সিডনী বৃহঃস্পতিবার, ২১শে অক্টোবর ২০২১, ৬ই কার্তিক ১৪২৮

শিল্পীর তুলিতে চিরকালের বঙ্গবন্ধু : ফারুক নওয়াজ


প্রকাশিত:
২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১৪:২৭

আপডেট:
২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১৪:৩০

 

‘জীবনটা এত ছোট কেন?’- এমন প্রশ্নের কোনো জবাব নেই।
তবুও জীবন একটু দীর্ঘ হয় কারো। যেমন রবীন্দ্রনাথ। পেয়েছিলেন আশি বছরের উজ্জ্বল জীবন। প্রতিভাকে ছড়িয়ে দিতে পেরেছিলেন পূর্ণ আভায়। মানুষকে দিয়েছেন অনেক। আলোকিত করেছেন বাঙালির আত্মপরিচয়ের আকাশ। মানবতা ও মনুষ্যত্বের জয়গান শুনিয়েছেন বিশ্বকে।
কিন্তু অপেক্ষাকৃত ছোট্ট জীবনও কখনো কখনো দীর্ঘজীবনকে ছাড়িয়ে যায়। ঠিক ফুলের মতো। সে ফোটে অন্যকে সৌরভ ও সৌন্দর্যে মোহিত করতে। তারপর ঝরে যায়, শুকিয়ে যায়। তা যাক। সে যে মানুষকে কিছুক্ষণের জন্য আনন্দ দিতে পেরেছে এটাই তার কৃতিত্ব। কিন্তু আমাদের বঙ্গবন্ধু, স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান ব্যতিক্রম। জীবনটা ছোটই তো! পঞ্চান্ন বছর ছয় মাসও পূর্ণ হয়নি। এ-বয়স কী বয়স? মানুষ এ-বয়সে নিজেকে গুছিয়ে নেয়ারও সময় পায় না। নিজের ভেতরের সৃষ্টিশীল আলোটাকে ভালো করে ছড়াতেও পারে না।
বঙ্গবন্ধু এই ছোট্ট জীবনটাকে কত বড় করে তুলেছিলেন, যা কল্পনারও অতীত। জন্ম নিয়েছিলেন ব্রিটিশশাসিত ভারতবর্ষে। এই বাংলার এক অখ্যাত গ্রাম টুঙ্গিপাড়ায়। লেখাপড়ার শুরু গ্রামের বাঁশ-বেড়ার পাঠশালায়। হাইস্কুলে ভর্তি হয়ে দেখলেন বর্ষায় ফাটা ছাদ দিয়ে জল পড়ছে। এই ফাটা ছাদের কারণেই শেখ মুজিবুর রহমান ওরফে খোকা নামের ফুটবলপ্রিয় ছাত্রটিকে নতুন করে জেনে নিলেন শিক্ষক এবং সহপাঠীরা। শুধু তারাই নয়, খোদ অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক আর মন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীও। তাঁরা এক সফরে এসে ওই স্কুলটা দেখতে গেলেন। দেখে চলে যাচ্ছেন, এমন সময় এক ছাত্র তাঁদের পথ-রোধ করে দাঁড়াল। ওরা বিস্মিত হলেন, ‘কী চাও তুমি?’ ‘আমাদের স্কুলের ছাদ ফেটে গেছে। এটার সংস্কার করে দিতে হবে। নইলে আমাদের পড়াশুনা শিকেয় উঠবে।’ এবার তাঁরা অবাক হলেন ছাত্রটির সাহস দেখে। নিজের জন্য নয়, তার চাওয়া স্কুলের জন্য, পড়াশুনার জন্য। শেরে বাংলা তার দিকে একটু তাকিয়ে বললেন. ‘হবে!’ আর সোহরাওয়ার্দী ছাত্রটিকে চিনতে পেরেছিলেন একটু বেশিই। বুঝতে পেরেছিলেন সে যে-সে নয়, তার মধ্যে অসাধারণ আলো আছে, চিরন্তন শিখা আছে, আছে আগুন। এই আগুন দিয়ে সে জাতির অনন্ত আঁধার ঘোচাবে ঠিকই।
তিনি জেনে নিলেন তার নামধাম। আর বললেন, সময়মতো তাঁর সঙ্গে দেখা করতে।
না, মধ্যে অনেক সময় চলে গেছে। অত বড় নেতার সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছে হয়নি তাঁর। কেন দেখা করবে? তাঁর তো কোনোকিছুর দরকার নেই। আবার মাঝখানে ছাত্রটি অসুস্থ হয়ে পড়ে। বেরিবেরি, আর চোখের গ্লুকোমা রোগ। পড়াশুনো গেল থেমে। বেশ ক’বছর গেল এভাবে। সুস্থ হয়ে আবার পড়াশুনো। পাস করলেন ম্যাট্রিক, এরপর কলকাতায় গেলেন। ভর্তি হলেন ইসলামিয়া কলেজে।
খোকা, এখন শেখ মুজিবুর রহমান। সংক্ষেপে শেখ মুজিব। ছাত্রনেতা। ব্রিটিশ আমল। দেশে নানা সমস্যা। নাই স্বাধীনতা। স্বাধীন স্বদেশভ‚মির জন্য লড়াই হয়ে আসছে দীর্ঘকাল ধরে। মহাত্মা গান্ধীসহ বড় বড় নেতা আন্দোলনে আছেন। ছাত্রনেতা মুজিবও ছাত্রদের নিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। এ-সময় নতুন করে তাঁর পরিচয় হয় ডাকসাইটে নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে।
এরপর অনেক বড় ইতিহাস। শেখ মুজিব থেকে বঙ্গবন্ধু। তারপর স্বাধীন বাংলাদেশের জাতির পিতা। বিশ্বের এক মহান নেতা হয়ে ওঠেন তিনি। তাঁর জীবনের দৈর্ঘ্য বয়স দিয়ে হিসেব করলে ভুল হবে।
তাঁর অবদান, মহান সংগ্রামী জীবন... এ-জীবন হাজার বছর বয়সের সমান। সেই জীবনের ইতিহাস লিখে শেষ হয় না। কত ঘটনা, কত গল্প তাঁকে নিয়ে। এ-জন্য কবি তাঁকে নিয়ে কবিতা লিখে চলেছেন। গান লিখে চলেছেন। গল্পকার গল্প লিখে চলেছেন, তাঁকে নিয়ে উপন্যাস, চলচ্চিত্র কতকিছু হচ্ছে, হয়ে যাবে বাঙালি যতদিন থাকবে। তাঁর জীবনের নানা সময়ের তোলা আলোকচিত্র দেখে আমরা অবাক হই। কে তুলেছে এত ছবি? তুলে রেখেছে মানুষ। কারণ তিনি মানুষের আপনজন, মাটি-মানুষের নেতা। এমন নেতা হাজার বছরে একটা জন্মায় না। মানুষ এটা বুঝেছিল তাই তাঁর নানা মুহূর্তের ছবি তুলে রেখেছিল।
আর শিল্পীরা, যাঁরা রংতুলির জাদুকর... তাঁরাও কি প্রিয়নেতার ছবি না-এঁকে বসে থাকতে পারেন? আজ দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বঙ্গবন্ধুর পোট্রেট, স্কেচ। তাঁর জীবনের নানা মুহূর্তের চিত্র এঁকে চলেছেন রঙতুলির মানুষেরা। সেইসব ছবি আমাদের নতুন প্রজন্মকে নিরন্তর প্রেরণা জুগিয়ে চলেছে।

সবার ছবি আঁকা যায় না
না, সবার ছবি আঁকা যায় না। আঁকা যায়, তবে তাঁকে কাছে বসিয়ে তাকে দেখে-দেখে শিল্পী তার স্কেচ, মুখাবয়ব আঁকতে পারেন। এমনটি দেখা যায় একুশের বইমেলায়, এখানে-ওখানে। আঁকা যায় মানুষের ছবি। মানুষ মানে আমজনতা। তখন একজন বিশেষ মানুষ নয়, কমন মানুষ হয়ে যায় সেই ছবির মানুষগুলো। হ্যাঁ, মহান মানুষদের ছবি, যে মানুষেরা মানুষের অনুপ্রেরণার উৎস। যাঁরা শিল্পীর হৃদয়ে গেঁথে থাকেন। তাঁদের ছবি সহজেই আঁকা যায়। তেমন মানুষ জগতে কম জন্মান। রবীন্দ্রনাথের ছবি শিল্পী খচখচ করে এঁকে দিতে পারেন। নজরুল আঁকতেও বেগ পেতে হয় না। হ্যাঁ, মহাত্মা গান্ধী, শেক্সপীয়র, ইয়াসির আরাফাত, নেলসন ম্যান্ডেলাও আঁকা যায়। তেমনি আঁকা যায় আমাদের বঙ্গবন্ধুকেও। আমাদের শিল্পীরা খুব সহজে আঁকতে পারেন বঙ্গবন্ধুকে। কারণ, এ-ছবি হৃদয়ে গেঁথে আছে। এমনকি আমাদের নবীন বা শিশুশিল্পীরাও বঙ্গবন্ধুর ছবি এঁকে ফেলতে পারে চোখ বুজে। এ-ছবি যে বাঙালি জাতিসত্তার পরিচয়। আমাদের ইতিহাসে, পতাকায়, অবারিত সবুজে, নদীর উত্তাল ঢেউয়ে... সর্বত্র এই ছবি মনের চোখে দেখা যায়। সেই জন্য শিল্পী সহজেই এ-ছবি আঁকতে পারেন।

বঙ্গবন্ধুপ্রাণ চিত্রকরেরা
বাঙালি শিল্পীমাত্রই বঙ্গবন্ধুপ্রাণ চিত্রকর। কে আঁকেননি বঙ্গবন্ধুর ছবি? বঙ্গবন্ধুর সারাজীবন আমাদের চিত্রকরেদের তুলির ছোঁয়ায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে। আগেই বলেছি বঙ্গবন্ধুর আয়ুষ্কাল ছিল মাত্র ৫৫ বছর ৫
মাস ২৫ দিন। অদীর্ঘ জীবন। এই সামান্য সময়ের জীবনকে তিনি কাজের মধ্য দিয়ে, ত্যাগের মধ্য দিয়ে, দেশপ্রেমের মধ্য দিয়ে, সাহস ও সততার মধ্য দিয়ে... অমর-অজেয় করে তুলেছেন তিনি।
তারপরও কথা, কিছু শিল্পীর তুলিতে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠেন বঙ্গবন্ধু। যেন বঙ্গবন্ধুকে আঁকতেই তাঁদের তুলি হেসে ওঠে। এমন এক তুলির জাদুকর হাশেম খান। বঙ্গবন্ধুর ছবি মানেই যেন হাশেম খানের ছবি। তিনি বঙ্গবন্ধুর স্কেচ এঁকেছেন অসংখ্য। অসংখ্য বঙ্গবন্ধু-বিষয়ক বইয়ের প্রচ্ছদ এঁকেছেন। শুধু প্রবন্ধ এবং ইতিহাস-জীবনীই নয়, বঙ্গবন্ধু আমাদের সৃজনশীল সাহিত্যের বড় অংশজুড়ে বিরাজ করে আছেন। গল্প-উপন্যাস, কবিতা, শিশুসাহিত্য... সব শাখাতেই বঙ্গবন্ধু আছেন। আমাদের কবির হৃদয়ের আবেগ বঙ্গবন্ধু, আমাদের সঙ্গীতের অন্তরা-সঞ্চারির সুরের ঝঙ্কার বঙ্গবন্ধু। আর আমাদের নাটক-চলচ্চিত্রের সংলাপ-স্পন্দনেও বঙ্গবন্ধু সাহস ও দেশপ্রেমের প্রতীক হয়ে আছেন। সাহিত্যের সব শাখাতেই শিল্পীদের অংশগ্রহণ থাকে বলেই তাঁদের আঁকতে হয় বঙ্গবন্ধুর ছবি। প্রচ্ছদে, ইনারে, বইয়ের ভেতরের প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠায় ইলাস্ট্রেশনও আঁকতে হয় তাঁদের। হাশেম খান ছাড়াও বঙ্গবন্ধুর সেরা-সেরা ছবি এঁকেছেন কাইয়ুম চৌধুরী, রফিকুন নবী, বীরেন সোম, ফরিদা জামান, শেখ আফজাল, রণজিৎ দাস প্রমুখ।

আরো যাঁরা বঙ্গবন্ধুর ছবি, স্কেচ, গল্প-কবিতার ইলাস্ট্রেশন নিরন্তর এঁকে চলেছেন, তাঁদের নামের তালিকা অনেক দীর্ঘ। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন সমরজিৎ রায় চৌধুরী, সৈয়দ ইকবাল, আজিজুর রহমান, শামসুদ্দোহা, রেজাউন নবী, সামিনা নাফিজ, সুশান্ত অধিকারী, আতিয়া ইসলাম এ্যানি, রবিউল ইসলাম, ধ্রুব এষ, রব্বানী শামীম, আলপ্তগীন তুষার, সাফিন ওমর, আব্দুল মোমেন মিল্টন, কামালুদ্দিন, বিশ্বজিৎ গোস্বামী, রজত, এস কে মেহেদী কামাল, সোহাগ পারভেজ, শাহজাহান আহমেদ বিকাশ প্রমুখ। আর বঙ্গবন্ধুর জীবনশেষের সিঁড়িতে লুটিয়ে থাকা সেই নিথর পবিত্র শব্দদেহটি এঁকেছেন শিল্পী শাহাবুদ্দিন। যে ছবিটি দেখামাত্র যে কোনো মানুষ বেদনাস্নাত হয়ে ওঠে, অশ্রুসজল হয়ে ওঠে দুই চোখ। স্বাধীনতার মার্চ এলে, বিজয়ের ডিসেম্বর এলে, ভাষার ফেব্রুয়ারি এলে কিংবা শোকের আগস্ট এলে দেশজুড়ে নানা আয়োজনের মধ্যে থাকে বাঙালির বীরত্ব ও আত্মত্যাগের ইতিহাসের চিত্রকর্ম-প্রদর্শনী। আর সেই প্রদর্শনীর পুরোটা জুড়েই থাকে চিরকালের বঙ্গবন্ধু। কারণ, বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ এক ও অভিন্ন অনুষঙ্গ।
সব শেষে বলব, যতকাল বাংলাদেশ থাকবে, বিজয়ী বাঙালির লাল-সবুজ পতাকা থাকবে, মধুমতি-ধানসিঁড়ি পদ্মা-মেঘনা গড়াই-কর্ণফুলী-সুরমা-কুশিয়ারা থাকবে; ততদিন বঙ্গবন্ধু থাকবেন। থাকবে এদেশের কবি, গান-কবিতা, সাহিত্য-শিল্প। আমাদের কবি-সাহিত্যিকরা নিরন্তর লিখে যাবেন বঙ্গবন্ধুর অমর কীর্তিগাথা আর চিত্রকরেরা এঁকে যাবেন মহাজীবন বঙ্গবন্ধুর প্রাণোজ্জ্বল, সাহসে সমুজ্জ্বল, সংগ্রামে দুর্বার, দেশপ্রেমে প্রদীপ্ত মুখচ্ছবি আর তাঁর অনন্য জীবনচিত্র।

 



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top