সিডনী সোমবার, ২৫শে জানুয়ারী ২০২১, ১২ই মাঘ ১৪২৭


আমার আমি : শায়লা সুলতানা


প্রকাশিত:
১১ জানুয়ারী ২০২১ ১৯:৩২

আপডেট:
২৫ জানুয়ারী ২০২১ ১৪:২৭

 

‘হ্যালো রুবা, শোন আমি তোর ভাইয়ের বাসা থেকে চলে যাচ্ছি। এক মাসের মধ্যে ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে দেব।’
‘ভাবী এসব কী বলছ? তোমার মাথার ঠিক আছে?’
‘হ্যাঁ, আমি ঠিক আছি।’
‘কোথায় যাবে তুমি? প্লিজ ভাবী মাথা ঠাণ্ডা কর।’
‘একটা রুম ভাড়া করেছি। আপাতত সেখানেই। উঠব। ভালো থাকিস। রাখছি।’
ফোন রেখে মারুফা গোছগাছ শেষ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

রুবার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হলেও দুশ্চিন্তায় পড়ে যায় সে। ভাবীকে তো এমন কঠিন হতে কখনো দেখেনি। ওর বয়স যখন নয় বছর তখন মেজো ভাইয়ের বউ হয়ে মারুফা আসে তাদের বাড়িতে। মেজো ভাই বিয়ে করার আগেই বড় ভাই -ভাবী আলাদা হয়ে গিয়েছিল। ফলে মেজোভাবীর পেছনেই সারাদিন ঘুরঘুর করতো। মা না থাকাতে ভাবীর আঁচলের তলাই ওর মায়ের আঁচলের তলা হয়ে যায়। সন্তানের মা হবার আগেই মারুফাও যেন মাতৃত্বের স্বাদ অনুভব করত রুবার ঘোরঘুরি আর গা ঘেঁষাঘেঁষিতে। এখন একই শহরে আধঘন্টার পথের দূরত্বে রুবার বাসা। ভাইয়ের চেয়ে ভাবীই তার বেশি আপন। অন্য ভাবীদেরকেও এমন করে কাছে পায়নি। তাছাড়া বিয়ে-শাদি করে সবাই যার যার মত নিজেদের সংসার গোছাতে ব্যস্ত ছিল। বড় দুই বোনেরও অনেক আগেই বিয়ে হয়ে গেছে। তারাও সংসার ফেলে বাবার বাড়িতে আসার সময় তেমন একটা পায়নি। সবকিছু মিলিয়ে মেজোভাবী তার ভাবী, মেজোভাবীই তার মা। রুবার যখন ইচ্ছা হয় হুটহাট মারুফার কাছে চলে যায়। আজ ভাবীর ফোনটা পাওয়ার পর থেকে খুব অস্থির লাগছে। মেয়েটাকে স্কুল থেকে আনতে যেতে হবে। অতটা দেরিও সহ্য হচ্ছে না। স্বামীকে ফোন করে বলল, ‘শামীম তোমার যত সমস্যাই থাকুক ছুটির পরে মৌরিকে বাসায় নিয়ে এসো। আমার এক্ষুনি একটু ভাবীর ওখানে যেতে হবে। এসে তোমাকে সব বলব। রাখছি বাই।’

 

‘ভাইয়া কোথায়, ভাবী?’
‘তিনদিনে ট্যুরে গিয়েছে সিলেটে।’
‘ভাবী তুমি এমন একটা সিদ্ধান্ত নিচ্ছ। ভাইয়ার কথা না হয় বাদই দিলাম। সীমান্ত, প্রশান্ত আর আমার কথাও একটু ভাবছ না?’
‘তোরা তো এখন বড় হয়েছিস। তোদের কথা ভেবে ভেবেই তো সিদ্ধান্তটা নিতে একত্রিশ বছর লেগে গেল।’
‘ভাবী প্লিজ তুমি এমন সিদ্ধান্ত নিও না।’
‘নারে এভাবে আর আটকাস না। এতটা বছর ধরে মেনে নিয়ে নিয়ে মরে মরে বেঁচে আছি। যেটুকু অবশিষ্ট আছে একটু হাত পা ছড়িয়ে নিঃশ্বাস নিয়ে বাঁচতে দে। আমাকে বাঁধা দিস না।’
‘কিন্তু তোমার কীসের এত কষ্ট ভাবী?’‘রুবা, বিয়ের পর থেকে যে শারীরিক আর মানসিক নির্যাতন সহ্য করেছি। এখন আর তার এক কোণাও সহ্য করতে পারি না রে।’

‘কী বলছ ভাবী? কোনোদিন তো কিছুই বুঝিনি।’

‘হ্যাঁ, এই দিক থেকে তোর ভাইয়া খুব ভালো যে তোদের সামনে কখনো কিছু করেনি।’

 

বিয়ের পর প্রথম রাতে মারুফার স্বামী তার উপর হামলে পড়ে যে পাশবিকতা করেছিল, সেটা কোনো সুস্থ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। তবে রাতের বিভীষিকা আড়াল হয়ে গিয়েছিল পরদিন রুবা আর শ্বশুরের মুখের দিকে তাকিয়ে। এরপর প্রতিটি রাত, প্রতিটি সকাল একই ভাবে আসতে থাকলো মারুফার জীবনে। কিছুদিন যাওয়ার পর নেশা করে ঘরে ফিরতে শুরু করল আশরাফ। মুখ ফুটে সামান্য প্রতিবাদ করলেই চলতো অকথ্য শারীরিক নির্যাতন। কোনোরকম শব্দ করলে মাত্রা বেড়ে যেত দ্বিগুণ। কতবার ভেবেছে , সকাল হলে কেউ আর তাকে দেখবে না। এই ফ্ল্যাট, এই ঘরের প্রতিটি জিনিসেই মারুফার স্পর্শ আছে কিন্তু সে শুধু এর কোথাও নেই।

 

ভাবীর মুখে এসব কথা শুনে রুবার বুক ভেঙ্গে যায়। অস্ফুটে উচ্চারণ করে, ‘কেন তুমি তখনই চলে যাওনি?’

‘তোর আর বাবার প্রতি কী এক সর্বগ্রাসী মায়া আর দায়িত্বর বেড়াজালে জড়িয়ে গেলাম যে সকালে উঠে চুলায় রান্না চাপাতে চাপাতে বাবা এসে যখন বলতো, ‘মা, তোমার শাশুড়ি বেঁচে থাকলে তোমাকে এভাবে প্রতিদিন সকালে চুলা ঠেলতে হত না’, তখন বাবার সেই দরদমাখা কণ্ঠ আমাকে কেমন করে যেন রাতের সব কষ্ট ভুলিয়ে দিত। তাছাড়া নিজের বাবা মারা যাবার পর মা এত কষ্ট করে লেখাপড়া শিখিয়ে আমাকে একজন শিক্ষিত সুদর্শন ছেলের কাছে বিয়ে দিয়েছেন। সেই মায়ের বোঝা হতে আর ইচ্ছে করেনি। বরং মনে হত একটা চাকরি করে যদি মাকে একটু সাহায্য করতে পারতাম। কিন্তু  চাকরির চেষ্টা করারও তখন সুযোগ ছিল না। একদিন আমার মাথার আঁচল সরে যেতে কনুইয়ের উপরে ব্লাউজের হাতার নিচে কালো জখম দেখে তুই বললি, ‘ভাবী এখানে কী হয়েছে?’ আমি তাৎক্ষণিক সংগত কোনো মিথ্যে কথা খুঁজে না পেয়ে বললাম, ‘গরম তেলের ছিটা লেগেছে।’

তুই তখনো জানিস না তেলের ছিটা হাতের অতটা উপরে কখনো লাগে না। এজন্য আরো মিথ্যে বলা থেকে সেদিন রক্ষা পেয়েছিলাম।
‘মা, তোমার কপালে কী হল?’ বাবার সেই গম্ভীর কণ্ঠের প্রশ্নে থতমত খেয়ে বললাম, ‘বাবা দরজার কানিতে গুতো খেয়ে দাগ হয়ে আছে।’
‘একটু সাবধানে চলবেনা?’
‘চিন্তা করবেন না বাবা। মলম লাগিয়েছি। ঠিক হয়ে যাবে।’
বাবাকে কেমন করে বলি, ঘরের পুরনো কাসার ফুলদানিটা আপনার ছেলে আমার কপালে ছুড়ে মেরেছে। গলগল করে আধপোয়াটেক রক্ত পড়ে এমন বিভৎস একটা ক্ষত হয়ে আছে।
কখনো শার্ট ইস্ত্রি না থাকা, কখনো জুতো মুছে দিতে দেরি হওয়া, কখনো অফিস থেকে ফিরে টেবিলের জগে পানি না পাওয়া এগুলো ছিল আমার জন্য শারীরিক শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

দু'একদিনের জন্য আমাকে মায়ের কাছে নিয়ে যাওয়ার সময় তার কোনোদিনই হয়নি । তোর মনে আছে কিনা জানিনা, একবার মায়ের অসুস্থতার খবর পেয়ে বাবাকে বলতেই বাবা বললেন, ‘রুবাকে নিয়ে আজই যাও । কয়েকদিন থেকে আস মায়ের কাছে।’

আমতা আমতা করে বললাম, ‘বাবা, আপনার ছেলেকে না জানিয়ে- ’

‘তোমাকে সে নিয়ে ভাবতে হবে না,’ বাবার অভয় পেয়ে পাশের বাড়ির রেখার মাকে বললাম দু’একদিন রান্না করে দিতে। বিপদে আপদে সেই ছিল আমাদের ভরসা। আমার আর তর সইছিল না। আধঘন্টার মধ্যে মোটামুটি গোছগাছ করে তোকে নিয়ে মায়ের কাছে ছুটে যাই। ফিরে আসি দু’দিন পরেই।’

 

‘বাবার বাড়ি থেকে ফিরে আসার কী দরকার ছিল? আমার খেয়ে, আমার পরে আমার অনুমতি ছাড়া বাপের বাড়ি যাওয়া?’

মুখ খিঁচিয়ে বলতে বলতে আমার চুলের মুঠি ধরে দেয়ালের মধ্যে ছুড়েঁ মারে। দেয়ালের সাথে সেঁটে ভীতবিহ্বল চোখে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলাম। প্যন্ট থেকে বেল্ট খুলে ঝেড়ে বাড়ি বসাল আমার দুই পাশের দুই থাইয়ের মধ্যে।  শক্ত করে মুখ চেপে ধরাতে আমার বুকফাঁটা চিৎকার বুকের ভেতরেই গুমরাতে থাকলো।

‘উঃ! ভাবী আর বলো না। আমি আর শুনতে পারছি না।’

‘বাবা চলে গেলেন, তোর বিয়ে হয়ে গেল। আশরাফের প্রমোশন হওয়াতে আমরা শহরে চলে এলাম। নিজের চেষ্টায় আমার ব্যাংকের চাকরিটাও হলো। কিন্তু তখনও মুক্তির কোনো পথ খোলা ছিল না। কারণ ততদিনে আমি দুই ছেলের মা। সীমান্তর বয়স তখন ছয় আর প্রশান্তর চার। ওদের স্কুলে ভর্তি করা,  আনা নেওয়া করা, ওদের পড়ানো কোনো কিছুতেই এতটুকু সাহায্য পাইনি। গায়ে হাত উঠা বন্ধ হলেও চাকরি, বাচ্চা সব সামলিয়ে একটু এদিক সেদিক হলেই গঞ্জনা, অপমানের শেষ থাকত না।

তুই যখন এই শহরে এলি তখন সীমান্ত, প্রশান্ত বড় হয়ে গেছে। হয়তো তাদের বাবার সাহচর্য পায়নি বলে স্বভাব চরিত্রে তার মত হয়নি। বিদেশে থাকলেও দায়িত্বে এতটুকু অবহেলা নেই ওদের। সবকিছুতে শেয়ার করার পরও আশরাফের অর্থ আর পৌরুষের দম্ভে আমি বড্ড ক্লান্ত। রুবা, আমি এটাও প্রমাণ করতে চাই যে, বাড়ি, গাড়ি, অর্থকে আমি জীবনের চেয়ে কখনো বড় করে দেখিনি। আমার ইচ্ছা-অনিচ্ছা, ভালো লাগা-খারাপ লাগা কোনোকিছুই ওর কাছে বিবেচ্য না। আমার অর্থ আর আমার শরীর ছাড়া ওর কাছে আমার কোন মূল্যই নেই। কিন্তু আমার যে শরীর এত অত্যাচার সহ্য করেছে সেই শরীর আজ মনের উপরে হানা এতটুকু আঘাত, এতটুকু অপমান আর  সহ্য করতে পারছে নারে।

আমার দুঃখগাঁথা শুনলে সমাজের মানুষ কটাক্ষ করে বলতো, মেরদণ্ডবিহীন নারী। এত সহ্য করেও স্বামীর সংসারে থাকতেই হবে? আর এখন আমি যখন সংসার ছেড়ে চলে যাচ্ছি তখন সমাজ বলবে, পুরুষ মানুষ একটু এদিক সেদিক হতেই পারে। তাই বলে মেয়েমানুষের সংসার ছেড়ে যেতে হবে?

ছি! ছি! ছি!সেসব আর আমি তোয়াক্কা করি না।
‘আমার ঘর’ বলে একটা ঘর থাকবে আমার। যেখানে আমার ‘আমি’ বলে একটা সত্তা থাকবে। যেখানে সবকিছুতে আমি থাকব। যে ঘরের জানালায় দাঁড়িয়ে আমি একটা নীল আকাশ দেখতে পাবো, পারবো বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে।’

মারুফাকে জড়িয়ে ধরে ফুপাতে ফুপাতে রুবা বলে, ‘ভাবী আমি কী স্বার্থপর। তোমার কাছ থেকে নিজের সবটুকু সুখ শুষে নিয়েছি। অথচ কষ্টের প্রলেপে ঢাকা তোমার মনটাকে কখনো ছুঁয়ে দেখার চেষ্টাও করিনি। তোমাকে আর আমি বাঁধা দেব না। তুমি তোমার মতো করে বাঁচ। পারলে আমাকে ক্ষমা করে দিও।’

রুবার পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে ধরাগলায় মারুফা বলে, ‘পাগলী। এমন করে কেন বলছিস? ভালো থাকিস।’

রুবা আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না । মারুফার বাহুবন্ধন থেকে নিজেকে মুক্ত করে দ্রুত বেরিয়ে গিয়ে রিক্সায় উঠে। চোখ মুছতে মুছতে ফোলা চোখে বাসায় ঢুকে নিজের বিছানায় আছড়ে পড়ে। চার দেয়াল ভেদ করে তার বুকফাঁটা কান্নার শব্দ ছড়িয়ে যায় বৃক্ষ-পাতায়, আকাশে-বাতাসে, সুদূর কোনো চরাচরে।

মারুফা তার আপন ঘরে সেদিনকার মত মেঝেতে তোষক ফেলে একটা চাদর বিছিয়ে তাতে গা এলিয়ে দেয় নির্ভার, নিশ্চিন্তে। সকালের এক টুকরো নরম রোদের উষ্ণতায় ঘুম ভাঙলে তার কাছে মনে হয়, এক রাতের একটানা নির্মল ঘুম মানুষকে এতটা তৃপ্তি দিতে পারে, এই রাতটা এমন করে তার জীবনে না এলে কোনোদিন হয়তো সে বুঝতেই পারতো না।

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top