সিডনী বৃহঃস্পতিবার, ২৩শে সেপ্টেম্বর ২০২১, ৮ই আশ্বিন ১৪২৮

নীল পাহাড়ের চূড়ায় (পর্ব বাইশ) : শাহান আরা জাকির পারুল 


প্রকাশিত:
২৬ জুলাই ২০২১ ১২:৫৬

আপডেট:
২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১ ২৩:১৭

 

বীরাঙ্গনাকে বিয়ে করেছে মহান বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রকৌশলী রাতুল চৌধুরী। একজন ধর্ষিতা নারীকে সামাজিক মর্যাদায় গ্রহণ করা কি চাট্টিখানি কথা। কিন্তু কেন রাতুল এর এই মহতি ইচ্ছের সাধন!

এতো এতো রক্তের বিনিময়ে যে বাংলাদেশ স্বাধীন হলো, সেখানেতো দিনরাত ধর্ষণ এর শিকার হচ্ছে শিশু থেকে মায়ের বয়সি রমণীরাও! চলন্ত বাসের মধ্যে ধর্ষিত হচ্ছে নারী! ধর্ষণের শিকার হচ্ছে প্রবাসী নারী কর্মী!

বিদেশ থেকে সন্তান নিয়ে ফেরা এইসব নারীদের দুঃসহ জীবনকাহিনী মর্মান্তিক! এইসব নারী কর্মীদের অনেকেই অন্তঃসত্ত্বা হয়ে বা সন্তান নিয়ে দেশে ফিরতে বাধ্য হন। পিতৃপরিচয় ও অনেক ক্ষেত্রে মা ছাড়া এইসব সন্তানেরা বেড়ে উঠছে।

 

এমনই ক'জন সন্তান নিয়ে ফেরা নারীদের দুঃসহ জীবন কাহিনী তুলে ধরে নীলিমা! একজন নারীকর্মী ছয় মাস বয়সী সন্তানকে বিদেশে অন্যের হাতে তুলে দিয়ে এসেছেন। এই জীবনে তিনি আর তাঁর সন্তানের মুখ দেখতে পাবেন না, এমন শর্তে রাজি হয়ে নিজের সন্তানকে দিয়ে দেওয়া এই নারী বললেন, ‘আমি ছেলেরে না দিয়া কী করুম? ওরে নিয়া কই যামু? স্বামী তালাক দিলে বাড়িতে মায়ের কাছে দুই ছেলেরে রাইখ্যা বিদেশ গেছিলাম। এখন ফিরছি সৌদিতে যে বাড়িতে কাজ করতাম ওই বাসার মালিকের ছেলের সন্তান নিয়া। এই কথা তো কাউরে বলাও যাইতো না।’

অবশেষে,আদালতের মাধ্যমে এই নারী,তার  শিশুটিকে অন্য একটি পরিবারের কাছে তুলে দিয়েছেন। কিন্তু সে মা!

তাই ধর্ষণের ফলে জন্ম নেওয়া এই সন্তানের প্রতি মায়া জন্মে গেছে তাঁর।

এই নারী,ধর্ষণও নির্যাতনের বিচার পাননি। দেশে ফিরে এক অনিশ্চিত পথে পা বাড়িয়ে হাঁটছেন তিনি!

সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশ থেকে গৃহকর্মীসহ বিভিন্ন কাজের জন্য যাওয়া নারীদের অনেকেই সন্তান পেটে নিয়ে বা সন্তান কোলে নিয়ে দেশে ফিরতে বাধ্য হন। দেশে ফেরার পর পিতৃপরিচয় ছাড়া এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মা ছাড়া এই সন্তানেরা বেড়ে উঠছেন।

মানিকগঞ্জের এক কিশোরী জর্ডানে কাজের জন্য গিয়ে বাংলাদেশি দালালের খপ্পরে পড়ে। পরে সে যৌনকাজ করতে বাধ্য হয়। এই কিশোরী মা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ছয় মাসের সন্তান পেটে নিয়ে দেশে ফিরেছিল। সম্প্রতি এই নারীর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, সন্তানের বয়স প্রায় তিন বছর হতে চলেছে। এই মা এখন আর কিশোরী নেই। বললেন, ‘বিদেশ গিয়া কোনো লাভ তো হইলই না, মাঝখান থেকে জীবনটাই শেষ হইয়্যা গেল।’

বিদেশফেরত এই নারীরা সরকারিভাবে সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেই বিদেশ গিয়েছিলেন। কিন্তু ফিরে আসার পর সরকার, রিক্রুটিং এজেন্সি কেউ এই নারীদের দায় নিচ্ছে না। দেশে ফিরে কোনো কোনো নারী আত্মহত্যা করারও চেষ্টা করেছেন। এলাকায় জানাজানির পর কেউ কেউ বাসা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছেন।

এতো গেলো বিদেশে ধর্ষিত হওয়ার ঘটনা ! কিন্তু এই স্বাধীন বাংলাদেশেও ঘটছে অনেক বিকৃত ঘটনা!আর এখানে জড়িত আছে মসজিদের হুজুর কিংবা মাদ্রাসার ভন্ড হুজুররাও!

এইতো কিছুদিন আগে ঘটে যাওয়া একটি ধর্ষণ কেস সারাদেশে তুমুল আলোড়িত হয়েছিল!

পত্রিকায় হেডলাইন ছিল সেদিন ----

মাদ্রাসা ছাত্রীর মৃত্যু:

মাদ্রাসা শিক্ষার্থীকে দগ্ধ অবস্থায় প্রথমে ফেনী সদর হাসপাতালে পরে ঢাকায় আনা হয়। ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান!

শরীরের ৮০ শতাংশ দগ্ধ হবার পর ঢাকায় নিয়ে আসার পথে তার ভাইয়ের মোবাইলে রেকর্ড করা এক অডিওতে তাকে বলতে শোনা গেছে- "শিক্ষক আমার গায়ে হাত দিয়েছে, শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত আমি এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করবো"।

এই ছাত্রী মারা যাওয়ার পরে বাংলাদেশে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। 

প্রথমে তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছিল এবং তার শরীরের ৮০ শতাংশই আগুনে পুড়ে গিয়েছিল বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছিলেন। 

মাদ্রাসায় আলিম পরীক্ষা দিতে গেলে কৌশলে ভিকটিম এর লোকজন মেয়েটিকে ছাদে ডেকে নিয়ে গিয়ে তার গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়।

ছাত্রীটির ভাই বিবিসি বাংলাকে বলেন, তার বোন কয়েকদিন আগে তার মাদ্রাসার অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির মামলা করেছিল, সেই ঘটনার জেরে ওই অধ্যক্ষের পক্ষের দুষ্কৃতীরা তার বোনকে পুড়িয়ে মারার জন্য কৌশলে তাকে ডেকে নিয়ে সাড়া শরীরে আগুন লাগিয়ে

দেয় ।

মেয়েটি আত্মরক্ষার জন্য দৌড়ে নিচে চলে আসে এবং রাস্তার লোকের সহায়তায়

স্থানীয় হাসপাতালে নেয়া হয়! পরবর্তীতে ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে হেরে যান এই নিষ্পাপ কোমল মেয়েটি!

মুক্তিযুদ্ধে ধর্ষিত নারীরা বীরাঙ্গনা উপাধি পেয়েছে!

পালিয়েছে নরপশুর দল!

কিন্তু স্বাধীন দেশের মাটিতে নারীদের উপর এ কেমন বর্বরতা!

নীলিমা আপনমনে ভাবতে থাকে এসব!

দুদিন ধরে নিতুর সাথে কোন কথাই হচ্ছেনা নীলিমার !

অস্থিরতা খুব বেশি বেড়ে গেছে ! একমাত্র ছেলে আনন্দ সেই যে চলে গেলো কানাডায় স্কলারশিপ

পেয়ে!দেখতে দেখতে পাঁচ  বছর হলো! আসি আসি করে আর আসতেই চায়না আনন্দ!পড়া লেখা শেষ করে ভালো চাকরিতে ঢুকেছে!ফোনে কথা হয়!

কিসের একটা কঠিন অভিমান ছিল আনন্দের মনে !

নীলিমা জিজ্ঞেস করতে খুব ভয় পেতো!রাতুল ও বারণ করতো নীলিমাকে!

কিন্তু সেই রাতুলকেই একদিন বিদেশ যাওয়ার আগে আনন্দ এক কঠিন প্রশ্ন করে বসলো-----বাবা, দাদু কিংবা দাদীমা কেউ একজন কি পাঠান বংশোদ্ভূত ছিল!

হটাৎ এমন প্রশ্নে চমকে ওঠে রাতুল ও নীলিমা দুজনেই! এ সব কেমন প্রশ্ন করছো বাবা !

এমনিতেই করি নাই বাবা!

আমার খুব কৌতহল বলতে পারো ! সাড়া জীবন স্কুল ,কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে এই প্রশ্নটি অনেক বেশি শুনতে হয়েছেতো!

নীলিমা কাঁপতে থাকে ! রাতুল স্তব্দ হয়ে যায়!

কেউই কোন উত্তর দিতে পারেনা!

আসলেই আনন্দের গড়নটা ছিল ঐসব হানাদার পাঠানদের মতই!হয়তো কোন এক পাঠান পাকসেনার ঔরসজাত সন্তান সে!

নীলিমার বুকের উপর দিয়ে রোলার চলে!বীভৎস স্মৃতি বিষ কাঁকড়ার মতো আঁকড়ে ধরে!

আনন্দ আপনমনে ব্যাগ ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র গোছাতে গোছাতে এক কাপ চা চায় মায়ের কাছে!

নীলিমা যেন হাপ্ ছেড়ে বাঁচে ! ওড়নায় মুখ চেপে দৌড়ে যায় কিচেন এ!

এর তিনদিন পর চলে যায় আনন্দ বিদেশে লেখাপড়ার জন্য!তার একবছর পরেই রাতুল স্ট্রোক করে! ফেরানো যায়না আর!

(চলবে)

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top