সিডনী মঙ্গলবার, ১৮ই জানুয়ারী ২০২২, ৪ঠা মাঘ ১৪২৮


ইংরেজি নববর্ষ উদযাপন: কী বলে ইসলাম : মোঃ শামছুল আলম


প্রকাশিত:
২৯ ডিসেম্বর ২০২১ ১৩:৩৫

আপডেট:
১৮ জানুয়ারী ২০২২ ০৪:৫৮

ছবিঃ মোঃ শামছুল আলম


নববর্ষ বা New Year’s day – এই শব্দগুলো নতুন বছরের আগমন এবং এ উপলক্ষে আয়োজিত উৎসব-অনুষ্ঠানাদিকে ইঙ্গিত করে। এতদুপলক্ষে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, হাসিঠাট্টা ও আনন্দ উপভোগ, সাজগোজ করে নারীদের অবাধ বিচরণ ও সৌন্দর্যের প্রদর্শনী, রাতে অভিজাত এলাকার ক্লাব ইত্যাদিতে মদ্যপান তথা নাচানাচি, পটকা ফুটানো – এই সবকিছু কতটা ইসলাম সম্মত? মুসলিমরা যে আল্লাহতে বিশ্বাসী, সেই আল্লাহ কি মুসলিমদের এইসকল আচরণে আনন্দ-আপ্লুত হন, না ক্রোধান্বিত হন ? নববর্ষকে সামনে রেখে এই নিবন্ধে এই বিষয়টি আলোচিত হয়েছে ।
খৃস্টানদের অনুকরণে ইংরেজি বছর শেষে নতুন বছরের শুরুতে ‘থার্টি ফার্স্ট নাইট’ (১২টা ১ মিনিট) পালন করাকে ইসলাম সমর্থন করে না। এ রাতে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে অশ্লীলতা-নগ্নতা ও বেলেল্লাপনার বন্যায় মেতে উঠে অনেকে! মদ পান, ছেলে মেয়ের যৌন উম্মাদনাসহ বিভিন্ন অনৈতিক, কর্মকান্ড ও নোংরা অনুষ্ঠান করে ইংরেজি নববর্ষকে বরণ করা হয়। যা ইসলামের দৃষ্টিতে গুরুতর অপরাধ।
বর্তমানে বর্ষবরণ নামে যে অশ্লীলতা, বেহায়াপনা, হৈ-হুল্লোড় ও নগ্নতার প্রদর্শন চলে, তা কি একজন নিম্নস্তরের মুমিনের জন্যও শোভা পায়? বছরের সূচনালগ্নে যখন একজন মুমিন উপস্থিত হয়, তখন তার অনুভূতি এ ধরনের হওয়া দরকার—যে দিনগুলো আমার শেষ হয়ে গেল, তা তো আমার জীবনেরই একটি মূল্যবান অংশ। একটি বছর শেষ হওয়ার সরল অর্থ, আমার জীবনের দালান থেকে ৩৬৫ দিনের ৩৬৫টি পাথর যেন খসে পড়ল। আমার জীবন সংকীর্ণ হয়ে এলো। এটা আনন্দের নয়, চিন্তার ব্যাপার। এখন আনন্দ-উল্লাসের সময় নয়, বরং সময় হলো হিসাব-নিকাশের। কাজেই একটি বছরের উপসংহারে দাঁড়িয়ে মুমিনের মানসপটে প্রশ্ন উত্থাপিত হয় যে একটি বছর তো আমি শেষ করেছি, কিন্তু যে মহান উদ্দেশ্যে (তাঁর ইবাদত-বন্দেগির জন্য) মহান আল্লাহ আমাকে এই বসুন্ধরায় পাঠালেন, সে পথে কতটুকু অগ্রসর হয়েছি? সে পথে আমার প্রাপ্তি কতটুকু?
ইসলামী জাহানের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর (রা.) একবার মিম্বরে দাঁড়িয়ে তাঁর খুতবায় এক ঐতিহাসিক উক্তি উপস্থাপন করেছিলেন, যা ইমাম তিরমিজি (রহ.) স্বীয় গ্রন্থ তিরমিজি শরিফ এবং ইমাম ইবনে আবি শায়বা (রহ.) স্বীয় গ্রন্থ মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বায় উল্লেখ করেন। হজরত ওমর (রা.) বলেছিলেন, ‘হিসাব চাওয়ার আগে নিজের হিসাব করে নাও, তোমার কাজ পরিমাপ করার আগে নিজেই নিজের কাজের পরিমাপ করে নাও।’ (জামে তিরমিজি, ৪/৬৩৮)।
বিজাতীয় সংস্কৃতি উদযাপন থেকে বিরত থাকতে কোরআন ও হাদিসে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া (ইসলামি রীতিনীতি) অন্য কোনো ধর্মের অনুসরণ করবে কখনো তার সেই আমল গ্রহণ করা হবে না। আর পরকালে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে’। (সূরা আল ইমরান : ৮৫)।
নবীজী (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যে অন্য জাতির সঙ্গে আচার-আচরণে, কৃষ্টি-কালচারে সামঞ্জস্য গ্রহণ করবে সে তাদের দলভুক্ত বিবেচিত হবে। (সুনানে আবু দাউদ : ২৭৩২)।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহপাক সু-স্পষ্ট এরশাদ করেন, ‘প্রত্যেক জাতির জন্য আমি একটি নির্দিষ্ট বিধান এবং সুস্পষ্ট পথ নির্ধারণ করেছি’। (সুরা মায়িদাহ : ৪৮)।
রাসুল (সাঃ ) এরশাদ করেন, ‘যদি তুমি খারাপ কাজ করো, আর তোমার খারাপ লাগে, ভালো কাজ করে ভালো লাগে তাহলে তুমি মুমিন। কিন্তু যদি খারাপ কাজ করে ভালো এবং ভালো কাজ করে খারাপ লাগে তাহলে তুমি মুমিন হতে পার না’। (মুসলিম : ১৯২৭)।
হজরত আবদুল্লাহ বিন আমর থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি অনারবীয় দেশে বসবাস করে, সে যদি সে দেশের মেহেরজান (নববর্ষ) উদযাপন করে এবং বাহ্যিকভাবে তাদের সঙ্গে সাদৃশ্য রাখে এমনকি এ অবস্থায় সে মৃত্যুবরণ করে, তা হলে কিয়ামতের দিন তাকে তাদের (কাফিরদের) সঙ্গে হাশর করা হবে’ (বায়হাকি মাজমুয়াতুত তাওহীদ : ২৭০)।
একজন ঈমানদার নর-নারীর জন্য প্রতিটি দিন-রাত উৎসব ও আনন্দের। বছরে গুটি কয়েক দিন নয় বরং প্রতিটি দিন আনন্দের। প্রতিটি দিন ক্ষণ আমাদের জন্য মুল্যবান।
আমাদের করণীয়ঃ
ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে ইংরেজি নববর্ষ-সংক্রান্ত যাবতীয় অনুষ্ঠান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কারণ এতে কয়েক ধরনের ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ড রয়েছে।
এক. শিরকপূর্ণ অনুষ্ঠানাদি, চিন্তাধারা ও সংগীত।
দুই. নগ্নতা, অশ্লীলতা, ব্যভিচারপূর্ণ অনুষ্ঠান।
তিন. গান ও বাদ্যপূর্ণ অনুষ্ঠান।
চার. সময় অপচয়কারী অনর্থক বাজে কথা ও কাজ।
এমতাবস্থায় প্রতিটি মুসলিমের দায়িত্ব হলো, নিজে এগুলো থেকে সম্পূর্ণরূপে বিরত থাকা এবং মুসলিম সমাজ থেকে এই ইমানবিধ্বংসী প্রথা উচ্ছেদে নিজ নিজ সাধ্য ও অবস্থান অনুযায়ী সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো। এ প্রসঙ্গে আমাদের করণীয় হলো—
এক. যাদের নিজস্ব প্রভাব ও দাপট রয়েছে, তাদের কর্তব্য হবে অধীনস্থদের এ কাজ থেকে বিরত রাখা।
দুই. মসজিদের ইমামরা এ বিষয়ে মুসল্লিদের সচেতন করে বিরত থাকার উপদেশ দিতে পারেন।
তিন. পরিবার প্রধানরা এ বিষয়টি নিশ্চিত করবেন যে তার পুত্র-কন্যা, স্ত্রী কিংবা তাঁর অধীনস্থ অন্য কেউ যেন নববর্ষের কোনো অনুষ্ঠানে যোগ না দেয়।
চার. এ ছাড়া ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেকে তাঁর বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন, সহকর্মী, সহপাঠী, পরিবারের মানুষ ও প্রতিবেশীকে উপদেশ দিতে পারেন এবং নববর্ষ পালনের সঙ্গে কোনোভাবে সম্পৃক্ত হওয়া থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করবেন।
পরিশেষে...
নতুন বছরের সাথে মানুষের কল্যাণ, এর কোনো সম্পর্ক নেই। ইমাম আবু হানিফা রহ:-এর দাদা তাঁর পিতাকে পারস্যের নওরোজের দিন (নববর্ষের দিন) আলী রা:-এর কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং কিছু হাদিয়াও পেশ করেছিলেন। (হাদিয়াটি ছিল নওরোজ উপলক্ষে) আলী রা: বললেন, ‘নওরোজুনা কুল্লা ইয়াওম’ মুমিনের প্রতিটি দিনই তো নববর্ষ। (আখবারু আবু হানিফা) অর্থাৎ মুমিন প্রতিদিনই তার আমলের হিসাব-নিকাশ করবে এবং নবউদ্যমে আখিরাতের পাথেয় সংগ্রহ করবে।
ইসলামের চতুর্থ খলিফা আলী রা:-এর এ কথা দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, নববর্ষ উপলক্ষে পরস্পর উপহার আদান-প্রদান এবং শুভেচ্ছা বিনিময়ের কোনো গুরুত্ব ইসলামে নেই। নতুন বছর নতুন কল্যাণ বয়ে আনে, দূরীভূত হয় পুরনো কষ্ট ও ব্যর্থতার গ্লানি এ ধরনের কোনো তত্ত্ব ইসলামে আদৌ সমর্থিত নয়, বরং নতুন বছরের সাথে কল্যাণের শুভাগমনের ধারণা আদিযুগের প্রকৃতি-পূজারী মানুষের কুসংস্কারাচ্ছন্ন ধ্যান-ধারণার অবশিষ্টাংশ। এ ধরনের কুসংস্কারের কোনো স্থান ইসলামে নেই। বরং মুসলিমের জীবনে প্রতিটি মুহূর্তই মূল্যবান হীরকখণ্ড। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বছরের প্রথম দিনের কোনো বিশেষ তাৎপর্য নেই। আর তাই তো ইসলামে হিজরি নববর্ষ পালনের কোনো প্রকার নির্দেশ দেয়া হয়নি। এমনকি পয়লা মহররমকে নববর্ষের সূচনা হিসেবে গণনা করা শুরুই হয় নবী সা:-এর ওফাতের বহু পরে দ্বিতীয় খলিফা ওমর রা:-এর শাসন আমলে। এ থেকে বোঝা যায় যে, নববর্ষ উদযাপন ইসলামের দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ নয়।
কেউ যদি এ ধারণা পোষণ করে যে, নববর্ষের প্রারম্ভের সাথে কল্যাণের কোনো সম্পর্ক রয়েছে বা যদি সে মনে করে যে, আল্লাহ এ উপলক্ষ দ্বারা মানবজীবনে কল্যাণ বর্ষণ করেন তবে তা শিরকে পতিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

 

মোঃ শামছুল আলম
লেখক ও গবেষক

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top