সিডনী শনিবার, ২৭শে ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১৪ই ফাল্গুন ১৪২৭

রাতের বৃষ্টি : লিপি নাসরিন


প্রকাশিত:
১৮ জানুয়ারী ২০২১ ১৩:৩০

আপডেট:
২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ০০:৪৯

 

এক উজ্জ্বল আলোককণায় ভরে দুপুরটা ছিলো ঝরঝরে। অপরাজিতা তাকিয়ে ছিলো ডাগর চোখে একটু ঝুঁকে, যেন কতো কষ্ট করে নিজেকে ধরে রেখেছে বৃন্তের সাথে। উত্তরের বাতাস লাগামহীন। জানালার কাছে দাঁড়িয়ে মধুমিতা পানিতে মাছের পিঠের মতো চলকে চলকে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া  রোদের খেলা দেখছিল। মাঝে মাঝে ও কেমন হঠাৎ বিষণ্ণ হয়ে যায়। নিজেকে নিজের কাছে মনে হয় অস্তিত্বহীন। ওর হাঁটা- চলা, কিংবা দৈনন্দিন বিযয়গত কাজকর্ম কেমন যেন থেমে যায় অর্থহীন নিমগ্ন নির্জনতায়। কতক্ষণ দাঁড়িয়ে ও প্রাচীরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া অগভীর জলরাশি আর আলোর এই দীপ্তিময়তা উপভোগ করছিল।

একঝলক ঠাণ্ডা বাতাস দিক পরিবর্তন করে ওর মুখে এসে লাগলো। শিরশির করে গায়ের লোমে কাঁটা দিয়ে উঠলো। মধুমিতা সরে এলো জানালা থেকে। ফোনটা বাজছে। ইচ্ছা হচ্ছে না ধরতে। তবু স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখলো। ফোন বেজে থেমে গেলো। আজকাল কোন মানুষের সাথে ওর কথা বলতে যেন কষ্ট হয়। মানুষের ইনিয়ে বিনিয়ে কথা বলাকে কিংবা অপ্রয়োজনীয় আলাপকে ঘৃণা করতে শিখেছে। সেজন্য মনে মনে ও ভীষণ তৃপ্ত। একটা অযাচিত যাতনা থেকে যেন মুক্তি পেয়েছে আর নিজেকে সংযত রাখার গৌরবেও যেন আপ্লুত। দৈনন্দিন প্রাচুর্যতা হয়তো ক্ষণিক জীবনকে ভুলিয়ে রাখে কিন্তু তা ততোটা গভীরভাবে জীবনকে আড়োলিত করতে পারে কই। তার স্থিরতা কোথায়? এতসব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে মধুমিতা  আবার জানালার কাছে এসে দাঁড়ায়। জানুয়ারির মাঝামাঝি  রোদের তীক্ষ্মতা আর উত্তরের বাতাসে দূরের নারিকেল বন যেন কেঁপে কেঁপে উঠছে। জীবনে যারা তাকে কষ্ট দিচ্ছে বা দিয়েছে সেই মানুষগুলোকে মাথা থেকে সরাতে আপ্রাণ চেষ্টা করে, অপ্রয়োজনীয় ভেবে ঘৃণায় মন বিষিয়ে উঠে ওকে বিষণ্ণ করে ফেলে। রোদ আর ছায়ায় লতাপাতা প্রাচীরের দেয়ালে নকাশা কেটে কেটে সরে যায় । মধুমিতা সেদিকে তাকিয়ে রইলো। চোখ থেকে,  ব্রেন থেকে সব কথা হারিয়ে গিয়ে এক গাঢ় নিস্তব্ধতা ওকে ঘিরে ধরলো। কতক্ষণ এভাবে ছিলো মনে নেই, ফোন বেজে ওঠার শব্দে সচকিত হয়ে উঠলো, দৌড়ে ও ঘর থেকে এসে ফোনের স্ক্রিনে  দেখলো আবারো আসাদের ফোন। বিরক্তভরে ফোন রিসিভ করলো

হ্যালো

এই কী করছো তুমি? আগে একবার ফোন দিয়েছিলাম রিসিভ করলে না যে? শরীর ভালো আছে তো তোমার?

মধুমিতার ইচ্ছা হলো ঠাস ঠাস করে বলে ,তোমার সাথে কথা বলতে আমার ইচ্ছা হয়না। বিরক্তভরে অস্ফুট স্বরে জবাব দিলো, না শরীর ভালো আছে। পাল্টা ওকে কিছু জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হলো না। জানালা দিয়ে তেমনি বাইরে তাকিয়ে মধুমিতা যেন বাইরের উত্তাপটা অনুভব করতে চাইছে।
হ্যালো, তুমি কি ব্যস্ত নাকি? ওপাশ থেকে আসাদের জিজ্ঞাসু কণ্ঠস্বর।
না তেমন নয়। এখনো দুপুরের রান্নাটা হয় নি।
এখনো রান্না করোনি? খাবে কখন? দুইটা বাজে, অসাদ যেন  ওর জন্য সবসময় উদ্বিগ্ন এমন ভাব করে বললো।
একবেলা না খেলে কী এমন ক্ষতি হয়? মধুমিতা লাউড স্পিকার দিয়ে ফোনটা টেবিলে রেখে দেয়।
ঠিক আছে তুমি তাহলে রান্না করো, আমি পরে ফোন করবো। মধুমিতা প্রত্যুত্তর না দিয়েই ফোনটা কেটে দেয়।
আজ ওর কোন কিছুতেই যেন মন নেই। কী করবে বুঝে উঠতে পারছে না। প্রিয় কোন সঙ্গও যে তার এখন চাই তাও নয়, মন কেমন এক অদ্ভুত বিষণ্ণতায় ভরে উঠেছে। মনে মনে ও কোন আনন্দের জন্য অপেক্ষা করছে কিন্তু জানে না সে আনন্দ কখন কিভাবে ওর কাছে ধরা দেবে।

হঠাৎ নিচে কলাগাছের ঝোপে ওর নজর  গেলো,কলার মোচা ফুঁড়ে আশ্চর্য সবুজ থরে থরে সাজানো কলাগুচ্ছ উঁকি দিচ্ছে, সকালে নিচে নেমে পুরা বাড়ি একবার চক্কর দেওয়া ওর অভ্যাস তখন তো ওগুলো নজরে আসে নি। ওর বিষণ্ণ মুখে মৃদু হাসির রেখা দেখা দিলো। খবরটা তখনই রঞ্জনকে জানানোর জন্য ও ব্যস্ত হয়ে উঠলো। কিন্তু আজ তো ছুটির দিন। রঞ্জন বাসায় ওকে ফোন করা যাবে না। ওর বউ, বাচ্চার প্রতি খুব সতর্ক থাকে। সে তার বাইরের জীবনটাকে বাইরে রেখেই ঘরের চৌকাঠে গিয়ে দাঁড়ায়। সেখানে মধুমিতা একদম অশরীরী এমনকি ও মধুমিতাকে স্মরণের নিভৃতেও পারঙ্গম করে তোলে না অথচ এই রঞ্জনই মধুমিতার শারীরিক স্পর্শে পাগল হয়ে ওঠে তখন ওর দুনিয়ার মধুমিতা ছাড়া কেউ নেই। মধুমিতা অনেকবার ভেবেছে তাদের সম্পর্ক নিয়ে, একেকবার ভেবেছে ওর সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেবে। যে সম্পর্ক কেবল সম্পর্কের জন্য তাকে বাঁচিয়ে রেখে রঞ্জন আনন্দ পেলেও মধুমিতা কেবল গাঢ় হতাশায় দিন দিন ডুবে যাচ্ছে। তাই এবার ওকে এর শেষটুকুর জন্য তৈরি হতে হবে, অবশ্য রঞ্জনের দিক থেকে মধুমিতার প্রতি বাঁধনটা পলকা সুতার মতো ,সে কোন মুহূর্তে ছিঁড়ে গেলেও রঞ্জন সেই ছেঁড়া জায়গাটা অন্য কোন সুতোয় গিঁট দিয়ে নেবে হয়তো। মধুমিতার বারবারই মনে হয়েছে রঞ্জন সেই পুরুষ যাকে ভালোবাসা যায়, শরীরী সুখটাকে তার কাছ থেকে নিংড়ে নেওয়া যায় কিন্তু একান্ত আপন করে সারাজীবন পাওয়া যায় না। ফোনটা আবার বেজে উঠলো। বিরক্তিতে মধুর ভ্রূযুগলে কুঞ্চন  দেখা দিলো। আহ,কী যে বিরক্তকর! বলে মোবাইল ফোনটা হাতে নিতেই দেখলো রঞ্জনের ফোন। মুহূর্তে ওর মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠলো।

রঞ্জন প্রথম কথা বললো, কী করছো মধু? ওর গলার স্বরে যেন সত্যি মধু ঝরে পড়ে অন্তত মধুমিতার কাছে তাই-ই মনে হয়।
তোমার কথা ভাবছি, মধুমিতা একটু উদাসভাবেই যেন উত্তর দিলো।
হুম, ভাবো ভাবো, ভালো করে ভাবো, এবার যেদিন আমরা লং ড্রাইভে যাবো সেদিন তোমার ভাঁজে ভাঁজে দেখবো কতটুকু ভাবলে, বলেই রঞ্জন সেই প্রাণখোলা হাসিতে যেন চারিদিকে কাঁপিয়ে তুললো।
মধুমিতা নামটি বড় লাগে বলে রঞ্জন ওকে মধু বলে ডাকে। মধুমিতার বেশ ভালোই লাগে দুঅক্ষরের এই নামটি।
তুমিতো ছুটির দিনে ফোন করো না, কোথায় তুমি রঞ্জন?
বাইরে এসেছি একটা কাজে, তোমার সাথে বেশ কদিন কথা হচ্ছে না তাই ভাবলাম ... আসলে অফিসে এতো বেশি কাজের চাপ।
ও আচ্ছা বলে মধুমিতা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলো।
হ্যালো শুনতে পাচ্ছো মধু? রঞ্জন ব্যস্ত হয়ে বলে।
হ্যাঁ পাচ্ছি, বলো।
লাঞ্চ করেছো? রঞ্জন বলে।
না, করবো। তুমি বাসায় কখন ফিরবে? মধু একটু ম্রিয়মান গলায় জিজ্ঞেস করে।
কাজটা শেষ করেই ফিরবো, কেনো কিছু বলবে?
না ,তেমন কিছু না। আচ্ছা আমাদের কবে দেখা হচ্ছে আবার ?
দেখি একটু ফ্রি হলেই তোমাকে নিয়ে শহরের বাইরে যাবো? ঠিক আছে এখন রাখি। তুমি লাঞ্চ করো বলেই রঞ্জন কল কেটে দেয়।
মধু কী যেন বলতে যাচ্ছিল দেখলো রঞ্জন কল কেটে দিয়েছে।

রঞ্জনের সাথে মধুর পরিচয়টা খুব অদ্ভুত ভাবে। ও তার সহকর্মী না, প্রতিবেশীও না কিংবা পূর্ব পরিচিত কেউ না। মধুমিতা অফিস থেকে একটা ট্রেনিংএ গিয়েছিল সেখানে ট্রেনার হিসাবে রঞ্জন এসেছিল দুয়েকবার। মধু চটকদার সুন্দরী না হলেও ওর মধ্যে একটা বুদ্ধিদীপ্ত স্নিগ্ধ  কোমলতা সবসময় বিরাজ করে। ওর চাহনি, কথা বলার স্টাইল যে কোন পুরুষকে ওর দিকে দুবার তাকাতে বাধ্য করে। সেই ট্রেনিং শেষ হবার পর সবকিছু মধু ভুলেই গিয়েছিল তাছাড়া মনে রাখার মতো তেমন কিছুই তো ছিলো না। অন্য ট্রেনারদের ব্যাপার মধুমিতার মনের স্বাভাবিক অবস্থা রঞ্জনের বেলায়ও প্রযোজ্য ছিলো। কিন্তু রঞ্জনের চোখ ঠিকই মনে রেখেছিল মধুমিতাকে। আরো প্রায় ছমাস পর একদিন গভীর রাতে মধুমিতার ফোন বেজে ওঠে। রঞ্জন নিজের পরিচয় দিয়েই কথা বলেছিল কিন্তু মধুমিতা কিছুতেই তার চেহারা সেদিন স্মরণ করতে পারেনি।

তারপর থেকে কয়েকদিন পরপর ফোন, দেখা করা এভাবে একটা সম্ভ্রমপূর্ণ সম্পর্কের মধ্যে দিয়ে দিন কেটে যাচ্ছিল। ভালো বন্ধুত্ব হলো দুজনার মধ্যে। মাঝে মাঝে দেখা হতো, গল্প হতো। জীবনের গভীরতম ভাবনার বিষয়গুলি মধুমিতার চোখ মুখে কেমন যেন জ্বলজ্বল করতো। রঞ্জন চেয়ে থাকতো ওর কালো বুদ্ধিদীপ্ত চোখের দিকে।

অমন করে তাকিয়ে কী দেখছো,  মধুমিতার ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা ফুটে উঠতো।
কেমন একটা গভীর বিষণ্ণতা খেলে যায় তুমি যখন কথা বলো, রঞ্জন মখমলের মতো ঘাসের উপর নিজেকে ছড়িয়ে দিতে দিতে বলতো।
তারপর রঞ্জন বুঝি বন্ধুত্বের ভারটাকে আর সহ্য করতে পারছিল না। একদিন মুখ ফুটে বলেই ফেললো সে মধুমিতাকে চায় একান্ত সান্নিধ্যে।

মধুমিতা অবাক হয় নি তবে রঞ্জন সম্পর্কে তার এতদিনের ভাবনাটায়  ছেদ পড়েছিল। সে সম্পর্কের মধ্যে স্বাক্ষর থাকে না মধুমিতা সে সম্পর্কের জালের বাইরে থেকে জীবনকে উপভোগ করতে চায়। কিন্তু তবুও না চাইলেও রঞ্জনকে উপেক্ষা করা মধুমিতার পক্ষে সম্ভব হয় নি। সেই জালে ও জড়িয়ে গেছে সবচেয়ে বেশি। এখন রঞ্জনকে না হলে যেন চলে না, আর রঞ্জনও নিজেকে উজাড় করে দেয় মধুমিতার কাছে। তারপরও কোথাও একটা ফাঁকা জায়গায় স্বার্থপরতার বাতাস বুদবুদ তোলে। মধুমিতার নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। কোন একদিন মধুমিতাকে হার মানতে হয় রঞ্জনের সুন্দর বাহুযুগলের বন্ধনে। রঞ্জন ওকে বলেছিল সবকিছুই মধুমিতার জন্য ও করতে পারবে তবে শুধু ...

মধুমিতা তাকিয়ে ছিলো রঞ্জনের মুখে, সে মুখে একরাশ শূন্যতা আর ধূসর চোখের কোমল করুণ নিঃসঙ্গতায় রঞ্জনের ভয় করেছিল সেদিন। ও কি মধুমিতাকে এই বন্ধনে জড়িয়ে ভুল করলো এই ভাবনাতেই প্রতিবার ও মধুমিতাকে নামিয়ে দিয়ে গেছে।

ছোটবেলায় বাবা হারানো মধুমিতা বেড়ে উঠেছিল মায়ের চোখের প্রহরাতে। এ পর্যায়ে আসতে তাকে বাস্তবতার অলিগলিগুলো সন্তর্পণে ডিঙোতে  হয়েছে। মাও দুবছর হলো নেই। মাকে নিয়ে ছোট্ট এই বাড়িটাতে মধুমিতা থাকতো। তেমন অবস্থাপন্ন না  হলেও খুব বেশি কষ্ট তাদের হয়নি। বাবার জমি জায়গা যা ছিলো মা শক্ত হাতে সবকিছু সামলে তাদেরকে বড় করে তুলেছিল। এটি তার বাবার রেখে যাওয়া বাড়ি। ভাই দুজনের আলাদা বাড়িতে বসবাস। মা মারা যাবার পর তারা মধুমিতাকে তাদের কাছে নিতে চেয়েছিল কিন্তু ও যায় নি। বলেছিল, এখানেই সে বেশ আছে।

অফিস সামলে বিকেল সাড়ে পাঁচটা নাগাদ রঞ্জন এলো। রাস্তার সাইডে গাড়ি দাঁড় করিয়ে মধুমিতাকে ফোন করতেই পাঁচমিনিটের মধ্যে ও অফিস থেকে বেরিয়ে এলো। রঞ্জন যেদিন মধুমিতাকে নিয়ে লং ড্রাইভে যায় সেদিন ড্রাইভারকে আগেই ছুটি দিয়ে নিজে ড্রাইভ করে। এই সময় টুকু মধুমিতার খুব ভালো লাগে। রঞ্জন যখন ড্রাইভ করে পাশে বসে থেকে ও গুণগুণ করে গান গায়। নিজের মধ্যে অদ্ভুত  ধরণের একটা অনুভূতি হয় যেন পাখির মতো ও আকাশে উড়ে উড়ে বেড়াচ্ছে। মেঘ ছুঁয়ে ছুঁয়ে আরো উপরে উঠে যাচ্ছে। শহরের কোলাহল  ছেড়ে ওরা যখন বেরিয়ে আসলো তখন সূর্য পশ্চিম আকাশে গোধূলির রঙ ছড়াতে শুরু করেছে। শীতের শুষ্কতায় চারদিকে রুক্ষ্মভাব। মেইন রোড থেকে যে রাস্তাটি ডানে বেঁকে গেছে রঞ্জন গাড়ি ঘুরিয়ে দিলো সে রোডে।  ডান হাতে স্টিয়ারিং ধরে বাম হাতে মধুমিতার একটা হাত ধরলো পরম যত্নে।

কী করছো? দুহাতে স্টিয়ারিং ধরো, দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। মধুমিতা ভয়ার্ত চোখে সামনের দিকে তাকিয়ে থাকে।
আরে দূর কিচ্ছু হবে না, রঞ্জন তেমনি ওর হাত ধরে রেখে ডান হাতে স্টিয়ারিং ঘোরায়।
মধুমিতার হঠাৎ বুকের মধ্যে কেঁপে উঠে, ছাড়ো বলছি , এক টানে রঞ্জনের হাতের ভেতর থেকে হাতটা টেনে বের করে আনে।
কী হলো অমন করছো কেনো? রঞ্জন দুহাতে স্টিয়ারিং ধরে বলে ,তোমার কি ভয় লাগছে মধু?
মধুমিতা যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচে। না ঠিক আছি।
রঞ্জন হা হা করে হেসে ওঠে।

ভাবছো যদি মরে যাও এক বিবাহিত পুরুষের সাথে তাহলে বদনাম রটে যাবে, রঞ্জন আবার হাসতে হাসতে মধুমিতাকে বাম হাতে টেনে ধরে নিজের আরো কাছে নিয়ে আসে। মধুমিতা এবার ইচ্ছা করে রঞ্জনকে বাম হাতের নিচ দিয়ে জড়িয়ে ধরে করে বলে, এই যে আমি তোমাকে জড়িয়ে ধরেছি এবার তুমি দুহাতে স্টিয়ারিং ধরো প্লিজ। রোদ নেই আজ, কুয়াশা আর মেঘ মিলে একটা ধোঁয়াশার মতো পরিবেশ।

কিছু দূর এসে একটা খোলা মাঠের কাছে রঞ্জন গাড়ি থামায়। মাঠটা বেশ বড়, একপ্রান্তে একটা নবনির্মিত আধপাকা বাড়ি দাঁড়িয়ে আছে, মাঠের এ প্রান্তে একটি ছোট চা বিস্কিটের দোকান। ওরা নেমে হেঁটে একপাশে পড়ে থাকা একটা বড়সড় কাঠের গুঁড়ির উপর বসে। রঞ্জন পকেট থেকে সিগারেট বের করে ধরায়। সূর্য  তখন বড় একটা থালার আকার ধারণ করেছে। পশ্চিমের গাছগুলো লাল আর সবুজে মিশে উজ্জ্বল দীপ্তি ছড়িয়ে দিচ্ছে, ঘাসের বুকে ক্রমশ নেমে আসছে অন্ধকার। মধুমিতা তন্ময় হয়ে পশ্চিমে গাছগুলো দেখছিল আর কাঠের গুড়ির গায়ে আনমনে আঙুলের আঁকিবুকি করছিল।

মধু , বলো কী বলতে চেয়েছিলে, আধখাওয়া সিগারেট ফেলে দিয়ে রঞ্জন বলে।

মধুমিতা পশ্চিম আকাশ থেকে মুখ ফিরিয়ে রঞ্জনের দিকে কেমন করুণ ম্লান অথচ প্রত্যয়পূর্ণ চোখে তাকায়। রঞ্জন বিচলিত হয়, সে প্রত্যয় না জানি প্রতিজ্ঞায় পরিণত হয়। মধুমিতা একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রঞ্জনের দিকে।

মধু তোমার কী হয়েছে? দুহাতে মধুমিতাকে ধরে একটা ঝাঁকি দেয় জোরে। মধুমিতা কেঁপে ওঠে। ওর দুচোখের কোণে অশ্রুর রেখা গোধূলির আলোয় আরো ঘন হয়ে ঘনিয়ে আসা আঁধারে চিকচিক করতে থাকে।

এই মধু এই... কী , কী হয়েছে তোমার?  ওমন করে তাকিয়ে আছো কেনো? প্লিজ মধু , কী হয়েছে বলো। রঞ্জন যেন একটু ভয় পেয়ে মধুকে ছেড়ে দেয়।
মধুমিতা মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, কই কিছু হয়নি তো।
বাঁচালে যা ভয় পেয়েছিলাম, রঞ্জন মধুমিতার হাতটা নিজের হাতের মধ্যে নিতে নিতে বলে।

বেশ খানিকটা আঁধার ওদের ঘিরে ধরেছে। উত্তরের হিম পড়া বাতাসটা থেকে থেকে ঝাপটা দিয়ে যাচ্ছে। রঞ্জন ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললো, আজ আর না ফিরি, কাছেই রাতে থাকার মতো একটা ছোটখাটো রেস্ট হাউস আছে,  চলো ওখানে রাতটুকু  কাটিয়ে আমরা একেবারে কাল অফিস করে বাসায় যাবো। মধুমিতা একটু ভাবলো তারপর বললো, না, বাড়িতে কেউ কোন প্রয়োজনে আসলে আমাকে না পেলে সবাই ভীষণ ভাববে আর তোমার পরিবারের লোকজনও তোমার জন্য অস্থির হয়ে উঠবে।

ঠিক আছে তাহলে চলো আমরা কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে একটু সন্ধ্যা করে ফিরে যাবো, রঞ্জন মধুমিতার হাতটা ধরে তুলতে তুলতে বললো।

সায়ান্ধকারে মধুমিতা রঞ্জনের হাত ধরে দূরত্বটুকু পেরিয়ে এসে গাড়িতে উঠলো। অনতিদূরে গিয়ে একটা সুন্দর কটেজের সামনে  রঞ্জন গাড়ি থামালো। ওদের দেখে একজন বাইরে আসলে রঞ্জন তার সাথে কথা বলে গাড়ির কাছে এসে মধুমিতাকে  নামতে বলে।

মধুমিতা ঘুরে ঘুরে দেখে, চারিদিকে লাইটের ব্যবস্থা। সামনেই একটা বড় গোলাপ গাছের ঝাড়। কটেজের পিছনদিকে একটা শান বাঁধানো ছোট্ট পুকুর। ওদিকটা যেতেই রঞ্জন বললো, ওদিকে যেও না মধু। এসো আমরা একটু রেস্ট নিয়ে ফিরে যাবো।

গোলাপের গন্ধে ভরে আছে আশপাশ। আঃ কতদিন এমন তাজা গোলাপের গন্ধ পায় না!

মুহূর্তে মধুমিতার ক্লান্তি দূর হয়ে গেলো। ও যেন নব উন্মাদনার ঘায়ে অস্থির হয়ে উঠলো, বুকের মধ্যে থেকে সমস্ত উদ্বেগ আর বিষণ্ণতা ঝরে গিয়ে ও একেবারে ঝরঝরে হয়ে উঠলো। গোলাপের ঝাড়টার সামনে ক্ষণিক দাঁড়িয়ে  রইলো। রঞ্জন ততক্ষণে ঘরে ঢুকে সটান শুয়ে পড়েছে। মধুমিতা আর একটু সামনে এগিয়ে গেলো যেখানে বেশ কটি আমগাছ সারি করে লাগানো তার ফাঁক দিয়ে উঠে গেছে নারকেল গাছ। এ পাশটায় আরো একটা মৌসুমী  ফুলের বাগান।

কয়েকটার নাম ওর কাছে অজানা। আশেপাশে তেমন লোকবসতি চোখে পড়লো না। কটেজটাকে ঘিরে একটা ছোট পার্কের মতো, বোঝা যাচ্ছে সবে তৈরি হচ্ছে। মধুমিতার দেরি থেকে রঞ্জন আবার বেরিয়ে এসে ওকে ডাকলো। মধুমিতা ধীর পায়ে কটেজের দিকে এগিয়ে আসলো, কিন্তু ওর আজ এইখানে দাঁড়িয়ে থাকতেই ভালো লাগছে , মনে হচ্ছে যদি অনন্তকাল এইভাবে এই প্রকৃতির বিশুদ্ধতায় ও দাঁড়িয়ে থাকতে পারতো এই সুরভি আর সৌন্দর্য নিয়ে তাহলে বোধহয় জীবনে চাওয়ার আর কিছু থাকতো না। তবে ওর এই অনুভূতিটার স্থায়িত্ব খুব বেশি না, কিছু পরেই এই চেতনা ওর মধ্যে থেকে বিলুপ্ত হয়ে এক ক্ষুব্ধ হতাশায় ও ভরে উঠবে। নিজের কর্ম,  সময় আর অস্তিত্ব ওর কাছে স্পষ্ট হতে হতে আবারও মিলিয়ে যায় তখন ওর দরকার হয় খুব কাছের কাউকে যে ওকে বুঝতে পারবে তার সমস্ত স্বত্তা দিয়ে,ওকে কাছে টানতে পারবে নিবিড়তম ভালোবাসা আর শুদ্ধতায়। মধুমিতা গোলাপে ঝাড়টার কাছে এসে আবার দাঁড়ায়। এতক্ষণ ও খেয়াল করে নি কাঁটা মেহেদি দিয়ে দুপাশে বেশ সুন্দর করে  বেড়া দেয়া। ছোট বেগুনি ফুলগুলো যেন গল্প করার জন্য একেবারে মুখিয়ে রয়েছে।

ঘরে ঢুকে মধুমিতা দেখে রঞ্জন খালি গায়ে হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে আছে। ওর ফর্সা শরীর থেকে যেন একটা দ্যুতি  বেরিয়ে ঘরটার আলোটাকে আরো  কোমনীয় করে তুলেছে। ওকে এ অবস্থায় দেখে মধুমিতার হৃদস্পন্দন দ্রুত হতে লাগলো, চেতনা যেন লোপ পাবে মাথার ভেতর এমন কিছু একটা হতে হতে ও নির্নিমেষ তাকিয়ে আছে। রঞ্জন শুয়ে থেকেই বললো, কী ভাবছো মধু ? এসো রেস্ট নাও, একটু পরই আমরা ফিরে যাবো। মধুমিতা বোধহয় সেসব শুনতে পেলো কি পেলো না। ও আস্তে করে রঞ্জনের পাশে বসে ওর বুকে ডান হাতটা রাখলো। রঞ্জন চোখ বোজা অবস্থা থেকে তাকিয়ে মধুমিতার  হাতের উপর হাতটা রাখে। না, রঞ্জন কখনো ওকে জোর করে নি। যা কিছু সত্য বলে মধুমিতার জীবনে ঘটেছে তা মধুমিতার পূর্ণ আনন্দ আর উচ্ছ্বলতায়। যে আনন্দ আর অনুভূতিতে মধুমিতা জীবনের একটা দিককে দেখেছে সেটাকে উপেক্ষা আর ঘৃণায় ভরিয়ে  দেবে- না তা সে পারবে না।

মধু কী ভাবছো? আবার চোখ বন্ধ করে রঞ্জন জানতে চাইলো।
আচ্ছা রঞ্জন আমাদের যদি আর কোনদিন দেখা না হয়, মানে তোমার আর আমার সম্পর্কটা যদি আজ এখানেই শেষ হয়ে যায় তুমি কি খুব কষ্ট পাবে? কথাগুলো যখন বলছিল তখন তা মধুর বুকে তীক্ষ্ম ছুরির ফলা হয়ে আছড়ে পড়ছিল প্রচণ্ড ক্রুদ্ধভাবে।
রঞ্জন উঠে বসে। তারপর কিছুটা নিঃস্তব্ধতা। তুমি কি সত্যি তাই চাও?
আমাদের এ সম্পর্কের মূল্য তোমার কাছে কতটুকু? মধুমিতা  জানালা দিয়ে পুকুরের উপর ঘনিয়ে উঠা আঁধারে দিকে তাকিয়ে রইলো।
অনেক... অনেক... মধু। তোমার কাছ থেকে আমি শুধু নিয়েছি তোমাকে কিছু দেবার যোগ্যতা আমার নেই। আমি শুধু পূজা করতে পারি কিন্তু প্রাপ্য ষোল আনা বুঝিয়ে দিতে পারি না। এ আমার ভারি কষ্ট মধু। বাইরে গাঢ় অন্ধকারে মধু বিস্ফোরিত চোখে তাকিয়ে আছে যেন এমন কিছু ঘটতে যাচ্ছে যার জন্য সে এখনো প্রস্তুত হয় নি।
তোমায় ছেড়ে থাকতে আমারও খুব কষ্ট হবে কিন্তু পারতে যে আমাদের  হবেই।
রঞ্জন বুঝতে পারলো না এতদিনের এই হাসি, গান আজ কী এমন হলো যে তাকে মুছে ফেলতে হবে।
বেশ তাই হোক। যে সাধনায় আমরা দুজনে আমাদের অন্তরকে বেঁধে রেখেছিলাম সে সাধনা হয়তো আমাদের পূর্ণ হয়েছে তাই আজ বাঁধন খুলে গেলেও তা আর জোড়া দেবার চেষ্টা নাই বা করলাম।
মধুমিতা ঘুরে দাঁড়িয়ে রঞ্জনের মুখোমুখি হলো। ওর গাঢ় গভীর চোখ দুটি বাঁকানো ভ্রুযুগলের নিচে যেন কেমন বিবর্ণ পাতার মতো কেঁপে কেঁপে উঠছে। ও দুহাতে গভীরভাবে মধুমিতাকে জড়িয়ে ধরে ক্ষণিক অপলক হয়ে রইলো। বাইরে হু হু করে বাতাস বইছে। শীতে বাইরে আলোগুলো যেন ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসছে। মধুমিতা নিবিড় আলিঙ্গনে রঞ্জনকে জড়িয়ে ধরলো। ওর মুখটা তুলে ঠোঁটে চুমু দিতে গেলেই মধুমিতা হাত দিয়ে বাঁধা দেয়। ধীরে ধীরে দুজনের আলিঙ্গন শিথিল হয়ে আসে। কোন বিবর্ণ পাতা গাছের কাণ্ড বেয়ে ধীরে ধীরে নেমে আসার মতো ওদের দুজনের এতদিনের পরিচয়ও বুঝি হাতের শিথিলতার সাথে নেমে যেতে থাকলো দুজনের শরীর বেয়ে। এভাবে মধুমিতা সরে যাওয়ায় রঞ্জন যেন একটু লজ্জা পায়, অপমানিত বোধ করে। তাহলে মধুমিতা কি তাকে এতদিন মন থেকে গ্রহণ করে নি? তাই বা কী করে হয়। যখনই যে মধুমিতাকে ছুঁয়েছে তখনই তার কামনার্ত চোখ বলেছে, আমি তৈরি, এসো আমাতে প্রবেশ করো। 

আমরা কি ফিরতে পারবো আজ? মধুমিতা বাইরে তাকিয়ে ঘোলাটে আলোগুলো দেখছিল।
তুমি যেতে চাইলে এখনি বেরিয়ে পড়া যায় বলে রঞ্জন আবার গিয়ে শুয়ে পড়লো।
কটা বাজলো?
এই তো পৌনে নটা, রঞ্জন বললো মোবাইলে সময়টা দেখে নিয়ে।

তুমি এই জায়গাটা আগে থেকে চিনতে? মধুমিতা তেমনি তাকিয়ে আছে বাইরে। ঘোলাটে আলোগুলো থেকে ক্ষীণরশ্মি পুকুরের কোণায় ছোট কামিনী গাছের পাতায় পড়ে কেমন যেন বাতাসে ছড়িয়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে।
না চিনতাম না তবে এক বন্ধুর কাছে শুনেছিলাম।
ওহ, বলে মধুমিতা অস্ফুট শব্দ করলো।
আচ্ছা রঞ্জন তুমি কি আমাকে ভালোবাসো? মধুমিতা এসে  খাটে রঞ্জনের পাশে বসে।
রঞ্জন কাত হয়ে মধুমিতার দিকে ফিরে বলে, হয়তো বাসি, হয়তো না।
সত্যিকারের ভালোবাসা বলতে কিছু কি আছে রঞ্জন?
রঞ্জন আবার সোজা হয়ে শুয়ে পড়ে,
এটার উত্তর আমি জানি না বলে।
ভালোবাসাটা দেহকে ঘিরে। ভালোবাসায় দেহযোগ হলে আত্মার বন্ধনটুকু ছুটে যায়।
হয়তো তাই, রঞ্জন কেমন নির্লিপ্তভাবে জবাব দেয়। আচ্ছা তোমার সেই কলিগ কী যেন নাম, ওহ,আসাদ সে কি এখনো যোগাযোগ রাখছে তোমার সাথে? রঞ্জন প্রসঙ্গ পাল্টায়।
আসাদের কথা উঠতেই মধুমিতার ভ্রূ কুঁচকে ওঠে। হঠাৎ আসাদের কথা জানতে চাচ্ছো যে?
না, এমনি মনে হলো তাই। বেচারা তোমাকে ভালোবাসে।

তা বলতে পারবো না তবে তার সঙ্গ আমার কাছে উপভোগ্য নয়। ওর চেহারাটা মনে হতেই ভিতরে ভিতরে কেমন যেন অনুভব করে মধুমিতা। প্রথম দিকে তার আচরণে অন্যরকম ইঙ্গিত ছিলো, যদিও তাকে তেমন ধর্তব্যে মধুমিতা আনে না কিন্তু ওর একটু গর্তের  মধ্যে বসানো চোখ দুটো দেখলে কেমন যেন মনে হয় কোমলতাহীন, রুক্ষ কিছুটা ধূর্তও বটে। চাহনিটা লোভী। মধুমিতার গা  ঘিনঘিন করে সে দৃষ্টির কথা মনে হলেই।

হঠাৎ টিপ টিপ করে বৃষ্টি শুরু হলো। কুয়াশার মতো কেঁপে কেঁপে বৃষ্টিধারা ঘোলাটে আলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে পড়ছে।
রঞ্জন,  বৃষ্টি এলো যে, ফিরবো কেমন করে আমরা?
এমন সময় দরজায় টোকা পড়লো। বোধহয় এখানকার কেয়ারটেকার এসেছে। রঞ্জন উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিয়ে কথা বলে ফিরে এসে বললো, মধু আজ বোধহয় ফিরতে পারবো না, রাতের খাবারের কথা বললাম। বৃষ্টি একটু  একটু করে বাড়ছে।
আমারও তাই মনে হচ্ছে। তোমার বাড়ির লোকেরা চিন্তা করবে রঞ্জন, আমাদের আগেই ফেরা উচিত ছিলো।
হু বলে রঞ্জন বাসায় ফোন দিলো।
শীতের বৃষ্টি মধুমিতার ভীষণ প্রিয়। কেমন যেন একটা নিশ্চিন্ত ভাব আছে। সব কাজ ফেলে রাখার অজুহাত পাওয়া যায়।
রঞ্জন গিয়ে মধুমিতার পাশে দাঁড়ায়। সত্যি কি আমরা পরস্পরের কাছ থেকে দূরে সরে যাবো, ভুলে যাবো মধু? রঞ্জন কেমন যেন অস্থির হয়ে উঠেছে। পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে ওর কাঁধে মুখ ঘষে, কখনো মাথায় নাক রেখে চুলের গন্ধ নেয়। মধুমিতা বাঁধা দেয় না। আজ এই মুহূর্তে যে জোয়ার ওর বুকের ভিতর উথলে উঠেছে তাকে বাঁধ দিয়ে ওকেই বাঁধতে হবে। আর সে খড়কুটো আঁকড়ে ধরার মতো করে বাঁচতে চায় না। জীবনের সংগ্রামের পথটি  তার চেনা সে পথে তাকে একাই হাঁটতে হয়েছিল তাই আবার একা হাঁটতে তার ক্লান্তি লাগবে না।

মধু ,রঞ্জন ডাকে। সে কণ্ঠস্বর মধুমিতার কাছে মনে হয় দূর থেকে ভেসে আসা কোন রাতচরা পাখির কষ্ট। তাহলে কি রঞ্জন অসুখী, কই কোনদিন তো তার মনে হয়নি এ কথা।
আমি তোমাকে কোনদিন ভুলবো না রঞ্জন।আমার নিভৃতের খেলায় তুমি রবে। আমার কষ্টে বিরহে,ব্যথায় তুমিই হবে আমার আনন্দ।
আমি চাই তুমি এবার বিয়ে করে সুখী হবে, এ কথা বলতেই মধুমিতা ঘুরে দাঁড়িয়ে রঞ্জনের চোখে চোখ রাখলো কিন্তু মুহূর্তে ও চোখ নামিয়ে নিলো। এতো মায়া ফুটে ওঠে ওর চোখের মধ্যে যে মধুমিতা সহ্য করতে পারে না।
রাত দুটো বাজে। টেবিলের উপর খাবার ঢাকা দেওয়া। রঞ্জন বললো, চল ডিনার করি,আর কতক্ষণ না খেয়ে থাকবে। ওরা টেবিলের দুপাশে চেয়ার পেতে মুখোমুখি বসে রাতের খাবার খেলো। মধুমিতা খুব অল্পই খেলো রঞ্জন পীড়াপীড়ি করা সত্ত্বেও। খাওয়া শেষে রঞ্জন সিগারেট ধরায়। বাইরে বৃষ্টির শব্দ কমে আসতে থাকে। হয়তো হাসনা হেনা ফুটেছিল সন্ধ্যায় এখন তার সুবাস ছড়িয়ে পড়েছে বাতাসে।
রঞ্জন আমি একটু বাইরে যাবো?
এতো রাতে! তুমি কি পাগল হলে মধু? রঞ্জন সিগারেট নিভিয়ে দেয়।
শুধু বুক ভরে একটু শ্বাস নিয়েই ফিরে আসবো, মধুমিতার কণ্ঠে মিনতি ঝরে পড়ে।
কিন্তু এখানকার সবকিছুই আমাদের অপরিচিত, এতো রাতে বাইরে যাওয়া কি ঠিক হবে? তুমি বরং এপাশের জানালাটাও খুলে দাও।
মধুমিতা জানালাটা খুলতে দিতেই একরাশ হিমেল হাওয়া হাসনাহেনার গন্ধ নিয়ে ঘরে ঢুকে পড়ে, পর্দাগুলো দুলে ওঠে।
আঃ মনে হচ্ছে এর চেয়ে সত্য, এর চেয়ে অমলিন আর কিছু নেই। মধুমিতা জোরে টেনে টেনে কয়েকবার শ্বাস নিলো।
ইস কী ঠাণ্ডা! মধু এবার জানালার গ্লাস লাগিয়ে দাও। রঞ্জন বলে ওঠে।
জানালা বন্ধ করে মধুমিতা রঞ্জনের পাশে এসে বসে। রঞ্জন বালিশে হেলান দিয়ে আধ শোয়া অবস্থায়।
রাততো প্রায় শেষ হয়ে এলো, ঘুমাবে না আজ?
তোমার ক্লান্ত লাগলে ঘুমিয়ে পড়ো, আমি তোমাকে পাহারা দিই বসে। মধুমিতা হেসে ওঠে।
সে হাসির মধ্যে কতো গভীর বেদনা লুকিয়ে রেখেছে, রঞ্জনের মধুমিতার চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে এতটুকুও অসুবিধা হয় না।
মধুমিতা রঞ্জনের গলাটা জড়িয়ে ধরে দুহাতে। রঞ্জন ওর হাত শক্ত করে চেপে ধরে।
আমাকে ছেড়ে গিয়ে তুমি যদি সুখী হও তাহলে জেনো পৃথিবীতে আমি সবচেয়ে খুশি হবো আর যদি তুমি কষ্টে থাকো তাহলে নিজে অপরাধের পাহাড়সম বোঝা নিয়ে বেঁচে থাকবো।
মধুমিতা স্মিত হেসে বলে, চোখ বন্ধ করো, ঘুমানোর চেষ্টা করো, আমি জেগে আছি।
রঞ্জন মধুমিতার হাত দুটো বুকের মধ্যে ধরে রেখে চোখ বন্ধ করে। মধুমিতা ওর বাম বাহুতে কপাল রেখে মুখটা নিচু হয়ে থাকে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই রঞ্জনের শ্বাস গাঢ় হয়। মধুমিতা বুঝতে পারে রঞ্জন ঘুমিয়ে পড়েছে। আস্তে করে হাত সরিয়ে নিয়ে ও আবার জানালার কাছে এসে দাঁড়ায়। বৃষ্টি থেমে গেছে , পাতার বুক থেকে টপাস টপাস করে ঝরে পড়ছে বৃষ্টির ফোঁটা। একটা পাখি জানালার সামনে দিয়ে উড়ে গেলো। সকাল হয়ে আসছে বুঝি। পিছন ফিরে রঞ্জনকে দেখে ও। গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছে রঞ্জন। মধুমিতার চোখ ঝাপসা হয়ে এলো, দুফোঁটা  জল গড়িয়ে গেলো। ও ব্যাগ খুঁজে একটা ছোট প্যাড বের করে লিখতে বসলো।

রঞ্জন,
তুমি ঘুমিয়ে গেছো। কী অদ্ভুত লাগছে তোমাকে দেখতে অবশ্য তুমি সবসময় সুন্দর আর অসম্ভব রকমের শান্ত। যখন কথা বলো তখন মনে হয় একটা শান্ত নদী বয়ে যাচ্ছে। আমি সবসময় সেই শান্ত নদীটিতে সাঁতরাতে চেয়েছি তরঙ্গ না তুলে কারণ তরঙ্গকে আমার খুব ভয়।

যাই হোক, এখন তোমাকে আসল কথাটা বলি। গত সপ্তাহে হঠাৎ আমার বাসায় এক ভদ্রমহিলা আসেন। আমি উনাকে চিনি না কিংবা কখনো দেখেছি বলেও মনে পড়ে না কারণ এই দীর্ঘ পাঁচ বছরে উনাকে চেনার বা দেখার প্রয়োজন কখনো আমার হয় নি। তিনি নিজেকে পরিচয় দিলেন মিসেস রঞ্জন বলে। প্রমাণ স্বরূপ সাথে করে এনেছিলেন শিশুপুত্রসহ তোমাদের যুগল ছবি। কী কথা হয়েছিল তার সাথে আমার সেটি আর নাই বা বললাম শুধু আমার হাতটা তুলে যখন তার মাথায় রাখলো তখন সিঁথিতে তাঁর লাল টকটকে সিঁদূর দেখে আমার কেবলই মনে হয়েছিল ঐ জায়গাটায় যদি আমি হতাম তাহলে কী করতাম? এমন অসহায়ের মতো আচরণ করতে হতো আমাকেও। আমি তোমার বউকে কথা দিয়েছিলাম। এই একটা সপ্তাহ নিজের সাথে প্রচণ্ড যুদ্ধ করে সিদ্ধান্তে এসেছি, আর ফিরে তো আমাকে যেতেই হতো রঞ্জন। আজ না হয় কাল। যেটুকু আমার পাওনা ছিলো আমি তাই পেলাম আর যা আমার দেবার আছে এখন তাই আমাকে দিয়ে যেতে হবে।

আর একটা কথা চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছি, ভেবো না কিছু করে খাবার জোগাড় করার মতো যোগ্যতা আমার আছে।  খুব ভালো থেকো রঞ্জন।

চিঠিটা রঞ্জনের পাশে রেখে মধুমিতা উঠে দাঁড়ায়। নিজেকে এতো ভারি মনে হচ্ছে যেন পা চলতেই চায় না। বাইরে তাকিয়ে দেখলো আঁধার সরতে শুরু করেছে। সারারাত বৃষ্টিতে ভিজে হাসনা হেনার ছোট্ট পাপড়িগুলো কেমন গুটিশুটি মেরে আছে। মধুমিতা দরজা খুলে বাইরে এলো। ঝরে যাওয়া পাতার সিক্ত বুকে পা ফেলে ও এগিয়ে গিয়ে বড় রাস্তায় উঠলো।

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top