সিডনী বৃহঃস্পতিবার, ২৫শে ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১৩ই ফাল্গুন ১৪২৭

লাইফ অব এ রিকশা পেইন্টার (পর্ব তিন) : কাজী মাহমুদুর রহমান 


প্রকাশিত:
২৫ জানুয়ারী ২০২১ ১৩:৪০

আপডেট:
২৫ জানুয়ারী ২০২১ ১৪:৫১

 

মাদাম জুলিয়াঁ আবার পরের সপ্তাহেই এক বিকেলে খলিল চাচার রিকশা আস্তানায় এসে হাজির। এবার একা। একটি রিকশায় করে এসেছেন। খলিল চাচা তাজ্জব। মাদাম জুলিয়াঁর আগ্রহ আমি নতুন কী কাজ করছি তা দেখা। তিনি যেদিন এলেন সেদিন আমি খলিল চাচার রিকশা গ্যারেজের কাজে নয়, আমি দিনভর শাবিস্তান সিনেমা হলের সামনে বাঁশের ভারায় দাঁড়িয়ে আসন্ন মুক্তির অপেক্ষায় একটা ছায়াছবির নায়ক-নায়িকার রোমান্টিক দৃশ্য, ভিলেনের হিংস্র, কুটিল মুখের ছবি আঁকায় ব্যস্ত। আমার সঙ্গে একজন সহকারীও আছে।

খলিল চাচা মাদামকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে হাজির। আমি অবাক ও বিব্রত। সহকারীকে বাকি কাজটুকু শেষ করার নির্দেশ দিয়ে নেমে এলাম বাঁশের ভারা থেকে। মাদাম জুলিয়াঁ তার হাতের ক্যামেরা দিয়ে ইতোমধ্যেই স্নাপ শট নিয়ে ফেলেছেন বাঁশের ভারায় দাঁড়িয়ে আমার ছবি আঁকার দৃশ্য, ভারা থেকে নেমে আসার দৃশ্য।

হাতের রং প্যান্টে মুছতে মুছতে মাদাম জুলিয়াঁর দিকে হাসিমুখে হাত বাড়িয়ে দিই করমর্দনে। নিজের বিদ্যা ফলাই। বলি, বন অ্যাপ্রেমিদি (শুভ বিকেল)। কমতাঁলে ভুঁ (কেমন আছেন)?

জুলিয়াঁ হেসে বলেন, জ ভে বীয়া মেরসি, এভু?

অর্থাৎ আমি ভালো-এবং তুমি?

আমি উত্তর দিই, কমসি কম সা। অর্থাৎ আছি কোনোরকম, সো সো।

একজন তরুণী বিদেশিনীর সঙ্গে আমার এভাবে বিদেশি ভাষায় কথা বলতে দেখে কিছু উৎসাহী মানুষের ভিড় জমে যায়। এই বিব্রতকর পরিস্থিতিতে আমি খলিল চাচাকে বলি, চাচা আপনি ওনাকে এখানে টেনে আনলেন কেন? দেখছেন তো লোকজনের কেমন ভিড় জমে গেল, আমারও কাজের ক্ষতি হল। এখন এই সব ফালতু পাবলিক আপনিই সরান।

খলিল চাচা ঢাকাইয়া ভাষায় ভিড় জমানো পাবলিকের উদ্দেশ্যে হুংকার দিয়ে উঠলেন, ওই হালার পো হালারা, এইহানে খারাইয়া কী তামাছা দেখতাছোস? এইহানে একজন বহুত ইজ্জতওয়ালা বিদেছি মেহমান আইছেন আমাগো মহল্লার আর্টিছের লগে বাতচিত করতে। তোগো বাপের জন্মে ফরেন লেডি দ্যাখোচ নাই? আব্বে, তামাছা দ্যাখতে হইলে যা টিকিট কাইটা ছিনেমা হলে গিয়া দ্যাখ। এইহানে ভিড় জমাইয়া হা কইরা খারাইয়া থাকবি তো আমি হালায় তোগো পোন্দের মইধ্যে বাঁছ হান্দাইয়া দিমু। যা, ভাগ।

খলিল চাচার অশ্রাব্য হুংকারে সব ভিড় জমানো পাবলিক সুড়সুড় করে কেটে পড়ল। জুলিয়াঁ খলিল চাচার ভাষা বুঝলেন না। তবে এটা বুঝতে পারলেন খলিল চাচা দারুণ গালি ঝেড়েছেন। বিব্রত কণ্ঠে ইংরেজিতেই আমাকে বললেন, আমি দুঃখিত তোমাদের না জানিয়ে আসায়। আমি এখানে এসে তোমার কাজের ক্ষতি করেছি আর লোকজনকেও বোধহয় খলিল চাচার ধমক শুনতে হল।

আমি তাকে আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে ইংরেজিতেই বললাম, ঠিক আছে। এ নিয়ে দুঃখ প্রকাশের কিছু নেই। খলিল চাচা তার কাজটি ঠিকমতই করেছেন। যাক এসব কথা। তোমার হাতে কি সময় আছে? (ইংরেজিতে সম্বোধনে আপনি, তুমি সমস্যা নেই। সবই ইউ)

জুলিঁয়া বললেন, আছে। সমস্যা নেই।

আমি হাসলাম, তাহলে আমরা তিনজন কি একটা মিষ্টির দোকানে বসে কিছু মিষ্টি কথা বলতে পারি?

জুলিয়াঁ হেসে উঠলেন, নটি ম্যান, তুমি শুধু রং-তুলিতেই চৌকশ নও, কথাবার্তাতেও চৌকশ।

আমি খলিল চাচাকে বললাম, চাচা চলেন এই মহিলাকে নিয়ে আমরা প্রথমেই যাই শাঁখারীপট্টিতে। ওখানে শাঁখা দিয়ে কী সুন্দর সব অলঙ্কার, চুড়ি, শো পিস কীভাবে বানানো হয় তা দেখাই। আমাদের ঢাকার এসব শিল্প হাতের কাজ ওনাকে নিশ্চয় অবাক করবে। ওনার যদি খুব পছন্দ হয় তাহলে কিছু কিনে উপহারও দিতে পারি।

খলিল চাচা মাথা নাড়লেন, হ, ভাতিজা ঠিকই কইছ। তারপর?

আমি বললাম, তারপর একটা ভালো মিষ্টির দোকানে। উনিতো আমাদের মেহমান। মিষ্টি মুখ না করালে কেমন দেখায়?

 

খলিল চাচা প্রস্তাব শুনে মহাখুশি। হ, ভাতিজা ঠিকই কইছ। এইটা হইল আমাগো মান-ইজ্জতের ব্যাপার। তয় একখান কন্ডিছন, ছাঁখারী পট্টিতে উনি যা কিছু পছন্দ করবেন তা কিনাকাটা, মিষ্টির দুকানে যা কিছু খাইবেন ছব খর্চার দায়িত্ব আমার। তুমি ভাতিজা, তুমি এই মুরুব্বির ইজ্জত রাখবা। ফাল দিয়া নিজের গাঁটের পয়ছা খর্চা করবা না। বুঝলা?

আমি সম্মতির ভঙ্গিতে মাথা নাড়লাম। জি চাচা তাই হবে।

শাবিস্তান থেকে শাঁখারীপট্টি বেশি দূর নয়। আমরা পথের অজস্র রিকশা, গাড়ি আর কৌতূহলী মানুষদের ভিড় পাশ কাটিয়ে হাঁটতে হাঁটতে শাঁখারী পট্টিতে উপস্থিত হলাম।

শাঁখারীপট্টিতে জুলিয়াঁ ছোট্ট ছোট্ট ঘিঞ্জি দোকানে শাঁখা শিল্পীদের শাঁখের করাতে আর হাতের নিখুঁত কাজে শাঁখের চুড়ি, অলঙ্কার, বড় বড় শঙ্খে খোদাই করা যে কারুকাজ দ্যাখেন তাতে বিস্ময়ে তিনি মুগ্ধ। ওয়ান্দারফুল... ওয়ান্দারফুল বলতে বলতে তিনি পটাপট ছবি তুলতে থাকেন তার ক্যামেরায়। মুখে অবিরাম প্রশংসার ফুলঝুরি-গ্রেত, ওয়ান্দারফুল, লাভলি...।

শাঁখার যে সব অলঙ্কার জুলিয়াঁর বেশি পছন্দ হয়, দৃষ্টিতে মুগ্ধতা ঝরে পড়ে তা বুঝতে পেরে খলিল চাচা শাঁখারী দোকানিকে ইশারায় প্যাক করতে নির্দেশ দেন। বলেন, দামের লেগা চিন্তা করবি না। দাম আমি দিমু। পরে লইয়া লিস।

জুলিয়াঁর পছন্দ অনুযায়ী কিছু শাঁখা অলঙ্কার, বড়শঙ্খের ওপর চিত্রিত ছবি দোকানি প্যাক করে জুলিয়াঁর হাতে দেয়। জুলিয়া তার ভ্যানিটি ব্যাগ খুলে দাম দেবার উপক্রম করতেই দোকানি হাত জোড় করে। বলে, না, না।

জুলিয়া বুঝতে না পেরে আমার দিকে তাকালেন। আমি তাকে বলি, মাদাম, এগুলো আমাদের পুরোনো ঢাকার মহল্লাবাসী, আর এই শাঁখাপল্লির কারিগরদের পক্ষ থেকে খলির চাচার পক্ষ থেকে তোমাকে উপহার। তুমি আমাদের সম্মানিত মেহমান। এই সামান্য উপহার নিলে সবাই খুশি হবে।

জুলিয়াঁ আনন্দে বিগলিত হয়ে শুধু বলতে থাকেন, ওহ গ্রেত। থ্যাংক ইউ, থ্যাংক ইউ... মাই লাভ তু অল অফ ইউ।

এবার শাঁখারীপল্লি থেকে বেরিয়ে পাটুয়াটুলির বিখ্যাত এক মিষ্টির দোকানে যাই আমরা তিনজন। মিষ্টির দোকানে মাছির মতোই ভিড়। তবুও আমাদের সঙ্গে বিদেশিনী দেখে মালিক, ম্যানেজার, বয় সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ে আমাদের আপ্যায়ন করতে। দ্রুত একটা টেবিল খালি করে পরিষ্কার করে মুছে-টুছেআমাদের বসার ব্যবস্থা করে দেয়। এবার অর্ডার দেবার পালা। খলিলচাচা সরেস রসগোল্লা, ছানা সন্দেশ, গরম ফুলকো লুচি ও তার সঙ্গে মুখরোচক তরকারির অর্ডার দেন। হুংকার দিয়ে বলেন, এই খুব ছাপ ছুতরা পেলেট, গ্লাস দিবি। কাঁটাচামুচ দিবি। তোগো কলের পানি দিবি না। মিনারেল ওয়াটারের বোতল দিবি। ফরেন মেহমান লইয়া আনছি। কথাডা মনে রাখিছ।

 

সেটা মনে রেখেই মিষ্টির দোকানের কর্মচারীরা খুব সতর্কতার সাথেই মিষ্টিসহ অন্যান্য খাবার পরিবেশন করে। এসব মিষ্টি ও খাবার জুলিয়াঁর অচেনা। আমি সবগুলো মিষ্টির নাম, কী দিয়ে তৈরি হয় এবং এগুলো অস্বাস্থ্যকর নয় সেটা বুঝিয়ে বলি। রসিকতা করে বলি, মাদাম নির্ভয়ে খান। যদি খেতে খারাপ লাগে তাহলে এই খলিল চাচা মিষ্টির দোকান শুদ্ধ বুড়িগঙ্গা নদীতে ফেলে দেবে। আর যদি পেটপীড়া বা বমি লাগে, তাহলে কাছেই আছে আমাদের বিখ্যাত মিটফোর্ড হাসপাতাল সেখানে নিয়ে যাওয়া হবে। সো রিলাক্স অ্যান্ড টেক ইয়োর ফুড।

আমার কথায় জুলিয়াঁ হেসে ফেললেন। প্রথমে লুচি, তরকারি খান। খেতে খেতে বলেন, ইত্স হত্ স্পাইসি, বাত ভেরি তেস্তি। আই লাইক ইত। জুলিয়াঁ রসগোল্লা ও ছানার সন্দেশও খেলেন সেই একই রকম তৃপ্তির ভঙ্গিতে।

খাওয়া দাওয়া শেষে মিষ্টির দোকান থেকে বেরিয়ে এবার বিদায়ের পালা। সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হয়ে গেছে। আলো ঝলমল পুরোনো ঢাকার শহর এখন অন্যরূপে। রাস্তাঘাট এমনিতেই অপ্রশস্ত, রিকশা, গাড়ি ও মানুষের ভিড়ে ভারাক্রান্ত। জুলিয়াঁকে এখন রিকশা করেই যেতে হবে তার ধানমন্ডির রেস্ট হাউজে। রিকশাওয়ালা পুরোনো ঢাকার, নতুন ঢাকার অলিগলি, রাস্তাঘাট সবই চেনে। কিন্তু এই নতুন বিদেশিনীকে রিকশায় একা ছেড়ে দেওয়া ঠিক হবে কিনা, পথে তিনি কোনো ছিনতাইকাীর পাল্লায় পড়বেন কিনা সে চিন্তা খলিল চাচার মাথায় উদয় হল। আমাকে বললেন, ভাতিজা, এই সাঁজ রাইতে উনারে একলা যাইবার দেওয়া ঠিক হইব না। পথে ঝামেলা হইবার পারে। আমি কই তুমি ওনার লগে যাও। ছহি ছালামতে উনারে পৌঁছাইয়া দিয়া আহো। যাওনের কালে তারে বুঝাইয়া কইবা ফরেন মাইয়া মানুষের এইভাবে যহন তহন একলা ঘুরাফিরা, আওন যাওন ঠিক না।

কথাটা ঠিকই। মাদাম জুলিয়াঁর এইভাবে আসা আর ফিরে যাবার নিরাপত্তা নিয়ে আমিও চিন্তাগ্রস্ত ছিলাম। জুলিয়াঁকে বুঝিয়ে বললাম, মাদাম, ইট উইল বি ভেরি রিস্কি ফর ইউ টু গো অ্যালোন ইন এ রিক্শ। সো ক্যান আই অ্যাকম্পনি ইউ ফর ইয়োর সেফটি?

মাদামও এমন প্রস্তাব পেয়ে মহাখুশি। বললেন, ওহ ইয়েস, ইয়েস। দ্যাত ইজ ইয়োর কাইন্দনেস। ইত উইল বি মাই প্লেজার ইফ ইউ অ্যাকম্পনি মি। আদারওয়াইজ আই উইল বি লস্ত। আংকল কালিল, ইউ আর এ গ্রেত ম্যান। থ্যাংক ইউ ফর ইয়োর গিফত অ্যান্দ তেস্তি সুইত।

খলিল চাচার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমরা একটা রিকশায় উঠলাম। এক রিকশায় এক বিদেশিনীর সঙ্গে আমার প্রথম স্বদেশের রাস্তা ভ্রমণ। ‘এ জার্নি বাই রিক্শ ফ্রম পাটুয়াটুলি টু ধানমন্ডি উইথ এ বিউটিফুল লেডি’ এটা নিয়ে খাতায় একটা রচনা লিখতে পারতাম অতি স্বচ্ছন্দে, কল্পনার রং এ। কিন্তু বাস্তবে আমি, ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’ এই গানের মতো রোমান্টিক বা কল্পনাপ্রবণ নই। কখনোই নিজের মা ও বোন নাজনিন ছাড়া অন্য কোনো নারীর সঙ্গে রিকশায় চড়িনি। সুতরাং আমি বেশ আড়ষ্ট। কিন্তু জুলিয়াঁ অত্যন্ত স্বচ্ছন্দ, মোটেই আড়ষ্ট নন। পথে যেতে যেতে ভাঙা ইংরেজিতে ঢাকার ইতিহাস, ঐতিহ্য সম্পর্কে কিছু কথা বলতে বলতে আমার আড়ষ্টতা কিছুটা দূর হল। কিন্তু মাদাম জুলিয়াঁর নানা কৌতূহল, নানা প্রশ্ন ঢাকা নিয়ে নয়শুধু আমাকে নিয়ে, আমাদের পরিবার নিয়ে। সে সব প্রশ্ন আমি সুকৌশলে এড়িয়ে ঢাকা নিয়েই কথা বলতে থাকলাম। জুলিয়াঁ বোধহয় বোর হয়ে গেলেন আমার এইসব ক্লান্তিকর কথাবার্তায়। হঠাৎ বলে উঠলেন, তুমি কি জানো আমরা ফ্রেন্সরা ইংরেজদের কিছুটা অপছন্দ করি?

 

জানি। আমি মাথা নাড়লাম। বললাম, তোমরা উভয়েই সাম্রাজ্যবাদী, বাণিজ্যলোভী। তোমরা চিরশত্রু, চিরবন্ধু। এটাও জানি ফরাসিদের প্রতি সপ্তাহে একবার লন্ডনে না এলে এবং ইংরেজদের ফ্রেন্স লিভে সপ্তাহে একবার প্যারিতে না গেলে জীবনটা মনে হয় পানসে।

জুলিয়াঁ মৃদু হেসে প্রতিবাদের সুরে হেসে বললেন, না, না, সবাই একরকম নয়। এভাবে বিষয়টা জেনারালাইজ করা ঠিক নয়। ভাষা শিক্ষা ও গবেষণার কাজে আমি নিজেও এক বছর লন্ডনে থেকেছি, ইংলিশ ল্যাংগুয়েজে ডিপ্লোমা কোর্স করেছি। অনেক ইংলিশ লিটারেচার পড়েছি। তার মানে এই নয় যে, আমি নিজের দেশ ও ভাষাকে অবেহলা করব। অথচ দুঃখের বিষয় হচ্ছে আমাকে সারাক্ষণ ইংরেজিতে কথা বলতে হয়, রিসার্চ ওয়ার্ক, আর্টিকেল সব ইংরেজিতেই করতে হয়। তোমাদের দেশেও আমি হাঁপিয়ে উঠেছি সারাক্ষণ এই ভাঙা ভাঙা ইংরেজি বলতে বলতে।

আমি বাংলায় বললাম,

‘নানান দেশের নানান ভাষা

বিনে কি স্বদেশী ভাষা পুরে কি আশা।

কত নদী সরোবর, কিবা ফল চাতকীর

ধারাজল বিনে কভূ ঘুচে কি তৃষা?’

মানে? জুলিয়াঁর প্রশ্ন। মনে হচ্ছে ছন্দময় সুরে কবিতার মতো কিছু বলছ? কথাটা ইংরেজিতে বলবে কি?

জুলিয়াঁর প্রশ্নে আর অনুরোধে আমি পড়লাম বিপাকে। বললাম, মাদাম এটা আমাদের জন্যে একটা অমূল্য কথা যা বলে গেছেন আমাদের বাংলা ভাষার এক প্রাচীন কবি। এই প্রাচীন কবিতার পঙ্ক্তি আমার মতো অর্ধশিক্ষিতের পক্ষে ইংরেজিতে অনুবাদ করে তোমাকে বোঝাতে আমি অক্ষম। তবুও হালকা কথায় বলতে পারি, নিজের মাতৃভাষা ছাড়া মনের কোনো আশাই পূরণ করা যায় না। হৃদয়ের ভাষা হৃদয় দিয়েই বুঝতে হয়। ভালোবাসার কথা ভালোবাসা দিয়েই বুঝতে হয়।

জুলিয়াঁ হেসে উঠলেন। বললেন, রাইত, রাইত। লাভ বিগেতস লাভ। ইয়াংম্যান, আমি যদি কখনো কাউকে ভালোবাসার কথা বলি তাকে আমি আমার ভাষাতেই বলব। বলে জুলিয়াঁ আমার হাতে মৃদু চাপ দিলেন। ওর এমন স্পর্শে আমি কিছুটা অস্বস্তি বোধ করলাম। অস্বস্তি কাটাতে প্রসঙ্গ পরিবর্তনের চেষ্টা করলাম। বললাম, মাদাম, এই দেশে আসার আগে তুমি আমাদের বাংলা ভাষা কিছুটা শিখে আসলে ভালো হত।

জুলিয়াঁ বললেন, হ্যাঁ তা ঠিক। তবে আমাকে যে আমার রিসার্চ ওয়ার্কের জন্যে কী পরিমান পড়াশুনা আর পরিশ্রম করতে হয় তা তোমাকে বোঝাতে পারব না। আমি বাংলা ভাষায় সহজ সরল কথোপকথন শেখার জন্যে যে সময়টুকু প্রয়োজন তাও বের করতে পারিনি।

 

আমি বললাম, প্যারিসে অনেক বাঙালি শিল্পী আছেন তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারতে?

জুলিয়াঁ বললেন, ছবি আঁকাআঁকির সূত্রে তাদের অনেকের সঙ্গেই আমার প্রায়ই যোগাযোগ হয়। তবে তারা বাংলার চাইতে ফ্রেন্স আর ইংরেজি বলতেই বেশি ভালোবাসেন।

আমি মৃদু হেসে বললাম, যেমন দেশে তেমনি আচরি।

- মানে?

- মানে যে দেশে বসবাস সেই দেশেরই তো আচার আচরণ মেনে চললে জীবনটা সহজ হয়। কেউ যদি বাংলায় তোমার সাথে কথা বলে তুমি কি তা বুঝবে?

- হ্যাঁ তা ঠিক। আমি বুঝব না। তবে এটা বুঝি মনের ভাব আদান-প্রদানে সব ভাষাই কিছুটা শেখা উচিত। আচ্ছা একটা কথা জিজ্ঞেস করি, এই যে তুমি হঠাৎ দু’একটা ফ্রেন্স কথা বলে ওঠো তা কি আমাকে চমকে দিতে? মজা করতে?

আমি বললাম, দুটোই। তবে এটা সিরিয়াসলি নিয়ো না।

- তুমি কি সত্যিই ফ্রেন্স জানো না?

- না, মাদাম। আমি টুকটাক যে দু’একটা ফ্রেন্স কথা বলেছি তা ফ্রেন্স ভাষা শিক্ষার বই পড়ে আর সুযোগ পেয়ে তোমাকে খুশি করতে। তুমি যদি ফ্রেন্স না হয়ে চীন দেশের হতে তোমাকে আমি ঐ ভাষার চীনেবাদাম বা চায়নিজ স্যুপ খাওয়াতাম। তুমি যদি জার্মান দেশের হতে তাহলে আমি তোমাকে গুটেন মরগেন, গুটেন টাগ, গুটেন আবেন্ড, গুটেন নাখ্ট বলতাম। কেন বলতাম? তোমার মতো অতিথিদের খুশি করতে বলতাম। বিদেশে কারো মুখে স্বদেশের ভাষা শুনলে কে না খুশি হয়? মাদাম, তুমি কি এই অর্ধশিক্ষিত একটা রং মিস্ত্রির মুখে ফ্রেন্স ভাষা শুনে অবাক হওনি? খুশি হওনি? আমাকে বন্ধু ভাবো নি?

মাদাম জুলিয়াঁ আমার হাতে চাপ দিয়ে বললেন, হ্যাঁ। আমি প্রথমে চমকে গেলেও খুশি হয়েছি। তাই তো আজ এক রিকশায় নির্ভয়ে তোমার সঙ্গে যেতে পারছি। তুমি এমন একটা মানুষ যাকে সত্যি বন্ধু মনে হয়, অনেকদিনের চেনা মনে হয়।

আমি হাসলাম। বললাম, আমাকে যখন চিনেছ তখন পথে যেতে যেতে আরো কিছু তোমাকে চেনাই। ঐ যে দেখছ রাস্তার ডান পাশে ব্রিটিশ আমলের এক গভর্ণরের বাড়ি যা এখন আমাদের হাইকোর্ট। আর এই বাম পাশের বিশাল লাল দালানটার নাম কার্জন হল ব্রিটিশ আমলের গভর্ণর লর্ড কার্জনের বাড়ি। এটা এখন ইউনিভার্সিটির সায়েন্স বিল্ডিং।

জুলিয়াঁ গম্ভীরস্বরে বললেন, তোমরা ঔপনিবেশিক শাসনের স্মৃতিকে সযতেœ এখনো ধরে রেখেছ।

 

আমি মাথা নাড়লাম। বললাম, হ্যাঁ ইতিহাস, সময়, ঐতিহ্য রক্ষায় আমরা অনেক কিছুই নষ্ট করি না। যেমন নষ্ট করিনি ফরাসিদের আবাস ও বাণিজ্যস্থল ফরাসগঞ্জ, আর্মেনিয়ানদের বসতি আরমানিটোলা, মুঘল আমলের লালবাগের কেল্লা, বিদেশি বেনিয়া খাজা আহসান উল্লাহর আহসান মঞ্জিল।

দোয়েল চত্বরের সামনে আসতেই আমি হঠাৎ করেই রিকশাওয়ালাকে বললাম, এই যে ভাই, তুমি বায়ে টার্ণ নাও, ঘুরে, ঐ মেডিকেল কলেজের ইমারজেন্সি গেটের কাছে যাও। তারপর মেডিকেলের সামনের রাস্তা দিয়ে আবার আসবে শহীদ মিনারের কাছে। বুঝলে?

রিকশাওয়ালা আমার নির্দেশ মতো রিকশা চালিয়ে মেডিকেল কলেজের প্রাচীন গেটের সামনে  এসে দাঁড়াল। আমি জুলিয়াঁকে বললাম, নেমে এসো মাদাম। আমার সঙ্গে এই গেটের মাঝখানে দাঁড়াও। ভেতরে ঐ যে দেখছ একটা খোলা চত্বর, এসো,দ্যাখো একটা স্মৃতির চারণভূমি।

জুলিয়াঁ নেমে এল রিকশা থেকে। আমার পাশে দাঁড়াল। আমার দৃষ্টিকে অনুসরণ করে তার অচেনা, অজানা কৌতূহলী দৃষ্টি।

চলবে

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top