঁ হয়ে ভাবতে বসলেন।

তিনদিন পরেই কোরবানি ঈদ। যা আছে কপালে, বলে ভাবাভাবি বন্ধ করে মামুন সাহেব এবার ছুটলেন গাবতলী গরুর হাটে। অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা করে গরুর গায়ে হাত দিয়ে টিপেটুপে, দাঁত, শিং ভালো করে চেক করে দেখে, তেজি একটা গরু কিনে দড়ি ধরে টানতে টানতে বাড়ির গেটে এসে কলিংবেল চাপলেন। ফ্ল্যাটের দারোয়ান দুলু মিয়া গেট খুলতেই গরু শিং দিয়ে গুতিয়ে দিয়ে স্বাগত জানালো তাকে।

পাটকাঠির মতো সুঠাম শরীরটাকে লাফ দিয়ে সরে গিয়েও দুলু মিয়া নিজেকে পুরোপুরি বাঁচাতে পারল না। দুলতে দুলতে গিয়ে পড়ল গ্যারেজে রাখা এক মোটর সাইকেলের উপর। গুতা খাওয়া হাতের কব্জি ডলতে ডলতে বড় বড় চোখে গরুর দিকে তাকিয়ে বলল, স্যার এই জিনিস পাইলেন কই?

সারা পথ গরুর সাথে মোটামুটি যুদ্ধ করেই টেনে নিয়ে এসেছেন মামুন সাহেব। ভাগ্যিস গরু সামলানোর জন্য দুইজন লোক সাথে নিয়ে গিয়েছিলেন। নাহলে এ গরুকে একলা টেনে আনা তার কর্ম ছিল না। পাগলা গরু এই সামনে কোন মানুষ দেখে তেড়ে ওঠে তো ওই রাস্তায় অন্য গরুদের গুতিয়ে বসে। কী যে, যা তা একটা অবস্থা। বদমেজাজি গরুটার কাজ কারবার সওয়াও যায় না, আবার কিছু করাও যায় না। পাগলা গরু যদি আবার রেগেমেগে রাস্তায় কাউকে গুতিয়ে দেয়, তখন আবার আরেক ঝামেলায় পড়তে হবে। এ ভুবনে হায়, কেউ ঝামেলায় পড়তে চায়? কেউ চাইলেও অন্ততঃ মামুন সাহেব চায় না। চায় না বলেই অনেক কষ্টে পিঠে হাত বুলিয়ে, ঘাস-ভুষি গুলিয়ে খাওয়াতে খাওয়াতে সবাই মিলে গরুর গলার দড়ি ধরে টানতে টানতে নিয়ে এসেছে এ পর্যন্ত।

দুলু মিয়ার কথা শুনে মামুন সাহেবের মেজাজ গেল চড়ে।
- গরু পাইলাম কই মানে কী? কোরবানীর গরু কই পাওয়া যায়, জানো না? যাও, লিফটের সামনে গিয়ে লিফট খালি কর।
- কেন স্যার?
- কেন মানে? গরুটাকে আট তালায় নিতে হবে না?
- কন কী স্যার? এত বড় গ্যারেজ থাকতে গরু নিবেন আট তালায়!
- হুম নিবো। তোমার কোনো সমস্যা?
- আট তালায় এই গরু রাখবেন কই?
- কেন, ফ্ল্যাটের বারান্দায়।
- স্যার এইসব কী কন?
- কেন? গ্রামে কোরবানি দিলে গরু কই রাখে শুনি? বাড়ির উঠানে রাখে না?
- জ্বি স্যার, তা তো রাখেই।
- তো শহরের উঠান মানে কি? বারান্দা। বারান্দায় রাখলে এত অবাক হবার কিছু আছে?
- জ্বী স্যার। মানে, জী না স্যার।

মামুন সাহেব তার ক্ষেপা গরুটাকে অনেক কসরত করে লিফটে উঠিয়ে নিয়ে ফ্ল্যাটের কলিংবেল চাপলেন। বেশ কয়েকবার চাপার পর বুঝতে পারলেন, চাপাচাপি করে লাভ নেই। ভেতরে কেউ নেই। হয়ত কোনো কাজে বাইরে গেছে সবাই। পকেট থেকে মেইনগেটের ডুপ্লিকেট চাবি বের করে প্রথমে নিজে ভেতরে ঢুকলেন। তারপর ঘরের নতুন সদস্যকে ঢোকালেন। বারান্দায় গ্রিলের সাথে বেঁধে রাখলেন দেখে নতুন সদস্য গরুটাও যেন অবাক হয়ে গেল।

মামুন সাহেবের স্ত্রী গিয়েছিলেন কোচিং থেকে ছেলেটাকে নিয়ে আসতে। ঘরে ফিরে ড্রয়িংরুমে বসে টিভির রিমোট নিয়ে বসলেন। জীবন মানে জি বাংলা চ্যানেল অন হতে না হতেই মাআআআ বলে ছেলের চিৎকার শুনলেন। তার পরেই ‘ধপাস’ একটা শব্দ। কী হয়েছে বলে শব্দের উৎসের সন্ধানে বারান্দায় এসে মিসেস লাকি যেন ভূত দেখলেন। নিজেকে সামলাতে না পেরে এক পা বাড়াতেই সদ্য ত্যাগ করা গরুর গোবরে স্লিপ করে তিনিও জ্ঞান হারালেন।

ক্ষেপা গরুটাকে হাট থেকে টেনে আনতে হুজ্জত কম হয়নি বলে মামুন সাহেব গিয়েছিলেন গোছল করতে। গোছল শেষে বারান্দায় টাওয়াল মেলে দিতে এসে দেখেন, তার একমাত্র স্ত্রী আর একমাত্র সন্তান অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে বারান্দায়। তাকে দেখে গরুটা ডেকে উঠল, হাম্বাআআ। এ দৃশ্য দেখে নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন মামুন সাহেব। হিন্দী সিরিয়াল হলে পরপর তিনবার বজ্রপাতের আওয়াজ হতো।

বিবিসি-এর বিশেষ সংবাদ দাতা দারোয়ান দুলুর কল্যানে গরুর ফ্ল্যাটে ওঠার খবর চাউড় হতে বেশি সময় লাগল না। ঘন্টাখানেকের মধ্যে আশেপাশের ফ্ল্যাটের প্রায় জনা পঞ্চাশেক প্রতিবেশী যেন হুমড়ি খেল বাসায়। যাদের মুখও কোনোদিন দেখেননি, সেই সব ভাই-ভাবিরা তাদের বাচ্চাদের সহ চলে এলো বারান্দায় গিয়ে গরুর সাথে সেলফি তুলবে বলে।

মামুন সাহেব কী করবেন, না করবেন বুঝতে না পেরে বেডরুমে ঢুকে দেখেন তাঁর স্ত্রী চোখ মুছতে মুছতে ব্যাগ গোছাচ্ছেন। স্বামীকে দেখে দাউদাউ করে জ্বলে উঠলেন।
- তুমি গরু নিয়ে ফ্ল্যাটে উঠলে কোন আক্কেলে শুনি?
- কেন, তোমাকে বলেই তো গরু কিনতে গরুর হাটে গেলাম।
- তাই বলে গরুটাকে বাসার ভেতর নিয়ে আসবে? গরুটা তোমার কোন জন্মের পরমাত্মীয় হয়?
- কী সব, যা তা বলছো ?
- যা তা নয়, যা তাই বলছি। এখন এই গরু কি নিচে নিয়ে যাবে, কি যাবে না, তাই বলো?
- আহা, এমন করছো কেন? প্লিজ ঠান্ডা হও। আমার কথা তো শোনো।
- কোনো কথা শোনাশুনি নাই। আধাঘন্টা ধরে সাবান ডলে ডলে গোছল করে এসেছি। তবুও মনে হচ্ছে গায়ে গোবরের গন্ধ। বাচ্চাটার তো মনে হয় জ্বর এসে গেছে ভয়ে। এ বাসায় হয় গরু থাকবে না হয় আমরা থাকবো। এখন তুমি ঠিক করো কে থাকবে?
- কোরবানির আগ পর্যন্ত গরু এখানেই থাকবে, দেয়ালের দিকে তাকিয়ে জোর গলায় বললেন মামুন সাহেব।
- কী! এটাই তোমার শেষ কথা?

মামুন সাহেব শেষ কথা বলার জন্য মুখ খোলার আগেই ঘরে ঢুকলো কাজের বুয়া। আম্মা, ফ্ল্যাট মালিক কমিটির চেয়ারম্যান সাহেব আইছে। আপনাগো বুলায়।

মামুন সাহেব তার স্ত্রীকে নিয়ে ড্রয়িং রুমে ঢুকে দেখেন, ফ্ল্যাট মালিক কমিটির চেয়ারম্যান সাহেবই না, পুরো কমিটির প্রায় সবাই চলে এসেছেন। কেউ কেউ বারান্দার দিকে উঁকি দিয়ে বিভিন্ন এংগেলে সেলফি তোলার চেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছেন।

মামুন সাহেবকে দেখে সবাই চোখ বড় বড় করে তাকালেন। একটু কাশি দিয়ে চেয়ারম্যান সাহেবই কথা শুরু করলেন।
- আসসালামু আলাইকুম মামুন সাহেব।
- ওয়াআলাইকুমুসসালাম। কী ব্যাপার?
- ইয়ে মানে ঈদ তো প্রায় এসে গেল তাই সবাই মিলে আপনার সাথে একটু কথা বলতে এলাম।
- এটা খুব ভালো করেছেন। ওগো শুনেছ, সবাইকে চা, নাস্তা কিছু দাও।
- না, না কিছু দিতে হবে না। শুনলাম আপনি নাকি ফ্ল্যাটে কোরবানির গরু নিয়ে এসেছেন।
- জী ঠিকই শুনেছেন।
- যে গরম পড়েছে, এর মধ্যে মাথা ঠিক রাখা আসলেই কঠিন। তা আপনার বাসার এসিগুলো কাজ করছে তো।
- কাজ করবে না কেন? কিন্তু হঠাৎ এসির কথা কেন?
- না মানে এমন গরমেই তো মানুষের ব্রেন আউট হয়ে যায়, তাই বললাম।
- আপনার কি ধারনা, আমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে? আমি পাগল?
- না, না ঠিক তা বলছি না।
- এই যে ১৬৫০ স্কয়ার ফুটের বাসায় বসে আপনারা কথা বলছেন, এটা কিন্তু সম্পূর্ন নিজের পরিশ্রমের অর্জিত টাকা দিয়ে কেনা। একটা টাকাও লোন নিয়ে না। মাথা খারাপ মানুষের পক্ষে কি এটা সম্ভব? আপনারা কোরবানির গরু ফ্ল্যাটে নিয়ে এসেছি বলে আমাকে পাগল ভাবছেন তো? আচ্ছা আপনারাই বলুন, কোরবানি সম্পর্কে কি বলা হয়েছে? বলা হয়নি, প্রিয় বস্তুকে কোরবানি দিতে? কেউ কী আমাকে বোঝাবেন, যে গরুটাকে আজ কিনে গ্যারেজের ফেলে রেখে একবারও নিজের হাতে কিছু না খাইয়ে, পিঠে হাত বুলিয়ে না দিয়ে, কাল কোরবানি দিয়ে দেবো, সেটা প্রিয় হয় কী করে? যে গরুটাকে একটু পর পর দেখব না, যার প্রতি আমার কোন মায়া জন্মাবে না, সে কী প্রিয় হয়? সেই গরুটাকে মাত্র তিন দিনের জন্যও নিজের কাছাকাছি রাখি, তবে কী আমি পাগল?

হঠাৎ কী একটা কাজের কথা মনে পড়ে যাওয়ায় চেয়ারম্যান সাহেব লিফটের দিকে রওনা দিলেন। তার পিছু পিছু গোটা দল। ঈদের আর মোটে তিনদিন বাকি। কাজ বাদ দিয়ে ফাও বসে থাকার সময় আছে কারো?

 

সত্যজিৎ বিশ্বাস
রম্য লেখক ও শিশু সাহিত্যিক
* রম্য বিভাগীয় সম্পাদক- কিশোর বাংলা
* নির্বাহী সম্পাদক- কিশোরকাল
* কন্ট্রিবিউটার – মাসিক স্যাটায়ার কার্টুন ম্যাগাজিন ‘উন্মাদ’, জাতীয় দৈনিক যুগান্তর ‘বিচ্ছু’, দৈনিক ইত্তেফাক ‘ঠাট্টা’।

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top