সিডনী বৃহঃস্পতিবার, ৯ই ডিসেম্বর ২০২১, ২৫শে অগ্রহায়ণ ১৪২৮

ঋতুকন্যা হেমন্ত : শাহান আরা জাকির পারুল 


প্রকাশিত:
১৬ নভেম্বর ২০২১ ১৪:৩৮

আপডেট:
৯ ডিসেম্বর ২০২১ ১৯:৩৭

 

ঋতু বৈচিত্র্যের বাংলাদেশে কার্তিক-অগ্রহায়ণ হেমন্তকাল। হেমন্ত মানেই কুয়াশাচ্ছন্ন সকাল। মিষ্টি রোদের মায়াবি আদর। জ্যোৎস্না-প্লাবিত রাত। বৃক্ষে বৃক্ষে পাতাঝরার নৃত্য। এসব ঋতুকন্যা হেমন্তের বৈশিষ্ট্য।

আবহমানকাল থেকেই হেমন্ত আনে কৃষকের মুখে অনাবিল হাসি। ধান কাটা-মাড়াই নিয়ে পরিতৃপ্তির ব্যস্ততা। চলতে থাকে নবান্নের পিঠা-পায়েসের আয়োজন। এসব আপামর খেটে খাওয়া মানুষের সংস্কৃতি। হেমন্তের গভীর গম্ভীর রূপ কীটস-এরও প্রাণ ভুলিয়েছিলো।  

কাব্যিক দৃষ্টিভঙ্গিতে হেমন্ত এক অপরূপা সুন্দরী। ঋতুকন্যা হৈমন্তীর প্রেমে হাবুডুবু খায় পুরো প্রকৃতি।

জীবনানন্দের চোখে হেমন্ত কী অসাধারণ------ ‘প্রথম ফসল গেছে ঘরে/হেমন্তের মাঠে মাঠে ঝরে শুধু শিশিরের জল;/অঘ্রানের নদীটির শ্বাসে/হিম হয়ে আসে/বাঁশপাতা-মরা ঘাস-আকাশের তারা!/বরফের মতো চাঁদ ঢালিছে ফোয়ারা!/ধানক্ষেতে-মাঠে/জমিছে ধোঁয়াটে/ধারালো কুয়াশা!’

হেমন্তের মোহময়ী গম্ভীর রূপ জীবনানন্দের প্রাণ দুলিয়েছিল। শিশির-কুয়াশা মিশ্রিত হেমন্ত ঋতু তাকে আকৃষ্ট করত। তাই জীবনানন্দের কাব্যেই হেমন্ত পেয়েছে শীর্ষস্থান। তার প্রতিটি কবিতায় রূপায়িত হয়েছে হেমন্তের অপরূপ বৈশিষ্ট্য– শিশিরের শব্দ, ধূসর কুয়াশা, মেটে জোছনা, মাঠ পাড়ের গল্প। কবির ভাষায়, ‘অঘ্রাণ এসেছে আজ পৃথিবীর বনে/সে সবের ঢের আগে আমাদের দুজনের মনে/হেমন্ত এসেছে তবু।’ 

হেমন্ত বিষণ্ণতার ঋতু তারপরও হেমন্ত ধরিত্রীর অন্তরঙ্গ সহচরী। হেমন্ত ভরে তোলে গৃহভাণ্ডার।

হেমন্ত এলে বাংলার ঘরে ঘরে আশ্বিনের ভাত কার্তিকে খাওয়ার ধুম পড়ে যায়। আশ্বিনের শেষদিন রান্না করা ভাত রাতে পানি দিয়ে ভিজিয়ে রাখা হয় কার্তিকের প্রথম দিন খাওয়ার জন্য। এটা গ্রামবাংলার এক ধরনের সংস্কৃতি। 

হেমন্তের শুরু কার্তিক মাস ফসল তোলার পূর্ব মাস। যার কারণে কৃষকের ঘরে খানিকটা অভাব থাকে বৈকি? আর তাই এই কার্তিককে ‘মঙ্গার মাস’ বলেও অনেকে আখ্যায়িত করেন। 

অগ্রহায়ণের প্রথম দিন থেকে ধান কাটার মৌসুম শুরু হয়। গ্রামের ঘরে ঘরে ফসল তোলার আনন্দ। নতুন ধানের গন্ধে অন্যরকম আবহাওয়া বইতে থাকে। নবান্ন আর পিঠেপুলির আনন্দে মাতোয়ারা হয় সবাই।

এ সময় গ্রামবাংলায় বাপের বাড়ি আসে মেয়ে নাইওরে!আত্মীয় পরিজন নিয়ে নতুন আনন্দে মেতে ওঠে সবাই!

ঋতুকন্যা হেমন্তে মধুর বাতাস ও সবুজ বনানী ক্রমেই ভিন্ন রূপ ধারণ করে। যৌবনের জলতরঙ্গ নৃত্যময় হয়ে ওঠে হেমন্ত সমীরণে। 

হেমন্ত আসে, মানুষের ভাগ্যের ও পরিবর্তন হয়। প্রকৃতি ঝরাপাতার গান শোনাতে থাকে। প্রকৃতির গালিচায় বাদামি, লাল, সোনালি পাতার রাশি। এ সময় ঝরাপাতার শব্দ ও হেমন্তের রং এক অন্যিরকম আমেজে প্রাণিত করে কবিদের।

 

শুষ্ক কঠিন প্রকৃতির পরিপূর্ণ রিক্ততা ও দিগন্তব্যাপী সুদূর বিষাদের প্রতিমূর্তি নিয়ে নিঃশব্দ চরণে হেমন্তের যেমন আগমন ঘটে,তেমনি বাঙালির ঘরে ঘরে সোনার ফসল দান করে রিক্ততার মধ্য দিয়ে শিশিরের মত নিঃশব্দ চরণে বিদায়ও গ্রহণ করে এই ঋতু।

হেমন্তের পরিণতি শীতের আগমনী গান। কুয়াশার চাদরে ঢাকা ঋতু শীতের দরজা খুলে দিয়ে আসে হেমন্তের বিদায়ের পালা। শীতের বুড়ি ঠকঠকিয়ে আসে সারা বাংলায় !

 

শাহান আরা জাকির পারুল 
নাট্যকার, লেখক ও গবেষক

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top