সিডনী সোমবার, ১২ই এপ্রিল ২০২১, ২৯শে চৈত্র ১৪২৭

ধর্মের রূপরেখা : রীনা ঘোষ


প্রকাশিত:
৭ এপ্রিল ২০২১ ১৪:৪০

আপডেট:
১২ এপ্রিল ২০২১ ১১:৫৩

 

পুন্যাত্মাদের কথায় আমার এই দেশ দেবভূমি। তাদের কথায় প্রাচীনকালে এখানে একমাত্র হিন্দুদের বাস ছিল। এরপর ঘটে বিভিন্ন বহিঃশত্রুর আক্রমণ । একে একে পারসিক, হুন, মোঘল এবং ইংরেজরা এদেশে আসে। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনে ঘটে, ভাষার আদান প্রদান হয় , সেই সাথে আদান প্রদান ঘটে ধর্মেরও। কিছু বলপূর্বক তো কিছু ইচ্ছাকৃত ধর্মের পরিবর্তন ঘটতে থাকে। হিন্দু প্রধান দেশ হয়ে ওঠে  - নানা জাতির ও নানা ধর্মের। হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, জৈন - সকলে মিলে মিশে থাকতে শুরু করে। কিন্তু এই মিল নাকি কোনোদিন ছিল না - নিজের ধর্মে রূপান্তর ছিল এর মূল লক্ষ্য। তাই ধর্মে ধর্মে তৈরি হল বিভেদ।

একমাত্র হিন্দু ধর্মই যদি এখনকার আদি ধর্ম হয় তবে তার ইতিহাস অবশ্যই থাকবে। এই ধর্মের উৎপত্তি কোথা থেকে হল । এটা ঈশ্বরের দান নাকি এটাও মানুষেরই সৃষ্টি? উত্তর খুঁজে পেলাম চতুর্থ শ্রেণীর ইতিহাস বইয়ে।

সেখানে লেখা আছে - এশিয়া মাইনর থেকে আসা একদল পশুপালক ( যারা আর্য নামে খ্যাত) ভারতের প্রাচীন অধিবাসী অনার্যদের  হারিয়ে উর্বর সিন্ধু নদের তীরে নিজেদের আধিপত্য স্থাপন করে বসবাস শুরু করে। 'স' কে 'হ' উচ্চারণ করার ফলে সেই সময় থেকে এই সিন্ধুনদ তীরবর্তী আর্যরা হিন্দু নামে পরিচিত হয় এবং পরবর্তীতে তাদের বাসভূমি "হিন্দুস্থান"। এই পরবর্তীতে আর্য সমাজের আসে জীবিকা ভিত্তিক বিভাজন - ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় , বৈশ্য ও শূদ্র। এই জীবিকা ভিত্তিক বিভাজন পরে সমাজের মজ্জায় ঢুকে যায় এবং হিন্দু ধর্মের মধ্যে পদবীর ভিত্তিতে শুরু হয়ে যায় বিভাজন। জাতপাত, উচুঁ নিচু, আর ধর্মের গোঁড়ামি শুরু হয়।

যেখানে আমার নিজের ধর্মের মধ্যেই এতো ভেদাভেদ, এতো মতানৈক্য, এতো অন্ধবিশ্বাস, সেখানে আমি অন্য ধর্মের সমালোচনা করবো কিরূপে? মুসলিমদের নারী শিক্ষার বিরোধ, পর্দা প্রথা আর তিন তালাক (বর্তমানে আইন বিরুদ্ধ) - এদের বিরুদ্ধে রুখে দাড়াব কোন মুখে? তবে একথা জানি ঈশ্বর কোনো বিভেদ করেন নি। করলে আমাদের অস্থি মজ্জায় আর রক্তের রঙে পার্থক্য থাকত। তাহলে এই ভেদাভেদের সত্যিই কি কোনো প্রয়োজন আছে? আদি কাল থেকে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য এই যে কাঁটা তার দেওয়া হয়েছে তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।

অন্য ধর্মের ছোঁয়া জলের উদাহরণ যদি বাদও দিই তাও কিছু খটকা থেকে যায় মনে। আমার ঠাকুমা মঙ্গলচণ্ডীর পুজো করতেন, পাশে লক্ষ্মী দেবীর সোনার ঘট। তিনি হিন্দু ঘরের সধবা গৃহিণী। সেই মায়ের পেটে জন্মে আমার বাবা তারামায়ের ভক্ত, সেই অর্থে তিনি শাক্ত ধর্মাবলম্বী। আমার বড়ো কাকা ঘরে রাধাগোবিন্দ পেতেছেন,  তাহলে কি তিনি বৈষ্ণব ধর্মের। কেউ শিব পূজা করলে সে হবে শৈব - এই আমাদের ধর্মের রূপ। কিন্তু প্রকৃত অর্থে এটাই কি ধর্ম? কোন ধর্ম মানবো আমি? কোন রূপেরই বা করব আরাধনা? ধর্ম কি আমার বংশগত নাকি আমি পৃথকভাবে তাকে গ্রহণ করবো? সাধারণ মাটি বা কোনো দামী ধাতুর আকারের মধ্যে কি সত্যিই তিনি বিরাজ করেন? নাকি তিনি নিরাকার? কত মুসলিম বন্ধুর বাড়ি ঈদের দিন আমি তাদের সিমাই খেয়েছি, তাহলে আমি কি বিধর্মী?

আমার কিঞ্চিৎ জ্ঞানে আমি জেনেছি "কোরান" এর 'আল্লাহ্ হুম', "গীতা"-র 'ওম', আর "বাইবেল" - এর 'U' (the word from the God, the word with the God) - প্রতিটি ধর্মের মূল অর্থ একই, মূল মন্ত্র একই। আমরা যে পথই অবলম্বন করি না কেন - আমাদের গন্তব্য কিন্তু সেই একটাই।

তাই আমার কাছে ধর্মের অর্থ হল - সত্য ও ন্যায়ের মেলবন্ধন। ধর্ম মানে আলো, ধর্ম মানে শুভ, ধর্ম মানে একতা - যা আমাদের মনের সমস্ত গোড়ামি, সমস্ত অন্ধকার এবং সকল মিথ্যা আর অন্যায়ের বিনাশ ঘটিয়ে মানুষে মানুষে মিলনের পথ সুগম করে, সেই হল প্রকৃত ধর্ম।  

 

রীনা ঘোষ
পশ্চিম বঙ্গ, ভারত


বিষয়: রীনা ঘোষ


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top