সিডনী শুক্রবার, ৩০শে জুলাই ২০২১, ১৫ই শ্রাবণ ১৪২৮


মনের পশুত্ব বিসর্জনই হউক কোরবানির আসল শিক্ষা : মোঃ শামছুল আলম


প্রকাশিত:
১৫ জুলাই ২০২১ ১৫:১৬

আপডেট:
৩০ জুলাই ২০২১ ১৬:৪২

 

আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা লাভের উদ্দেশ্যে কিছু বিসর্জন দেয়াকে কোরবানি বলা হয়। আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান (ছাহেবে নিসাব) ব্যক্তির উপর কোরবানির হুকুম পালন ওয়াজিব।সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কেউ যদি কোরবানির মতো ইবাদত থেকে বিরত থাকে, তাহলে সে ব্যক্তি গুনাহগার হবেন।

আদি পিতা আদম (আঃ)-এর দুই পুত্র কাবীল ও হাবীলের দেওয়া কুরবানী থেকেই কুরবানীর ইতিহাসের গোড়াপত্তন হয়েছে। তারপর থেকে বিগত সকল উম্মতের উপর এটা জারী ছিল। আমাদের উপর যে কুরবানীর নিয়ম নির্ধারিত হয়েছে, তা মূলতঃ ইবরাহীম (আঃ) কর্তৃক শিশু পুত্র ইসমাঈল (আঃ)- কে আল্লাহর রাহে কুরবানী দেওয়ার অনুসরণে ‘সুন্নাতে ইবরাহীমী’ হিসাবে চালু হয়েছে। 
মক্কা নগরীর জনমানবহীন ‘মিনা’ প্রান্তরে আল্লাহর দুই আত্মনিবেদিত বান্দা ইবরাহীম ও ইসমাঈল আল্লাহর কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মাধ্যমে তুলনাহীন ত্যাগের যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, বর্ষপরম্পরায় তারই স্মৃতিচারণ হচ্ছে ‘ঈদুল আযহা’ বা কুরবানীর ঈদ।
আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণের প্রকৃষ্ট নমুনা এই কুরবানীতে প্রতীয়মান। তাই কুরবানী বলা হয় ঈদুল আজহার দিনগুলোতে নির্দিষ্ট প্রকারের গৃহপালিত পশু আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের জন্য জবেহ করা। ইসলামি শরিয়তে এটি এবাদত হিসেবে সিদ্ধ, যা কুরআন, হাদীস ও মুসলিম উম্মাহর ঐক্যমত দ্বারা প্রমাণিত।
কুরআন মজীদে যেমন এসেছে -
'তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় কর ও পশু কুরবানী কর।’
সুরায়ে কাউসারে আল্লাহ তায়ালা হুজুর সা. কে হুকুম করে বলেন-
নিশ্চয় আমি আপনাকে হাউজে কাউসার দান করেছি। অতএব আপনার পালনকর্তার উদ্দেশ্যে নামাজ ও কুরবানি আদায় করুন।
আল্লাহ তাআলা অন্য আয়াতে বলেন- হে আমার হাবিব আপনি বলুন যে, অবশ্যই আমার নামাজ, আমার কুরবানি, আমার জীবন, আমার মরণ, সব কিছুই মহান প্রতিপালকের জন্য। (সূরা আনআ’ম- ১৬২)
আল্লাহ তাআলা আরো বলেন- তারা কতক নির্দিষ্ট দিনে গৃহ পালিত চতুষ্পদ জন্তুর মাধ্যমে আল্লাহকে স্মরণ করে। (সুরা হজ্ব: আয়াত- ২৮)
আল্লাহর কাছে (কুরবানীর পশুর)) গোশত ও রক্ত পৌঁছে না বরং তোমাদের অন্তরের তাকওয়া পৌঁছে থাকে। (সূরা হজ্ব, আয়াত- ৩৭)
রাসুল সা. হাদিসে বলেন, হযরত আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন-
কুরবানির দিন পশু কুরবানির চাইতে আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয় আর কোন আমল, নেই। কেয়ামতের দিন জবেহ করা পশুকে তার শিং ও খুরসহ হাজির করা হবে। কুরবানির জন্তুর রক্ত জমিনে পড়ার আগেই তা আল্লাহর কাছে কবুল হয়ে যায়। সুতরাং তোমরা খোলা মনে এবং সন্তুষ্টি চিত্তে কুরবানি কর। (মেশকাত শরীফ )

হাদিসে আরো আছে- হুজুর সা. ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি স্বচ্ছল ও কুরবানি করতে সক্ষম, অথচ কুরবানি করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহে উপস্থিত না হয়। (বাইহাকী )

কুরবানির আত্মত্যাগের এ পরীক্ষায় সফলকাম হয়েছিলেন মুসলিম জাতির পিতা হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম। আর তিনি ‘খলিলুল্লাহ’ বা আল্লাহর প্রিয়বন্ধু উপাধি লাভ করেছিলেন।
কুরবানির বিধান সব নবি-রাসুলদের শরিয়তেই বিদ্যমান ছিল। পবিত্র কুরআনে পাকে কুরবানির বিধানের প্রমাণ পাওয়া যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন-

‘আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্যে কুরবানির এক বিশেষ রীতি পদ্ধতি নির্ধারণ করে দিয়েছি, যেন তারা ওই সব পশুর ওপর আল্লাহর নাম নিতে পারে, যা আল্লাহ তাদেরকে দান করেছেন।’ (সুরা হজ : আয়াত ৩৪)

আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় বান্দাদেরকে যাচাই-বাচাইয়ে ‘কুরবানি’কেই মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। যেমনিভাবে তিনি হজরত আদম আলাইহিস সালামের সময় তার দুই পুত্র হাবিল ও কাবিলের মাঝে কুরবানির বিধান দিয়েছিলেন। যা ছিল মানব ইতিহাসের প্রথম কুরবানি। যেখানে আল্লাহ তাআলা হাবিলের কুরবানিকে গ্রহণ করেছিলেন। আল্লাহ তাআলা বলেন-

‘হে রাসুল! আপনি তাদেরকে আদমের দুই পুত্রের বৃত্তান্ত যথাযথভাবে পাঠ করে শুনান। যখন তারা উভয়েই কুরবানি করেছিল, তখন একজনের কুরবানি কবুল হল এবং অন্যজনের কুরবানি কবুল হল না।
সে (কাবিল) বলল, আমি তোমাকে অবশ্যই হত্যা করব। অপরজন (হাবিল) বলল, অবশ্যই আল্লাহ মুত্তাকিদের কুরবানি কবুল করেন।সে (হাবিল) বলল, যদি তুমি আমাকে হত্যা করতে আমার দিকে হাত বাড়াও, তবুও আমি তোমাকে হত্যা করতে তোমার দিকে হাত বাড়াবো না। কেননা আমি বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করি।’ (সুরা মায়েদা : আয়াত ২৭-২৮)

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায় বলতে হয়-

‘তোরা ভোগের পাত্র ফেলরে ছুঁড়ে, ত্যাগের তরে হৃদয় বাঁধ’।

মানুষ আল্লাহর জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করবে, এই শিক্ষাই ইবরাহীম (আঃ) আমাদের জন্য রেখে গেছেন। মহানবী মুহাম্মাদ সাঃ আমাদের জন্য ঐ ত্যাগের আনুষ্ঠানিক অনুসরণকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন। আর ঈদুল আযহার মূল আহবান হ’ল সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ আনুগত্য প্রকাশ করা। সকল দিক হ’তে মুখ ফিরিয়ে এক আল্লাহর দিকে রুজু হওয়া। সম্পদের মোহ, ভোগ-বিলাসের আকর্ষণ, সন্তানের স্নেহ, স্ত্রীর মুহাববত সবকিছুর ঊর্ধ্বে আল্লাহর সন্তুষ্টি প্রতি আত্মসমর্পণ করে দেওয়াই হ’ল ঈদুল আযহার মূল শিক্ষা।

স্বামী, স্ত্রী ও শিশুপুত্রের গভীর আত্মবিশ্বাস, অতলান্তিক ঈমানী প্রেরণা, আল্লাহর প্রতি নিশ্চিন্ত নির্ভরতা ও অবশেষে আল্লাহকে খুশী করার জন্য তাঁর হুকুম মোতাবেক জীবনের সর্বাধিক প্রিয় একমাত্র সন্তানকে নিজ হাতে যবহ করার কঠিনতম পরীক্ষায় উত্তরণ-এসবই ছিল আল্লাহর প্রতি অটুট আনুগত্য, গভীর আল্লাহভীতি এবং নিজের তাওহীদ ও তাকওয়ার সর্বোচ্চ পরাকাষ্ঠা। ইবরাহীম (আঃ) আল্লাহর হুকুমে পুত্র কুরবানী করেছিলেন। মূলতঃ তিনি এর দ্বারা পুত্রের মুহাববতকে কুরবানী করেছিলেন। আল্লাহর ভালোবাসার চাইতে যে পুত্রের ভালোবাসা বড় নয়, এটিই প্রমাণিত হয়েছে তাঁর আচরণে। আল্লাহ এটাই চেয়েছিলেন। আর এটাই হ’ল প্রকৃত তাক্বওয়া বা আল্লাহভীতি।

৯৯ বছরের বৃদ্ধ হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম তার প্রাণপ্রিয় পুত্রকে কুরবানি করে সারা দুনিয়াকে এ সংবাদ দিয়ে গেলেন, যে আল্লাহ নির্দেশে আত্মত্যাগের বিকল্প নেই। আল্লাহর পক্ষ থেকে যে নির্দেশই আসুক তা পালনে একনিষ্ঠ হওয়াই প্রকৃত ইবাদত। তাইতো তিনি মিনা প্রান্তরে প্রাণাধিক সন্তানকে কুরবানি করে আল্লাহর নির্দেশ পালন করেছিলেন। আল্লাহ তাআলা হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামের আত্মত্যাগে খুশি হয়ে প্রাণপ্রিয় সন্তান হজরত ইসমাইলের পরিবর্তে জান্নাতি দুম্বায় কুরবানি কবুল করেছিলেন। আল্লাহ তাআলা বলেন-

‘আর আমি তার (ইসমাইল আলাইহিস সালামের) পরিবর্তে জবেহযোগ্য এক মহান জন্তু দিয়ে তাকে মুক্ত করে নিলাম। আর এ বিষয়টি পরবর্তীদের জন্য স্মরণীয় করে রাখলাম। ইবরাহিমের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। নিশ্চয় আমি এভাবে সৎকর্মপরায়নদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকি।’ (সুরা সাফফাত : আয়াত ১০৭-১১০)

হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামের আত্মত্যাগের সে নিদর্শন কুরবানি মুসলিম উম্মাহ প্রতিবছর জিলহজ মাসের ১০ থেকে ১২ তারিখ এ ৩ দিনের যে কোনো একদিন পালন করে থাকেন। সুন্দর স্বাস্থ্যবান পশুকে আল্লাহর উদ্দেশ্যে কুরবানির মাধ্যমে নিজেদের মনের পশুত্বকে কুরবানিই হলো এ ইবাদতের মূল উদ্দেশ্য।
হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামের এ সুন্নাতকে কেয়ামত পর্যন্ত মানুষ আল্লাহর নৈকট্য লাভের পথ ও ঈদ-উল-আজহার সবচেয়ে পছন্দনীয় আমল হিসেবে স্বীকৃতি দেবে এবং বাস্তবজীবনে মেনে নেবে।

ঈদুল আজহার কোরবানির পশু কিনে হাট থেকে বের হওয়ার সময় কিছু প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। ভাই কতো দিয়ে কিনলেন? বাহ্ জিতেছেন অথবা আহ্ ঠকেছেন। 
কথাগুলো শুনে ক্রেতা কখনো খুশি কখনও হতাশ হন। অথচ কোরবানির পশুকে আল্লাহ তার মহিমার প্রতীক করেছেন এবং বলেছেন তোমাদের জন্য এতে রয়েছে বিপুল কল্যাণ। 

সুতরাং দাম কম দিয়ে কিনতে পারলেন বলে জিতেছেন ভেবে খুশি হবেননা। বরং আপনার তাকওয়া ঠিক রাখতে পারলেই আপনি জিততে পারবেন
আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে লোক দেখানোর জন্য কুরবানি নয় বরং পশু জবাইয়ের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে মনের পশুত্ব ও আমিত্বকে জবাই করার তাওফিক দান করুন। কুরবানির মাধ্যমে নিজেকে তাকওয়াবান হিসেবে তৈরি করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top