সিডনী বৃহঃস্পতিবার, ৯ই ডিসেম্বর ২০২১, ২৫শে অগ্রহায়ণ ১৪২৮

রহস্যে - রোমাঞ্চে ভরা আদিম আন্দামানঃ অতীত ইতিহাসের খোঁজে : ডঃ সুবীর মণ্ডল


প্রকাশিত:
৩০ নভেম্বর ২০২০ ১০:২৭

আপডেট:
৯ ডিসেম্বর ২০২১ ১৮:৩৮

ছবিঃ আন্দামানে নৃবিজ্ঞানী ডঃ মধুমালা চট্টোপাধ্যায়

 

প্রকৃতিকে  তার আদিমরূপে দেখতে চাইলে আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের দ্বীপগুলো অতুলনীয়। নগরজীবনের কোলাহল থেকে মুক্ত এক অন্য পৃথিবী। আট থেকে আশির স্বপ্নপূরণের  আদর্শঠিকানা। তাসেরদেশের রাজপুত্রর কোন দূর দ্বীপের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়েছিলেন অকূল সমুদ্রে তার আমরা কেউ জানি না। তবে এখানে পৌঁছে আপনার মনে হবে এ যেন সেই অচিন দেশের রাজপুত্রের  স্বপ্নের দেশ "নীলের কোলে শ্যামল সে দ্বীপ প্রবাল দিয়ে ঘেরা" এর বালুকাবেলায় বসে অশান্ত সমুদ্রের গর্জনে ও ঝোড়ো হাওয়ায় আন্দোলিত শ্যামবনানীর মর্মর স্বরে শুনতে পাওয়া যাবে অনন্ত রহস্যের রোমাঞ্চকর আদিম মানুষের কথা। বঙ্গোপসাগর যেখানে কূলহারা ভারত মহাসাগরের বুকে গিয়ে মিশেছে তার কাছাকাছি নারিকেল কুঞ্জের শ্যামচ্ছায়া ঘেরা রহস্যময়ী আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ। ভারততীর্থ আন্দামান মেইনল্যাণ্ড কোলকাতা থেকে ১২৩৬ কিমি দূরে অবস্থিত। পৃথিবীর সুন্দরতম স্হানগুলির মধ্যে অন্যতম। আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ বিরল সৌন্দর্যের লীলাভূমি। মাথায় পাহাড়ী উঁচু--নিচু ঘোমটা; আকাশের হালকা নীল আর বনানীর গাঢ় সবুজের সঙ্গে, সূর্যের সোনালী রঙ মিশে যেন এক নকশা বুনেছে,আর কোমরে তার ফিরোজ  সবুজের সলিল ঘাঘরা,কটি দেশে ফেনময় উচ্ছ্বসিত তরঙ্গরাশি, কপাল তার আকাশের চাঁদ--টিপ, পায়ে তার ঘুঙুর বাজছে দিনরাতে। আহা! কি অপরূপা!কী লাবণ্যময়ী! ৩৭৩টি দ্বীপ নিয়ে আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের সংযুক্তি করণ হয় ব্রিটিশের হাতে ১৭৮৮সালে। এ -একবর্ণময় ইতিহাস। ১৮৮৯ সালে হাইড্রো গ্রাফার  ক্যাপন্টেন  আর্কিবল্ড  ব্লেয়ার উদ্বাস্তুদের জন্য  পোর্টুব্লেয়ার চ্যাথাম নামক অঞ্চলে প্রথম বসতি গড়ে তোলেন। সেই সঙ্গে কয়েদিদেরও রাখার ব্যবস্থা করা হয়। উপজাতি অধ্যুষিত এলাকায় সভ্য মানুষের ছোঁয়া এই প্রথম লাগে। সভ্যতার আলো আসে অন্ধকারাচ্ছন্ন দ্বীপে।এই দ্বীপে দুটি জেলা আন্দামান ও নিকোবর। ছোট বড় মিলিয়ে ২২টি দ্বীপে লোকবসতি গড়ে উঠেছে বেশ কিছু আগেই।

(১) সুন্দরবনের নাম শুনলেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে রয়াল বেঙ্গল টাইগারের লোমহর্ষক ছবি। যেন বনের মধ্যে দৌড়চ্ছে হরিণের পিছনে। ঠিক তেমনিই  আন্দামানের কথা উঠলেই মনের মধ্যে জেগে ওঠে জারোয়ারা। বিশালদেহী, কুচকুচে কালো কালো মানুষগুলো যেন তীর-ধনুক ত্যাগ করে সমুদ্রতীরে  দাঁড়িয়ে রয়েছে। সভ্যমানুষকে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।এ-এক অন্য পৃথিবী। শুধু পরতে পরতে আদিমতা ও রহস্যময়তা। সভ্যতার আলো বিচ্ছুরিত হয়নি একফোঁটাও। আন্দামানের এই আদিবাসিন্দা দের  সম্পর্কে আধুনিক সভ্য মানুষের কৌতূহল, আজ নয়,যুগ যুগ ধরে।আর এই কৌতূহলকে রসদ জুগিয়েছে জনবসতিহীন কয়েকশো দ্বীপ ঘিরেই রহস্য আর রোমাঞ্চ।এই দ্বীপগুলি স্বতন্ত্র চরিত্র নিয়ে অনন্ত জলরাশির মাঝে মাথা  তুলে নীরবে দাঁড়িয়ে আছে। বাইরে থেকে এই সব দ্বীপের যে কোন একটিকে দেখলেই  মনে হবে, এই বুঝি জারোয়ারা আক্রমণ  করতে এল!

(২) জারোয়াদের জংলি এবং জঙ্গি স্বভাব সম্পর্কে নানান কথা শোনা যায় আজকেও। তবে তাদের চেয়ে আরও ভয়ঙ্কর সেন্টিনেলিজ সম্প্রদায়ের মানুষ। জারোয়াদের সঙ্গে সভ্য জগতের একটা মানবিক সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা হয়েছে এবং চলছে ধারাবাহিক ভাবে আজো। কিন্তু সেন্টিনেলজির ব্যাপারে  বিশেষ কিছু সুবিধা কেউই করে উঠতে পারেনি।এটা অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা। তবে চেষ্টা এখনো চলছে নানা রকম ভাবে। নানান ধরনের তথ্য থেকে জানা যায়, যতবারই চেষ্টা হয়েছে তাদের কাছে যাওয়ার ও কাছের মানুষ হওয়ার, ততবারই ফল হয়েছে মারাত্মক ও মর্মান্তিক। অবশ্য আন্দামানের আকর্ষণ কেবল আদিম জনজাতিকে ঘিরে শুধু নয়, আছে অপরূপ প্রাকৃতিক শোভা। পর্যটকদের কাছে যার আকর্ষণ দুর্ণিবার। অনেকেই বলেন, আন্দামান দ্বীপপুঞ্জ হল বরফহীন সুইজারল্যান্ড। দেশি-বিদেশী পর্যটকরা তাই আন্দামানে গিয়ে মুগ্ধ হয়ে যান। কেন্দ্রশাসিত এই দ্বীপপুঞ্জে দ্বীপের সংখ্যা আনুমানিক ৫০০। জনবসতি আছে মাত্র বর্তমানে ৩৮টিতে। সব মিলিয়ে আন্দমান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের জনসংখ্যা ৪ লক্ষের কাছাকাছি । তবে এদের মধ্যে আদিম জনজাতির সংখ্যা নগণ্য। এদের চারটি নামে এবং বর্ণে বিভক্ত করা হয়। গ্রেট আন্দামানিজ, ওঙ্গি, জারোয়া এবং সেন্টিনেলিজ। প্রথম দুটি সম্প্রদায় অনেক আগেই সভ্যতার সংস্পর্শে এসেছে।তবে সেই সভ্যতা তাদের কাছে আশীর্বাদ নয়, অভিশাপ রূপে দেখা দিয়েছে। গ্রেট আন্দামানিজরা অস্তিত্ব লোপাটের আশঙ্কায় দিন গুনছে। সভ্যমানুষের নানা রকম ব্যাধি এইসব বন্য মানুষদের গ্রাস করেছে। গবেষণা লব্ধ তথ্য থেকে জানা যায় অসুখের মধ্যে নিউমোনিয়া, হাম এবং যৌনরোগ সিফিলিসও আছে। বংশ রক্ষার ক্ষেত্রে বড় অন্তরায় হয়ে পড়েছে এইসব মারণ রোগ। বর্তমানে ভারত সরকার এদের রেখেছে স্ট্রেট আইল্যাণ্ডে।

(৩) ওঙ্গিদের বাসভূমি লিটল আন্দামান। অস্তিত্বের সংকট এদের কেও পিছু ধাওয়া করেছে। জীবিত ওঙ্গিদের বর্তমান সংখ্যা ৯৭এর কাছাকাছি।এরা এখন সভ্য সমাজের মতো পোশাক, নেশার তাগিদে তামাক ব্যবহারে অনেক বেশি পারদর্শী হলেও জারোয়াদের মতো এরাও জঙ্গি মানসিকতার। ১৮৬৭সালে ব্রিটিশ জাহাজ 'আসাম ভ্যালি' লিটল আন্দামানে নোঙর করে বিপদে পড়ে। খালাসিরা জাহাজ থেকে নামামাত্র তাদের বনের মধ্যে টেনে নিয়ে চলে যায়, নির্বিচারে হত্যা করে। কেউ উদ্ধার করতে পারেনি।কারণ তীরবৃষ্টি চলে। আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের তৎকালীন চিফ কমিশনার জেনারেল স্টুয়াট রওনা দেন লিটল আন্দামানে। জাহাজ নোঙর করেন এবং নামেন। তবে ওঙ্গিদের দেখা না পেয়ে তাদের জন্য উপহার সামগ্রী রেখে আসেন। পরে সিঙ্ক আইল্যাণ্ড থেকে বেশ কিছু জনকে ধরে পোর্টব্লেয়ারে আনেন। প্রচুর উপহার সামগ্রী তাদের হাতে তুলে দিয়ে আবার স্বস্হানে  রেখে আসা হয়। তারপর থেকেই ওঙ্গিদের সঙ্গে সভ্য সমাজের সম্পর্ক তৈরি হয়। ওঙ্গিরা আধুনিক সমাজের কুপ্রভাবে পড়েছে।  আন্দামানের এই আদিম জনজাতি তামাকের নেশায় বুঁদ হয়ে আছে। নারী-পুরুষ সকলেই তামাক খেতে ভালোবাসেন। খাদ্য বলতে শুয়োরের মাংস, মাছ, কচ্ছপ, কাঁকড়া ছাড়াও নানান ধরণের ফলমূল, শাকপাতা ওঙ্গিরা তৃপ্তির সঙ্গে খায়। তবে ওদের খাওয়া-দাওয়ার মধ্যে অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য নৃতত্ত্ববিদরা লক্ষ করেছেন। সেটা হলো ওরা ভীষণ পেটুক। প্রচুর খেতে পারে। খাবার পেলে গোগ্রাসে গিলে খায়। অবাক হওয়ার মতো ঘটনা হলো তিনদিন পর্যন্ত উপোসে থাকতে কোন অসুবিধা হয় না ওদের।

(৪) অবশ্য গ্রেট আন্দামানিজ এবং ওঙ্গিদের বন্য জীবন সম্পর্কে নৃতত্ত্ববিদরা আরো গবেষণায়  জেনেছেন, জঙ্গলের রাজত্বে আইন অলিখিত হলেও, প্রয়োগের ক্ষেত্রে কোন ফাঁকফোকর নেই। বিবাহ থেকে মৃত্যুর শোক পালন  সবই আইনের মতোই রীতি অনুযায়ী হয়। কেউ কোনও অন্যায় করলে বয়স্করা বসে বিচার করে। সেই রায় চূড়ান্ত। কেউ অমান্য করে না।এই জনজাতির বিয়েটা বেশ অভিনব। কৈশোর না পেরলে আধুনিক সমাজের মানুষের মতোই বিয়ে হয় না ওদের সমাজে। পাত্রী পরিণত হলে পাত্র ঠিক হয়। বিয়ের সময় কনে বসে থাকে একটি ঝুপড়িতে। পাত্রকে এনে পাত্রীর কোলে বসিয়ে দেওয়া হয়। এইভাবেই বিয়ের কাজ সম্পন্ন হয়। পরস্ত্রী ফুসলে নিয়ে যাওয়ার প্রবণতা এদের মধ্যে কোনদিনই ছিল না। বিয়ের পর ওঙ্গি এবং গ্রেট আন্দামানিজদের 'হনিমুনে' যাওয়ারও চল ছিল। বর-বউ বিয়ের পর চলে যেত গভীর অরণ্যে, সকলের ধরাছোঁয়ার বাইরে ‌। একান্তে দু'জনে বেশ কিছুদিন কাটিয়ে আবার ফিরে আসত নিজেদের সমাজে। আমৃত্যু স্বামী--স্ত্রীর অবিচ্ছিন্ন জুটি। বিবাহ বিচ্ছেদের বালাই নেই। তবে স্বামী অথবা স্ত্রীর মৃত্যুর পর যে কেউ পুনরায় বিয়ে করতে পারে। তাতে কোন বাধা নেই। মেয়েরা সাজগোজ না জানলেও, নিজেদের শরীর সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন। কটিদেশে গাছের ছাল, ঊর্ধ্বাঙ্গে পাতা-পল্লবের ব্যবহারই তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ওঙ্গি মেয়েরা চুল একটু বড় হলেই কাঁচ দিয়ে কেটে ফেলে। এটাও এক ধরনের রূপচর্চা।

(৫) আন্দামানে এই দুই আদিম জনজাতি সম্পর্কে অনেক কিছুই জানা গেলেও জারোয়াদের  জীবন সম্পর্কে বেশ কিছু তথ্য আজও অজানা থেকে গেছে। কেউ কেউ বলেন বহিরাগত  শত্রুর হাতে থেকে নিজেদের জীবনরক্ষার স্বার্থেই  আন্দামানের আদিম মানুষেরা আজো স্বভাবে হিংস্র। বিভিন্ন সময়ে দ্বীপপুঞ্জের দখল নিয়ে যুদ্ধ-সংঘর্ষ  হয়েছে ও এখনো মাঝে মাঝে  সংবাদ শিরোনামে লক্ষ্য করা যায়। বিভিন্ন সময় দ্বীপপুঞ্জের দখল নিয়ে যুদ্ধ-বিগ্রহ হয়েছে।তাতেই আতঙ্ক বেড়েছে। তাঁর ওপর সমুদ্র এবং অরণ্যের বিপুল পরিমাণ সম্পদ লুটপাটের জন্য যুগ যুগ ধরে দেশী-বিদেশী চোরা শিকারিদের হানা চলেছে বিভিন্ন দ্বীপে। এখনোও চলে চোরাগোপ্তা শিকার। তাদের অপকর্মে বাধা দেওয়ার কাজে জারোয়ারা আজও জাগ্রত প্রহরী। জারোয়ারা ঠিক কোন দ্বীপে অবস্হান করছে তার হদিশ সম্পর্কে কারোর সঠিক জ্ঞান নেই। খাদ্যের সন্ধানে তারা সর্বদা ঘুরে বেড়ায়, এ দ্বীপ থেকে অন্য দ্বীপে। এক সময়ে জারোয়াদের আনুমানিক সংখ্যা  ছিল আড়াইশোর মতো। পাঁচ ফুটের নীচে কারোও উচ্চতা নয়। গায়ের রঙ কালো, চুল কোঁকড়ানো। অনন্ত ৩০/৪০ বছর ধরে আন্দামান এবং নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের প্রশাসনের সহযোগিতা ও প্রচেষ্টায়  কোনও কোনও অংশের জারোয়াদের সঙ্গে উপহার সামগ্রী বিনিময় হয়েছে।এই পর্যন্ত, সম্পর্ক স্হাপনের কাজ তার বেশি এগোয়নি। বিভিন্ন ভিডিও ক্যাসেট থেকে দেখা গেছে জারোয়াদের কাছে যাওয়ার নানা ধরনের উদ্যোগ ও অভিযান নেওয়া হয়েছে। সরকারি লঞ্চ পৌঁছনমাত্র বেশ কিছু জারোয়া নর-নারীর  উপস্থিত ঘটে, জলের কাছাকাছি চলে আসে। কয়েক জন পুরুষ জারোয়া লঞ্চের উপরে উঠেও পড়ে। বেশ আনন্দ সহকারে উপহার সামগ্রী নিয়ে গভীর জঙ্গলে লুকিয়ে পড়ে। নারকেল ও লাল কাপড় ফেলে আনন্দে আত্মহারা হয়ে ওঠে। জারোয়া জননীরা কোলে বাচ্চা নিয়ে সমুদ্রতীরে দাঁড়িয়ে থাকে। তবে অন্য একটি ভিডিও ক্যাসেট থেকে দেখলাম সেন্টিনেলিজরা এখনো রয়েছে বেশ দূরে। সেন্টিনেল দ্বীপের ভৌগোলিক অবস্থান কিছুটা বিচ্ছিন্ন। কাছাকাছি কোনো দ্বীপ নেই। ওরা জলের মধ্যে সাঁতার কেটে এসে শত্রুকে আক্রমণ করে। জারোয়াদের চেয়ে অনেক বেশি হিংস্র। ভিডিও ফিল্ম দেখে মনে হলো এদের স্বাস্হ্য মজবুত ও সুঠাম। উচ্চতা ছয় ফুটের মতো। নারী-পুরুষ সবাই উলঙ্গ। লম্বা লম্বা পা ফেলে ভীষণ তাড়াতাড়ি হাঁটে। জারোয়া ও সেন্টিনেলিজরা  শুয়োরের মাংস খেলেও  হরিণকে হত্যা করে না।  কিছু কিছু নৃতত্ত্ববিদ মনে করেন, হরিণ সম্পর্কে ওদের একটা  স়ংস্কার আছে। হয়তোবা হরিণকে দেবতা জ্ঞানে পুজো করে। বর্তমানে সেন্টিনেলিজদের সংখ্যা ৬০/৭০ হবে বলে আন্দামান প্রশাসনের অনুমান।

(৬) কিছু কিছু নৃতত্ত্ববিদের মতে, জারোয়া ও ওঙ্গিদের মিলনে জন্ম হয়েছে সেন্টিনেলিজদের। অতীতের কোন এক যুদ্ধের সময়, এরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং সেন্টিনেল দ্বীপেই আশ্রয় নেয়। তবে আন্দামানের আদিম জনজাতিদের জন্ম ও জীবনধারা সম্পর্কে যে সব চর্চা হয় তার বেশি ভাগই অনুমানভিত্তিক। ওরা আন্দামানে এলো কি করে? এব্যাপারে নানা জনের নানা ধরনের ভাবনা ও মত। কেউ বলেন, পঞ্চদশ শতাব্দীতে  মোজাম্বিকের একটি জাহাজ আন্দামানের কাছে ডুবে যায়। তাতে ৩০০ কাফ্রি ক্রীতদাস যাত্রী ছিল। সেই যাত্রীদের মধ্যে কয়েকজন সাঁতার কেটে আন্দামানের দ্বীপে আশ্রয় নেয়। তাদের উত্তরাধিকারী হলো এই ওঙ্গি, জারোয়া, সেন্টিনেলিজরা। (অবশ্য যাঁরা এই মতের বিরুদ্ধে তাঁরা মনে করেন, ১৪৯৮ সালে প্রথম পর্তুগিজ জাহাজ ভারতে পৌঁছেছিল। তাহলে তার আগে কী করে আন্দামানে পর্তুগিজ জাহাজ এলো? আর জাহাজে ছিল সাদা চামড়ার মানুষ। তারা সবাই মরেগেল, আর কেবল সাঁতরে তীরে এসে বাঁচল কাফ্রিরা? ইতিহাসের তথ্য অনুযায়ী আসলে চীন ও মালয়ি জলদস্যুদের একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘাটি ছিল আন্দামানে। বাইরে থেকে আসা অন্যলোকদের ওপর সন্ত্রাস সৃষ্টি করায় তারা অত্যন্ত দক্ষ ছিল। এই কাজে ব্যবহারের জন্য জলদস্যুরা কাফ্রিদের এনেছিল। সেটাই হলো আন্দামানের আদিম জনজাতিদের জন্মবৃত্তান্ত। এই কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের এক সময়ের ডেপুটি কমিশনার এস কে গুপ্ত লিখেগেছেন" আমার অনুমান বাংলাদেশের জলাভূমি, সাঁওতাল পরগনা, বর্মা এবং মালয়ের ঘন অরণ্যের বাসিন্দা ছিল এরা।)

ছবিঃ আদি বাসী শিশুদের সাথে নৃবিজ্ঞানী ডঃ মধুমালা চট্টোপাধ্যায়

শেষকথাঃ 

বিভিন্ন ধরনের গবেষণা মূলক কাজ থেকে মনে হয়েছে আন্দামানের এই আদিম জনজাতিদের সঙ্গে আফ্রিকান নিগ্রোদের সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। এদের জন্মরহস্য আজোও অনেকখানি কাল্পনিক। কেউ সঠিক করে কিছু বলতে পারে না। আর সেই কারণেই বোধহয় আন্দামানের আদিম জনজাতিদের ঘিরে সভ্য সমাজের কৌতূহল আরও বৃদ্ধি পেয়েছে ও ঘনিভূত হয়েছে।১৮৬৩সালে ব্রিটিশ সরকারের শাসকরা রসদ্বীপে' "আন্দামান হোম" তৈরি করে। এইখানে গ্রেট আন্দামানিজদের কিছুদিন রাখা হয়। এটাই তাদের জীবনে চরম সর্বনাশ ডেকে আনে। এই জনজাতির নারীরা অবাধ মেলামেশার সুযোগ পাওয়ায় সভ্যজগতের নানা যৌনরোগের শিকার হয়। সংক্রামিত হয় সেই সব রোগ। জন্মহার কমার শুরু সেখান থেকে। একই অবস্থা ওঙ্গিদেরও। ১৯০২ সালে এদের সংখ্যা ছিল ৬৭২। বর্তমানে সেই সংখ্যা অনেক খানি কমে গেছে বলে গবেষকরা জানিয়েছেন। পোর্টব্লেয়ার যার নামে সেই পোর্টম্যান সাহেব একটি গবেষণা মূলক অনুসন্ধান চালিয়েছিলেন সূদূর অতীতে। দক্ষিণ আন্দামানের কিছু দ্বীপে গ্রেট আন্দামানিজদের সঙ্গে জারোয়াদের সম্পর্ক স্হাপনের একটা ধারাবাহিক চেষ্টা চালান তিনি। কিন্তু এর ফল আশাব্যঞ্জক ছিল না। কোনদিন দু'সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্পর্ক মধুর ছিল না।একে অপরকে চরম শত্রু ভাবতো। বহুদিনের বিদ্বেষ ছিল।কারণটা আজও অজানা। যদিও এই নিয়ে বহু কাল্পনিক গল্প চালু আছে। জারোয়ারা নানান ভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে গ্রেট আন্দামানিজদের তারা একেবারেই পছন্দ করে না। ব্রিটিশ ও জাপানীদের আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে আক্রমণ জারোয়াদের মনকে বিষিয়ে তোলাই একটি কারণ বলে মনে করেন  গবেষক দলের বিভিন্ন নৃবিজ্ঞানীগণ। আজো জারোয়াদের মধ্যে হিংস্র স্বভাব বিরাজ করছে অনেক নৃতত্ত্ববিদ মনে করেন ‌‌‌।দেশ-বিদেশের বহু গবেষক কাজ করে চলেছেন এদের ওপর। কেন্দ্রীয় সরকার ও আন্দামান প্রশাসন নানান জনকল্যাণ মূলক কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।কালগর্ভে যাতে এই আদিম জনজাতি বিলুপ্ত হয়ে না যায়। তার জন্য নানান প্রকল্প বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করে চলেছে ভারত সরকার।

জারোয়াদের মা বলে পরিচিত এক বাঙালি নৃবিজ্ঞানী এই ব্যাপারে বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। নিষিদ্ধ দ্বীপে প্রথম পা রাখলেন বাঙালি কন্যা ডঃমধুমালা চট্টোপাধ্যায়। সময় ১৯৯১ সালের ৩রা জানুয়ারি। নানান নামে তাকে অভিহিত করা হয়। কেউ বলেন নিষিদ্ধ দ্বীপের রানী, কেউ বলেন জারোয়াদের জননী, আবার কেউ ডাকেন "জংলী ম্যাডাম" বলে। ১৯৯১ সালের ৩রা জানুয়ারি রাতে 'এম ভি তারমুগলি' জাহাজে করে সেন্টিনেল দ্বীপের উদ্দেশে রওনা দেন। সাথী ছিলেন আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের প্রশাসনের ডাক্তার অরুন মল্লিক। সঙ্গে সাধারণ পোশাক পরা পুলিশ। পরের দিন সকালে জাহাজ থেকে নৌকা করে দ্বীপভূমিতে নামার চেষ্টা করেন। নেমে পড়েন কোন ভয় না করে।একটু এগিয়ে কয়েকটি কুঁড়েঘর দেখতে পান। কিছু সময় পরে সেন্টিনেলিজদের  সাক্ষাৎ পান। এদের হাতে বিষ মাখানো  তির-ধনুক। নৃবিজ্ঞানী মধুমালা চট্টোপাধ্যায় ভয় না পেয়ে একটি, একটি করে নারকেল গড়িয়ে দিতে শুরু  করেন। সে গুলো নিতে লাগলো সেন্টিনেলিজরা। দূরে দাঁড়িয়ে থাকা ১৪ বছরে এক তরুণ তাকে নিশানা করে তির নিক্ষেপ করতে উদ্যোগী হতেই এক জারোয়া নারী তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয় এবং নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে ডঃ মধুমালা চট্টোপাধ্যায়কে বাঁচান।

ছবিঃ আন্দামানবাসীদের সঙ্গে নৃবিজ্ঞানী ডঃ মধুমালা চট্টোপাধ্যায়

এই ভাবে তিনি   ধীরে ধীরে তাদের আস্হা অর্জন করেছিলেন। ওদের আপনজনে পরিনত হন। ১৮৮৯ সালে তিনি ওঙ্গা উপজাতিদের নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। কিছু দিন পর ওদের ভাষা আয়ত্ত করেছিলেন। এমনকি কিছু সাংকেতিক শব্দ বা ইঙ্গিত তিনি বুঝতে পারলেন।  অনেক দিন কাজ করার পর তিনি আস্হা অর্জন করেছিলেন। তিনি সেন্টিনেলিজদের উদ্দেশে বললেন "কাইরি ইচেইরা" বাংলা মানে দাঁড়ায় "আমি তোমাদের মায়ের মতো।" তারপর বললেন এদিকে এসো। এর উত্তরে কয়েকজন বলল, "নারিয়ালি জাবা, জাবা।" মানে আরও নারকেল পাঠাও। আন্দামানের আদিম জনজাতিদের আবাসস্থলে তিনি পৌঁছে গিয়েছিলেন। সর্বত্র তাঁর পদচিহ্ন আছে। সমস্ত আদিম জনজাতিদের কাছে মধুমালা চট্টোপাধ্যায় আজ "জংলি ম্যাডাম" নামে খ্যাত। এই পর্যন্ত ২০টি গবেষণা মূলক গ্রন্হের লেখক তিনি। তাঁর লেখা গ্রন্হ "ট্রাইবজ অফ কার নিকোবর"। স্হান পেয়েছে ব্রিটিশ মিউজিয়াম, অক্সফোর্ড ,হাভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্হাগারে। ভারতীয় নৃবিজ্ঞানী মধুমালা চট্টোপাধ্যায় দীর্ঘ ৩৫ বছরের অধিক সময়  আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের জনজাতিদের নিয়ে কাজ করেছেন। তিনি ভারত ও পৃথিবীর একজন অন্যতম সফল নৃবিজ্ঞানী যিনি নিষিদ্ধ দ্বীপের মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব পূর্ণ সম্পর্ক  স্হাপন করতে সক্ষম  হন। নারকেলের শুভেচ্ছা উপহার হিসাবে দেওয়ার মাধ্যমেই তিনি সহজেই তাদের মন জয় করতে সক্ষম হন। বর্তমানে ভারত সরকারের সমাজ কল্যাণ বিভাগের একজন  দায়িত্বশীল আধিকারিক। এর আগে সেন্টিনেলিজদের নিয়ে গবেষণা করেন নৃতত্ত্ববিদ টি,এন, পণ্ডিত। বর্তমানে ৬টি উপজাতি অধ্যুষিত এলাকা আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ।গ্রেট আন্দামানিজ, ওঙ্গি, জারোয়ারা, সেন্টিনেলি, নিকোবরিজ, শম্পেন।

২০১১ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী জারোয়াদের সংখ্যা ছিল ৪০ (আন্দামান শিখা পত্রিকা)। কোন মুদ্রা ব্যবহার করে না, তাদের বিরুদ্ধে সরকার কোন মামলা করতে পারে না। ভিডিও ও ক্যামেরায় গতিবিধি  রেকর্ড নিষিদ্ধ। ১৯১৭সালে ভারত সরকার ঘোষণা করেন সেন্টিনেলিজরা আদিম অধিবাসী।

তথ্যসূত্র: ১) আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে প্রকাশিত বিভিন্ন পত্রিকা ২) ডঃ মধুমালা চট্টোপাধ্যায়: 'ট্রাইবজ অফ কার নিকোবর' ৩) বিভিন্ন ভিডিও ফিল্ম।

 

ডঃ সুবীর মণ্ডল
লোকগবেষক, প্রাবন্ধিক, অনুগল্প ও ছোটগল্প এবং ভ্রমণ কাহিনীর রচয়িতা
বাঁকুড়া, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top