সিডনী শুক্রবার, ২৬শে ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১৪ই ফাল্গুন ১৪২৭


আমি হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যকর্মে প্রভাবিত এবং তার জন্য আমি ধন্য : প্রচেত গুপ্ত


প্রকাশিত:
৯ ডিসেম্বর ২০২০ ১৬:০৩

আপডেট:
৯ ডিসেম্বর ২০২০ ১৬:০৮

ছবিঃ প্রচেত গুপ্ত ও সাইফুর রহমান

 

প্রচেত গুপ্ত (১৪ অক্টোবর ১৯৬২) একজন বাঙালি সাহিত্যিক এবং সাংবাদিক। তাঁর জন্ম কোলকাতার বাঙ্গুর অ্যাভিনিউতে একটি বৈদ্য পরিবারে। তিনি বাঙ্গুর বয়েজ স্কুলে পড়াশোনা করেছিলেন। তিনি ছোটবেলা থেকেই লেখালেখি আরম্ভ করেন। মাত্র বারো বছর বয়েসে তাঁর প্রথম গল্প আনন্দমেলা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক হন। ২০০৭ খ্রিষ্টাব্দে পরিচালক তরুণ মজুমদার তাঁর 'চাঁদের বাড়ি' উপন্যাসটি অবলম্বনে একটি বাঙলা চলচ্চিত্র তৈরি করেন। ২০১১ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর 'চোরের বউ' গল্পটি অবলম্বনে পরিচালক শেখর দাস 'নেকলেস' নামের একটি চলচ্চিত্র তৈরি করেন। তিনি সমকালীন বাংলা সাহিত্যের একটি পরিচিত নাম। তাঁর কিছু গল্প হিন্দি, ওড়িয়া এবং মারাঠি ভাষাতে অনূদিত হয়েছে। তিনি বাংলা পত্রিকা যেমন 'উনিশ কুড়ি', 'সানন্দা' এবং 'দেশ'-এর নিয়মিত লেখক সব মিলিয়ে বর্তমানে তার বইয়ের সংখ্যা ৫৬টি প্রচেত গুপ্তের জনপ্রিয় বইগুলোর মধ্যে- ‘আমার যা আছে’, ‘আশ্চর্য পুকুর’, ‘তিন নম্বর চিঠি’, ‘শূন্য খাম’, ‘রূপোর খাঁচা’, ‘চাঁদ পড়ে আছে’, ‘রাজকন্যা’, ‘ঝিলডাঙার কন্যা’, ‘যাদব বাবু মিথ্যে বলেন না’, ‘অপারেশন সিংহদুয়ার’, ‘চিরুনি’, ‘প্রিয় বান্ধবীকে’, ‘কল্যাণপুরের কাণ্ড’, ‘স্বপ্নের চড়াই’, ‘রানিপুরের কাপুরুষ’, ‘আমার পরাণ যাহা চায়’, ‘যাবজ্জীবন’, ‘এক যে ছিল সাগর’, ‘পাখির ডাক’, ‘কোথাও নয়’, ‘জলে অঙ্ক’, ‘ছাদে কে হাঁটেউল্লেখযোগ্য পশ্চিম বঙ্গের জনপ্রিয় এই কথাসাহিত্যিকের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বাংলাদেশের আরেক জনপ্রিয় কলামিস্ট গল্পকার সাইফুর রহমান এই দুই সাহিত্যিকের কথোপকথনের অংশবিশেষ পত্রস্থ হল

সাইফুর রহমান : মাত্র ১২ বছর বয়সে আপনার প্রথম গল্প প্রকাশিত হয় ‘আনন্দমেলা’ পত্রিকায়। কিন্তু উপন্যাস লিখলেন ৪২ বছর বয়সে। বারো থেকে বিয়াল্লিশ- এত দেরি কেন?

প্রচেত গুপ্ত : আলাদা করে কোনো কারণ নেই। খুব ছোটো থেকেই গল্প লেখার নেশা ছিল। এটা অনেকেরই থাকে। বোধহয় প্রচুর গল্পের বই পড়লে এমন হয়। আমি যে খুব একটা সিরিয়াস লেখালিখি করতে পারব এমনটা ভাবিনি। ইচ্ছে ছিল; কিন্তু নিজের ওপর ভরসা ছিল না। ১২ থেকে ৩২ বছর- এ সময়কালটা বেশিরভাগ সময়েই আমি ছোটদের জন্য গল্প লিখেছি। সেগুলোই যে ছাপা হতো বা ছাপতে দিতাম এমন নয়। বড়দের জন্য লিখেছি হাতেগোনা কয়েকটা। এখন সেসব পড়লে মনে হয়, না লিখলেই ভালো হতো। পরিণত নয়। এরপরের সাত আট বছর আমি প্রস্তুতি নিয়েছি। পড়েছি অনেক। দেশ-বিদেশের সাহিত্য বোঝার চেষ্টা করেছি। একজনকে কেন লিখতে হয়, আমি কেন লিখব, না লিখে অন্য কিছু করলেও তো হয়- এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে উপলব্ধির মধ্যে নেয়ার চেষ্টা করেছি। লিখেছি অল্প। মোটামুটি ৩৮-৪০ বছর বয়স থেকে সিরিয়াসভাবে লিখতে শুরু করি। স্বাভাবিকভাবেই উপন্যাস লিখেছি অনেকটা পরে।

লেখক হয়ে ওঠার গল্পটি যদি পাঠকদের শোনাতেন

: আমার বাড়ি ছিল লেখাপড়ার বাড়ি। বাবা ক্ষেত্রগুপ্ত ছিলেন রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। জাতীয় অধ্যাপক। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র অবস্থায় ছটি স্বর্ণপদক পেয়েছেন। তিনি আড়াইশ’টির কাছাকাছি প্রবন্ধের বই লিখেছেন। আমাদের দেশের তো বটেই বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়েও তিনি অতিথি শিক্ষক হয়ে গিয়েছিলেন। সেমিনার করেছেন। আমার মা জ্যোৎস্নাগুপ্ত রামমোহন কলেজে অধ্যাপনা করেছেন। তারও অনেক বই রয়েছে। সব মিলিয়ে আমাদের বাড়িতে বই পড়ার রেওয়াজ ছিল। বড়দের প্রচুর বই তো ছিলই, ছোটদেরও অনেক বই, পত্রিকা আসত। গোটা বিশ্বের বই। সেসব পড়তে পড়তে লিখতে ইচ্ছে করত। স্কুলে পড়ার বয়সে রোজ রাতে পড়াশোনার পর কিছু না কিছু নিজের মতো লিখতাম। লেখাটা একটা অভ্যেসের মতো হয়ে গিয়েছিল। ভেতর থেকে তাড়না অনুভব করতাম।

আপনি যে অঞ্চলটায় থাকতেন সেখানে আরও বসবাস করতেন নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, পুর্ণেন্দু পত্রী আর একটু এগিয়ে গেলেই পাওয়া যেত বিমলকরের বাড়ি। এই বিখ্যাত সাহিত্যিকরা আপনার প্রতিবেশী ছিলেন তারা আপনার লেখক হয়ে ওঠার পেছনে কি কোনো প্রেরণা জুগিয়েছেন?

: এদের কাছ থেকে এবং দূর থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। মুগ্ধ এবং বিস্মিত হতাম। এরা আমার কাছে বিরাট মাপের মানুষ ছিলেন। অবাক হয়ে ভাবতাম, এরা কীভাবে লেখেন? কীভাবে ভাবেন?

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের মতে প্রত্যেক লেখকেই উচিত একটা নিজস্ব ভাষা তৈরি করা। সেটার সূত্র ধরে বলা যায় আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তার ‘খোয়াবনামা’ লিখতে গিয়ে তৈরি করেছেন নিজস্ব একটি ভাষা। বিখ্যাত সাহিত্যিক অতীন বন্দোপাধ্যায়ের উপন্যাস পড়ে আরেক বিখ্যাত লেখক মুস্তফা সিরাজ অতীন বন্দোপাধ্যায়কে উদ্দেশ করে বলেছিলেন- ‘এ গদ্য পেলি কোথায়? আলাদা ঘ্রাণ আছে যে। নিশ্চয়ই চর্চা করেছিস।’ আপনার দৃষ্টিতে লেখকের এ নিজস্ব ভাষার গুরুত্ব কতটুকু?

: অবশ্যই। শুধু গদ্য নয়, সব বড় সৃষ্টিরই নিজস্ব ভাবনা, ভঙ্গি, প্রকাশ থাকতে হয়। লেখার তো বটেই। একজন লেখক জীবন-দর্শনকে নিজের মতো প্রকাশ করার জন্যই তো লেখেন। নইলে কেন লিখতে যাবেন? ছবি আঁকা, সিনেমা বানানোর মতোই নিজের কথা বলার জন্য নিজের ভাষা লাগে। আমি মনে করি, যখন একজন লেখকের নাম চেপে ধরেও তার লেখা চেনা যাবে, তখনই তিনি প্রকৃত ‘লেখক’।

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় হতে চেয়েছিলেন রিপোর্টার কিন্তু কালক্রমে হয়ে গেছেন একজন পুরুদস্তুর সাহিত্যিক। পেশা হিসেবে ‘সাংবাদিকতা’ বেছে নেয়ার কী কারণ

: স্কুলজীবনেই ঠিক করে ফেলেছিলাম, লিখব। একটি পয়সা উপার্জন করলে, তা করব লিখে। বাবা-মা লেখাপড়ার জগতের মানুষ হলেও আমি লেখাপড়ায় ফাঁকিবাজ ছিলাম। যাই হোক, লিখে বাঁচব, এই মনোভাব থেকেই সাংবাদিক হতে গিয়েছিলাম। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার পরীক্ষা দিইনি। ব্যাংক, রেলের চাকরির ফর্ম লুকিয়ে রাখতাম। আমার কিশোরী প্রেমিকা, বিয়ের পর গত বত্রিশ বছর ধরে যিনি আমার সঙ্গে রয়েছেন, তিনি সেই কিশোরবেলার প্রেমপর্বে আমাকে লেখক হিসেবেই দেখতে চাইতেন। কোনো সময় তথাকথিত বড় চাকরির জন্য চাপ দেননি। অনেক আর্থিক কষ্ট সহ্য করে আমাকে লিখতেই দিয়েছেন। রিপোর্টার হিসেবে একটা সময় পর্যন্ত আমি কিন্তু মন্দ ছিলাম না। এখন অফিসে যুগ্ম সম্পাদক হয়েছি, লেখক হিসেবে কিন্তু নয়। তবে কখনই আমি সাংবাদিকতা এবং সাহিত্যকর্মকে এক করিনি।

সাহিত্যিক ও আনন্দবাজার পত্রিকার একসময়ের সম্পাদক সন্তোষকুমার ঘোষ বলেছিলেন- সাংবাদিকতা লেখালেখির শত্রু। সন্তোষবাবু একসময় নিজের সাহিত্যকর্ম বিসর্জন দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন সাংবাদিকতায়। আপনার ক্ষেত্রে কি কখনও এরকম পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে?

: ওই যে বললাম, সাংবাদিকতা অনেকটা সময় কেড়ে নেয়। আমারও নিয়েছে। সেজন্যই তো সিরিয়াসভাবে গল্প-উপন্যাস লিখতে আমার চল্লিশ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে। অবশ্য একদিক থেকে ভালোই হয়েছে। জীবনকে দেখার, চেনার সময় পেয়েছি। শুনি, এখন নাকি কম বয়সেই কেউ কেউ লিখে প্রচুর বই বিক্রি করে ফেলেন। তাদের শুভেচ্ছা। তবে আমি বই বিক্রি করার জন্য কখনও লিখিনি। লিখতে পারতামও না।

সাহিত্যিক মতিনন্দী বলেছেন- বাংলাভাষায় ফুলটাইম লেখক হওয়া একটা অভিশাপ। এখন চাল-ডাল কিনতে যা টাকা লাগে একটা গল্প লিখে সেই টাকা আসে না। আপনার কী মনে হয়?

: বাংলায় লিখে বেঁচে থাকার মতো উপার্জন করা খুব কঠিন। খুব ভালো লিখেও লেখকরা অনাহারে থেকেছেন। এখন তো তা-ও কিছু অর্থ পাওয়া যায়, আগে তো অবস্থা ছিল ভয়াবহ। মনীষীসম লেখকরা দুর্দশার মধ্যে জীবন কাটিয়েছেন। চিরকালই লেখক শিল্পীদের এ কঠিন অবস্থার মুখোমুখি হতে হয়েছে। আমার মনে হয়, দারিদ্র্যকে না চিনলে সৃজনশীল কাজ করা কঠিন। ব্যতিক্রম নেই এমন নয়, রয়েছে। তবে উল্টো দিকের পাল্লার ভার বেশি।

গল্প-উপন্যাসের সূত্রগুলো কীভাবে আসে আপনার কাছে? যাকে সহজ কথায় প্লট বলে

: লিখে এবং না লিখে। কখনও মাথার মধ্যে খেলতে থাকে। ঘাড়ে চেপে বসে। তারপর লিখি। কখনও লিখতে বসে খুঁজে পাই। কোনো কথা, গান থেকেও লেখার বিষয় পাই। যেমন আমার একটা গল্প রয়েছে ‘মাঝে মাঝে তব দেখা পাই’। এই গানটা শুনতে শুনতে একদিন মনে হল এটা যদি একটা গল্প হয় কেমন দেখতে হবে? নিজের জন্যই লিখে ফেলি। একদিন একটা নির্মীয়মাণ ফ্লাইওভার দেখে মনে হল, এটার যদি প্রাণ থাকে এবং সে যদি সাপের মতো ভয়ংকর হয়? তাহলে কি নগর সভ্যতার মুখোমুখি হবে? এই রকম আর কী।

তবে কোনো ঘটনা দেখে বা শুনে গল্প-উপন্যাস আমি খুবই কম লিখেছি। অনেকে বলেন, নিজের অভিজ্ঞতাই লেখা উচিত। নিজে যা দেখি তার বাইরে লেখা হয় না। এ কথা আমি একদম মানি না। তাহলে তো শেকসপিয়রের সব নাটক ফেলে দেয়া উচিত। রবীন্দ্রনাথের গল্পেরও কোনো মানে থাকে না। ডিকেন্স বা অস্কারওয়ালইডের কী হবে?

ছবিঃ প্রচেত গুপ্ত ও সাইফুর রহমান

আপনার সঙ্গে বিভিন্ন সময় নানা আলাপচারিতায় লক্ষ করেছি লেখালেখি বিষয়ে আপনি সবসময় একটা ‘আলো’র কথা বলেন। সেই আলোটা আসলে কী?

: আমি মনে করি না, লেখকের কাজ শুধু বর্ণনা করা। চরিত্রের ভেতর লুকিয়ে থাকা আলোর সন্ধান তাকে করতেই হয়। আমি সে কাজ করি। কখনও সফল হই, কখনও পারি না। তবে এ চেষ্টা আমি নিরন্তর চালিয়ে যাব।

কবি জয় গোস্বামী যেমন বলেছেন- কবিতার চরিত্ররা একরকম আর উপন্যাসের চরিত্ররা অবশ্যই অন্য রকম। ‘সাঁঝবাতির রূপকথারা’ সবে দু’পাতা লিখেছি, তারপর বাড়িতে পাউরুটি দরকার- কিনতে গিয়েছি। ফিরছি যখন দেখলাম চিত্রশিল্পী অমিতাভ বন্দোপাধ্যায় হাতে করে আকা ক্যানভাস দোতলার ঘরে একপাশ থেকে অন্যপাশে রাখছেন। উনি দোতলায়, আমি নিচে রাস্তায়। ফিরে এসে লিখতে বসলাম আর আমার প্রধান চরিত্র একজন চিত্রকর হয়ে গেলেন। ‘সাঁঝবাতির রূপকথারা’ উপন্যাসে সৈকত একজন চিত্রকর। অমিতাভদা বোধহয় আজও জানেননা, আমি কাউকে স্টাডি করিনি-ভাবিনি কোনো চরিত্র নিয়ে। দৈব বশে এসে পড়েছে আমার সামনে। এই যে আমি রান্না করতে শিখিনি- আমার কখনও কখনও তাই মনে হয় আমি স্বাধীন হইনি এখনও। অথচ আমি স্বাধীন হতেই চাই পুরোপুরি। সব দিক দিয়ে। আমার চরিত্ররাও তাই চায়। কবিতার মধ্যে যে চরিত্রগুলো আসে সেসব চরিত্র আসে সময় ধরে হয়তো বা তাদের অনেক সময় ধরে স্টাডি করেছি। যেমন আমার ‘জগতবাড়ি’ কবিতা বইয়ের চরিত্ররা। উপন্যাসের ক্ষেত্রে কখনও এমন হয় না। শুরু হয়, চলতে থাকে। সত্যিকারের কোনো ঔপন্যাসিক একটা লেখাকে দু-পাঁচ বছর ধরে নিজের মধ্যে লালন করতে পারেন। আমি তো তা পারি।

: আমি যে দর্শনে, বিশ্বাসে, বোধে লিখতে বসি, আমার চরিত্ররা তাদের প্রয়োজনে আসতে থাকে। আমার কাছে চরিত্ররা গুরুত্বপূর্ণ নয়, আমি যা লিখতে চাই সেটা গুরুত্বপূর্ণ।

সাগর খুবই অলস একটি চরিত্র! বোহেমিয়ান। কিন্তু সহজ-সরল জীবন সাধারণত বাঁচতে চায়। সে কোনো বাধাধরা চাকরি-বাকরির মধ্যে নেই। নানা রকম অড জব করে রোজগার করে। আর ধারে খায়! কিন্তু সাগরের জীবন তো দুটো- একটা বাইরের জীবন, আরেকটা ভেতরের। সাগরকে নিয়ে আপনার উপন্যাসগুলো পড়লে মনে হয়, আমাদের সবার ভেতর-ই একজন সাগর আছে। সে সবসময় নানা রকম সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করে। হি ইজ আ প্রবলেম সল্ভার। আবার ক্ষমতাকে তাচ্ছিল্য করা, টাকাকে তুচ্ছ করা তার স্বভাব। পাশাপাশি সাগর আবার খুব প্র্যাকটিকাল। বাংলা সাহিত্যে যেমন শ্রীকান্তকে দেখা যায় যে, সে ভবঘুরে। নীললোহিতকে দেখা যায়, যে আরেকটু বেশি প্রেমিক। হিমু আবার মিষ্টিক্যাল। সাগরকে কিন্তু এই জায়গায় আমি বেঁধে রাখিনি। সাগর অলস, নৈর্ব্যক্তিক। সে ঘাপটি মেরে ঘুমোতে চায় ঠিকই; কিন্তু আবার কিছু একটা করতেও চায়। মঙ্গলই করতে চায়। সাগর কি তাহলে শ্রীকান্ত, নীললোহিত ও হিমুর মিশ্র সংস্করণ?

: শ্রীকান্ত, নীললোহিত, হিমুরা বাংলাসাহিত্যের কালজয়ী চরিত্র। পাঠকের ‘নয়নের মণি’ বললে কম বলা হবে। আমার সাগর চরিত্রের সঙ্গে এদের তুলনা করা বা মিশিয়ে ফেলা আমার পক্ষে গর্হিত অপরাধ হবে। আমি এমন একজনকে ভেবেছিলাম যে নিজে কিছু না করলেও অন্যের উপকারে কি লাগতে পারে? কোনো রোমান্টিসিজম বা মিস্টিক পথে নয়, করতে হবে বাস্তব উপায় দিয়ে। ইচ্ছের জোর অর্থ ক্ষমতার থেকে অনেক বেশি। এটা থেকেই আমার সাগর চরিত্র তৈরি। সে কিছু করবে। শুধু প্রেম নয়, রহস্যও নয়। সাগর একজন প্রবলেম সলভার। বাইরে অলস, ভেতরে পরিশ্রমী। বাইরে ঘাপটি মেরে ঘুমোয়, ভেতরে জেগে তাকে, বাইরে নৈর্ব্যক্তিক, ভেতরে ভীষণ কনশার্ন। সাগর ক্ষমতা, অর্থের অহমিকা, অসহায়ের প্রতি অন্যায়ের বিরুদ্ধে কড়া প্রতিবাদ করে। সে সমাজের বানানো, লোক দেখানো, প্রচারসর্বস্ব ভালো সাজার বিরুদ্ধে। আমি তাকে নিয়ে গল্পটা বলি, হালকা ভঙ্গিতে। তার মধ্যে আনন্দ বেদনা দুই থাকে। সাগর পড়ার আগে এবং সাগর পড়ার পর একজন পাঠক যেন সামান্য হলেও নিজেকে আলাদা ভাবে। যেন ভাবে, আমার কিছু নেই তো কী হয়েছে? আমিও তো কিছু করতে পারি। আমার মন রয়েছে, ইচ্ছে রয়েছে। তার মানে আমার সব আছে।

এই সুযোগে সাগরের বইয়ের কথা একটু বলে নিই। গত কলকাতা বইমেলায় আমার একটা বই বেরিয়েছে, ‘সাগরের সব আছে’ দেজ প্রকাশনের এই বইটিতে সাগরের চারটি উপন্যাস রয়েছে। একটি সাক্ষাৎকার রয়েছে। প্রচেত গুপ্তের সাক্ষাৎকারটি নিয়েছে খোদ সাগর। অভিযান প্রকাশনের বই রয়েছে ‘সাগর হইতে সাবধান।’

এক সময়ের জনপ্রিয় লেখক বিমল মিত্র আরেক জনপ্রিয় লেখক সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়কে উদ্দেশ করে বলেছিলেন- ‘উপন্যাসের স্ট্রাকচার কেমন হওয়া উচিত, ক্ল্যাসিকাল, কন্টিনেন্টাল, আমেরিকান উপন্যাস কেমন। তিনি বলতেন, উপন্যাস ঘরবাড়ির মতো। ধীরে ধীরে গড়ে তুলতে হয়। বিমলদাই সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়কে বলেছিলেন, ক্ল্যাসিকাল উপন্যাসের শ্রেষ্ঠ সম্পদ জমে আছে রাশিয়ান লিটারেচারে। আর তার প্রাণপুরুষ হলেন তলস্টয়। বিমলদা মাঝে মধ্যেই বলতেন, পড়তে হবে ভাই, মন দিয়ে পড়তে হবে। তার কারণ, প্রত্যেকটা লেখা তোমার মধ্যে তোমার লেখাকে জাগিয়ে তুলবে। বড় উপন্যাস লেখার আগে বিমলদা অন্য উপন্যাস পড়ে নিতেন। যেমন ক্ল্যাসিকাল গানের আগে আলাপ। উনি বলতেন, ‘দুটো গল্প লিখেই ভেবো না যে তুমি রাজা হয়ে গেছ।’ আমার প্রশ্ন হচ্ছে বর্তমান সময়ের লেখকরা পড়াশোানার সঙ্গে কতটুকু সম্পৃক্ত। তারা কতটুকু প্রস্তুতি নিয়ে লেখালিখির জগতে আসছেন।

: আমার বিশ্বাস অনেকেই লেখার আগে পড়েন। দুই বাংলার ক্ষেত্রেই এটা সত্য। এখন লেখকদের পড়ার প্রয়োজন বেড়েছে। এক ধরনের লেখার মূল উপপাদ্যই হচ্ছে ইনফরমেশন, রেফারেন্স, ইতিহাস, প্রযুক্তি। এটা খুব ভালো। তবে পড়লাম আরা উগরে দিলাম, সেটা সাহিত্য নয়। আত্মস্থ করতে হয়। যে লেখেক তার লেখা ‘আমি পড়েছি’ এটা প্রকাশ করে ফেলেন সেটা আর যাই হোক, সাহিত্য হয়ে ওঠে না। ওরকম আর একটা লেখা চলে আসে। মনে রাখতে হবে, বাংলা সাহিত্য বাঙালির, আন্তর্জাতিকতার দোহাই দিয়ে ইংরেজি বই, সিনেমা, ওয়েব সিরিজের অনুকরণ নয়। সময় বদলেছে, আমিও সাহিত্যকে বদলাব- এই ভাবানায় জোর করে চলতে গেলে বিপদ।

‘আমার যা আছে’ উপন্যাসটি আপনার প্রথম উপন্যাস। প্রায় ১৫ বছর আগেকার। একটা দড়িবাঁধা কম্পিউটারে লিখতে শুরু করেছিলেন! সেখানে ছিল, সাগর একটা বিরাট অফিসে গিয়েছে। তার সামনে দারোয়ানও রয়েছে। অফিসের মালিক সাগরকে ভেতরে ঢুকতে দিতে চায় না! দারোয়ান দিয়ে তাকে আটকাতে যায়। সাগর কিন্তু ঠিকই ভেতরে ঢুকে পড়ে এবং বেরুনোর সময় সেই দারোয়ানকেই স্যালুট ঠুকে দিয়ে যায়! এবার দারোয়ান তাতে ঘাবড়ে যাচ্ছে। আবার আরেকটা পর্বে দেখা যায়, একজন মন্ত্রী খুব সৎ একজন আইজিকে ট্রান্সফার করে দিয়েছে অন্যত্র। সাগর গিয়েছে সেই মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে। গিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করছে, ‘স্যার, আপনার লুঙ্গিটা কোথা থেকে কেনা’ মন্ত্রীর বড় ক্ষমতাকে পরোয়া না করে সাগর কিন্তু তাকে একটা ছোট জায়গায় নিয়ে আসছে। পুরোটাই একটা রসবোধের ওপর দাঁড়িয়ে। আপনি আপনার উপন্যাসে যে ধরনের রসবোধের সৃষ্টি করেছেন সে ধরনের টেকনিক কিংবা সেন্স অফ হিউমার সাধারণত হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসগুলোতে দেখা যায়। অনেকেই বলেন যে, আপনি হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যকর্ম দ্বারা প্রভাবিত।

: হ্যাঁ, আমি হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যকর্মে প্রভাবিত এবং তার জন্য আমি ধন্য। একইভাবে আমি শীষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের সাহিত্যকর্মে প্রভাবিত এবং ধন্য। আমি সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের সাহিত্যকর্মের গুণমুগ্ধ। তবে রবীন্দ্রনাথের গান থেকেই প্রভাবিত হই সব থেকে বেশি। পামুক, মুরাকামিতে আমি আছন্ন হয়ে পড়ি। মার্কেস ছাড়া আমি ম্যাজিক রিয়েলিজম্ বুঝতেও পারতাম না। আমি সব ভালো লেখক থেকেই অনুপ্রেরণা পাই। বা বলা ভালো, সব লেখকের ভালো লেখা থেকেই অনুপ্রাণিত হই। আমি সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের লেখা থেকে যেমন কথপোকথন শিখেছি, তারাপদ রায়ের লেখা থেকে শিখেছি রসবোধ। শীষেন্দু মুখোপাধ্যায়, হুমায়ূন আহমেদের জীবনবোধ আমাকে মুগ্ধ এবং বিষণ্ণ করে। সত্যজিৎ রায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, হুমায়ূন আহমেদের সহজ গদ্য আমাকে অবাক করে। কত সহজে পাঠকের কাছে পৌঁছে গিয়েছেন একবার ভাবুন তো। এরা সবাই মনীষীসম। তবে আবার বলছি, ভঙ্গি নয়, লেখকের জীবন দর্শনটাই আসল। নকল করে দুটো- তিনটে লেখা হয়, তার বেশি নয়। আসলে সাহিত্যকর্ম একটা ম্যারাথন দৌড়। একজন অন্যজনের হাতে মশাল তুলে দেন। সেই মশাল তার বোধের, উপলব্ধির।

অনেক নতুন লেখক দাবি করেন যে, ভালো লেখা সত্ত্বেও তাদের বইয়ের পর্যাপ্ত কাটতি নেই; কিন্তু সমরেশ মজুমদার এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন- ‘নতুন কিছু না দিলে পাঠক ছুড়ে ফেলে দেয়।’ আপনি এই সময়ের জনপ্রিয় লেখক হিসেবে বিষয়টি কীভাবে দেখেন?

: এই বিষয়ে আমি কী বলব? মাঝেমধ্যে ভাবি, আমি পাঠকের যে এত ভালোবাসা পাই, আমি কি তার আদৌ যোগ্য? মনে হয় না। জনপ্রিয় কাকে বলে আমি ঠিক জানি না। একজনের প্রিয় হওয়াটাও আমার কাছে জনপ্রিয়।

‘ঝিলেডাঙ্গার কন্যা’ উপন্যাসটি আপনার বেশ বড় একটি প্রয়াস। উপন্যাসটির কলেবরও বেশ বড়। পৃষ্ঠা সংখ্যা বোধকরি ৬৫২। এ উপন্যাসের উপজীব্য হচ্ছে- ঝিলডাঙা গ্রামের আশ্চর্য এক বালিকা- ফুল। ফুল নামের ফুটফুটে এ মেয়েটি বিপদের খবর আগাম বুঝতে পারে। বুঝতে পারে, ঝড়জঙ্গল কখন হবে, কখন আগুন লাগবে! প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি ভয়, লোভ, নিষ্ঠুরতার মতো মানবিক দুর্যোগেরও আগাম খবর পায় মেয়েটি। আর তার এ আশ্চর্য ক্ষমতার প্রেক্ষাপটেই এক অশান্ত, অস্থির, অগ্নিগর্ভ সময়ের চেহারা ক্রমে স্পষ্ট হতে থাকে। বিচিত্র সব চরিত্রের আগমন ঘটেছে এ উপন্যাসে! চিকিৎসক, স্কুল শিক্ষক, কুচক্রি পুলিশ অফিসার, নিষ্ঠুর গুন্ডা, দেহপসারিণী, টিভি কোম্পানির মালিক, লোভী রাজনীতিক, সব মিলিয়ে এক রঙিন ও বর্ণময় জগতের ছবি এঁকেছেন আপনি। আপনার কি আপনি উপন্যাসটি লিখে সন্তুষ্ট? আপনি কী মনে করেন ‘ঝিলেডাঙ্গার কন্যা’ বাংলা সাহিত্যে একটি বিশেষ স্থান করে নিতে পারে?

: এই প্রশ্ন করে আপনি আমাকে বিপদে ফেললেন। কোনো লেখা লিখেই কি সন্তুষ্ট হওয়া যায়? আর বাংলা সাহিত্যে কোন লেখাটা থাকবে, কোনটা হারিয়ে যাবে সে তো মহাকাল বলবে। আমি বলার কে? তবে এটুকু বলতে পারি ‘ঝিলেডাঙ্গার কন্যা’ উপন্যাসটি আমার খুব প্রিয়। লিখতে অনেক পরিশ্রম হয়েছে। একটা সময়কে ধরার চেষ্টা করেছি। আমার মনে হয়, দুনিয়াটা দু’ভাগে বিভক্ত। কেনা আর বেচা। আমরা চাই বা না চাই এই দুয়ের একদিকে আমরা থাকি। এতো কেনাবেচার মধ্যে থাকতে থাকতে মানুষ কি তার মানবিক গুণগুলোকে হারিয়ে ফেলে? এ উপন্যাসে আমি এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছি। ফুল নামের ছোট্ট মেয়েটি এখানে রূপক। সে আমাদের মনুষ্যত্বের প্রতীক। আমার আনন্দ, উপন্যাসটি আমার দেশে তুমুল জনপ্রিয় হয়েছে।

অনেক ঔপন্যাসিককেই দেখা যায় ঐতিহাসিক ঘটনাকে উপজীব্য করে উপন্যাস লেখার প্রতি ঝোঁক। আপনি এ পর্যন্ত কোনো ঐতিহাসিক উপন্যাস লেখেননি

: না। পরে যদি ভাবি চেষ্টা করব। তবে লিখলে ইতিহাস আত্মস্থ করে নিজের মতো করে লিখব। একটা বই থেকে ইতিহাস নিয়ে আর একটা বইতে লিখে দেব না।

চারদিকে নানা ধরনের বিনোদন মাধ্যম। তার ভিড়ে বইয়ের ভবিষ্যত কী?

: বই ছিল, আছে, থাকবে। সভ্যতার মতো।



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top