সিআরপি পরিদর্শনে অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী কামাল পাশা, প্রতিবন্ধী সেবায় দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ


প্রকাশিত:
২১ জুন ২০২৬ ১৭:৫২

আপডেট:
২১ জুন ২০২৬ ২১:২৫

ছবি: সিআরপির প্রধান কার্যালয় পরিদর্শন করেন অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী সমাজকর্মী ও মানবাধিকারকর্মী কামাল পাশা

বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও সমাজে অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে সেন্টার ফর দ্য রিহ্যাবিলিটেশন অব দ্য প্যারালাইজড (সিআরপি) দীর্ঘদিন ধরেই একটি আস্থার নাম। ১৯৭৯ সালে ব্রিটিশ ফিজিওথেরাপিস্ট ড. ভ্যালেরি অ্যান টেইলর (CBE, OBE)-এর উদ্যোগে মাত্র চারজন রোগীকে নিয়ে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি আজ দেশের অন্যতম বৃহৎ প্রতিবন্ধী পুনর্বাসন সংস্থায় পরিণত হয়েছে।

বর্তমানে দেশের ১২টি কেন্দ্রে সিআরপি চিকিৎসা, পুনর্বাসন, শিক্ষা, কর্মমুখী প্রশিক্ষণ, কমিউনিটি-ভিত্তিক পুনর্বাসন, গবেষণা এবং প্রতিবন্ধী অধিকার নিয়ে কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ১,১৮৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশই শারীরিক প্রতিবন্ধী, যা অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসংস্থানের এক অনন্য উদাহরণ।

২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে সিআরপি ২ লাখ ৩৫ হাজার ৯৯৮টি ফিজিওথেরাপি, ৫২ হাজার ৮৬৫টি অকুপেশনাল থেরাপি এবং ৪৮ হাজার ৭৭টি স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি সেবা প্রদান করেছে। একই সময়ে প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পুনর্বাসন কর্মসূচির মাধ্যমে ১ লাখ ২৯ হাজার ৪৭১ জন মানুষ সরাসরি উপকৃত হয়েছেন।

প্রতিষ্ঠানটির অধীন পরিচালিত বাংলাদেশ হেলথ প্রফেশনস ইনস্টিটিউট (BHPI) দেশের অন্যতম স্বনামধন্য অ্যালাইড হেলথ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। এখান থেকে প্রতিবছর ফিজিওথেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি, স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি, নার্সিংসহ বিভিন্ন বিষয়ে দক্ষ স্বাস্থ্য পেশাজীবী তৈরি হচ্ছেন।

সিআরপির বার্ষিক পরিচালন ব্যয় প্রায় ১০০ কোটি টাকা। এই অর্থের বড় অংশই দেশি-বিদেশি দাতা সংস্থা, ব্যক্তি ও উন্নয়ন সহযোগীদের অনুদানের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষায়িত পুনর্বাসন সেবার চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। তাই সিআরপির কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করতে সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বও গুরুত্বপূর্ণ।

এ প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি সাভারে সিআরপির প্রধান কার্যালয় পরিদর্শন করেন অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী সমাজকর্মী ও মানবাধিকারকর্মী কামাল পাশা।

পরিদর্শনকালে তিনি সিআরপির প্রতিষ্ঠাতা ড. ভ্যালেরি অ্যান টেইলর (CBE, OBE) এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মোহাম্মদ সোহরাব হোসেন-এর সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে সিআরপির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, বাংলাদেশে অ্যালাইড হেলথ পেশাজীবীদের দক্ষতা উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ, গবেষণা এবং অস্ট্রেলিয়া-বাংলাদেশের মধ্যে সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়।

কামাল পাশা বাংলাদেশ হেলথ প্রফেশনস ইনস্টিটিউট (BHPI)-এর বিভিন্ন বিভাগ পরিদর্শন করেন এবং শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মানের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ বাড়ানো গেলে বাংলাদেশি অ্যালাইড হেলথ গ্র্যাজুয়েটদের জন্য বৈশ্বিক কর্মক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হবে।

আলোচনায় ড. ভ্যালেরি টেইলর বাংলাদেশে Behaviour Management ও Positive Behaviour Support (PBS)-এর মতো বিশেষায়িত সেবার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ কাঠামো উন্নয়নে কামাল পাশার সহযোগিতা কামনা করেন। একই সঙ্গে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের পরিবার ও কেয়ারগিভারদের জন্য আন্তর্জাতিক মানের ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ চালুর বিষয়েও মতবিনিময় হয়।

বৈঠকে কামাল পাশা Friends of CRP–Australia (FCRP–Australia)-এর অগ্রগতির বিষয় তুলে ধরেন। তিনি জানান, সংগঠনটির আইনি নিবন্ধন ও কমপ্লায়েন্স কার্যক্রম অস্ট্রেলিয়ায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। ভবিষ্যতে এটি সিআরপির বৈশ্বিক সহযোগী নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে প্রশিক্ষণ, গবেষণা, দক্ষতা বিনিময়, স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রম এবং তহবিল সংগ্রহে কাজ করবে।

সফরে কামাল পাশার সঙ্গে ছিলেন বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী, সমাজসেবক এবং অতীশ দীপঙ্কর ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি-এর চেয়ারম্যান মো. শামসুল আলম লিটন। দীর্ঘদিন যুক্তরাজ্যে বসবাসের সুবাদে তিনি সিআরপির প্রতিষ্ঠাতা ড. ভ্যালেরি টেইলরের কর্মযজ্ঞের সঙ্গে পরিচিত। তিনি বলেন, একজন বিদেশি হয়েও ড. টেইলর আজীবন বাংলাদেশের প্রতিবন্ধী মানুষের সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করেছেন, যা মানবতার এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত। তিনি আশা প্রকাশ করেন, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়লে সিআরপি দেশের আরও প্রত্যন্ত অঞ্চলে সেবা সম্প্রসারণ করতে পারবে।

সফর শেষে কামাল পাশা বলেন, “সিআরপি বাংলাদেশের জন্য একটি গর্বের প্রতিষ্ঠান। তাদের কাজ শুধু পুনর্বাসনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং প্রতিবন্ধী মানুষের মর্যাদা, স্বাবলম্বিতা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি সফল মডেল। অস্ট্রেলিয়া ও বাংলাদেশের মধ্যে অ্যালাইড হেলথ, বিহেভিয়ার সাপোর্ট, কেয়ারগিভার প্রশিক্ষণ ও গবেষণায় যৌথ উদ্যোগ ভবিষ্যতে দুই দেশের জন্যই ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে। Friends of CRP–Australia সেই সহযোগিতার একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠবে বলে আমি আশাবাদী।”

উল্লেখ্য, কামাল পাশা বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার National Disability Insurance Scheme (NDIS)-এর একজন Behaviour Support Practitioner। গত ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি মানসিক স্বাস্থ্য ও প্রতিবন্ধী সেবাখাতে কাজ করছেন। পাশাপাশি তিনি NDIS নিবন্ধিত সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের কমপ্লায়েন্স, ক্লিনিক্যাল গভর্ন্যান্স, অডিট প্রস্তুতি ও ব্যবসা উন্নয়ন বিষয়ে পরামর্শ দিয়ে থাকেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে অস্ট্রেলিয়া ও বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী অধিকার, মানসিক স্বাস্থ্য এবং বহুসাংস্কৃতিক কমিউনিটির উন্নয়নে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছেন।


বিষয়:


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top