সিডনী সোমবার, ১২ই এপ্রিল ২০২১, ২৯শে চৈত্র ১৪২৭


চৈত্রের রোদ (নেপালি কবিতা) : ড. রেমিকা থাপা


প্রকাশিত:
২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ১৪:৫৭

আপডেট:
২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ১৫:০০

ছবিঃ কবি ড. রেমিকা থাপা এবং অনুবাদক বিলোক শর্মা

 

কবি ড. রেমিকা থাপা (মালবাজার কলেজ, পশ্চিমবঙ্গ)
অনুবাদ: বিলোক শর্মা (ডুয়ার্স, পশ্চিমবঙ্গ)

হাঁড়িতে জল গোড়া অবধি শুকিয়ে গেছে
পাখিটি পরিবহন করে চলেছে
তৃষ্ণার কণ!

ফুটপাথ থেকে ভিখারীটি
আকাশের অতিকায় রূপকে
মোহিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে
মনের বিশাল সিংহাসনে বসে
সে তারাদের কুড়িয়ে চলে
ন্যাতা কাপড়ে!

নিজের অগণিত যাত্রায় সিসিফস
অনেকবার আকাশকে দেখেছে
তার অভিশপ্ত পায়ের
ক্ষতচিহ্নগুলো দৌড়াতে দৌড়াতে সেই আকাশের নীলাভকে
পরিবহন করে চলে
অভিশপ্ত ধরিত্রীর কণ-কণ
সেই নীলের তৃষ্ণায়
কতটাই যে ব্যাকুল!

গোধূলীর তন্দ্রালু ধরিত্রী সেই নীলাভ রঙ গ্রহন করে
বিড়ম্বনার চুয়ানো হাঁড়িতে!

সর্বাঙ্গ নগ্ন অন্ধকারের নীচে
চ্যাপ্টা হয়ে ঘুমোয় একটি সুন্দরী রাত
অন্ধকারের কুরূপ তৃষ্ণায়
একটি ভগ্ন আকাশ নেমে এসে ক্ষিতিজের শরীরে চাবুক মারে
বর্বর অতিক্রমনের কোনায় কোনঠাসা হয়ে
কোনাকুনিতে মৃত্যুবরন করে একটি রানি রাত।

রক্তাক্ত হয়ে ফুলগুলো কোনো অবস্হায়
ঈশ্বরের চরণে পৌছায়
সন্দেশবাহক সারথী পায়রারা
বুদ্ধের কোলের খোজে খোঁড়াতে থাকে।

ঘড়ির প্রত্যেক টিকটিক আওয়াজে
ইহুদীর চেহারায় নেমে পড়া ধস
যেটি আদিম গুহার
অত্যাধুনিক বাথরুমে স্নান করতে যাচ্ছে।
জড়ো হয়ে বয়ে আসা বাতাসে
কাঁচা গন্ধের উপর বিজয়প্রাপ্ত করে
চাতকেরা উড়ে চলে
ওহ! তৃষ্ণার দংশ
প্রত্যেক প্রান্ত থেকে টেনে
আকাশকেই পান করতে চায়,
সর্বাঙ্গ নীল গঙ্গাকে
তৃষ্ণার এই দংশ!

গাছগুলোকে কমপ্লেক্স রয়েছে টাওয়ারদের সঙ্গে
যার লৌহ ডালে বসে
কোকিল ডাক দেয়
ক্রমাগত নীচু হওয়া গাছের পাতাগুলোকে ছলনা করে
শরদ বসন্তরা বাজারকে দেখে
মুদ্রাদের যাওয়া-আসার তাড়াকে দেখে
খবরের অক্ষরদের
তীক্ষ্ণ সংবাদকে শোনে
অক্ষরদের কলহের কোলাহল যত বাড়ে
বাজারের তৃষ্ণা তত তীব্র হয়
মানুষের ইচ্ছাও খুচরো পয়সার
চঞ্চল ছনছনানিতে তীব্রভাবে বাজতে থাকে
খুচরো ইচ্ছাগুলোর বাজারে পেটিতে বন্দী মানুষ
ইচ্ছারই দড়ির বন্ধনে গড়িয়ে পালিয়ে চলে।

সিদ্ধার্থ বেড়াতে বের হন
নিজেরই মনের কারাগারে
বন্ধ রয়েছে সারথী
পৃথিবীর পরিভাষাদের খুলে বেরিয়ে আসতে চায় না
মনের সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে
নিজের সঙ্গে হাঁটতেই চায় না নিজেরই ছায়া।

তৃষ্ণার হাজার রঙ
সাহারা মরুভূমি পেরিয়ে আসল
পাখিটি!
গঙ্গার তীরজুড়ে সারা দিন উড়ে চলল
সারাদিন জুড়ে পাখিটি
গুলমোহর গাছে
মাথা নীচু করে হাঁড়িতে দেখে
দেখা না পাওয়া নিজেরই শুষ্ক মুখ।

পাখিটি পরিবহন করে চলেছে
তৃষ্ণার কণ।

(কবি ড. রেমিকা থাপার নেপালি কবিতা 'চৈতকো ঘাম'--এর বঙ্গানুবাদ)

ড. রেমিকা থাপা: কবি ড. রেমিকা থাপা ভারতীয় নেপালি সাহিত্যে একজন অগ্রপঙ্ক্তির কবি। এখন অবধি তার 'বেদনাকো পছিল্তির' (২০০০), 'গাঁউমা কবিতাহরু' (২০০৭), 'কিনারাকা আওয়াজহরু' (২০০৮), 'মহাকাল সিসিফস' (২০২০)-চারটি কবিতা-সংকলন,  'পঠন বিপঠন' (২০১৩), 'ফরক বাটো' (২০১৯)- দুটি সাহিত্যিক আলোচনামূলক বই প্রকাশিত রয়েছে। এছাড়া, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'গীতাঞ্জলী' কাব্যগ্রন্হ ও একটি মৈথিলী গল্প সংকলন 'সরোকার'-কে নেপালিতে অনুবাদ করেন (যথাক্রমে ২০১০ ও ২০১১)। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের মালবাজার কলেজের নেপালি বিভাগে বিভাগ-অধ্যক্ষ হিসেবে কর্মরত।

বিলোক শর্মা: কবি বিলোক শর্মা ভারতীয় নেপালি সাহিত্যে কবি ও অনুবাদক হিসেবে পরিচিত। একটি নেপালি কাব্যকৃতি 'সময়াভাস' প্রকাশিত রয়েছে।পেশায় কৃষি-আধিকারিক শর্মা কবিতা লেখালেখির পাশাপাশি নিয়মিত নির্বাচিত নেপালি কবিতার বাংলায় অনুবাদ ও দেশ-বিদেশের পত্রিকায় প্রকাশনা করেন।



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top