সিডনী শুক্রবার, ২২শে অক্টোবর ২০২১, ৬ই কার্তিক ১৪২৮

হৃদমাঝারে : সায়ন্তনী পূততুন্ড


প্রকাশিত:
১১ অক্টোবর ২০২১ ২০:০২

আপডেট:
২২ অক্টোবর ২০২১ ০০:০১

ছবিঃ সায়ন্তনী পূততুন্ড

 

১.
সকালের নরম আলো তখন এসে পড়েছে কাচের জানলার ওপ্রান্তে। সূর্যের তাপ এখনও তেমন প্রখর হয়নি। নরম সোনালি আভা ঠিকরে পড়ছে চতুর্দিকে। গাঢ় সবুজের গায়ে হাল্কা সোনার রেখা টেনে স্নিগ্ধ রোদ ঝকমক করছে গাছের পাতায় পাতায়। ভোরের দিকে সামান্য বৃষ্টি হয়েছিল। ছোট ছোট জলবিন্দু এখনও চিকমিক করে উঠছে নরম ঘাসের গালিচায়। সদ্য প্রস্ফুটিত গোলাপের পাপড়িতে ফোঁটা ফোঁটা শীকরবিন্দু হীরের কুঁচির মত দ্যুতি ছড়াচ্ছে। সব মিলিয়ে প্রকৃতি এখন বড় লাজুক। তার আলোয় নিষ্পাপ কুমারীর সলজ্জ পবিত্র হাসি। তীব্র দহনকারী প্রখরতা নেই।
স্বনামধন্য শিল্পপতি ঋতুরাজ চট্টোপাধ্যায় কোলের ওপরে রাখা কতগুলো ফর্মে পরপর অভ্যস্ত হাতে সাইন করছিলেন। শেষ কাগজটায় স্বাক্ষর করে দিয়ে চোখ তুলে বাইরের জানলার দিকে তাকালেন। খুব ইচ্ছে করছিল এই সোনালি রোদের উষ্ণ আভা গোটা দেহে মেখে নিতে। এই বাহান্ন বছরের জীবনের অধিকাংশটাই তো শুধু মিটিঙে, বিজনেস ট্রিপে, পার্টিতে, প্রোজেক্টে আর কোম্পানির উন্নতিপ্রকল্পেই গেল! সেন্ট্রাল এসির ঝিমঝিমে ঠান্ডায়, দামি সোলার কন্ট্রোল গ্লাসে মোড়া রাজকীয় অট্টালিকাতে, আপাদমস্তক এয়ারকভিশন্ড গাড়িতে, এয়ার কন্ডিশন্ড অফিসের চিলড বদ্ধ কেবিনে অশ্রুত এক সতর্কবাণী ঘোষিত হয় – ‘তফাৎ যাও! এটা কর্পোরেট ওয়ার্ল্ড! এখানে অমলকান্তিদের জায়গা নেই!’ অথচ এখন তার বড় রোদ্দুর ছুঁতে ইচ্ছে করছে!
‘গুড মর্নিং স্যার’।
একটা সুপরিচিত মিষ্টি কণ্ঠস্বরে সম্বিত ফিরল ঋতুরাজের। তাকিয়ে দেখলেন, তার ব্যক্তিগত নার্স, অ্যাগনেস জনসন হাতে একটা ট্রে নিয়ে ঘরে ঢুকছে। ‘আ্যাগনেস’ শব্দটার অর্থ পবিত্রতা। বলতে বাধা নেই সেদিক দিয়ে সিস্টার অ্যাগনেস সার্থকনামা! অদ্ভূত একটা পবিত্রতা তার চেহারার মধ্যে প্রকট! একমাথা সোনালি চুল উঁচু খোঁপা করে বাঁধা থাকলেও দু একটা থোকা কানের লতির পাশ ঘেঁষে থাকে, আইভরির মত গায়ের রঙ, উজ্জ্বল নীল চোখে একই সঙ্গে আকাশের প্রশান্তি ও সমুদ্রের গভীরতা! ভদ্রমহিলার বয়েস চুয়াল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ তো হবেই। কিন্ত এখনও অসম্ভব সুন্দরী! চেহারার বাঁধুনি অটুট!
অথচ এই অতুল সৌন্দর্য দর্শকের চোখে বা হৃদয়ে জ্বালার সৃষ্টি করে না। আ্যাগিকে দেখলেই প্রথমে ম্যাডোনার কথা মনে পড়ে! শিশু ঈশ্বরপুত্রকে কোলে নিয়ে কুমারী মা! আর সে যতই নীলনয়না, স্বর্ণকেশী হোক্‌ -- ঋতুরাজের মনে পড়ে যায় নিজের মাকে। তেমনই দুধে আলতা রঙ! বিশেষ করে সেই দৃষ্টি! সেই স্পর্শ! আজও অনুভব করতে পারেন সেই মমতামাখা ছোঁওয়া!...
তিনি মৃদু হাসলেন – ‘ভেরি গুড মর্নিং আ্যাগি’।
অ্যাগনেস হাতের ট্রে টা বেডসাইড টেবিলে নামিয়ে রাখল। তারপর তার কোলের ওপরে ছড়ানো কাগজপত্রের দিকে তাকিয়ে ইংরেজিতে বলল – ‘ওগুলো কীসের পেপার্স্‌ স্যার? আপনি ফের অফিসওয়ার্ক শুরু করেছেন!’
ঋতুরাজ হেসে ফেললেন – ‘না না। অফিসের কাগজপত্র নয়। ডোনেশনের পেপারস্’।
অ্যাগি প্রাত্যহিক নিয়মমতোই তার পালস চেক করল। ওর হাসিমাখা নিশ্চিন্ত মুখই বলে দিল যে পালস রেট নর্মাল। এবার ব্লাড প্রেশার চেক করার যন্ত্রপাতি বের করতে করতে বলল – ‘কী ডোনেট করছেন?’
‘অরগ্যানস্!’ হাসিমুখেই জবাব দেন শিল্পপতি – ‘হার্টটা আর ডোনেট করা যাবে না। তবে চোখ, কিডনি, লিভার, লাংস্‌ - এটসেট্রা ডোনেট করছি। আমি মরার পর তো আর এগুলো কোনও কাজে আসবে না। তাই যদি অন্য কারোর কাজে লাগে তো মন্দ কী!’
অ্যাগি স্মিত হেসে বলে – ‘ভেরি নোবল ডিসিশন’।
ঋতুরাজ তার দিকে ঘোর লাগা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বললেন – ‘না। এই ডিসিশনটা আমি নিজে থেকে নিইনি। তুমি আমায় নিতে বাধ্য করেছ। ইউ আর মাই আইডল অ্যাগি!’
‘আমি! একটা সাধারণ নার্স! আপনার আইডল! ইম্পসিবল!’
‘কে বলল তুমি সাধারণ! যে মানুষটা তার ব্যক্তিগত শোক-দুঃখের উর্ধ্বে উঠে সমাজ কল্যাণের কথা ভাবতে পারে সে কোনভাবেই সাধারণ নয়’। ঋতুরাজের কণ্ঠে মুগ্ধতা ও আবেগ – ‘যে মা তার একমাত্র সন্তানের মৃত্যুর কিছুক্ষণের মধ্যেই তার অর্গ্যান ডোনেট করার মত একটা দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে পারে-সে কী করে সাধারণ হয় অ্যাগি? এইখানেই যে তুমি আমার ইন্সপিরেশন হয়ে দাঁড়িয়ে! আমার পথপ্রদর্শক!’
অ্যাগির মুখের হাসিটা ম্লান হয়ে যায়। সে একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছে। ঋতুরাজ অপ্রস্তুত হলেন। আাগনেসকে তিনি দুঃখ দিতে চাননি। ওর মুখেই শুনেছিলেন যে তার একমাত্র ছেলে, কুঁড়ি বছরের যুবক রবার্ট একটা মারাত্মক বাইক অ্যাক্সিডেন্টে মারা গিয়েছে। অকুস্থলেই মারা গিয়েছিল সে। চিকিৎসার বিন্দুমাত্রও সুযোগ দেয়নি। অ্যাগনেস সেই শোকার্ত অবস্থাতেও একটা দ্রুত অথচ কঠিন ডিসিশন নিতে পেরেছিল। সে নিজের মৃত ছেলের সমস্ত অর্গ্যান ডোনেট করে দিয়েছিল।
এই ঘটনাটা শোনার পর থেকেই ঋতুরাজের মাথায় অর্গ্যান ডোনেশনের চিন্তাটা আসে। এবং সেই মতন সমস্ত ব্যবস্থাও করে ফেলেছেন তিনি। বেঁচে থাকতে তো সমাজের কোনও উপকারে লাগলেন না। মৃত্যুর পরে যদি কারোর উপকার হয়!
অ্যাগির মুখে বিষন্নতাটা তখনও লেগে ছিল। ধাতস্থ হতে একটু সময় লাগল। প্রেশার মাপা হয়ে গিয়েছিল। যন্ত্রপাতি সরিয়ে রাখতে রাখতে বলল – ‘পারফেক্ট। বি পি একদম নর্মাল। এবার ব্রেকফাস্ট করা যাক?’
‘আজ ব্রেকফাস্ট কী এনেছ?’
অ্যাগনেস, তথা অ্যাগি জানায় – ‘ফ্রুটস, বিস্কিটস্‌ আ্যান্ড ওটমিল’।
ঋতুরাজ নাক সিটকালেন – ‘ওফ্‌! নট এগেইন! এতদিন ধরে তো তাই-ই খাইয়ে চলেছ! কতগুলো পেঁপে, আপেল, বেদানা, শশার হচপচ! আমার পেটটাকে যে ফ্রুট গার্ডেন বানিয়ে ছাড়লে! তার সঙ্গে কতগুলো ক্রিমক্র্যাকার বিস্কিট! ওটমিল! এটা ব্রেকফাস্ট! নো ব্রেড-বাটার, নো এগ, নো বেকন, নো সসেজ! ছ্যাঃ!’
আ্যাগি মিষ্টি হেসে ট্রে টা টেবিলের ওপর রাখল। তারপর এগিয়ে এসে রোগীর বুকের ওপর হাত রাখে! তার হাত যেন ঋতুরাজের হৃৎপিন্ড স্পর্শ করেছে। ভীষণ প্রশান্তি, ভীষণ আরাম বোধ করলেন তিনি। অ্যাগি তার বুকে আলতো করে হাত বোলাতে বোলাতে ইংরেজিতে বলল – ‘আমার আপত্তি নেই। কিন্তু আপনার হার্ট আপত্তি করতে পারে’।
'ড্যাম্‌ ইওর হার্ট!’
যতই মুখে ‘হার্ট'কে 'ড্যাম্‌ বলুন, ঋতুরাজ নিজেও জানেন এখন থেকে আর ডিম, বেকন, ব্রেড, বাটার চলবে না। চলবে না তার প্রিয় স্কচ ও সিগারেটের ব্র্যান্ড! কিছুদিন আগে হৃদযন্ত্র একেবারেই জবাব দিয়ে দিয়েছিল। ডাক্তাররা অনেক আগেই সাবধান করেছিলেন। কিন্তু ঋতুরাজ পাত্তা দেননি! ডাক্তারদের সতর্কবাণীকে ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে পান, ভোজন, ধূমপান – লেট নাইট সব এক নাগাড়ে চালিয়ে গিয়েছিলেন।
অতঃপর হৃদয় পুরোপুরি স্ট্রাইক করে বসল। বাঁচার আশা ছিল না! বেঙ্গালুরুর তিরুপতি হসপিটালের বিখ্যাত কার্ডিয়োলজিস্ট ও সার্জেন ডঃ প্যাট্রিক জয়প্রকাশ স্বামীনাথনের হাতযশে এবারের মত বেঁচে গেলেন! কিন্তু তার নিজস্ব হার্টটির বদলে অন্য একটি হার্ট বসাতে হল – যাকে এক কথায় বলে হার্ট ট্রান্সপ্লান্টেশন! সচরাচর বিপজ্জনক এই অপারেশনের সাফল্য অনেকটাই কপালের জোরের ওপর নির্ভর করে। তাই সার্জারির পরও বিপদসীমার মধ্যে ছিলেন ঋতুরাজ। বেশ কিছুদিন যমে-মানুষে টানাটানিও চলল। তার অতিবড় বন্ধুও ভাবতে পারেননি যে এই বিপদ কাটিয়ে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরবেন এই বিজনেস টাইকুন!
কিন্ত শেষমেষ তিনি ফিরলেন!
‘প্লিজ’। ফর্কে একটুকরো ফল গেঁথে ঋতুরাজের মুখের কাছে ধরেছে আ্যাগি। সে বাংলাভাষাটা অল্প বিস্তর বুঝলেও বলতে পারে না। স্নিগ্ধ হেসে ইংরেজিতেই বলল – ‘এখন এটা খেয়ে নিন্‌। লাঞ্চে আপনার ফেভারিট ডিশ দেব’।
‘ফেভারিট ডিশ?’ সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকালেন ঋতুরাজ।
অ্যাগি অনেক ভেবেচিন্তে বাংলা শব্দটা উচ্চারণ করে – ‘খিচড়ি!’
‘শেষে খি-চু-ড়ি!’ ছদ্মহতাশার ভঙ্গি করেছেন তিনি – ‘আমি ভাবলাম ‘বিরিয়ানি’ বলবে! তোমার খিচুড়ি মানে তো চালে, ডালে সেদ্ধ! নুন নেই, তেল নেই, ঘি নেই! এককথায় অখাদ্য!’
অ্যাগি হাসতে হাসতেই জবাব দেয় – ‘এখন ঐ অখাদ্য জিনিসই খেতে হবে। ইন কেস অব ইনডাইজেশন, বাঘও ঘাস খেতে বাধ্য হয়। হোপ, ইউ নো দ্যাট! স্বাস্থ্যের সঙ্গে বাঘকেও কম্প্রোমাইজ করতে হয়। আমরা তো মানুষ!’
কী যুক্তি! বাঘের পেট খারাপ হলে তাকেও ঘাস খেতে হয়! তাই ঋতুরাজকেও এখন এই বিরক্তিকর ফলগুলোকে গিলতে হবে! অগত্যা তিনি বিনাবাক্যব্যয়ে টুকটুক করে ফলের টুকরোগুলোকে মুখে চালান করতে লাগলেন। বলা ভালো, কোনরকমে গিলছেন। যত তাড়াতাড়ি ফলের প্লেটটা শেষ হয়, ততই মঙ্গল! এই ফল খেতে খেতেই বোধহয় কৃষ্ণ অতিষ্ঠ হয়ে গীতায় পই পই করে বলে গিয়েছেন – ‘মা ফলেষু কদাচন!’ কিন্তু একা ফলেই কি রক্ষে আছে? সঙ্গে আবার কতগুলো কাঠের মত ক্রিমক্র্যাকার বিস্কুট! ওটমিল! অসহা!
অ্যাগি ততক্ষণে টুকটুক করে তার মাথার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। আড়চোখে দেখলেন, তার চোখ বোঁজা। ঠোঁটদুটো অল্প অল্প নড়ছে। ঋতুরাজ জানেন, ও এখন প্রার্থনা করছে! তার আরোগ্যলাভ ও সুস্বাস্থ্যের জন্য ঈশ্বরের কাছে আবেদন জানাচ্ছে।
এই কাজটা অ্যাগি একদম শুরু থেকেই করে আসছে। তখন ঋতুরাজের অবস্থাও তেমন ভালো ছিল না। এতটাই দুর্বল হয়ে গিয়েছিলেন যে বিছানায় উঠে বসতেও পারতেন না। বেশি কথা বললে ক্লান্ত হয়ে পড়তেন! একটা ভীষণ অশান্তি মনের মধ্যে ঘুরপাক খেয়ে মরত। মনে হত, আর কোনওদিন সুস্থ, সবল হয়ে উঠতে পারবেন না। যতদিন বেঁচে থাকবেন, এই পঙ্গু শরীরটাকেই বোঝার মত টেনে যেতে হবে। নিজের এ অক্ষম ভবিষ্যতের কথা কল্পনা করে ক্রমাগতই হতাশ হয়ে পড়ছিলেন। মনে হচ্ছিল, এমনভাবে বেঁচে থেকে লাভ কী!
তার এ বিক্ষিপ্ত মনকে কেউ শান্ত করতে পারেনি। তার স্ত্রী নিবেদিতা, মেয়ে অদিতি বারবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে। ঋতুরাজের এখন মনে হয়, আসলে ওরা কেউ আন্তরিক ভাবে চেষ্টা করেনি। করেছিল একমাত্র আ্যাগি! কাজে বহাল হওয়ার ঠিক পরদিনই সকালে রোগীর হতাশ, পান্ডুর মুখের দিকে তাকিয়ে বিনম্র ভঙ্গিতে বলেছিল – ‘যদি আপনার আপত্তি না থাকে, তবে আমি কি আপনার জন্য ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করতে পারি?’
বিস্মিত হয়েছিলেন খতুরাজ। মুগ্ধও বটে! কেউ তার জন্য প্রার্থনা করতে চায়! এতদিন এত ঝড় ঝাপ্টা গেল! কই, কেউ তো কখনও তার জন্য প্রার্থনা করেনি! নিবেদিতা আধুনিকা। সে পার্টিতে যায়, শপিঙে যায়, পার্লারে যায় – কিন্তু মন্দিরে যেতে তাকে কখনও দেখেননি ঋতুরাজ! বাড়িতে বিরাট ঠাকুরঘর আছে। একমাত্র মা ছাড়া আর কেউ সেখানে কখনও ঢোকেনি! আর মায়ের মৃত্যুর পর নিয়মরক্ষার্থে একজন ব্রাহ্মণ পুরোহিতকে রেখেছেন তিনি। সেই ব্রাহ্মণই পুজো আচ্চা করেন। এ বাড়ির আর কেউ ঠাকুরঘরের ত্রিসীমানায়ও যায় না! বোধহয় ওরা কেউ ঈশ্বরবিশ্বাসী নয়!
সেদিন অ্যাগির কথা অদ্ভুত লেগেছিল তার। তবু একটু অম্লরসাক্ত স্বরে বলেছিলেন – ‘আমি তো হিন্দু। বাইবেলে কি কাজ হবে সিস্টার?’
অ্যাগি স্মিত হেসে বলে – ‘ঈশ্বরকে ডাকার জন্য কোনও ধর্মগ্রন্থের দরকার নেই স্যার। তবে আপনার সন্তুষ্টির জন্য আমি গীতা পাঠও করতে পারি’।
‘গীতা!’ আবার একটা বিস্ময়ের আঘাত। ঋতুরাজ অবাক হয়ে বলেন – ‘তুমি গীতা পড়তে পারো? সংস্কৃত জানো?’
‘জানি কি না দেখে নিন’। তেমনই শান্ত, স্মিত জবাব অ্যাগনেসের।
সেদিনই এই মহিলাকে ওর অসামান্যা মনে হয়েছিল। মনে পড়ে গিয়েছিল নিজের মায়ের কথা। ছোটবেলায় অসুস্থ হয়ে পড়লে মা দেবমূর্তির সামনে ঠায় বসে প্রার্থনা করতেন। অসুস্থ, কাতর সন্তানের মাথায় ছুঁইয়ে দিতেন আশীর্বাদি ফুল। মা চলে যাওয়ার পর ‘প্রার্থনা’ নামক বস্তুটি তার জীবনে আর আসেনি। বহুযুগ পর আবার ফিরে এল! তাও একজন অপরিচিতার হাত ধরে!
অনুমতি দিয়েছিলেন তিনি। তার মাথার কাছে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করেছিল অ্যাগনেস! প্রার্থনার সময় ওর মুখে ফুটে উঠেছিল এক অনাবিল আলো! সে আলো বিশ্বাসের! সে আলো করুণাময়ের প্রতি অকুণ্ঠ আস্থার! আাগনেসের সেই শান্ত, বিশ্বাসী মুখ এক যন্ত্রণাজর্জরিত, বিক্ষিপ্ত হৃদয়কে শান্তি দিয়েছিল। ভীষণ শীতল প্রশান্তি অনুভব করেছিল তার হৃদয়।
আজও আ্যাগনেসের মুখে সেই প্রশান্ত আলো দীপ্ত হয়ে উঠেছে। ঋতুরাজ একদৃষ্টে তাকিয়েছিলেন সেই অপূর্ব সমাহিত মুখের দিকে। তার বুকের মধ্যে কী যেন এক তীব্র অনুভূতি মোচড় দিয়ে উঠছে। ঐ পবিত্র মুখে কী ছিল তা তিনি জানেন না। কিন্তু যখন সে ওর কাছে আসে, যখন ওকে স্পর্শ করে তখন গোটা দেহ যেন বুভুক্ষু হয়ে ওঠে।
এমন অনুভূতি তার আগে কখনও হয়নি। কী যে তার অন্তহীন চাওয়া, তা আজও বুঝে উঠতে পারেননি ঋতুরাজ! শুধু মনে হয়, এ স্পর্শ তার চেনা! এ মানুষটা তার অপরিচিত নয়! জন্মজন্মান্তরের পরমাত্মীয় সে!
তিনি অস্ফুটে ডাকলেন – ‘আ্যাগি!’
আ্যাগি প্রার্থনা শেষ করে চোখ মেলল। মধুর হেসে বলল – ‘বলুন স্যার’।
‘আমার বুকে একটু হাত বুলিয়ে দেবে?’
এরকম অদ্ভুত আবদারে অ্যাগনেস একটু বিস্মিত হয়। কিন্তু মুখে প্রকাশ করে না। বরং সন্নেহে ঋতুরাজের পাশে বসে তার বুকে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিতে থাকে। ঋতুরাজের মনে হল ভীষণ প্রশান্তি অ্যাগির হাত ছুঁয়ে তার হৃদয়ে চুঁইয়ে পড়ছে। চতুর্দিক যেন নিমেষে নিস্তব্ধ হয়ে এল। স্থিত, শান্ত নৈঃশব্দের মধ্যে একমাত্র সরব তার হৃৎপিন্ড। সে যেন আ্যাগির স্পর্শের উত্তর দিয়ে চলেছে তার নিজের ভাষায় – ‘লাব...ডুব...লাব...ডুব...!’
আরামে চোখ বুঁজলেন ঋতুরাজ। আ্যাগি পিছন ফিরে বসেছিল। তাই দুজনের কেউই দেখতে পেল না যে ঠিক তখনই দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন ঋতুরাজের স্ত্রী নিবেদিতা! একদৃষ্টে ভেতরের দৃশ্যটা দেখছেন!
বলাই বাহুল্য, তার দৃষ্টিতে বরফ ছিল না! আগুন ছিল।

২.
‘তুই তো দিন দিন গ্ল্যামারাস হয়ে উঠছিস্‌ ঋতু! রহস্যটা কী?’
শিল্পপতি ঋতুরাজ চট্টোপাধ্যায়ের বাল্যবন্ধু, কলকাতা গোয়েন্দা বিভাগের জাঁদরেল কর্তা, অসীম দত্ত বন্ধুর দিকে হাসতে হাসতেই প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিলেন – লোকে বলে নতুন করে প্রেমে ট্রেমে পড়লে নাকি মানুষের গ্ল্যামার বাড়ে। তেমন কোনও হৃদয়ঘটিত কেস নয় আশা করি!’
‘ডোন্ট টক্‌ জিবারিশ অসীম!’ একটু লজ্জা পেয়েই বললেন ঋতুরাজ – এই বুড়ো বয়েসে এসব উপসর্গ থেকে দূরে থাকাই ভালো’।
‘বুড়ো হবে তোর বাপ!’ অসীম সজোরে হেসে ওঠেন – ইনফ্যাক্ট এই বয়েসটাই মেয়েদের পেছনে মাথাখারাপ করার জন্য একদম পার্ফেক্ট! আ্যান্ড লুক আ্যাট ইউ ম্যান! ইউ আর ব্লাশিং! আমি একটা আলটপকা ঠাট্টা করলাম, আর তোর গাল দুটো পুরো আপেলের মত টুকটুকে হয়ে গেল! সিরিয়াসলি, আছে না কি কেউ? এনি মিস্ট্রিগার্ল?’
হেসে বন্ধুর প্রশ্নটাকে উড়িয়ে দিলেন তিনি। অন্য কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, তার আগেই নিবেদিতা বলে উঠলেন – ‘জানেন না? মিস্ট্রিগার্লের নাম অ্যাগনেস জনসন!’
‘অ্যাগনেস জনসন!’ অসীম বিস্মিত হয়ে তাকালেন নিবেদিতার দিকে – ‘ইউ মিন, ঋতু’র পার্সোনাল নার্স? ঐ যার কথা আগের দিন শুনেছিলাম? স্বচক্ষে এখনও দেখা হয়নি অবশ্য!’
‘দেখলে চোখ ফেরাতে পারবেন না’। নিবেদিতা ব্যঙ্গবঙ্কিম কন্ঠে বললেন – ‘এই সব নারীদের জন্যই কালিদাস অনেক ‘দিল্‌তোড়’ শ্লোক লিখে গিয়েছেন! তণপ্তকাঞ্চনবর্ণা, নীল-নয়না, মদিরাক্ষী, স্বর্ণকেশী! আপনার বন্ধু যেদিন থেকে দেখেছেন, সেদিন থেকে শুধু তাকেই দেখে চলেছেন! আমরা কেউ আর ওঁর চোখে পড়ছি না!’
‘ওহ! রিয়েলি!’ নিবেদিতার খোঁচাটা অবশ্য বুঝলেন না অসীম। ঋতুরাজের মুখ গন্তীর হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেদিকে লক্ষ্য না করেই বললেন – ‘তাহলে তো তাঁকে একবার দেখতেই হচ্ছে! কোথায় তিনি? যাঁকে দেখে দেখে ঋতুর গ্ল্যামার বাড়ছে, তাঁকে একবার আমিও দেখে নিই! হয়তো শ্রীমতীর এক দৃষ্টিপাতেই এই 'জাম্বুবানসদৃশ কায়া’ ‘মহেন্দ্রনিন্দিত কান্তি'তে রূপান্তরিত হয়ে যাবে!’
‘জাস্ট শাট আপ!’ বিরক্তিতিক্ত মুখে বললেন ঋতুরাজ – ‘শি ইজ আ ড্যাম্‌ গুড নার্স! দ্যাট্স্‌ অল্‌। আজ আমার যতটা উন্নতি তুই দেখছিস্‌, গোটাটাই অ্যাগির ক্রেডিট! ও যেভাবে প্রাণ দিয়ে যত্ন করে তাতে আমি কেন, যে কোনও পেশেন্টের স্পিডি রিকভারি হবে’।
‘হ্যাঁ’। নিবেদিতার কণ্ঠে ঝাঁঝ – ‘সবটাই তো আ্যাগিই করে! আমরা কেউ কিছুই করি না!’
‘ইয়েস। দ্যাট্স্‌ দ্য ট্রুথ! কিছুই করো না তোমরা!’ ঋতুরাজ তীব্র, নিষ্ঠুর দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালেন – ‘আমি কী খাবার খাই, কী ডায়েট নেওয়া উচিত, কী মেডিসিন নিই, খাওয়ার আগে না পরে, ক’টা ওষুধ সারাদিনে ঠিক কখন কখন খেতে হয়, কত মিনিট হাঁটি – জানো তোমরা কেউ? ওসব তো বাদই দাও, কখনও আমার এতটুকু কেয়ার করেছ? তার কণ্ঠস্বরে রাগ ও উত্তেজনা প্রকট – আমি যখন আমি শয্যাশায়ী ছিলাম – তখন আমার সমস্ত নোংরা, সমস্ত বর্জ্য কে দিনের পর দিন পরিষ্কার করেছে? তুমি তো ও ঘরে ঢুকতেই ঘেন্না পেতে! অদিতি ও রাস্তাই মাড়াত না! অ্যাগি সেসব হাসিমুখে করে গিয়েছে! কোনওদিন তার এতটুকু বিরক্তি দেখিনি। ওর কাছে আমি যেন একটা ছোট্ট সদ্যোজাত শিশু ছিলাম! বিছানায় শুয়ে শুয়ে বোর হয়ে যেতাম! ছটফট করতাম! তখন তুমি তোমার বুটিক আর এন জি ও নিয়ে বিজি! আর অদিতি বন্ধু, পার্টি, ডিস্ক নিয়ে! তখন আমায় সঙ্গ কে দিয়েছে! ইয়েস, ঐ অ্যাগনেস জনসন! তার জন্যই আজ আমি এতটা সুস্থ হয়ে উঠেছি। একটা শয্যাশায়ী হাড়, চামড়া সর্বস্ব দেহকে সে এতটা যত করতে পেরেছে যে আজ অসীম আমার মধ্যে গ্ল্যামার দেখছে! এই ম্যাজিকের মেইন ম্যাজিশিয়ান অ্যাগনেস জনসন। অস্বীকার করতে পারো?’
ঋতুরাজ উত্তেজিত হয়ে উঠেছিলেন। তার এই শারীরীক অবস্থায় উত্তেজনা ঠিক নয়। তাই একটা মোক্ষম জবাব দিতে গিয়েও চেপে গেলেন নিবেদিতা। শুধু তার দু চোখে আগুন ঝলসে ঝলসে উঠতে লাগল।
‘আমার কপাল!’ ছদ্ম দীর্ঘশ্বাস ফেললেন অসীম। ব্যাপারটাকে হাল্কা করে দেওয়ার জন্য লঘু স্বরে বললেন – ‘একটা দুটো ব্লকেজও হার্টে বাঁধাতে পারলাম না যে এমন সুন্দরী নার্সের সেবা পাব’।
‘কপাল নয় বস্’। ঋতুরাজেরও উত্তেজনার পারদ নেমে এসেছিল। এবার তিনি একটা শ্বাস টেনে মৃদু হাসলেন – ‘এটা হার্টের ব্যাপার। তুই বুঝবি না। পুলিসরা চিরকালই হার্টলেস হয়’।
ডাকসাইটে আই পি এস অফিসার তার জাঁদরেল গোঁফে একটা মোচড় দিলেন – ‘দিলি তো পিন ফুটিয়ে! অবশ্য কথাটা ঠিকই বলেছিস্‌। কাজের ক্ষেত্রে আমাদের একটু ‘হার্টলেস’ বদনাম আছে। এই তো দ্যাখ্‌, গত কয়েকমাস ধরে এক সুন্দরীর পিছনে ধাওয়া করছি। কিন্তু সুন্দরী আমাদের ভয়ে ধরা দেওয়া তো দূর, তার ‘টিকি’... থুড়ি, ‘বেণী’ টুকুও দেখাচ্ছে না!’
কথাটা শুনে ভারি মজা পেলেন ঋতুরাজ। গোয়েন্দাবিভাগের বড় কর্তা চোর-ডাকাত ফেলে শেষে কি না এক সুন্দরীর পেছনে দৌড়চ্ছে! সজোরে হেসে উঠে বললেন – ‘ইন্টারেস্টিং! নিজের খানদানি বদনখানা তাকে একবার দেখিয়েছিলি বুঝি?’
‘সে সুযোগ আর হল কই! তেনার খানদানি বদনট্রুকুও এখনও দেখিনি, নিজেরটা আর দেখাব কী!’ অসীমের মুখ গন্তীর হল – ‘তবে ব্যাপারটা লাইটলি নিস্‌ না। সারাজীবনে অনেক মার্ডারার, অনেক চোর-বাটপাড়, হিস্ট্রি-শিটার দেখেছি। কিন্তু এরকম কেস মাইরি আর দেখিনি! শালা, এক মহিলা পুরো গোটা পুলিশ টিমকে নাকানি-চোবানি খাইয়ে ছাড়ছে! এখনও পর্যন্ত দুটো মার্ডার, চারটে ডাকাতি করা হয়ে গিয়েছে তার! সব মিলিয়ে নগদ ষাট লাখ টাকা আর কুড়ি লাখ টাকার গয়না সাফ করে দিয়েছে! অথচ একটা লিডও ছাড়েনি! কোনও ক্লু-ই নেই!’
‘বলেন কী!’ এবার নিবেদিতাও কৌতুহলী হয়ে উঠেছেন – ‘এত কান্ড করে ফেলেছে, অথচ আপনারা এখনও তাকে ধরতে পারেননি!’
‘মহিলাকে ধরা অত সহজ নয় ম্যাডাম!’ অসীম জানালেন – ‘যতটুকু তথ্য পেয়েছি সেই অনুযায়ী তার মোডাস অপারেন্ডি একই। মূলত ধনী পরিবারগুলোই তার মেইন টার্গেট। সেখানে আয়া, বেবি-সিটার এমনকি মেইড-যে কোনও রূপে দেবী অবতীর্ণা হন। কিছুদিন দুর্দান্ত কাজ করে। পরিবারের সবাইকে টপ্‌ টু বটম্‌ ইমপ্রেসড করে ফেলে। এমনকি বাড়ির কর্তাকেও বশ করে হাতের মুঠোয় রাখে! সেই ফাঁকে গোটা বাড়ির রেইকি করে। আলমারির চাবি থেকে লকারের চাবি সব কোথায় থাকে দেখে নেয়’।
‘তারপর?’ রুদ্ধশ্বাসে জানতে চান নিবেদিতা।
‘তারপর আর কী?’ অসীম একটা সিগারেট বের করতে গিয়েও ঋতুরাজের দিকে তাকিয়ে নিরস্ত হলেন – ‘তারপর এক রাত্রে ঘরে রাখা টাকাপয়সা, সোনাদানা সব হাপিশ করে দিয়ে ধাঁ! একদম হাওয়ায় ভ্যানিশ! বাধা পেলে খুন করতেও পিছ পা হয় না। এক বৃদ্ধ দম্পতি বাধা দিয়েছিলেন। তাদের দুজনকেই খুন করে দিয়েছে মহিলা! ডেঞ্জারাস!’
‘এই জোড়া খুনের খবরটা দেখেছি’। নিবেদিতা জানালেন – ‘তবে গোটা কেসহিস্ট্রটা জানা ছিল না’।
‘আমি আজকাল খুন-জখমের খবর খুব একটা দেখি না’। ঋতুরাজ বলেন – ‘অ্যাগি অ্যালাউ করে না। তাই কিছুই জানি না’।
‘আমরাও বিশেষ কিছু জানি না’। তিনি কাঁধ ঝাঁকালেন – ‘এভিডেন্স বলতে তেমন কিছুই হাতে নেই। গোটা কয়েক স্কেচ তৈরি হয়েছে বটে। কিন্তু ভিকটিমরা একেকজন একেকরকম বর্ণনা দিয়েছে। ফলে স্কেচের অবস্থাও তথৈবচ! স্রেফ এইটুকু জানি যে মহিলা মাঝবয়েসী, সুন্দরী, সম্ভবত অবাঙালি – কারণ তাকে বাংলায় কথা বলতে কেউ শোনেনি! একেক জায়গায় তার একেকরকম নাম! যে যে বাড়িতে সে কাজ করেছে, সেই সব বাড়ির লোকেদের কাছে তার একটা ফটোও নেই! ঐ বাড়িগুলোর কেউ তার পুলিস ভেরিফিকেশনের কথাই ভাবেনি। অথচ এটাই খুব জরুরী! লোকে যে কী করে এত কেয়ারলেস হয়...!’ বলতে বলতেই থামলেন অসীম। কী যেন ভেবে বললেন – ‘বাই দ্য ওয়ে, তোদের নার্স – কী যেন নাম?’
‘অ্যাগনেস জনসন’। আস্তে আস্তে বললেন ঋতুরাজ।
'ইয়েস। এই অ্যাগনেসকে কীভাবে রিক্রুট করলি? পুলিস ভেরিফিকেশন করিয়েছিস তো?’
‘নাঃ’। ঋতুরাজ মাথা নাড়লেন – ‘তার দরকার ছিল না। ডঃ স্বামীনাথন স্বয়ং ওকে রেফার করেছিলেন। তিরূপতি হসপিটালের একটা ব্রাঞ্চ কলকাতাতেও আছে। অ্যাগনেস সেখানেই কুড়ি বছর ধরে কাজ করছিল। ডঃ স্বামীনাথন বলেছিলেন ‘শি ইজ দ্য বেস্ট’।
‘ডঃ স্বামীনাথন মানে পি জে স্বামীনাথন। তাই তো?’
'ইয়েস। অন্য কোনও ডঃ স্বামীনাথনও আছেন নাকি?’
‘অবশ্যই আছেন। ডঃ এস স্বামীনাথন। পি জে স্বামীনাথনের ধর্মপত্নী। ওঁরা স্বামী-স্ত্রী, দুজনেই ধন্বন্তরি – ব্রিলিয়ান্ট কাপল। ভদ্রলোককে ঠিক সামনাসামনি দেখিনি কখনও। তবে নামে চিনি। অবশ্য ওঁর ওয়াইফকে খুব ভালো করেই চিনি’। অসীম বললেন – ‘তিনিও অসাধারণ একজন কার্ডিওলজিস্ট এবং সার্জেন। আমার বাবার বাইপাস সার্জারি তো ভদ্রমহিলাই করেছিলেন। তিরূপতি হসপিটালের কলকাতার ব্রাঞ্চেই হয়েছিল’।
‘ও’। ঋতুরাজ একটা শব্দ উচ্চারণ করেই চুপ করে গেলেন। ডঃ স্বামীনাথনের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে তার কোনও মাথাব্যথা নেই।
‘ডঃ স্বামীনাথন স্বয়ং যখন রেফার করেছেন, তখন আর কোনও প্রশ্নই ওঠে না’। অসীম মৃদু হাসেন – ‘কিন্তু যাঁর এত প্রশংসা শুনছি তাঁকে একবার চোখে দেখতে ইচ্ছে করছে যে! ঋতুর ‘নিউ উইনসাম ম্যারো’ বলে কথা!’
নিবেদিতার মুখে ঘন মেঘ জমে উঠল। ঋতুরাজ বিরক্ত হলেন – ‘এসব উল্টোপাল্টা কথা বলবি না। তুই আলাপ করতে চাইলে আ্যাগিকে ডেকে দিচ্ছি। বাট্‌ ডোন্ট বি ভালগার’।
‘ওকে ওকে!’ তিনি জিভ কাটলেন – ‘আমি শুধু দেখেই ধন্য হব ভাই। আর কোনও উদ্দেশ্য নেই! আমার তো আর হৃদয় পরিবর্তন হয়নি যে নতুন হৃদয়ের জন্য তস্য নতুন “হৃদয়েশ্বরী” লাগবে!’
কিন্তু অসীমের কপালই খারাপ! অ্যাগনেসকে তলব করেও পাওয়া গেল না! বাড়ির প্রধান পরিচারিকা আশা এসে জানাল – ‘তিনি তো একটু আগেই বেরিয়ে গেলেন!’
‘বেরিয়ে গিয়েছে!’ খতুরাজ অবাক – ‘কোথায় গিয়েছে!’
‘সে তো জানি না!’ আশা মাথা চুলকে উত্তর দেয় – ‘উনি তো বাংলায় কথা বলেন না! তাই আমিও জিজ্ঞাসা করিনি। তবে মনে হল বাজারের দিকে গেলেন’।
‘বাজারে!? তিনি অস্ফুটে বললেন – ‘বাজারে কেন...?’
‘আমাকে দেখে পালিয়ে গিয়েছেন!’ অসীম সজোরে হেসে উঠলেন – ‘এর আগের বারও তিনি উধাও ছিলেন! আজও দেখছি তাই! সম্ভবত আমার এই ভয়ঙ্কর মূর্তিটাই তাঁর অন্তর্ধানের মূল কারণ!’
অসীম হেসে উড়িয়ে দিলেও নিবেদিতার ভূরুতে ভাঁজ পড়ল। তাই তো! এর আগের বারও যখন তিনি এসেছিলেন, তখনও অ্যাগনেস বাড়িতে ছিল না। আজও নেই! অথচ সে বাড়ি থেকে কখনই বেরোয় না। আধঘন্টা আগেও তাকে কিচেনে দেখেছেন নিবেদিতা। আ্যাগি তখন খাতুরাজের ডিনারের মেনু শেফকে বোঝাচ্ছিল। অথচ এখন সে হাওয়া!
ব্যাপারটা কী!

৩.
‘ঐ মহিলাকে তুমি চেনো না মাম্‌! এ মহিলা বাবার মাথাটা স্রেফ চিবিয়ে খাচ্ছে!’ অদিতি চিৎকার করে বলল – ‘শি ইজ রুইনিং আওয়ার লাইফ! শি ইজ জাস্ট আ্যান ইনট্রুডার! ওর সাহস হয় কী করে আমার পার্টি ক্যানসেল করার!’
মুখে একটা সবুজ প্যাক লাগিয়ে বসেছিলেন নিবেদিতা। মেয়ের ক্ষুব্ধ অগ্ন্যুৎপাতে বিন্দুমাত্রও বিচলিত হলেন না।
তিনি শুধু মৃদুস্বরে বললেন – ‘এ ব্যাপারে আমার কিছু বলার নেই অডি। তুমি পার্টির জন্য যত টাকা চেয়েছিলে, আমি দিয়েছি। এখন যদি পার্টি ক্যানসেল হয় সেক্ষেত্রে আমি কী করতে পারি?’
‘অডি’, তথা অদিতি আরও রেগে গিয়ে বলল – ‘কেন? তুমি বাবাকে কিছু বলতে পারছ না! দ্যাট ব্লাডি বিচ্‌!...ঐ মেয়েছেলেটা আমার গার্জিয়ান নাকি যে কখন আমি পার্টি করব, কখন করব না তা বলে দেবে! এই বাড়িতে এখন শুধু তেনার হুকুমই চলছে! হু দ্য হেল ইজ শি! একটা দু পয়সার নার্স!...’
‘তোমার কী মনে হয়? তোমার বাবার সঙ্গে আমি কথা বলিনি?’ নিবেদিতা সোজা হয়ে বসলেন – ‘অ্যাগি দু পয়সার নার্স কী না জানি না। তবে উনিই এখন তোমার বাবার নিউ গার্জিয়ান। ওনার কথাই এখন এ বাড়িতে শেষ কথা। তিনি যদি আদেশ করেন, পেশেন্টের ঘরে ঢোকার আগে ডেটল নয়,-- গঙ্গাজলে হাত ধুতে হবে, তবে তোমার বাবা বলবেন – ‘তাই তো! গঙ্গাজল তো দুর্দান্ত আ্যান্টিবায়োটিক! কী দারুণ বৃদ্ধি তোমার আ্যাগি!’ বু-লশি-ট!’
কথার মধ্যে অন্তরের জ্বালাটা বড় বঙ্কিমভাবে প্রকাশ পেল। আসলে অদিতির পার্টির ব্যাপারে তিনি স্বয়ং ঋতুরাজের সঙ্গে কথা বলতেই গিয়েছিলেন। কিন্তু স্বামীর ঘরের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে দেখলেন, তার বিজনেস ম্যাগনেট পতিদেব স্রেফ একটা টাওয়েল পরে অর্ধনগ্ন হয়ে শুয়ে আছেন! আর সযত্নে তার দেহ স্পঞ্জ করিয়ে দিচ্ছে আ্যাগি! দৃশ্যটা দেখেই তার হাড় জ্বলে গিয়েছিল! বাহান্ন বছরের বুড়ো ভাম, হাফ নেকেড হয়ে এ মহিলার সামনে দিব্যি শুয়ে আছে! সুন্দরী মহিলার সুড়সুড়িতে খুব আরাম লাগছে লোকটার!
নিবেদিতার কান ঝাঁ ঝাঁ করছিল। কী অদ্ভূত নির্লজ্জ ওরা! মহিলার কথা বলাই বাহুল্য! কিন্তু ঋতুরাজ! তার আহ্লাদী পনা অসহ্য! সর্বক্ষণ শুধু 'অ্যাগি’ আর ‘আ্যাগি’! যেন নাম জপছে!
রাগের মাথায় তিনি সমস্ত আদব কায়দার কথা ভূলে গেলেন। সটান গটগটিয়ে ঢুকে পড়লেন স্বামীর ঘরে। অ্যাগির দিকে একটা জ্বলন্ত দৃষ্টি ছুঁড়ে দিয়ে বললেন – ‘তুমি এখন এখান থেকে যাও। স্যারকে আমিই স্পঞ্জ করিয়ে দিচ্ছি’।
অ্যাগি একবার ঋতুরাজের দিকে তাকায়। পরক্ষণেই মাথা ঝাঁকিয়ে ঘর থেকে হয়তো বেরিয়েই যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই ঋতুরাজ তার হাত টেনে ধরলেন – ‘প্রয়োজন নেই। অ্যাগিই করুক। তুমি পারবে না’।
‘কেন পারব না?’ দুজনের নির্লজ্জ হাত ধরাধরি পর্ব দেখে আপাদমস্তক রাগে জ্বলছিলেন তিনি। তবু ভীষণ জেদের সঙ্গে কথাটা ছুঁড়ে দিলেন নিবেদিতা – ‘আমি তোমার স্ত্রী ঋতু!’
‘আই অ্যাডমিট’। স্থির স্বরে বললেন তিনি – ‘কিন্তু মাথায় শ্যাম্পু করার জন্যও যার একজন আলাদা লোক লাগে, তার হাতে আমি আমার অসুস্থ দেহটাকে ছেড়ে দিতে পারি না। এনি ওয়ে, আ্যাগি, প্রিজ ক্যারি অন্’।
নিবেদিতার মনে হল, কেউ যেন সপাটে চড় মারল তাকে। অ্যাগনেসের দিকে তাকিয়ে দেখলেন সে নির্লিপ্ত, নিস্পৃহ ভঙ্গিতে আবার কাজে লেগে পড়েছে। তিনি কোনমতে অপমানটা হজম করে শান্ত স্বরে বললেন – ‘অডি’র ব্যাপারে কিছু কথা ছিল তোমার সঙ্গে’।
আরামে ঋতুরাজের চোখ বুঁজে এসেছিল। অ্যাগির হাতে যাদু আছে! যখন স্পর্শ করে তখন যেন তার আঙুলে পৃথিবীর সমস্ত শান্তি এসে জড়ো হয়। প্রথম প্রথম বডি স্পঞ্জ করাতে লঙ্জা পেতেন। আড়ষ্ট হয়ে থাকতেন। অ্যাগি সে কথা বুঝতে পেরেই বলেছিল – ‘টেক ইট ইজি স্যার। ছোটবেলায় কি আপনার মা কখনও আপনার বডিস্পঞ্জ করেননি?’
ঋতুরাজের মনে পড়ে গিয়েছিল পুরোনো দিনের কথা। শরীর অসুস্থ থাকলে মা একটা ভিজে তোয়ালে দিয়ে সারা গা মুছিয়ে দিতেন। কী যে আরাম ছিল মায়ের স্পর্শে! মনে হত অসুখ-টসুখ সব পালিয়ে গিয়েছে।
সেকথা অ্যাগিকে বলতেই সে হেসে বলেছিল – ‘তাহলে তো প্রবলেম সলভড্‌। আপনি চোখ বুঁজে আমাকে নিজের মা বলে ভাবুন। তাহলেই আর কোনও সমস্যা থাকবে না’।
এখন তাই-ই ভাবেন তিনি। আর ভাবতে ভাবতেই অনুভব করেন অ্যাগির আঙুলে সত্যিই যেন মাতৃত্বের স্পর্শ! সেই এক আন্তরিকতা! সেই একই আরাম!
কিন্তু আজ সেই সুখকর অনুভূতির মধ্যে ডুবে থাকার উপায় নেই। নিজের মেয়ের নামটা শুনেই সচকিত হয়ে উঠলেন ঋতুরাজ – ‘কেন? অডি'র আবার কী হল?’
‘কাল মেয়েটার জন্মদিন। তোমার কি সেকথা মনে আছে?’
গলন্ত সীসার মত শব্দগুলো ঢুকে গেল তার কানে। তিনি শান্ত ভাবেই বললেন – ‘হ্যাঁ। মনে আছে’।
‘মেয়েটা বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে সামনের বাগানে একটু পার্টি করবে ভেবেছিল। ফুড, স্ন্যাকস, ড্রিঙ্কস্‌, ডি জে, সব বুক করা হয়ে গিয়েছিল!’ নিবেদিতার কন্ঠস্বর চড়ল – ‘কিন্তু তোমার এই পেয়ারের নার্স কাল রাতে কাউকে কিছু না বলে সব জায়গায় ফোন করে অর্ডার ক্যান্সেল করে দিয়েছে! অডি’র বার্থ-ডে পার্টির গোটাটাই ক্যান্সেল করে দিয়েছে এই মহিলা!’
‘জানি তো!’ নিরুত্তাপ স্বরে জানালেন খতুরাজ – ‘ওর কাছে অবশ্য ওদের ফোন নম্বর ছিল না। তাই ক্যাটারার থেকে শুরু করে ড্রিঙ্কসের মকবুল, ইভেন্ট ম্যানেজার যোসেফ এবং ডি জের ফোন নম্বরও ওকে আমি নিজেই দিয়েছি’।
‘মানে!’ নিবেদিতার মুখ দিয়ে আর কোনও কথা বেরোয় না – ‘নম্বরগুলো তুমিই দিয়েছ!’
অ্যাগি আস্তে আস্তে বলল – ‘স্যারের এই অবস্থায় ওরকম লাউড মিউজিক বা হৈ চৈ এর পরিবেশ ঠিক নয় ম্যাডাম। হার্ট পেশেন্টদের জন্য ডি জের এ জোরালো বাজনা, ভাইব্রেশনের ইমপ্যাক্ট অত্যন্ত ক্ষতিকর। আর উনি তো সদ্য সদ্য একটা বিরাট অপারেশনের ধকল সামলে উঠেছেন। সেই জন্যই...!’
‘শা-ট আ-প ইউ...!’ তখনই কোনও বিশেষণ জোগাল না নিবেদিতার মুখে। তিনি অতিকষ্টে রাগ চেপে বললেন – ‘ তুমি এসব ঠিক করার কে? বাড়িতে কী হবে না হবে তার ডিসিশন নেওয়ার অধিকার তোমায় কে দিল?’
অ্যাগির ঠোট কেঁপে উঠল। কিন্তু সে কিছু বলার আগেই খাতুরাজ বলে উঠলেন – ‘সে অধিকার ওকে আমি দিয়েছি! আমার নিজের স্বার্থেই দিতে হয়েছে। আর কিছু বলবে?’
কথাগুলো মনে পড়তেই মনটা তিতো হয়ে গেল নিবেদিতার। অদিতিকে কীভাবে বোঝাবেন যে তার বাবা এখন অন্য একজন স্ত্রীলোকের হস্তগত হয়েছেন! সে কথা বলা যায় না। সে কথা বড় লজ্জার! নিজের নারীত্বের অপমানও বটে!
‘আমি তোমায় বলে দিচ্ছি মাম!’ অদিতি উত্তেজিত হয়ে সারা ঘরে ছট্ফট্‌ করে ঘুরে বেড়াতে শুরু করেছে – ‘ঐ মহিলা খুব একটা সুবিধের নয়! কিছু গোলমাল তো আছেই। তুমি লক্ষ্য করে দেখেছ, অসীম আঙ্কল্‌ বাড়িতে এলেই ও কেমন ভ্যানিশ হয়ে যায়! আঙ্কলের সামনে কিছুতেই আসতে চায় না!’
ব্যাপারটা নিবেদিতাও লক্ষ্য করেছেন। এর মধ্যেই অফিসার অসীম দত্ত বন্ধুকে দেখতে আরও কয়েকবার এ বাড়িতে এসেছেন। কিন্তু যখনই তিনি আসেন, তখনই অ্যাগনেস যেন কোথায় হাওয়া হয়ে যায়। পরে জানতে চাইলে অদ্ভুত অদ্ভুত অজুহাত দেখিয়ে এড়িয়ে যেতে চায়। বিষয়টা অনেকবার ঋরাজকে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন তিনি। কিন্তু ঋতুরাজ বোধহয় অ্যাগির বিষয়ে সম্পূর্ণ অন্ধ! অ্যাগির হাবভাব যে যথেষ্ট সন্দেহজনক, সেকথা স্বীকার তো করলেনই না, উলটে বললেন – ‘আ্যাগি মিউজিয়ামের কোনও দ্রষ্টব্য বস্ত নয় যে সবার সামনে তাকে শো-পিস হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেই হবে। ওর ব্যক্তিগত অনেক কাজ আছে’।
‘ব্যক্তিগত কাজ করার জন্য আমরা ওকে স্যালারি দিই না’।
তিনি মৃদু হাসলেন – ‘রাইট। কিন্তু পেশেন্টের বন্ধুর সামনে পোজ দিয়ে দাঁড়াবার জন্যও নিশ্চয়ই ওকে স্যালারি দেওয়া হয় না’।
বাবার এই অদ্ভুত যুক্তি শুনে অদিতি আর স্থির থাকতে পারে না। বিরক্ত হয়ে বলে – ‘তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে অ্যাগি বুঝি মহাসতী পদ্মিনী, আর অসীম আঙ্কল আলাউদ্দিন খলজি!’
‘অ্যাগি পদ্মিনী কি না জানিনা। তবে অসীম অফকোর্স আলাউদ্দিন খলজি – নো ডাউটস্‌’। ঋতুরাজ এতক্ষণ বিছানায় বসেছিলেন। এবার চিৎ হয়ে শুয়ে পড়েন – ‘এখন তোমরা এ ঘর থেকে যাও। আর আ্যাগিকে ডেকে দাও। আই আ্যাম ফিলিং টায়ার্ড’।
এমন ভাবে কথাটা বললেন যেন অ্যাগনেস ক্লান্তিহরা মৃতসঞ্জীবনী! সামনে এসে দাঁড়ালেই সব ক্লান্তি, শ্রান্তি দূর হয়ে যাবে। মনে মনে চিড়বিড় করে ওঠে মা ও মেয়ে। কিন্তু কারোর কিছু করার নেই!
অদিতি উত্তেজিত হয়ে বলতে থাকে – ‘তুমি লক্ষ্য করেছ? অসীম আঙ্কল ঐ মার্ডারার মহিলা সম্পর্কে যে ইনফরমেশন দিয়েছেন, অ্যাগির সঙ্গে সেসব প্রায় মিলে যায়! মধ্যবয়স্কা-সুন্দরী-অবাঙালি! মোডাস অপারেন্ডিটাও একই ধরণের। এ মহিলা বেবি-সিটার, আয়া বা মেইড হয়ে ফ্যামিলিতে ঢুকে যায়। দারুণ পারফরম্যান্স করে সবাইকে ইমপ্রেস করে ফেলে। বাড়ির কর্তাকেও হাত করে ফেলে’। তার গলার স্বর এবার খাদে – ‘এগজ্যান্টলি সেটাই এ বাড়িতেও হচ্ছে! কে বলতে পারে, এবার হয়তো তিনি নার্স হিসাবে আবির্ভূতা হয়েছেন!’
‘তুই ঠিকই বলেছিস অডি’। তিনি বিড়বিড় করে বলেন – ‘সামথিং ইজ রটেন্‌ ইন্‌ দ্য স্টেট অব ডেনমার্ক ...!’
এতক্ষণ একটু দূরে ভ্যাকুয়াম ক্লিনার চালাতে চালাতে প্রধান পরিচারিকা আশা মা-মেয়ের কথা চুপ করে শুনছিল। দু একবার কিছু বলার জন্য মুখ খোলার চেষ্টা করলেও শেষমেষ চেপে গিয়েছে। এ বাড়ির মালকিন চাকর-বাকরদের খুব একটা মানুষ বলে গণ্য করেন না। তাই হয়তো সাহস করে উঠতে পারেনি। কিন্তু এখন আর থাকতে পারল না। ভ্যাকুয়াম ক্লিনারটা বন্ধ করে এগিয়ে এল সে। খুব কুণ্ঠিত স্বরে বলল – ‘ম্যাডাম, একটা কথা বলব?’
নিবেদিতা তার দিকে তাকিয়ে অম্লরসাক্ত হাসলেন – ‘আপনিও কথা বলবেন! বাঃ, এখন তো দেখছি এ বাড়ির চাকর-বাকরেরাই সব কথা বলবে। সিস্টার বলবে, আপনি বলবেন, শেফ বলবে – শুধু আমরাই স্পিকটি নট!’
আশা মুখ চুন করে ফিরে যাচ্ছিল। নিবেদিতা তাকে ডাকলেন – ‘কী বলতে এসেছিস বলে যা। শুনি’।
‘ম্যাডাম আমার অপরাধ নেবেন না!’ সে ভয়ে ভয়ে বলল – ‘কিন্তু এ মেম মেয়েছেলেটা রাতের বেলায় চুপি চুপি সাহেবের ঘরে যায়!’
‘হো-য়া-ট!’
এবার মা ও মেয়ে একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠেছে! নিবেদিতার মুখ চোখ ফেটে যেন আগুন প্রচন্ড লাভা হয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে! তিনি স্খলিত স্বরে বলেন – ‘কী বলছিস্‌!’
জিভ কাটল আশা। একটু ইতস্ততঃ করে সে আগের মতই কুণ্ঠিত ভাবে ঘটনাটা জানায়। ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকবার মধ্যরাত্রে সে নিজের চোখে অ্যাগনেসকে ঋতুরাজের ঘরে ঢুকতে দেখেছে। অবশ্য ঘরের ভেতরে কী ঘটে তা তার জানার কথা নয়। কারণ ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই অ্যাগনেস দরজা ভেজিয়ে দেয়।
কথাটা বলার পর প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য আশা আড়চোখে দুজনের দিকে তাকায়। অদিতির মুখ রক্তশূন্য। সে কোনওমতে ধপ্‌ করে সোফার ওপর বসে পড়ে!
আর নিবেদিতা? তিনি সম্ভবত অজন্তা”র ঘোড়শতম গুহার বিখ্যাত শিল্পকীর্তি ‘মরণাহত রাজকুমারী’ তথা ‘ডাইং
প্রিন্সেসে’ রূপান্তরিত হয়েছেন! কোনমতে মেয়েকে বললেন – ‘তোর অসীম আঙ্কলকে একবার ফোন কর্‌ তো!’

৪.
ঘড়িতে ঢংঢং করে রাত দুটোর ঘন্টা পড়ল। এই মুহূর্তে চতুর্দিকে আর কোনও শব্দ নেই। শুধু মাঝে মাঝে গাছের পাতার খসখস আর রাতচরা পাখির উড়ে যাওয়ার ঝট্পট্! প্রশান্ত অন্ধকারের বুকে আর কোনও আওয়াজ শোনা যায় না।
এখন এ বাড়িতে কেউ জেগে নেই। অনেকক্ষণ আগেই বাড়ির সমস্ত আলো নিভে গিয়েছে। শুধু হলঘরে একটা নীল আলো জ্বলছে। তার নীলাভ আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে গোটা ঘরটা। আলো নয়, যেন স্নিগ্ধ নীল স্বপ্ন! অথবা নীল জল! অতলান্তিক সমুদ্রের মত ডুবিয়ে রেখেছে স্বপ্নলোকে! আচমকা দেখলে মনে হয়, এ বাস্তব নয় – বরং বাস্তব থেকে অনেক দূরে থাকা এক রূপকথার রাজ্য! হয়তো এখানেই পাওয়া যাবে সেই তেপান্তরের মাঠ পেরিয়ে আসা রাজপুত্রকে! কিংবা সেই সুদীর্ঘকেশী রাপুনজেলকে!
হঠাৎ সেই স্থিত, শান্ত নীল আলোয় আলোড়ন উঠল! যেন নীল জল কেটে সাঁতরে চলে গেল এক জলপরী! নীলাভ আলো তার শ্বেতপাথরের মত ত্বকে পিছলে পড়ছে! সোনালী চুলে নীল অভ্রের ঝিকিমিকি। তার চলন সাবধানী। অত্যন্ত সতর্ক। পা টিপে টিপে নিশ্চুপে সে এগিয়ে চলল মাস্টার বেডরুমের দিকে। সেই ঘরেই এই মুহূর্তে নিদ্রামগ্ন আছেন ঋতুরাজ।
অ্যাগনেস কোনও তাড়াহুড়ো করল না। বরং ধীরে সুস্থে ঢুকে গেল ঋতুরাজের ঘরে। একবার সতর্ক দৃষ্টিতে চতুর্দিকটা দেখে নিল। নাঃ, আশেপাশে কেউ নেই। শুধু ছায়া ছায়া ফার্ণিচারগুলো যেন রুদ্ধশ্বাসে কিছু একটা ঘটার জন্য অপেক্ষা করছে। সে নিশ্চিন্ত হয়ে দরজা ভেজিয়ে দিল। ধীর পায়ে এগিয়ে গেল বিছানার দিকে।
ঋতুরাজ তখন গভীর নিদ্রায় মগ্ন। এ সিটা একটু বেশিই শীতল হাওয়া ছড়াচ্ছে। ভদ্রলোক চাদর গায়ে দিয়েও কুঁকড়ে শুয়ে আছেন। অ্যাগি সন্তর্পণে রিমোটটা তুলে নিয়ে শীতলতার মাত্রা একটু কমিয়ে দেয়। ঋতুরাজের গায়ের চাদরটাও সযত্নে ঠিকঠাক করে দেয়। তারপর আস্তে আস্তে বসে পড়ল নিদ্রিত মানুষটির ঠিক পাশে। তার বুকের ভেতর থেকে একটা অদম্য কান্না উঠে আসছে। অ্যাগি জানে এখন সে যা করছে তা অন্যায়! এখন সে যা বলবে, তা কোনওদিন প্রকাশ্যে বলা সম্ভব নয়। তবু প্রতি রাতে বার বার ফিরে আসে এই মানুষটির কাছে। কীসের তাড়নায় আসে তা কাউকে বোঝানো যাবে না...!
আস্তে আস্তে ঘুমন্ত ঋতুরাজের বুকের ওপর মাথা এলিয়ে দিল অ্যাগনেস! তার বুকে মাথা রেখে চোখ বুঁজল সে! একটা অপরিসীম বেদনা অ্যাগির কণ্ঠরোধ করে রেখেছিল। তার চোখ বেয়ে টপটপ করে অশ্রুবিন্দু গড়িয়ে পড়ছে। দুহাতে ঋতুরাজকে আঁকড়ে ধরে বুকের ওপর আলতো চুম্বন এঁকে দিতে দিতে কান্নাজড়িত কষ্ঠে বলে উঠল – ‘আই লাভ ইউ ... আই লাভ ইউ ... আই লাভ ইউ ডিয়ার ...!’
‘কী হচ্ছে এসব!’
হঠাৎই দপ্‌ করে ঘরের আলো জ্বলে উঠল! তার সঙ্গে তীব্র একটা নারী কন্ঠস্বর রাত্রির নিস্তব্ধতাকে খান্‌ খান্‌ করে বলে ওঠে – ‘ইউ লাভ হিম! ব্লাডি হো-র!’
অ্যাগি চম্‌কে ওঠে! ঋতুরাজও ঘুম ভেঙে ধড়মড় করে উঠে বসেছেন। বিহ্বল গলায় বললেন – ‘কী হল!’
ভেজিয়ে দেওয়া দরজা যে কখন অজান্তে খুলে গিয়েছে তা টের পায়নি অ্যাগি! দরজার সামনে দাঁড়িয়ে তখন বাঘিনীর মত ফুঁসছেন নিবেদিতা। পারলে এখনই অ্যাগির ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে ওকে টুকরো টুকরো করে ফেলেন! তিনি অবশ্য একা নন্‌। সঙ্গে অদিতি ও আশাও রয়েছে। আশার কথা শুনে আজ রাতেই ওত পেতে বসেছিলেন। এবার একেবারে হাতে নাতে ধরে ফেলেছেন!
‘কী হয়েছে তা ওকে জিজ্ঞাসা করো!’ অ্যাগির দিকে তর্জনী উদ্যত করে বলল অদিতি – ‘আস্ক হার! এ তো বসে আছে শয়তানী!’
ঋতুরাজ বিস্মিত দৃষ্টিতে অ্যাগনেসের দিকে তাকালেন। তার নীল চোখ দু'টো অপমানে বেদনাহত! মুক্তোর মত জলবিন্দু ফোঁটায় ফোঁটায় গড়িয়ে পড়ছে। অপরাধীর মত মাথা নীচু করে বসে আছে সে!
‘শি ইজ আ ইম্পস্টার!’ এবার তীব্র কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠলেন নিবেদিতা – ‘আমি অসীমকে ওর ব্যাপারে খোঁজ করতে বলেছিলাম। অসীম একটু আগেই আমায় ফোনে জানিয়েছেন, শুধু কলকাতা নয় – তিরুপতি হস্পিটালের কোনও ব্রাঞ্চেই অ্যাগনেস জনসন নামের কোনও নার্স নেই! সম্ভবত ডঃ স্বামীনাথনের লেটারটাও নকল! শি ইজ নাথিং বাট আ ফ্রড! সম্ভবত ও – ই সেই মার্ডারার, যাকে পুলিস হন্যে হয়ে খুঁজছে! অসীম এখনই এখানে এসে পড়বেন। ওঃ ঋতু ...!’
ঋতুরাজ কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে নিবেদিতার দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন – ‘অ্যাগি মার্ডারার নয়। তোমার ভূল হচ্ছে!’
‘আমার ভুল হচ্ছে!’ ফের ফুঁসে ওঠেন তিনি – ‘তুমি কি অন্ধ? দেখতে পাচ্ছ না, রাত দুটোর সময় ও এই বেডরুমে এসে হানা দিয়েছে! কী উদ্দেশ্যে? জানো ও এখানে এসে কী নোংরামি করছিল? আমি সেসব কথা তোমাকে বলতেও পারব না! আমার রুচিতে বাঁধছে!’
‘তোমায় বলতে হবে না’। ঋতুরাজ শান্তভাবেই জবাব দিলেন – ‘আমি জানি। প্রতি রাতেই টের পাই। আ্যাগি, তোমার কথার উত্তর কখনও দেওয়া হয়নি। পাছে তুমি কিছু মনে করো তাই সব বুঝেও চুপ করে ছিলাম। তবে আজ উত্তরটা দিচ্ছি’। তিনি উপস্থিত সকলের দিকে একঝলক দৃষ্টিক্ষেপ করে অ্যাগিকে বললেন – ‘আই লাভ ইউ টু-উ!’
নিবেদিতার মাথায় যেন বিস্ময়ের পাহাড় ভেঙে পড়ল! ঋতুরাজ সব জানেন। শুধু তাই নয়, সোজা ‘আই লাভ ইউ টু’ বলে দিল লোকটা! তার মানে, এই মহিলার নোংরামিতে তারও সায় আছে! তিনি কী বলবেন, কী করবেন বুঝে উঠতে পারেন না। শুধু একবার আ্যাগির দিকে তাকালেন। অদ্ভূত ব্যাপার! অ্যাগি যেন শিউরে উঠল! সেও অগাধ বিস্ময়ে ঋতুরাজের দিকে তাকিয়ে আছে! ওটা কি সত্যিই বিস্ময়? না দুর্দান্ত অভিনয়!
কোনমতে বললেন নিবেদিতা – ‘বাঃ, তাহলে তো আর কিছুই বলার নেই! একটা ইম্পস্টার, ফ্রডকে তুমি ভালোবাসো! বুঝতে পারছি না হাততালি দেব কি না!’
‘হাততালি দেওয়াই বোধহয় উচিত!’ তিনি মৃদু হেসে বললেন – ‘ও ইম্পস্টার নয়। তবে এটা ঠিক যে আাগনেস জনসন বলে সত্যিই কেউ নেই! যিনি আছেন তিনি...!’
‘শ্যারণ স্বামীনাথন!’
ঋতুরাজ কথাটা শেষ করার আগেই নিবেদিতার পেছন থেকে অসীমের বিস্মিত কণ্ঠস্বর ভেসে এল! তিনি সম্ভাব্য অপরাধীকে গ্রেফতার করতে এসেছিলেন। কিন্তু গ্রেফতার করবেন কী! অপরাধীকে দেখে তিনি হতবাক! প্রবল বিস্ময়ে বললেন – ‘ডঃ এস স্বামীনাথন! আপনি এখানে?’
অ্যাগনেস, ওরফে ডঃ শ্যারণ স্বামীনাথন দু হাতে মুখ ঢেকে কান্নায় ভেঙে পড়লেন! উপস্থিত সকলেই হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। কারোর মুখেই কোনও কথা নেই! কী বলা উচিত কেউ ভেবে পাচ্ছেন না! নীরবতাকে ভেঙে দিয়ে শেষপর্যন্ত ঋতুরাজই মুখ খুললেন – ‘ইয়েস অসীম। ডঃ এস স্বামীনাথন। যিনি তোর বাবার অপারেশন করেছিলেন। ডঃ প্যাট্রিক জয়প্রকাশ স্বামীনাথনের ধর্মপত্নী! ওর একমাত্র অপরাধ একটাই। সিস্টার আ্যাগনেস জনসনের ছদ্মনামে মাসের পর মাস তিনি এক মুমূর্ষু রোগীর আপ্রাণ সেবা করে গিয়েছেন’।
এতক্ষণে অশ্রুভেজা চোখ তুলে ঋতুরাজের দিকে তাকালেন আ্যাগনেস, অর্থাৎ ডঃ শ্যারণ স্বামীনাথন। ভেজা স্বরে জানতে চাইলেন – ‘আপনি সব জানতেন!’
‘হ্যাঁ’ তিনি স্মিত হাসেন - ডঃ প্যাট্রিক স্বামীনাথন নিজেই জানিয়েছিলেন আমায়। কারণ অ্যাগনেস জনসনের হাব-ভাব আমারও সন্দেহজনক ঠেকেছিল। একজন সিস্টার কুড়ি বছর ধরে কলকাতায় কাজ করে চলেছে, অথচ সে বাংলা জানে না! তার ওপর প্রায়ই মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গিয়ে অনুভব করতাম – অ্যাগনেস আমার বুকে মাথা দিয়ে শুয়ে আছে! গোটা ব্যাপারটাই গোলমেলে লেগেছিল। তাই খোঁজ করলাম। এবং জানতে পারলাম যে তিরুপতি হসপিটালের কোনও ব্রাঞ্চেই অ্যাগনেস জনসন বলে কেউ নেই। অথচ ডঃ স্বামীনাথনকে অবিশ্বাস করাও অসম্ভব। তাই তাঁকেই ফোন করে সমস্ত ব্যাপারটা জানালাম। তিনিই আমায় সমস্ত কথা খুলে বললেন। এবং সেইদিন থেকেই আমি সব জানি। অফিসার অসীম দত্তকে বারবার এড়িয়ে যাওয়ারও এটাই কারণ। অসীমের বাবা ডঃ শ্যারণ স্বামীনাথনের পেশেন্ট ছিলেন। সেই সূত্রে বেশ কয়েকবার ওদের দেখাও হয়েছে। অ্যাগনেসকে দেখলেই অসীম চিনে ফেলত, যেটা অনভিপ্রেত ছিল’।
‘কিন্ত এরকম একজন স্বনামখ্যাত ডাক্তার!’ অসীম অবাক – ‘শেষপর্যন্ত একজন সাধারণ নার্সের ছদ্মবেশে! কেন?’
নিজের বুকের ওপর হাত রেখে বললেন খতুরাজ – ‘এটার জন্য। আমার এই নতুন হাটার ডোনারের নাম রবার্ট স্বামীনাথন। পি জে স্বামীনাথন ও মিসেস স্বামীনাথনের একমাত্র সন্তান। নিজের নামটা ভুল বললেও, ছেলের ব্যাপারে সত্যি কথাই বলেছিল আ্যাগি’।
উপস্থিত সবাই স্তম্ভিত! ঘরে পিনপতনের মত নৈঃশব্দ!
এবার মুখ খুললেন শ্যারণ – ‘ঠিক কথা! প্যাট্রিক নিজের হাতে রবার্টের হৃৎপিন্ড বসিয়েছিল মিঃ চ্যাটার্জীর বুকে’।
বলতে বলতেই কেঁদে ফেললেন তিনি। কান্নাজড়ানো স্বরে বললেন – ‘তখন আমার মনে হয়েছিল, আমার রবার্ট বুঝি আবার বেঁচে উঠেছে! তার রক্ত-মাংসের নিস্তব্ধ হৃৎপিন্ডটার যেন প্রাণপ্রতিষ্ঠা হয়েছে! যখন প্যাট্রিক এসে বলল, যে রবার্টের হার্টটা মিঃ চ্যাটার্জীকে দেওয়া হয়েছে – তখনই আমার মনে হল, রবার্ট আমার কাছে ফিরে এসেছে! অন্যরূপে! অন্য দেহে! কিন্তু হৃদয়টা তো তারই! আমি ঠিক করলাম, এবার আর ছেলেকে কিছুতেই হারিয়ে যেতে দেব না! আশঙ্কা ছিল সামান্যতম অযত্নেও হয়তো রবার্টের হৃৎপিন্ডটা থেমে যেতে পারে। আমি সেটা হতে দিতে পারতাম না! রবার্টের কাছ থেকে দূরে থাকাও অসম্ভব ছিল! তাই...!’
এরপর আর কিছু বলার থাকে না! নিবেদিতা লজ্জিত, আনতনয়নে মেঝের দিকে তাকিয়েছিলেন! এখন বুঝতে পারছেন আসল ঘটনাটা কী! প্রতি রাতে এক হতভাগিনী মা তার সন্তানের হৃৎস্পন্দন শুনতে ছুটে যেত ঋতুরাজের ঘরে! সন্তানের হদয়ের কাছেই জানাত তার ভালোবাসার কথা। আসলে সে কখনই কোনও মধ্যবয়স্ক পরপুরুষকে স্পর্শ করেনি। যতবার সে ঋতুরাজকে ছুঁয়েছে, ততবারই ঠিক তার নিজের সন্তানকে স্পর্শ করেছে! বিজ্ঞান বলে, মানুষের হৃৎিপন্ড শুধু ‘লাব-ডুব’ শব্দই করতে পারে। কিন্তু এক হতভাগ্য মাতৃহৃদয়ের কাছে সেই শব্দই হয়ে উঠেছিল তার সন্তানের না বলা কথা...!
ঋতুরাজ আস্তে আস্তে এগিয়ে গেলেন মহিলার দিকে। তারপর তার মাথাটা সযত্নে টেনে নিলেন নিজের বুকের ওপর। ধীর স্বরে বললেন – ‘আর তো গোপনীয়তার কিছু নেই। শোনো...ভালো করে শোনো...!’
তার বুকের ওপর কান পেতে অদ্ভুত একটা হাসি হাসলেন শ্যারণ! তার কান্না হাসি সব একসঙ্গে মিলেমিশে গেল। শুনতে পেলেন বুকের ভেতর থেকে ‘লাব-ডুব’ শব্দের তালে তালে কে যেন বলে চলেছে – ‘মা! মা! মা!’
হাসতে হাসতেই কেঁদে ফেললেন তিনি। কোনমতে বললেন – ‘আই লাভ ইউ! আই লাভ ইউ মাই সান!’
‘লাভ ইউ টু মা!’ ঋতুরাজ হেসে বললেন – ‘আমি নই, আমার হার্ট বলছে’।
শ্যারণ অশ্রুসিক্ত মুখ তুলে তাকালেন। ঋতুরাজের মনে হল, সেই মুখের সঙ্গে একে একে মিলে গেলেন মাতা মেরী এবং গণেশ জননী!
আসলে শেষপর্যন্ত ওরা সকলেই তো মা!

সমাপ্ত

 

সায়ন্তনী পূততুন্ড
লেখিকা, পশ্চিম বঙ্গ, ভারত

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top