সিডনী সোমবার, ১২ই এপ্রিল ২০২১, ২৯শে চৈত্র ১৪২৭

ভাষা-প্রেম ও আমাদের আত্মপ্রবঞ্চনা : সিরাজুল ইসলাম জীবন


প্রকাশিত:
২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ১৪:৫১

আপডেট:
১২ এপ্রিল ২০২১ ১১:৪৭

 

বাংলাদেশে দিন দিন ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে পড়ার প্রবণতা বেড়েই চলেছে। এটাকে কোনো ভাবেই ভাষাপ্রেমের লক্ষণ বলা যায় না। আর যার ভাষাপ্রেম নেই তার দেশপ্রেমও নেই। ভাষা এবং দেশ অঙ্গাঙ্গি ভাবে জড়িত।

ইংরেজি স্কুলে পড়ার হার বৃদ্ধির জন্য প্রথমত দায়ী করবো আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থাকে। রাষ্ট্র কেন আইন করে এটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলো না। দ্বিতীয়ত আমাদের দেশের অভিভাবকদের দায়ী করবো। একশ্রেণির উঠতি টাকাওয়ালা অভিভাবক আছেন যারা নিজেরা তেমন লেখাপড়া না জানলেও সন্তানকে এক লাফে ইংরেজ বানাতে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোতে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। আরেক শ্রেণির অভিভাবক রয়েছে যারা নিজেরা বাংলা মিডিয়ামে পড়ে সমাজে ভালোভাবে প্রতিষ্ঠা পেলেও সন্তানের জন্য বেছে নিচ্ছেন ইংরেজি স্কুল। এটা হলো তাদের মানসিক দাসত্ব। এদেরকে কোনোভাবেই দেশপ্রেমিক বলা যায় না। এদের মধ্যে রয়েছ  ডাক্তার, প্রকৌশলী, আমলা, ব্যবসায়ী ইত্যাদি ইত্যাদি। উল্লিখিত এই দুই শ্রেণির অভিভাবকই তাদের সন্তানকে ইংরেজি স্কুলে পড়ানোকে ক্রেডিট মনে করেন।  আমার কাছে মনে হয় এটা অর্থহীন ন্যাকামিপনা, অনাহূত নাটুকেপনা।

এখন একটু বিশ্লেষণ করে নিই ইংরেজি স্কুলে পড়ার আদৌ কোনো প্রয়োজন আছে কি না? না আমি কোনো যৌক্তিক প্রয়োজন দেখছি না। প্রথমত একজন ছাত্র বাংলা মিডিয়ামে পড়েই ভালো ইংরেজি জানতে পারে, কিন্তু ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে পড়ে ভালো বাংলা জানা সম্ভব নয়। ব্যতিক্রম থাকলে ভিন্ন কথা। মূল কথা হলো মাতৃভাষা ভালোভাবে না জানলে পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জন সম্ভব নয়। একজন মানুষ যদি একশত ভাষাও জানে, ঠিক ঐ মানুষটি রাতে যখন স্বপ্ন দেখে তখন কিন্তু একশত ভাষায় স্বপ্ন দেখে না; স্বপ্ন দেখে মাত্র একটি ভাষায় এবং সেটা হলো তার মাতৃভাষা। তাই যে ভাষা আমাকে স্বপ্ন দেখায়, চিন্তা করায়, প্রতিনিয়ত ভাবায় সেই ভাষাকে বাদ দিয়ে অন্য ভাষার পণ্ডিত হয়ে বিশাল কিছু অর্জন করে ফেলবো ইহা আত্মপ্রবঞ্চনা ছাড়া আর কিছুই নয়।

এবার একটু পরিসংখ্যান দেখে নিই। আমাদের দেশের অতীত কাল থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত যারাই আন্তর্জাতিক এবং জাতীয় পর্যায়ে খ্যাতি অর্জন করেছেন তাদের কয়জন ইংরেজি মিডিয়ামের ছাত্র ছিলেন? প্রায় সবাই ই তো বাংলা মিডিয়াম থেকে সাফল্যের স্বর্ণশিখরে ওঠেছেন। আমি কারো নাম নেয়ার প্রয়োজন মনে করছি না। বর্তমান বাংলাদেশের যারা কর্ণধার তাদের প্রায় সবাই ই তো বাংলা মিডিয়াম থেকে উঠে আসা। বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক রয়েছেন যারা, ব্যতিক্রম ছাড়া তাদের সবাই তো বাংলা মিডিয়াম স্কুলের ছাত্র ছিলেন। এখন আমার প্রশ্ন বাংলা মিডিয়াম স্কুলে পড়ে ওনারা এত ভালো ইংরেজি জানেন কীভাবে? একথাটি সকল বিষয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। এবার দৃষ্টি ফেরাই ভর্তি পরীক্ষার দিকে। প্রতি বছর বুয়েট-মেডিকলসহ ভালো ভালো প্রতিষ্ঠানে যারা চান্স পায় তার কত পার্সেন্ট ইংরেজি মিডিয়াম থেকে আসা আর কত পার্সেন্ট বাংলা মিডিয়াম থেকে আসা? সবখানেই বাংলা মিডিয়ামের ছাত্রদেরই একক আধিপত্য। তাহলে ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে কোন কলা খাওয়ার জন্য আপনার সন্তানকে পাঠাবেন? আমি একথা বলছি না যে,  ইংরেজি জানা যাবে না। ইংরেজি অবশ্যই জানতে হবে। এখন একজন মানুষকে অন্তত তিনটি ভাষায় পারদর্শী হওয়া প্রয়োজন। তবে সেটা তো বাংলাকে বিসর্জন দিয়ে নয়। আমি নিশ্চিত ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে পড়া কোনো ছাত্রের পক্ষে রবীন্দ্র-নজরুলের গান বুঝা সম্ভব নয়। বাংলা ভাষার কোনো ক্ল্যাসিক সাহিত্য বুঝা তো একেবারেই অসম্ভব। ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে একজন সন্তানের পেছনে যে টাকা ব্যয় হয় তার শতকরা দশভাগ অর্থ বাংলা মিডিয়ামে খরচ করলে শুধু  ইংরেজি ভাষা নয়, সেক্সপীয়র-মিল্টন পর্যন্ত বুঝতে পারবে। আমাদের সমস্যা হচ্ছে মানসিকতায়। আমাদের দেশপ্রেম প্রশ্নবিদ্ধ। বাংলা ভাষার কোনো দোষ নেই। আমরা নিজেরাই আত্মপ্রবঞ্চনার মিছিলে ক্রমাগত বুঝে না বুঝে সায় দিচ্ছি।

যারা মাতৃভাষা বাংলাকে বাদ দিয়ে ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা আর্জনের জন্য সন্তানকে ইংলিশ মিডিয়ামের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন তারা একসঙ্গে তিনটা ক্ষতি করছেন। প্রথম ক্ষতি হলো, ঐ সন্তান হবে মানসিক প্রতিবন্ধী, কারণ তার মনের স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হবে। চিন্তার জগতে কোনো গভীরতা আসবে না। দ্বিতীয় ক্ষতি হলো, এই সন্তান পিতা-মাতার তেমন কোনো কাজে আসবে না। তৃতীয় ক্ষতি হলো, এই সন্তান দেশেরও কোনো কাজে আসবে না। বাংলা মিডিয়াম বাদ দিয়ে যারা ইংরেজি মিডিয়ামকে ধ্যান-জ্ঞান করছেন তাদের অবস্থা হলো অনেকটা এমন যে, নিজের মাকে কালো মনে করে অন্যের কসমেটিকস মাখা বা বার্নিশ করা সাদা ছামড়ার নকল মাকে নিজের মা মনে করার মতো। এই চেষ্টা মাইকেল মধুসূদন দত্ত অনেক করেছিলেন। কিন্তু তিনি ইংরেজ হতে পারেননি। ভুল স্বীকার করে শেষপর্যন্ত দুঃখিনী বর্ণমালার কাছেই ফিরে আসেন। আমার মনে হয় না মাইকেল মধুসূদনের চেয়ে বেশি ইংরেজি এখনকার কোনো বাঙালির পক্ষে জানা সম্ভব। তাই মরীচিকাকে পানি মনে না করাই কল্যাণকর।

মাতৃ-ভাষা নিয়ে এ আমার ক্ষুদ্র প্রয়াস।

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top