সিডনী রবিবার, ৩রা জুলাই ২০২২, ১৯শে আষাঢ় ১৪২৯

আদরের ছুটি : নবনীতা চট্টোপাধ্যায়


প্রকাশিত:
১৬ মে ২০২২ ১৬:২৩

আপডেট:
৩ জুলাই ২০২২ ১৫:০৮

 

এই কাহিনির শুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিবাহ বাসর দিয়ে। ২৪শে অগ্রহায়ণ, ১২৯০ সালে কলিকাতার জোড়াসাঁকোর  বৃহৎ দালানে কুলপ্রথানুসারে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের রূপবান, প্রতিভাবান কনিষ্ঠ পুত্রের সাথে খুলনা জেলার দক্ষিণডিহি গ্রামের বেণীমাধব রায়চৌধুরির (যিনি  আবার ঠাকুরবাড়ীর এস্টেটের কর্মচারী ও)  কিশোরী কন্যা ভবতারিণীর শুভ পরিণয়োৎসব সম্পন্ন হয়। পাত্র ও পাত্রীর পরিবারের অসম সামাজিক অবস্থা ছাড়াও এই বিবাহ তৎকালীন অন্যান্য সামাজিক বিবাহ থেকে একটু আলাদাই ছিলো।  এই বিবাহের নিমন্ত্রন পত্র অভিভাবক নয়, পাত্র স্বয়ং নিজের বয়ানে করেছিলেন এবং সেই নিমন্ত্রন পত্রে তাঁর স্বভাবগত কৌতুকের ছোঁয়া ও ছিলো। নিমন্ত্রণ পত্রটি ছিল এইরকম :


"প্রিয় মহাশয়,
আগামী রবিবার ২৪শে অগ্রহায়ণ তারিখে শুভদিনে শুভলগ্নে আমার পরমাত্মীয় শ্রীমান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শুভবিবাহ হইবেক। তদুপলক্ষে আপনি বৈকালে উক্ত দিবসে ৬নং জোড়াসাঁকোস্থ দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভবনে উপস্থিত থাকিয়া বিবাহাদি সম্পন্ন করিয়া আমাকে এবং আত্মীয়গণকে বাধিত করিবেন।
ইতি
অনুগত
শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর"


এছাড়াও এই বিবাহে অন্যদের মতো রবীন্দ্রনাথকে  কনের গৃহে যেতে হয়নি বিবাহ করতে।  জোড়াসাঁকোর  বাড়ীতে পশ্চিমের দালান ঘুরে ঐতিহ্যময় জমকালো পারিবারিক শাল গায়ে দিয়ে কবি বিয়ে করলেন ভবতারীণিকে। নিজেই নিজের বাসরে দরাজ গলায় গান ধরলেন 'আ মরি লাবণ্যময়ি/কে ও স্থির সৌদামিনী/পূর্ণিমা-জোছনা দিয়ে/মার্জিত বদনখানি/নেহারিয়া রূপ হায়/আঁখি না ফিরিতে চায়/অপ্সরা কি বিদ্যাধরী/ কে রূপসী নাহি জানি'। প্রথম শ্রেণী অবধি শিক্ষাপ্রাপ্তা গ্রাম্য নিস্পাপ সদ্য কিশোরীর  দুই চোখে তখন রূপকথার জগত দেখার বিস্ময়। চারিপাশে জরিদার বেনারসী ও গা ভর্তি গহনায় ঠাকুর পরিবারের অভিজাত মহিলাকুল।  আভিজাত্য ও সংস্কৃতি মিলেমিশে ঠাকুর পরিবারের নামে লোকে শ্রদ্ধায় মাথা নীচু করে।  তার উপর পরিবারের উজ্জ্বলতম জ্যোতিস্ক তার এই প্রতিভাবান স্বামী, তিনি কি পারবেন তাঁর যোগ্য  জীবন সাথী হতে?
বস্তুত তাঁদের উনিশ বছরের দাম্পত্য জীবনে মৃণালিনী আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছেন নিজেকে যথার্থ রবীন্দ্র ঘরণী করে তুলতে। বিবাহের পরেই কবি তাঁর ভবতারিণী নাম পরিবর্তন করে মৃণালিনী নাম রাখলেন। যেন পদ্মের মতো কোমলস্বভাবা এক নারী।  নিজে তাঁকে আজীবন ছুটি, ছোটো বৌ বলে ডেকেছেন। সবার ছোটো বলে জোড়াসাঁকোর পরিবারের সকলে তাঁকে আদর করে ছোটোবৌ বলে ডাকতেন। শুধু নাম নয়, পরিবর্তন করা হলো বেশভূষা, আচার আচরণ, মুখের ভাষা| মহর্ষির নির্দেশে  তাঁকে ঠাকুরবাড়ির উপযুক্ত করে তোলার ভার দেওয়া হলো জ্ঞাণদানন্দিনীর উপর। ইংরাজি শিক্ষার জন্য তাঁকে পাঠানো হলো লরেটো হাউসে। কবি হেমচন্দ্র বিদ্যারত্নকে ভার দিলেন মৃণালিনীর সংস্কৃত শিক্ষার। এছাড়াও পিয়ানো শিক্ষা, গানের শিক্ষা, ঠাকুরবাড়ির আদবকায়দা ইত্যাদির মাঝে ফুলতলি গ্রামের সেই গ্রাম্য কিশোরীটি নি:শব্দে কোথায় হারিয়ে গেলো। কবির ভ্রাতুস্পুত্র বলেন্দ্রনাথ ঠাকুর  ছিলেন পুস্তক পাগল। তিনি যে যে বই পড়তেন, কাকিমাকে তা পড়ে শোনাতেন। এমন কি  ইংরেজি উপন্যাস অনুবাদের কাজ ও শিখিয়েছিলেন। কবির কনিষ্ঠা কন্যা মীরা দেবি তাঁর স্মৃতিচারনায় উল্লেখ করেছেন "আর একটা ছবি মনে পড়ে, শান্তিনিকেতনে দোতলার গাড়িবারান্দার নীচে একটি টেবিল ল্যাম্প জ্বলছে। মায়ের হাতে একটা ইংরাজি নভেল। তার থেকে বাংলায় অনুবাদ করে দিদিমাকে শোনাচ্ছেন।" শুধু তাই নয় পরবর্তী জীবনে কবির অনুপ্রেরনায় মৃণালিনী দেবী অনুবাদ চর্চায় মন দিয়েছিলেন। শান্তিনিকেতনের রবীন্দ্রভবনে  কবিপত্নীর সেই অনুবাদ চর্চার খাতা এখনো সযত্নে রক্ষিত আছে। রবীন্দ্রনাথের 'রাজা ও রানি নাটকের প্রথম মঞ্চস্থ যখন হয়েছিল, মৃণালিনী  নারায়নীর ভূমিকায় জীবনে সর্বপ্রথম লাইমলাইটের সামনে এসে দাঁড়ালেন। তাঁর সপ্রতিভ সাবলীল অভিনয়ে উপস্থিত দর্শকেরা মোহিত হয়ে গেছিলো। যদিও এরপরে আর তাঁকে কোনোদিন অভিনয়ে অংশগ্রহণ করতে দেখা যায় নি। আসলে বিভিন্ন সৃজনশীলতা থাকলেও  তাঁর প্রধান ভালোবাসা ছিল স্বামী, পুত্রকন্যা, সংসারের সবাইকে নিয়ে এক মঙ্গলময় সংসারের  কল্যাণী নারী হওয়া। "বাড়ীর ছোটো হলে কী হয়, জোড়াসাঁকো বাড়ির তিনিই প্রকৃত গৃহিণী ছিলেন, কাকিমার কাছে সকলেই ছুটে আসত তাদের সুখ দু:খের কথা বলতে|সকলের প্রতি তাঁর সমদৃষ্টি ছিল। তিনি ছিলেন সকলের দু:খে দু:খী, সকলের সুখে সুখী, তাঁকে কোনোদিন কর্তৃত্ব করতে হয়নি, ভালোবাসা দিয়ে সকলের মন হরণ করেছিলেন"(পিতৃস্মৃতি/রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর)
আর দশটা সাধারন বাঙালি বধূর মতো মৃণালিনী দেবীও  স্বহস্তে বিবিধ পদের রান্না করে স্বামীকে খাওয়াতে ভালোবাসতেন। কবিও নানান ধরনের অভিনব রান্নার ফরমায়েশ করতেন স্ত্রীর কাছে।  কবিপত্নীর মুন্সিয়ানায় বাঙালি রান্নায় যোগ হলো  পরিবন্ধ মিষ্টান্ন, মানকচুর জিলাপি, দইয়ের মালপোয়া, পাকা আমের মিষ্টি ইত্যাদি। ঠাকুরবাড়িতে যখন খামখেয়ালি সভার অধিবেশন বসতো, কবি অভিনব সব ভোজ্য পদের ফরমায়েশ করতেন স্ত্রীর কাছে। কবিপত্নী ও মাথা খাটিয়ে নিত্য নতুন সুস্বাদু পদ  তৈরী করতেন। ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলে মৃণালিনী দেবীর রন্ধনপটুতার  সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল।
স্বামীর সাথে তাঁর দাম্পত্য জীবনের দিনগুলি খুব একটা নিরবচ্ছিন্ন স্থিতিশীল ছিল না। কখনো গাজীপুরে, কখনো শিলাইদহে, কখনো শান্তিনিকেতন বা জোড়াসাঁকোতে  কাটিয়েছেন। বিশ্বকবি তখন আরো বেশি ব্যস্ত। নানান সভাসমিতি, আন্তর্জাতিক ভ্রমণ, শান্তিনিকেতনে স্বপ্নের  শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন ইত্যাদি বিভিন্ন কর্মে  পরিব্যাপ্ত। বারবার সংসার পাল্টাতে হয়েছে, যাযাবরের মত জীবন যাপন করতে হয়েছে, কখনো স্বামীসঙ্গহীন একাকীত্বের বেদনা বহন করতে হয়েছে। সব কিছুই তিনি ধীর, স্থির, শান্ত, স্থিতভাবে গ্রহণ করেছেন। কখনো কোনো অভিযোগে বিদ্ধ করেন নি তাঁকে| এটাই ছিল তাঁর চরিত্রের এক মহান গুণ। অথচ স্বামীর প্রতিটি কাজে  তাঁকে সহযোগীতা করেছেন। শান্তিনিকেতনে আবাসিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় নির্দ্বিধায় তাঁর মূল্যবান গহনা দান করেছেন। রবীন্দ্রনাথ যে আদর্শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শান্তিনিকেতনে  গড়তে চেয়েছিলেন, প্রথমদিকে ঠাকুরবাড়ির অনেকের  কাছেই এটা রবির বড়লোকি খেয়াল মনে হয়েছিল। অনেকেই মনে করেছিলেন এই খেয়াল বেশিদিন স্থায়ী হবে না। পরিবারের মধ্যে এরজন্য মৃণালিনী দেবীকে অনেক সমালোচনার, প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়েছিলো। কিন্তু তিনি  সব অসুবিধা হাসিমুখে সহ্য করে কবির পাশে ছিলেন। সেদিন মৃণালিনী দেবী এগিয়ে এসে কবির পাশে না দাঁড়ালে  রবীন্দ্রনাথ তাঁর স্বপ্নের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিকে সফলতার সাথে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারতেন কি? কবি নিজেও একাধিকবার বিভিন্ন স্মৃতিচারণায় স্বীকার করেছেন"ছোটোবউকে অনেক কষ্ট সইতে হয়েছে, জানি একথা তিনি মনে করতেন না।" স্ত্রীর প্রতি কবির ভাবনালোক পরিস্ফুট হয়েছে মৃণালিনীকে লেখা তাঁর একাধিক পত্রের মাধ্যমে। এই সব পত্রে কবি তাঁকে 'ভাই ছুটি, ভাই ছোটবৌ, ছুটকি ইত্যাদি নামে অভিহিত করেছেন। রবীন্দ্রনাথের চিঠির উত্তরে লেখা মৃণালিনী দেবীর চিঠিগুলি বেশির ভাগই হারিয়ে গেছে। যে কয়টি চিঠি পাওয়া গেছে তা থেকে বোঝা যায় সহধর্মিণী থেকে সহকর্মিণী হয়ে উঠতে তাঁর চেষ্টার কোনো ত্রুটি ছিল না। ধীর, স্থির, শান্তস্বভাবা,মানসিক ভাবে দৃঢ সহধর্মিণীকে কবি ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা ও আস্থা করতেন। মৃণালিনী দেবীর চিঠির  ভিতর কবি খুঁজে পেতেন এক অসামান্য সুখ। তাই সময়মত চিঠির উত্তর না পেলে  রবীন্দ্রনাথ অস্থির বোধ করতেন। দুশ্চিন্তায় নানা রকম দু:স্বপ্ন দেখতেন। মৃণালিনী দেবীর  চরিত্রের মধ্যে এমন একটা চৌম্বকীয় শক্তি ছিল যা রবীন্দ্রনাথ কখনো অবহেলা করতে পারেন নি।
ইন্দিরা দেবীর লেখা থেকে  আমরা জানতে পারি শান্তিনিকেতনে থাকার সময়ে আগুনের তাতে দীর্ঘদিন রান্না করে করে  অত্যধিক পরিশ্রমে মৃণালিনী দেবীর অসুখের সূত্রপাত হয়। তাঁকে কলকাতায় আনা হয় চিকিৎসার জন্য। প্রায় দুই মাস তিনি শয্যাশায়ী ছিলেন। এই দুই মাস নার্স থাকা সত্বেও কবি নিজের হাতে তাঁর শুস্রুষা করেছিলেন। কিন্তু কবির সব চেষ্টা ব্যর্থ করে ১৯০২ সালে মাত্র  ঊনত্রিশ বছর বয়সে  বিদায় নিলেন কবিপত্নী মৃণালিনী দেবী।  পিছনে ফেলে গেলেন তাঁর প্রিয়তম শোকবিহ্বল বিশ্বকবি স্বামী,নাবালক সন্তান সন্ততি, অসংখ্য গুণমুগ্ধ  প্রিয়জন ও সাজানো সংসার।

 

নবনীতা চট্টোপাধ্যায়
পশ্চিম বঙ্গ, ভারত

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top