সিডনী শুক্রবার, ৩০শে জুলাই ২০২১, ১৫ই শ্রাবণ ১৪২৮

ফেলুদার সাথে লখনৌ  ভ্রমণ! : আনিসুল কবীর


প্রকাশিত:
১৩ মে ২০২১ ০২:৪৩

আপডেট:
১৭ মে ২০২১ ১২:১০

ছবিঃ : আনিসুল কবীর

 

লেখার টাইটেল দেখে অনেকের একটা ভ্রু কিঞ্চিৎ উপরের দিকে বাঁকা হয়েছে এ আমি হলপ করে বলতে পারি। সবার মুখের অবস্থা বোধ করে আমারও খানিকটা আনন্দ হচ্ছে বলাই বাহুল্য। প্রথমেই বলে নেই এই কাহিনীর সাথে ফেলুদা বা গোয়েন্দা প্রদোষ মিত্তিরের কোন ভূমিকা নাই। আমি নিজেকে ফেলুদার খুরততো ভাই শ্রী তপেশ রঞ্জন মিত্র ওরফে তপশেও ভাবিনা। এটা একদম আমার নিজের ভ্রমণকাহীনি। তবে ফেলুদার নাম কিভাবে আমার নিজের কাহিনীর সাথে জুড়ে গেলো খুব তাড়াতাড়ি খোলাসা করছি। একটু অপেক্ষা করুন।

প্রথমে বলে নেই লখনৌ নামটার প্রতি আমার ছোটকাল থেকেই খুব আগ্রহ। জানি অনেকেই বিশ্বাস করতে চাইবেনা। না চাইলে তো আর কিছু করার নেই। আমাদের যাদের ছেলেবেলা ৮০-৯০ দশকে কেটেছে, তাদের সবার পছন্দের অথবা ঘুরে বেড়াবার জায়গার তালিকায় দিল্লী আগ্রার সাথে মোঘল বাদশাহদের ঐতিহাসিক জায়গাগুলো ছিলো বেশি। প্রথম স্থানে ছিলো আগ্রার তাজমহল, তারপর  আগ্রহ ছিলো দিল্লী  লখনৌসহ নবাব-বাদশাহদের বিখ্যাত সব স্থানগুলোর প্রতি। লখনৌর প্রতি আগ্রহ বেড়েছে ফেলুদা পড়ে। মানে সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদার উপন্যাস পড়ে। ফেলুদাকে নিয়ে লেখা সবগুলো উপন্যাস বেশ কয়েকবার করেই পড়েছি। রহস্যগুলো তো সব জানি, এজন্য এখন আমি ফেলুদার উপন্যাস পড়ি ট্রাভেল গাইড হিসাবে। সত্যজিৎ রায় ফেলুদাকে সেখানেই নিয়ে গেছেন যেখানে তিনি নিজে বেড়িয়ে মজা পেয়েছেন কোন এক সময়, বা যে জায়গাগুলো বেড়িয়ে উনার ভালো লেগেছে। বলা যেতে পারে সত্যজিৎ রায়ের প্রিয় জায়গার মধ্যে লখনৌ একটি। কারন উনি দুই দুইবার ফেুলুদাকে নিয়ে গেছেন লখনৌ শহরে। খুব অল্প শহরেই দুটি ফেলুদার উপন্যাস লেখা হয়েছে। লখনৌ নিয়ে লেখা দুটি উপন্যাস হচ্ছে ‘বাদশাহী আংটি’ আর ‘শকুন্তলার কন্ঠহার’। বাদশাহী আংটি ফেলুদার দ্বিতীয় কাহিনী। একদম প্রথম দিকে লেখা। যেহেতু অনেক আগের লেখা, ফলে এই বইটিতে লখনৌ শহরের একদম অথেনটিক বর্ননা পাওয়া যায়। বাদশাহ নবাবদের শহর লখনৌতে যেমন পুরোনো একটা আবহ পাওয়া যেত, এখন কিছুটা হয়তো কমে গিয়েছে। কারন  হালে আধুনিকায়নের ফলে ভারতের সব শহর একদম বদলে গেছে। ইউটিউবে দেখলাম লখনৌতে মেট্রোলেরও চলছে। সেজন্য ফেলুদার উপন্যাসের লেখার সাথে বর্তমান লখনৌর আর মিল খুঁজে পাবেন না হয়তো। তবে আমি যখন গিয়েছিলাম তখন সবকিছু প্রায় উপন্যাসের সাথে মিলে গিয়েছিলো।

লেখার ভূমিকা বড় হচ্ছে আর সাথে সাথে আপনার ভ্রু হয়তো আরেকটু বেশি বাঁকা হয়ে গেছে। মনে মনে ভাবছেন এই ব্যাটা ফেলুদা ফেলুদা বলে মুখে ফ্যানা তুলে ফেলছে কেন?  আচ্ছা ঠিক আছে, আসল কথায় আসি। ২০১২ মাসের ডিসেম্বরের ৪ তারিখ থেকে ৭ তারিখ পর্যন্ত সাড়ে তিন দিনের লখনৌ ভ্রমণের স্মৃতি নিয়ে এই লেখা। যেহেতু লখনৌ  বাংলাদেশিদের জন্য খুব কমন জায়গা না, সেজন্য আজ লেখার বিষয় হিসাবে লখনৌকেই বেছে নিয়েছি। আমার সেজ দুলাভাই বাংলাদেশের খুব বড় ডাক্তার। উনার বাসায় একদিন পারিবারিক আড্ডায় বলছিলেন ‘আমরা লখনৌতে যাচ্ছি। খোকন তুমি সাথে যাবা নাকি? সাথে মিশুও যাচ্ছে, চলো ঘুরে আসি’। শেহরীন কালাম মিশু আমার ভাগ্নি। আমার কোলে পিঠেই বড় হয়েছে। বড় হয়ে মিশুও ডাক্তার হয়ে গেছে। আমি একটু বিনয় করে দুলাভাইকে বলেছিলাম ‘আপনাদের সেমিনারে আমি গিয়ে আর কি করবো? আপনারা তো ঘুরাঘুরির সময় পাবেন না’। দুলাভাই হাসতে হাসতে বলছিলেন, ‘চলো চলো, এমন নতুন জায়গা আর কোথায় পাবা, তুমি যেহেতু নিজেকে ট্রাভেলার ভাবো, এই সুযোগ মিস করা ঠিক হবেনা। আগামীকাল ভিসা ফর্ম জমা দিয়ে দাও’। এরপর আর কথা হয় না। আমার সেজ দুলাভাই প্রফেসর ডাঃ আবুল কালামের বাসায় মানুষ হয়েছি আমি। নিজের বাবার মতোই স্নেহ করেন। উনার সাথে এমন ভ্রমণের সুযোগ পাওয়া এমনিতে আনন্দের, তারপর আবার একদম অন্যরকম জায়গা। ভারতের উত্তর প্রদেশের রাজধানী লখনৌ। নবাব-বাদশাহের শহর। তারপর খুব অল্প সময়ে ভিসা করে ফেললাম। ইউটিউবে লখনৌর ভ্রমণ ব্লগ দেখা আর ফেলুদার লখনৌর উপন্যাসগুলো পড়ে নিলাম দুই তিনদিনের মধ্যে। ইউটিউব দেখে লখনৌর বিখ্যাত টুন্ডি কাবাবের গন্ধও মনে হয় নাকে পেতে শুরু করলাম। ফেলুদার জবানিতে লখনৌর অলিগলীতে ঘুরাঘুরিও করলাম কল্পনা শক্তির জোরে।

লখনৌতে আমরা গিয়েছিলাম লখনৌর বিখ্যাত কিংস জর্জ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত প্লাস্টিক সার্জারিক একটা আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে। কনফারেন্সের সেমিনার আর সেশনগুলো হবে ইউনিভার্সিটির অটোল বিহারী বাজপেয়ী সায়েন্টিক কনভেনশান সেন্টারে। প্নেনের টিকেট কাটা হলো এক সময়ের বিখ্যাত জেট এয়ারওয়েজে। ঢাকা থেকে দিল্লী, দিল্লী থেকে লখনৌ। কোন হোটেলে থাকবো সে বিষয়ে কোন আইডিয়া ছিলোনা।

৪ ডিসেম্বর ২০১২ সালের সকালে আমরা ঢাকা থেকে দিল্লীর ফ্লাইটে উঠি। সময়টা ভুলে গেছি। জেট এয়ারওয়েজ সব সময় ঠিক সময়ে ছাড়তো। মনে আছে সময় মতো ছেড়ে যথাসময়ে আমরা দিল্লীতে পৌঁছেছিলাম। আমার জানা মতো দিল্লী এয়ারপোর্ট অনেক বড় হওয়ার কথা। কিন্তু প্লেন থেকে নেমে ইমিগ্রেশনের দিকে রওনা হওয়ার সময় মনে হলো এয়ারপোর্টের এমাথা ওমাথা দেখা যাচ্ছে। অবাক হলাম খুব। এতো ছোট এয়ারপোর্ট? পুরো এয়ারপোর্ট কার্পেট করা, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। আমরা হাটা শুরু করে বুঝলাম কাহিনীটা। এক মাথা শেষ করে হয়তো আরেক দিকে বাঁক নেয় টার্মিনাল বিল্ডিং। এক বাঁক শেষ হতেই আরেক বাঁকের শুরু। প্রায় মাইল খানেক যাওয়ার পরে মনে হয় ইমিগ্রেশন কাউন্টারগুলোর দেখা পেয়েছিলাম। আসলেই সুবিশাল এয়ারপোর্ট। দিল্লী এয়ারপোর্টের ইমিগ্রেশনের জায়গাটাও খুব সুন্দর।

দিল্লী এয়ারপোর্টেও ইমিগ্রেশন এরিয়া

দিল্লী এয়ারপোর্ট হয়ে আমরা যখন লখনৌর চোধুরী চরন সিং এয়ারপোর্টে পৌঁছালাম তখন আমার জন্য সবচেয়ে আনন্দের ঘটনাটা ঘটলো। এয়ারপোর্টের সমস্ত প্রক্রিয়া শেষ করে যখন আমরা বাহিরে আসলাম তখন আমাদের জন্য কনফারেন্সের স্বেচ্ছাসেবক অপেক্ষা করছে। দুলাভাইকে সাদর অভ্যর্থনা শেষে ছেলেটি জানতে চাইলো আমরা ক্লার্ক আওয়াধ নাকি অন্য আরেকটি হোটেল (নাম ভুলে গেছি) কোনটিতে উঠতে চাই। ক্লার্কস-আওয়ধের ভাড়া বেশি অন্য হোটেলটার ভাড়া কিছুটা কম। ক্লার্কস-আওয়ধ নামটা শুনেই আমার বুকে ঘোড়ার দৌড় শুরু হয়ে গেছে। লখনৌ ভ্রমণের গাইড হিসাবে লখনৌকে নিয়ে লেখা ফেলুদার কাহিনী দুটো বাদশাহী আংটি আর শকুন্তলার কণ্ঠহার বেশ ভালো ভাবে পড়ে গিয়েছি। দ্বিতীয় কাহিনীতে ফেলুদা ক্লার্কস-আওয়ধে উঠেছিলো। উপন্যাসের মধ্যে সেই হোটেলের কিঞ্চিৎ বর্ণনা আছে। আমার কাছে ব্যাপারটা কিছুটা মেঘ না চাইতেই সাইক্লোনের মতো হয়ে গেলো। ফেলুদার উপন্যাসের হোটেলে থাকার সুযোগ সৃষ্টি হয়ে গেলো। কালাম ভাইকে বললাম আমি ক্লার্কস-আওয়ধে উঠতে চাই। উনিও রাজি হলেন। আর আমি লখনৌ পৌঁছেই কিছুক্ষনের মধ্যে যেন ফেলুদার উপন্যাসে ঢুকে গেলাম।  

আমরা যেহেতু বিকেলের আগেই লখনৌতে পৌঁছে গিয়েছিলাম, সেজন্য হোটেলে যাওয়ার পথেই লখনৌ শহরের একটা প্রাথমিক ধারণা পেয়ে গিয়েছিলাম। ফেলুদার উপন্যাস বাদশাহী আংটির থেকে কিছুটা বর্ণনা তুলে দিচ্ছি এখানে- ‘স্টেশন থেকে বাড়ি আসার পথে বুঝলাম লখনৌ শহরটা খুব সুন্দর। গম্বুজ আর মিনারওয়ালা বাড়ি দেখা যাচ্ছে চারদিকে, রাস্তাগুলো চওড়া আর পরিষ্কার, আর তাতে মোটরগাড়ি ছাড়াও দুটো নতুন রকমের ঘোড়ার গাড়ি চলতে দেখলাম’। এই বর্ণনার মধ্যে শুধু ঘোড়ার গাড়ির অংশ টুকু বাদ দিলেই লখনৌর প্রকৃত বর্ণনার সাথে মিলে যাবে। লখনৌতে কোন স্থাপনায় গম্বুজ থাকলেই সেটা মসজিদ আপনি বলতে পারবেন না। পরবর্তীতে আমার মনে হয়েছে শহরের বাড়িঘর বিল্ডিংয়ের ইউনিফর্মিটি ঠিক রাখার জন্য লখনৌ শহরের প্রশাসন কিছু নিয়মকানুন মেনে চলে বোধহয়। সেজন্য শহরের বিল্ডিংগুলোর মধ্যে গম্বুজ আর মিনারের ছড়াছড়ি আর হোটেলগুলো সব ম্যাচের বাক্সের মতো চারকোনা। পার্থক্য শুধু আকারের। গাছপালা আর আবহাওয়া দেখে বোঝার উপায় ছিলোনা যে আমরা বাংলাদেশ থেকে হাজার মাইল দূরের কোন জায়গার পৌঁছেছি।

ক্লার্কস-আওয়ধ হোটেলে পৌঁছে মন ভালো হয়ে গেলো। ফেলুদার শকুন্তলার কন্ঠহার বইতে আগেই পড়েছিলাম ফেলুদা লালমোহনবাবুকে এই হোটেল সম্পর্কে বলেছিলো ‘আওয়ধ হল লখনৌর সেরা হোটেল। একেবারে গুম্তীর উপরে। হোটেলের পাশ দিয়ে নদী বয়ে গেছে’। আমাদেরও মনে হলো সত্যজিৎ রায় উনার উপন্যাসে এই হোটেল সম্পর্কে একটুও বাড়িয়ে বলেন নাই। চমৎকার ছিমছাম হোটেল রিসেপশন দেখেই আমাদের পছন্দ হয়ে গেলো। অন্য ফাইভ স্টার হোটেলের মতো শানশওকত না থাকলেও রুচি আর ঐতিহ্যের মিশেলে একটা ভালোলাগা তৈরী করেছিলো। হোটেলে চেকইন করার সময় আমি আর মিশু নিজেদের ছবি তুলে নেই রিসেপশনে বসে।

 ক্লার্কস-আওয়ধ হোটেলের রিসেপশন এরিয়া

মিশুকে সিঙ্গেল রুম আর আমি আর কালাম ভাইয়ের জন্য একটা ডাবল রুম ঠিক করা হয়েছিলো। ফ্রেশ হয়ে বিকালে নাস্তা খেতে গিয়ে ফেলুদার উপন্যাসের আরও কিছু অংশ মিলিয়ে নিলাম। শকুন্তলার কন্ঠহার বইতে আরও ছিলো, ‘দু ঘরের জানালা দিয়েই গুম্তী নদী দেখা যায়। নদীর ওপারে পশ্চিমে যখন সূর্য অস্ত যায়, সে দৃশ্য দেখবার মতো। হোটেলের খাওয়াও দুর্দান্ত ভাল। আমরা অনেক জায়গায় অনেক থেকেছি, কিন্তু এত ভালো খাওয়া কোনও হোটেলে খাইনি’। টপ ফ্লোরের রেস্টুরেন্টের কাঁচের জানালা দিয়ে গুম্তী নদী আর গুম্তী নদীর ওপারে সূর্যাস্তও দেখা হলো। যদিও আমার অতোটা ভালো লাগে নাই। তবে হোটেলের খাওয়াটা আসলেই খুব ভালো ছিলো।

হোটেলের জানালা দিয়ে দেখা গুমতি নদী

আমরা লখনৌ পৌঁছেছিলাম  ২০১২ সালের ডিসেম্বরের ৪ তারিখে। পাঁচ তারিখ থেকে কালাম ভাই আর মিশুর কনফারেন্স শুরু। সন্ধায় কিছুটা সময় হাতে আছে দেখে আমরা ট্যাক্সি করে কনফারেন্সের ভেন্যুতে ঘুরে আসলাম। কালাম ভাইয়ের জুনিয়র কিছু কলিগ আগেই লখনৌতে পৌঁছে গিয়েছিলো। কিং জর্জ মেডিকেল ইউনিভার্সিটিতে কালাম ভাইয়ের কলিগ পামি আপা আর ইমরান ভাইয়ের সাথে দেখা হলো। কিছুক্ষণ থেকে আমরা আবার হোটেলে চলে আসি।

পরের দিন ৫ ডিসেম্বর ২০১২ তে আমাদের লখনৌ  ট্যুর শুরু। সকালে উঠে নাস্তা করেই হোটেল রিসেপশনিস্টকে বলে একটা ছোট গাড়ী ভাড়া করে নেই। কম বয়সি ড্রাইভার ৩০০ রুপির বিনিময়ে কনফারেন্স হলে নামিয়ে দিয়ে আসতে রাজি হলো। যাওয়ার পথেই ড্রাইভার ছেলেটির ফোন নাম্বার নিয়ে নেই। আমরা অবশ্য তখন পর্যন্ত মোবাইল ফোনের সিম কিনতে পারি নাই। তখন ভারতে মোবাইলের সিম সহজে পাওয়া যেত না। ভারতের বিভিন্ন স্থানে সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের জন্য মোবাইলের সিম কেনায় ভীষণ কড়াকড়ি ছিলো। আমরা সকাল সাড়ে নয়টায় কিং জর্জ মেডিকেল ইউনিভার্সিটির অটোল বিহারী বাজপেয়ী সাইন্টিফিক হলে পৌঁছে যাই। আগের দিন রাতের আলো আধারী কনভেনশন সেন্টারটি দেখে ভালো লাগলো বেশ। যদিও নতুন বিল্ডিং, কিন্তু লখনৌর অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী বিল্ডিংয়ের সাথে মিলিয়ে পুরোনো ধাচে তৈরি করা হয়েছে।

অটোল বিহারী বাজপায়ি সাইন্টিফিক কনভেনশন হল

কনভেনশন হলটির বিশাল গম্বুজটির উচ্চতা প্রায়  ৫২.৫ মিটার বা প্রায় ১৬ তালার সমান উঁচু । লাল গালিচা বিছানো করিডোর দিয়ে কনফারেন্সের এক্সিবিশন এরিয়াতে গিয়ে বাংলাদেশর টিমের সাথে দেখা হলো। টিমের সবাই আমার দুলাভাইয়ের জুনিয়র কলিগ। উনারা নিজেরাও বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠিত প্লাস্টিক সার্জন এক এক জন। পামি আপা, ইমরান ভাই আর তানভির হিমন ভাইয়ের সাথে পরিচয় হলো। সবাই একটু অবাক হলো যে আমি একজন নন-মেডিকেল পার্সন হয়ে মেডিকেল কনফারেন্সে এসেছি দেখে। এরপর কনফারেন্সের সেশনগুলো শুরু হয়ে যাওয়াতে আমি একা মোবাইলের সিম কেনার জন্য কনফারেন্স হল থেকে বেরিয়ে আসি। গেট দিয়ে বেরিয়ে আশেপাশে কোন মোবাইলের দোকান পেলাম না। লখনৌতেও দেখলাম বাংলাদেশের মতো সাইকেল রিক্সা চলে। একজন রিক্সাওয়ালা আমাকে ৩০ রুপিতে মোবাইলের সিমের দোকানের আপডাউন চুক্তিতে নিয়ে রওনা হলো। এর মধ্যে বলে রাখি লখনৌর ক্লার্ক্স আওয়ধ হোটেল ছাড়া আর কিছু তেমন ভালো লাগছিলো না আমার। মনে হচ্ছিলো আমি মোহাম্মদপুরে আছি। জেনেভা ক্যাম্পের পাশে কোন জায়গায়। মোহাম্মদপুরে যেহেতু দীর্ঘ দিন ছিলাম, মোহাম্মদপুরের সেলুন, কাবাবের দোকান আর মাংসের দোকানীদের কথার সাথে লখনৌর মানুষদের কথায় আর চেহারায় ব্যাপক মিল। লখনৌর মানুষের আদব লেহাজের অনেক গল্প শুনেছি আগে। কিন্তু প্রথমেই যাদের সাথে সাক্ষাৎ হয়েছে, বিশেষত রিক্সাওয়ালা আর ট্যাক্সিওয়ালা, সবাইকে একটু চালাক প্রকৃতির মনে হয়েছে।

রিক্সাওয়ালা দুই প্যাডেল মারার পরই মাথা বাঁকিয়ে আমার দিখে তাকালো, ‘ সাব এক বাত বলু’। আমি খুব চোস্ত ভাবে বললাম ‘বলিয়ে’। রিক্সাওয়ালা মুখে মধুর হাসি দিয়ে বললো ‘আপকা চিকেন লাগেগা’? সকালে ভরপেট নাস্তা আর ১০ মিনিট আগে কফি খাওয়া আমি মুখ বেঁকিয়ে চিৎকার করলাম ‘নেহি লাগেগা’। এবার ব্যাটা একটা ফিচকে হাসি দিলো, যেন জানতো আমি কি বলবো। মুখে বললো ‘খানে কা নেহি, পেহেন নে ক্যা চিকেন, স্যার’। আমি অবাক। গায়ে মুরগী দিয়ে ঘুরবো নাকি আবার। যাই হোক আশেপাশে দোকানের সাইন বোর্ড আর রিক্সাওয়ালার আন্তরিক প্রচেষ্টায় বুঝতে পারলাম যে লখনৌতে ‘চিকেন কারি’ মানে মুরগীর ঝোল না, এই চিকেন কারি সুতো দিয়ে কাপড়ের উপরে নিখুঁত হাতের কাজ।

মোবাইলের সিম কেনার জন্য অনেক অনুরোধ অনুনয় বিনয় করে আমার আর মিশুর জন্য দুটি সিম কিনতে পারলাম। আবার আগের রিক্সায় চড়ে রিক্সাওয়ালার সাথে চিকেন কারি বিষয়ক জ্ঞানগর্ভ আলোচনা করতে করতে কনফারেন্স হলে ফেরত আসলাম। তারপর সারাদিন বিভিন্ন সেমিনার শুনতে শুনতে কাটিয়ে দিলাম কনফারেন্স হলেই। রাতে গালা ডিনার ছিলো কনফারেন্স ভেন্যুতেই। কনফারেন্স হল সংলগ্ন ছোট মাঠের চারিদিকে সারি দিয়ে বিভিন্ন ধরনের খাবারের স্টল আর মাঝখানে গোল গোল গোল টেবিলে বসার যায়গা। ঐ ডিনারের জন্যই লখনৌর সব বিখ্যাত কাবাব আর লোকাল খাবারের স্বাদ নেয়ার সুযোগ হলো। কমপক্ষে ২৫টা আলাদা স্টলে যে যার মতো খাবার নেয়া যাচ্ছিলো। কাবাবের স্টলগুলোতে মানুষের লম্বা লাইন ছিলো। আমি আর মিশু ঘুরে ঘুরে খাবার নিয়ে খেলাম। কালাম ভাই উনার কলিগদের সাথে বসে ছিলেন। লখনৌ স্ট্রিট ফুডের জন্য জন্য বিখ্যাত। শিক কাবাব, হরিয়ালী কাবাব, টুন্ডি কাবাব আলু টিক্কি চাট ইত্যাদি বিখ্যাত স্ট্রিট ফুড মন ভরে খেলাম।

গালা ডিনার

রাতে ট্যাক্সিতে আসার পথেও ট্যাক্সিওয়ালা সেই সাইকেল রিক্সাওয়াল মতো নাটকীয় ভাবে বললো ‘স্যার এক বাত বলু’। চিকেন কারি লাগবেনা শুনে সেই ভাবেই হেসে বললো ‘খানে কা নেহী, পেহেন নেকি চিকেন স্যার’। মোটামুটি একই ভাবে মানা করে দিলাম ট্যাক্সিওয়ালাকে। ট্যাক্সি ড্রাইভার বারবার বলছিলো যে সে পরের দিন ভালো চিকেন কারির দোকানে নিয়ে যাবে আমাদের। নরম করে আবারও মানা করে দিলাম। মজার ব্যাপার হচ্ছে এরপর লখনৌতে এমন কোন ট্যাক্সি ড্রাইভার আর রিক্সওয়ালা নাই যারা আমাকে চিকেন কারির কথা জিজ্ঞেস করে নাই। আর প্রত্যেক বার আমি বলেছি, ‘নেহি চাহিয়ে’ আর ওরা ‘খানেকা নেহি, পেহেন নেকি চিকেন স্যার’ বলেছে। ব্যাপারটা ভিষণ মজার ছিলো।

আমাদের তৃতীয় দিনের ভ্রমণ হচ্ছে আসল লখনৌ ভ্রমণ। তৃতীয় দিন ঠিক করা হয়েছিলো যে দুপুর ২টা পর্যন্ত আমরা লখনৌর প্রধান প্রধান টুরিস্ট স্পট ঘুরে দেখবো। আর দেখার জায়গাগুলো ঢাকা থেকেই ঠিক করে গিয়েছিলাম ফেলুদার বই পড়ে আর ইউটিউব ভিডিও দেখে দেখে। লখনৌতে বেড়ানোর একটা সুবিধা হচ্ছে ঐতিহাসিক জায়গাগুলো অবস্থান কাছাকাছি। বড় ইমামবড়া, ছোট ইমামবড়া, রুমি গেট আর হুসেইনাবাদ ক্লক টাওয়ার, সব এক কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে। ফলে তিন থেকে চার ঘন্টায় মোটামুটি ফেলুদার উপন্যাসে পড়া জায়গাগুলো দেখে ফেলতে পারবো বলে ধারণা করেছিলাম। সময়ের অভাবে বুড়ি ছোয়া খেলার মতো দেখা যদিও। কিন্তু ফেলুদার উপন্যাস বারংবার পড়ি বলে মনে মনে জায়গাগুলো অনেক চেনা মনে হচ্ছিলো। সাথে ইউটিউব আর গুগুল ইমেজের কল্যাণে চেহারাও বেশ পরিচিত ছিলো জায়গাগুলোর। সকাল বেলা আগের দিনের পিচ্চি ড্রাইভারকে সদ্য কেনা ইন্ডিয়ান নাম্বার দিয়ে ডেকে আনালাম। আমাদের প্রথম লক্ষ্য বড় ইমামবড়া আর ভুলভুলাইয়া। দুটি আসলে একই জায়গা। লখনৌর মধ্যে বড় ইমামবড়া অথবা ভুলভুলাইয়া যেন হীরের রাজ্যে কোহিনুরের মতো। সবচেয়ে দামি আর আদরের। ঢাকা থেকেই ঠিক করে গিয়েছিলাম, আর কিছু দেখি না দেখি বড় ইমামবড়া যেন বাদ না পড়ে। বড় ইমামবড়ার এত সুন্দর বর্ণনা ফেলুদার বাদশাহী আংটি বইয়ে দেয়া আছে যে আমি ঐ বই থেকে কিছু বর্ণনা এখানে তুলে দিবো। তাতে করে পাঠকের জন্য বড় ইমামবড়ার সৌন্দর্য আরও পরিষ্কার ভাবে ফুটে উঠবে বলে আমার ধারণা। সাথে আমার তোলা কিছু ছবি তো থাকবেই।

হুসেইনাবাদ ক্লক টাওয়ার

বড় ইমামবড়া হচ্ছে লখনৌ শহরে অবস্থিত বিশাল এক প্রাসাদ। ১৭৮৪ সাথে অযোধ্যার নবাব আসাফ-উদ-দৌলা প্রাসাদটি নির্মাণ সম্পন্ন করেন। কথিত আছে দয়ালু নবাব বড় ইমামবড়ার কাজ বারবার ভেঙ্গে দিয়ে প্রায় ১২ বছর ধরে এই প্রাসাদটি নির্মাণ করেন, এতে করে অযোধ্যার দুর্ভিক্ষপিড়িত মানুষদের বেকারত্ব দুর করেছিলেন। আর সৌন্দর্যের দিক থেকে না হলেও বিশালত্বের দিক থেকে এটা ভারতের অন্যতম বৃহৎ প্রাসাদ।

আমরা সেই পিচ্চি ড্রাইভারের ৮০০ সিসির মারুতিতে চড়ে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বড় ইমামবড়ার কাছাকাছি পৌঁছে গেলাম। বড় ইমামবড়ার কাছাকাছি গিয়েই বুঝতে পারলাম ফেলুদার বইয়ের কথা সত্যি। ফেলুদার বইয়ে আছে ‘নতুন শহরের রাস্তাঘাট দেখতে দেখতে আর টাঙ্গার ঝাঁকুনি খেতে খেতে যে জায়গাটায় পৌঁছালাম, গাড়োয়ানকে জিজ্ঞেস করাতে ও বলল সেটার নাম কাইজার-বাগ। নবাবি আমলের যত প্রাসাদ-টাসাদ সব নাকি এই কাইজার-বাগের আশেপাশেই রয়েছে।’

ফেলুদার কথা যে কতোটা সত্যি সেটা আমি কাইজার-বাগে পৌঁছেই বুঝলাম।  হুসেইনাবাদ ক্লক টাওয়ার, যেটার ছবি ইউটিউবে দেখে বাকেট লিস্টে রেখেছিলাম, সেটা দেখি রাস্তার পাশে ফেলফেলিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। মনে মনে অবাক হলাম ওটার মলিন দশা দেখে। ইউটিউবে দেখে বাকেট লিস্টে রাখা আরেকটা সুন্দর স্থাপনা রুমি গেট চোখের সামনে ভেসে উঠলো বড় ইমামবড়ার গেটে গাড়ি থেকে নামতেই। ছোট ইমামবড়ার গেটও দেখি বড় ইমামবড়ার গেট থেকে একটু দূরেই। আমার অবস্থা ধাড়কান ছবির শিল্পা শেঠির মতো প্রায়, অক্ষয়কুমার আর সুনীল শেঠির গানে একবার এইদিকে তাকায় তো আরেকবার অন্য দিকে তাকায়। আমি অবাক হয়ে দেখলাম আমার বাকেট লিস্টের ৮০ শতাংশ জায়গা এক জায়গায় দাড়িয়েই চোখে পড়ছিলো।

বড় ইমামবড়ার গেট একটা বিরাট ইমারতের মতো। ইমারতের গায়ে বিরাট বিরাট মাছের ছবি খোদাই করা। সেজন্য এটার নাম ‘মচ্ছি ভওয়ন’, আর মচ্ছি ভওয়নেই বড় ইমামবড়া। টিকেট কেটে ঢুকতেই বিশাল চত্বর। চত্বরের ডানে বিরাট একটি মসজিদ। পরে মসজিদের নাম জেনেছি, আসিফি মসজিদ। এই মসজিদও লখনৌর বিখ্যাত স্থাপনার মধ্যে একটি। আর সোজা তাকালে যে বিশাল চৌকো প্রাসাদটি দেখা যায় ওটাই বড় ইমামবড়া বা দরবার। আর এই দরবার হলের উপরের বিখ্যাত ভুলভুলাইয়া। ফেলুদার বইয়ে আছে ‘দুশো বছর আগে নবাব আসাফ-উদ্-দৌল্লা তৈরী করেছিলেন এই প্রাসাদ। ভেবেছিলেন আগ্রা দিল্লিকে টেক্কা দেবেন। ভারতবর্ষের সেরা প্রাসাদ-করনে-ওয়ালাদের নিয়ে হল একটা কম্পিটিশন । তারা সব নকশা পাঠাল। তার মধ্যে বেস্ট নকশা বেছে নিয়ে হল এই ইমামবড়া। বাহারের দিক দিয়ে মোগল প্রাসাদের সঙ্গে কোন তুলনা হয় না, তবে সাইজের দিক থেকে একেবারে নাম্বার ওয়ান। এত বড় দরবার-ঘর পৃথিবীর কোনও প্রাসাদে নেই’। আমাদের গাইড লোকটিও আমিসহ কালাম ভাই আর ভাগ্নি মিশুকে পৃথিবীর বৃহত্তম দরবার কক্ষের অবাক করা সব তত্ত্ব দিয়ে মুগ্ধ করছিলেন। ‘দরবার ঘরটা দেখে মনে হল তার মধ্যে অনায়াসে একটা ফুটবল গ্রাউন্ড ঢুকে যায়। আর একটা কুয়ো দেখলাম, অত বড় কুয়ো আমি কখনও দেখিনি। গাইড বললো অপরাধীদের ধরে ধরে ওই কুয়োর মধ্যে ফেলে দিয়ে নাকি তাদের শাস্তি দেওয়া হত।’ এই লাইন টা ফেলুদা থেকে নিলাম।

মচ্ছি ভওয়ন

কালাম ভাই আর মিশু ভুলভুলাইয়া আর আসিফি মসজিদের সামনে।

বড় ইমামবড়া

বড় ইমামবড়ার দরবার হল

দরবার হলের উপরেই ভুলভুলাইয়া। খুব চাপা সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে হয়। কালাম ভাই নিচে চেয়ারে বসে আমাদের জন্য অপেক্ষা করবেন বলে আমাদের গাইডের সাথে যেতে বললেন। ভুলভুলাইয়ার বর্ণনাটাও ফেলুদা থেকে দিতে চাই। ‘কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্য লাগলো ভুলভুলাইয়া। এদিক ওদিক এঁকেবেঁকে সুড়ঙ্গ চলে গেছে সেগুলো এমন কায়দায় তৈরী যে, যতবারই এক একটা মোড় ঘুরছি, ততবারই মনে হচ্ছে যেন যেখানে ছিলাম সেইখানেই আবার ফিরে এলাম। একটা গলির সঙ্গে আরেকটা কোনও তফাত নেই- দুদিকে দেয়াল, মাথার ওপরে নিচু ছাত, আর দেওয়ালের ঠিক মাঝখানটায় একটা করে খুপরি। গাইড বলল, নবাব যখন বেগমদের সঙ্গে লুকোচুরি খেলতেন, তখন ওই খুপরিগুলোতে পিদিম জ্বলত। রাত্তিরবেলা যে কী ভুতুড়ে ব্যাপার হবে সেটা বেশ বুঝতে পারছিলুম।’ আমাদের গাইডও এইসব কথা বলেছিলো। একটা সময় আমরা ভুলভুলাইয়া থেকে বড় ইমামবড়ার ছাদে গিয়ে দাড়াই। ওখান থেকে লখনৌ শহরটা পুরো দেখা যায়। আসিফি মসজিদ আর মচ্ছি ভওয়নের একটা সুন্দর কম্পোজিশনও পাওয়া যায়। নিজেকে ফেলুদা ফেলুদা মনে হল।

ভুলভুলাইয়ার গোলকধাঁধা

ভুলভুলাইয়ার ছাদ থেকে দেখা দৃশ্য

মনে ভীষণ আনন্দ নিয়ে এরপর ছোট ইমামবড়া ঘুরে দেখি। বড় ইমামবড়া আর ছোট ইমামবড়া সম্পূর্ণ আলাদা রকম বিষয়। ছোট ইমামবড়া হচ্ছে সত্যিকারের ইমামবড়া বা শিয়া মুসলমানদের প্রার্থনার জায়গা। যা ১৮৩৮ সাথে মোহাম্মদ আলী শাহ তৈরী করেছিলেন। ছোট ইমামবড়া বিল্ডিংটা খুব সুন্দর। অল্প সময়ে ছোট ইমামবড়া দেখে বের হয়ে গেলাম আমরা। এর পরের গন্তব্য রেসিডেন্সি। এটাও ফেলুদার বই পড়ে বাকেট লিস্টে রেখেছিলাম।

ছোট ইমামবড়া

রেসিডেন্সির আসল নাম ব্রিটিশ রেসিডেন্সি। সিপাহী বিপ্লবের সময় লখনৌ শহরে ব্রিটিশ জেনারেলের থাকার জায়গার নাম রেসিডেন্সি। সেপাই বিদ্রোহের সময় সেপাইদের আক্রমণে ব্রিটিশ সেনারা এই রেসিডেন্সি কমপ্লেক্সে আশ্রয়গ্রহণ করেছিলো। সেপাই বিদ্রোহের স্মৃতি বিজরিত জায়গাটি এখন লখনৌর সবচেয়ে বিখ্যাত পর্যটন প্রিয় জায়গা।

রেসিডেন্সির বর্ণনাটা আবার আমি ফেলুদার বই থেকে নিতে চাই। ‘রেসিডেন্সিটা সত্যিই একটা দেখবার জিনিস। প্রথমত জায়গাটা খুব সুন্দর। চারিদিকে বড় বড় গাছপালা-তার মাঝখানে এখানে ওখানে এক একটা মিউটিনির আমলের সাহেবদের ভাঙা বাড়ি। গাছগুলোর ডালে দেখলাম ঝাঁকে ঝাঁকে বাঁদর।

সেপাইদের গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া বিল্ডিং

মিশু আর কালাম ভাই মুগ্ধ হয়ে দেখছে রেসিডেন্সি

‘সেপাই মিউটিনির সময় লখনৌ শহরে নবাবদেরই রাজত্ব। ব্রিটিশরা তাদের সৈন্য রেখেছিলেন এই বাড়িটার ভেতরেই। স্যার হেনরি লরেন্স ছিলেন তাদের সেনাপতি। বিদ্রোহ লাগল দেখে প্রাণের ভয়ে লখনৌ শহরের যত সাহেব মেমসাহেব একটা হাসপাতালের ভিতর গিয়ে আশ্রয় নিল। কদিন খুব লড়েছিলেন স্যার হেনরি, কিন্তু আর শেষটায় পেরে উঠলেন না। সেপাই-এর গুলিতে তাঁর মৃত্যু হল। আর তার পরে ব্রিটিশদের কী দশা হল সেটা এই বাড়ির চেহারা দেখেই কিছুটা আন্দাজ করা যায়।’

বিরাট বিরাট গাছ আর ভাঙ্গাচোরা বিল্ডিংয়ের মধ্যে কেমন যেন একটা শান্তি শান্তি একটা ব্যাপার ছিলো রেসিডেন্সিতে। সেপাই বিদ্রোহে আমাদের উপমহাদেশের বীর সেপাইদের বীরত্বে আমাদের মন ভালো হয়ে গেছিলো সেদিন।

৯ বছর আগের লখনৌ ভ্রমণের ঘটনা লেখতে গিয়ে যে সেটা এতো বড় হয়ে যাবে ভাবিনি। সেজন্য ভ্রমণকাহিনিটা আর লম্বা করবোনা। ভ্রমণ বলতে এটুকুই বলা যায়। তবে লখনৌ ভ্রমণে যেতে চায় বা ভবিষ্যতে লখনৌতে সুযোগ পাবে, তাদের বলতে চাই যে লখনৌ একটা ঐতিহাসিক শহর। এখানের মানুষরা খাওয়াদাওয়া পছন্দ করে। এখানকার বিরানী, কাবাব, মিষ্টি, চাট ইত্যাদি অবশ্যই চেখে দেখবেন। লখনৌর পুরোনো বাজার হজরতগঞ্জ আর চক মার্কেটে অবশ্যই যাওয়া উচিৎ। লখনৌর চিড়িয়াখানা ভারতের সেরা চিড়িয়াখানার একটা। সাথে যেতে পারেন লখনৌর অসংখ্য পার্কের কয়েকটিতে। গুমতি/গমতি নদীর তীরে আছে ঘুরার জন্য অনেক সুন্দর জায়গা। আধুনিক মল আর সুপার মার্কেটেও উকিঁ দেয়া যেতে পারে।

ছোট্ট একটা দুঃখের ঘটনা দিয়ে লখনৌ ভ্রমণ শেষ করি। কালাম ভাই ঠিক করেছিলেন শেষ দিনের ডিনারটা হোটেলেই করবেন। সেজন্য উনি কনফারেন্সের গ্রান্ড ডিনারের রেজিষ্ট্রেশন বাদ দিয়েছিলেন। ভেবেছেন দেশে ফেরার আগে একটু রেস্ট নেয়া হবে, সাথে নিজেরা নিজেদের মতো সময় কাটানো যাবে। আগেই বলেছি ক্লার্কস আওয়ধ লখনৌর সেরা হোটেল। আর সেই কনফারেন্সটাও খুব বড় একটা কনফারেন্স, ফলে আমার আশংকা সত্যি করে কনফারেন্সের গ্রান্ড ডিনার কাম কনসার্টটা আমাদের হোটেলের পিছনের লনেই শুরু হলো। যেহেতু রেজিষ্ট্রেশন করা হয়নি, সেজন্য আমরা টপফ্লোরে যখন খেতে বসেছি, তখন জানালা দিয়ে মাঠের চারিপাশের কাবাবের স্টলগুলো দেখে দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলছি। শুধু খাবার না, অনেক পরিচিত মুখের মানুষের সাথে আড্ডাটাও অনেক মিস হয়ে গিয়েছিলো সেদিন।    

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top