সিডনী বৃহঃস্পতিবার, ২৫শে ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১৩ই ফাল্গুন ১৪২৭

করোনায় বিপর্যস্ত পোশাক শিল্প ঘুরে দাঁড়াতেই আবারও অনিশ্চয়তায় : অনজন কুমার রায়


প্রকাশিত:
২৩ জানুয়ারী ২০২১ ১৪:৫০

আপডেট:
২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ১৩:০৭

 

করোনা মহামারী প্রাদুর্ভাব সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ায় তৈরি পোশাক খাতে এক ধরণের বিপর্যয় দেখা দেয়। আমাদের দেশের মোট রপ্তানী আয়ের প্রায় ৮৩ শতাংশ আসে পোশাক শিল্প থেকে। তাই, দেশের পোশাক শিল্প অর্থনীতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। পোশাক শিল্প বিপর্যয়ের ফলে অর্থনীতির উপর নেতিবাচক প্রভাব বিদ্যমান থাকে।

পোশাক রপ্তানীতে শীর্ষে অবস্থানকারী দেশ চীন। ধারণা করা হয়েছিল করোনা ভাইরাস উৎপত্তির কারণে চীনের উপর দীর্ঘ মেয়াদী প্রভাব বিদ্যমান থাকবে। চীনের উপর নেতিবাচক প্রভাব বিদ্যমান থাকলে অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও রপ্তানীর ক্ষেত্রে সুবিধা ভোগ করতে পারবে। কিন্তু, বাণিজ্যযুদ্ধের সম্ভাব্য পরিণতি মোকাবেলায় চীনা উদ্যোক্তাদের কারখানা ভিয়েতনামে স্থানান্তর করা হয়। ফলে ভিয়েতনামে পোশাক শিল্পের বাণিজ্য সম্প্রসারিত হতে থাকে। বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের কাঁচামাল বেশিরভাগই চীন থেকে সরবরাহ করতে হয়। কিন্তু করোনার কারণে কাঁচামাল সরবরাহে জটিলতা দেখা দেয়। তাই করোনাকালীন সময়ে সরবরাহ চেইনের বৈচিত্র্যকরণে এবং অর্থনৈতিক ক্রিয়াকালাপে সমস্যা দেখা দেয়। যার ফলে, পোশাক শিল্পে নেতিবাচক প্রভাব বিদ্যমান থাকে। যদিও ২০১৮ সালের তুলনায় ২০১৯ সালে পোশাক রপ্তানীতে বাংলাদেশ এগিয়ে ছিল। কিন্তু, ২০২০ সালের সূচনালগ্ন থেকেই উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০১৯ সালে গ্লোবাল ক্লোথিং এক্সপোর্টে বাংলাদেশের বাজার অংশীদারিত্বে ছিল ৬ দশমিক ৮ শতাংশ যা ২০১৮ সালে ছিল ৬ দশমিক ২ শতাংশ। এক বছর ব্যবধানে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারত্ব বাড়ে দশমিক দুই শতাংশ। রপ্তানী উন্নয়ন ব্যুরো ইপিবি'র মতে, ২০১৯ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বরে পোশাক রপ্তানীর পরিমাণ ১ হাজার ৬০২ কোটি ৪০ লাখ ডলার। কিন্তু, ২০২০ সালে একই সময়ে রপ্তানী নেমে আসে ১ হাজার ৫৫৪ কোটি ৬৫ লাখ ডলারে যা বিগত বছরের তুলনায় ২ দশমিক ৯৯ শতাংশ কম।

মহামারী প্রকোপের দরুণ মার্কিন ও ইউরোপের বাজারে পোশাকের চাহিদা কমে আসায় আমাদের দেশ থেকে রপ্তানীর ক্রয়াদেশ অনেকক্ষেত্রে বাতিল হয়ে যায়। তার উপর আমাদের দেশে দুই মাস লকডাউন থাকায় বিরূপ প্রতিক্রয়া দেখা দেয়। যার ফলে উৎপাদন ব্যাহত হয়। পর্যাপ্ত পরিমাণ কাজ না থাকায় কারখানা থেকে অনেক শ্রমিককে ছাটাই করা হয়।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার(WTO)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯ সালে বিশ্বে পোশাক রপ্তানীতে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল দ্বিতীয়, ভিয়েতনাম ছিল তৃতীয়। তবে, বিজিএমইএ'র হিসাব অনুযায়ী ইতোমধ্যে বাংলাদেশকে পেছনে ফেলে বর্তমানে দ্বিতীয় স্থানে অবস্থান করছে ভিয়েতনাম। বিজিএমই-এর অন্য এক তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের জানুয়ারী থেকে মে মাস পর্যন্ত ভিয়েতনামের পোশাকখাতে রপ্তানী আয় আসে ১ হাজার ৫০ কোটি ৯১ ডলার। যেখানে বাংলাদেশ রপ্তানী করে ৯৬৮ কোটি ৪৯ লাখ ১০ হাজার ডলারের পণ্য। ২০২০ সালের প্রারম্ভিক সময় থেকেই পোশাকখাতে মন্দাভাব দেখা দেয়। কয়েক মাসের ব্যবধানে আস্তে আস্তে মন্দাভাব কমতে থাকে। মহামারী প্রাদুর্ভাবের দরুণ বিশ্বের অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়ায় গত এপ্রিল মাসে বাংলাদেশে রপ্তানী আয় তলানীতে ঠেকে। লকডাউন শিথিল করায় মে মাস থেকে রপ্তানী ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। চলতি ২০২০-২০২১ অর্থবছরে প্রথম তিন মাসে সেই ইতিবাচক ধারা অব্যাহত ছিল। অক্টোবরে প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশ কমলেও নভেম্বরে দশমিক ৭৬ শতাংশ বেড়ে যায়। (সূত্র: দৈনিক জনকন্ঠ; ৬ জানুয়ারী, ২০২১)

তবে মন্দাভাব কাটিয়ে উঠা শুরু করলে আবারও পোশাক শিল্পে শঙ্কা দেখা দেয়। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের একটা বড় অংশ ইউরোপের বাজার দখল করে আছে। ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পোশাক রপ্তানী করে আসছে জার্মানীতে, তারপর যুক্তরাজ্যে। মোট পোশাক রপ্তানীর প্রায় ৫৪ শতাংশ ইউরোপের বিভিন্ন দেশগুলোতে হয়ে থাকে, বাকি ৪৬ শতাংশ অন্যান্য দেশে। তাই ইউরোপ দেশগুলোর ব্যবসায়িক পরিস্থিতির উপর পোশাক রপ্তানীর আয় অনেকাংশ নির্ভর করছে। গত নভেম্বর থেকে শুরু হয়েছে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ। কিন্তু ইউরোপের দেশগুলোতে করোনায় আঘাত হানায় আবারও পোশাক বাজারে স্থবিরতা দেখা দেয়। বিশেষ করে যুক্তরাজ্যে নভেম্বর মাসে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হওয়ায় সীমিত আকারে আবারও লকডাউন ঘোষণা করা হয়। সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। করোনার প্রথম ধাক্কায় পোশাক খাত ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্থ হয়। কিছুদিনে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করলেও করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে রপ্তানীর ক্ষেত্রে বিপর্যয়ের শঙ্কা আবারও দেখা দেয়। অথচ পোশাক রপ্তানীর চাহিদা অন্যান্য সময়ের চেয়ে শীত মৌসুমেই বেশি হয়।

আবার, বিশ্ব ব্যাংক প্রকাশিত অন্য এক রিপোর্টে দেখা যায়, তৈরি পোশাক রপ্তানী কমে যাবার অন্যতম কারণ হচ্ছে লিড টাইম (পণ্য সরবরাহের সময়সূচী) বেশি হওয়া। পোশাক রপ্তানীতে ভিয়েতনামের ক্ষেত্রে লীড টাইম কম হওয়া, ভাল বন্দর সুবিধা, অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ সর্বোপরি বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার মতো ক্ষমতা। অন্যদিকে, মেনমেইড ফাইবারের চাহিদা বাড়লেও বাংলাদেশে কটন ফাইবারের উৎপাদন বেশি হচ্ছে। তাছাড়া প্রযুক্তিগত এবং অবকাঠামোগত কারণেও অন্যান্য দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। প্রতিদ্বন্দ্বি দেশগুলো বিশেষ করে ভারত, পাকিস্থান, তুরস্কসহ নিজস্ব মুদ্রার সাথে ডলারের ডিভ্যালুয়েশন করছে। কিন্তু আমাদের দেশে সেটা সম্ভব হচ্ছে না। স্বভাবতই সেখানে টিকে থাকা কষ্টকর হচ্ছে। তাছাড়াও পোশাক ক্ষেত্রে এক ধরণের মন্দাভাব সারা বিশ্বে বিরাজ করায় পোশাকের দরও কমতির দিকে। আবার মহামারীর প্রকোপজনিত কারণে মানুষের পোশাক কেনার চাহিদাও অনেক কমে আসছে। তবে দিন দিন পোশাক বাজারে চাহিদায় বৈচিত্র্য দেখা দেওয়ায় এক ধরণের পরিবর্তন এসেছে। বিদেশের ক্রেতারা ক্রয়াদেশের ক্ষেত্রেও বৈচিত্র্য নিয়ে আসছে।

আশার কথা হলো, মহামারী জনিত কারণে ওভেন পোশাক রপ্তানী কমলেও নিটওয়্যার রপ্তানী বেড়েছে। বাংলাদেশকে প্রতিযোগিপৃূর্ণ দেশগুলোর সাথে টিকে থাকতে হলে উৎপাদিত পণ্যের সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। পাশাপাশি প্রযুক্তিগত উন্নয়ন জোরদার করতে হবে। মহামারী প্রাদুর্ভাব মোকাবেলায় পোশাক খাতকে বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচাতে সরকার বিভিন্ন ধরণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তার মধ্যে প্রণোদনা প্যাকেজ উল্লেখযোগ্য। পাশাপাশি অন্যান্য সহযোগিতাও সরকার থেকে দেয়া হচ্ছে। তবে, বাংলাদেশে গভীর সমুদ্র বন্দর প্রতিষ্ঠিত হলে অনেকটা বাঁধা কাটিয়ে উঠা সম্ভব হবে। মহামারীর মন্দভাব কাটিয়ে উঠতে পারলে আবারও তৈরি পোশাক শিল্পে সুদিন ফিরে আসবে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।

 

অনজন কুমার রায়
ব্যাংক কর্মকর্তা ও লেখক

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top