সিডনী বৃহঃস্পতিবার, ৯ই ডিসেম্বর ২০২১, ২৫শে অগ্রহায়ণ ১৪২৮

সাম্প্রতিক বেলুড় মঠ: সোনালি ইতিহাসের খোঁজে (পর্ব দুই) : ডঃ সুবীর মণ্ডল


প্রকাশিত:
১৯ জুলাই ২০২১ ২১:৪৪

আপডেট:
৯ ডিসেম্বর ২০২১ ২০:০০

 

আমেরিকার শিকাগো ধর্ম মহাসন্মেলনে (১৮৯৩) সাড়া জাগিয়ে পাশ্চাত্যে বিখ্যাত হয়ে উঠেছিলেন যে বিবেকানন্দ, পরাধীন নেটিভ ভারতবর্ষকে উন্নত অহংকারে পৃথিবীর মানচিত্রে গেঁথে দিয়েছিলেন যে বিবেকানন্দ, সেই রামকৃষ্ণ নয়ণের মণি, পাশ্চাত্য থেকে সতীর্থ স্বামী শিবানন্দকে লিখেছিলেন- "মা ঠাকরুণ কি বস্তু বোঝেন, বুঝতে পারনি এখনও, কেহই পারে না, ক্রমে পারবে- আমার জীবন থেকে শ্রীরামকৃষ্ণ যান তাতে আমি ভীত নই, কিন্তু মা- ঠাকরুণ গেলে সর্বনাশ'। সারদাদেবীর স্বরূপটি বিবেকানন্দ বুঝতে পেরেছিলেন বলেই, বেলুড় মঠের জমি কেনার পর অশক্ত শরীরে তাঁকে তা ঘুরে দেখিয়েছিলেন অত্যুৎসাহে। আবার বেলুড় মঠ প্রতিষ্ঠার আয়োজন সম্পূর্ণ হলে তাঁকে দিয়েই বিবেকানন্দ পূর্ণাঙ্গ অভিষেক করিয়েছিলেন। সময় ১৩ মার্চ ১৮৯৯। আসলে সারদাদেবীর হাতে 'সমস্যায় কিলবিল করা' তামাম পৃথিবীর মানুষের দেখভালের দায়িত্ব মহাসমাধির আগে শ্রীরামকৃষ্ণ দিয়ে গিয়েছিলেন। সশরীরে যতদিন ছিলেন তা তিনি পালন করেছেন। বেলুড় মঠে মায়ের পটচ্ছবির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে হচ্ছিল তিনি সেই সুমহান দায়িত্ব এখনও পালন করে চলেছেন নিরবচ্ছিন্নভাবে। তিনি শান্তি, ত্যাগ, সেবা, পবিত্রতা সহনশীলতার বার্তা সকলেরই হৃদয়ের মধ্যে গেঁথে দিতে উদগ্রীব। সারদাদেবী মন্দিরের মুখ তাই সমস্ত প্রথা ভেঙে কলকাতার অভিমুখী। আন্তর্জাতিক মহানগরী কলকাতার দিকে শ্রীমার দৃষ্টি নিবন্ধ আসলে ওই তামাম দুনিয়ার সকল মানুষের কথা ভেবেই। রামকৃষ্ণ পার্ষদের কাছে সারদাদেবীর কথা ছিল, শেষ কথা। তাঁরা সংঘজননীকে নানান অভিধা দিয়েছেন আপন আপন উপলব্ধির নিরিখেই। শুধুমাত্র সন্ন্যাসী, অনুরাগী-ভক্তরা নন একালের ঐতিহাসিক- সমাজতাত্ত্বিকেরা তাঁকে 'বেদান্তের ফলিত রূপ' বলে আখ্যায়িত করেছেন। নারী প্রগতির অন্যতমা পুরোধা রূপেও তাঁর অবস্থান  সর্বজনবিদিত। অসংখ্য ভক্ত-অনুরাগীগন মুখোমুখি বসে মা সারদাদেবীর মন্দিরের সামনেই ধ্যানের গভীরে প্রবেশ করেন। সারদাদেবীর মন্দির থেকে দক্ষিণ পথ ধরে এগোতেই চোখে পড়ে সবুজ ঘাসের মখমলে বসে থাকা অবাঙালি গুণগ্রাহী ভক্তদের। এ-এক অন্যভুবন। প্রত্যহ দিনান্তে এঁরা পুণ্যতোয়া গঙ্গার তীরে সারদাদেবী এবং বিবেকানন্দের মন্দিরের মাঝখানে বসে ধর্মকথা পাঠ করেন। হাওড়ার শহরের মানুষ এঁরা। এঁরা বেলুড় মঠের পুণ্যভূমিতে বসে ভগবৎ কথায় মেতে ওঠেন, তখন মনে পড়ে সেই বিষ্ণুপুর রেল স্টেশনের কুলিদের কথা। কথিত আছে সূদুর লন্ডনের চার্চে মেরির মুখের মাঝে ভগিনী  নিবেদিতা দেখেছিলেন মা সারদাদেবীকে। আজো প্রতিদিন সকালে, সরকারি ব্যবস্থাপনায় দেশি-বিদেশি পর্যটকরা যখন আসেন এখানে, তখন বিদেশি পর্যটকেরা মা'র মুখের মধ্যে নিবেদিতার মতোই কি খুঁজে পান মা মেরিকে?
গঙ্গার পশ্চিম পাড়ে কাশী- বারাণসী মতনই। একথা মা সারদাদেবী বেলুড় মঠ প্রতিষ্ঠাকালে স্বামী বিবেকানন্দকে জানিয়েছিলেন। বিবেকানন্দ গভীর ভাবে উৎসাহিত  হয়েছিলেন। সেই বিবেকানন্দ-যিনি রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের রূপকার, রূপকার বেলুড় মঠেরও। আজ তার স্মৃতিমন্দিরে পৌঁছে একশ বছরেরও আগে বেলুড় মঠ প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপটটি মানসপটে উদ্ভাসিত হয় আমাদের। করোনার আবহে এ- বছর বেলুড় মঠের প্রতিষ্ঠার ১২৫ তম বর্ষ পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত হয়েছিল সাধারণ অনুষ্ঠান। গোটা দেশ ও বিশ্ব তাকিয়ে ছিল এই শুভদিনের অপেক্ষায়। বিবেকানন্দ ১৮৯৭-এ পাশ্চাত্য জয় করে কলকাতায় ফেরার পর অবস্থান করেছিলেন আলমবাজার মঠে। ১৮৯৭-এর ১২ জুন ভূমিকম্পে আলমবাজরের অস্থায়ী মঠ বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বরানগরের বিপরীতে গঙ্গার পশ্চিম তীরে হাওড়ার বেলুড়ে পীতাম্বর মুখোপাধ্যায়ের বাগানবাড়ি ভাড়া করে উঠে এসেছিল আজকের রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশন। ১৮৯৮-এর ১২ই ফেব্রুয়ারি বিবেকানন্দের ব্রিটিশ অনুরাগিনী- হেনরিয়েটা মুলারের দেওয়া ৩৯ হাজার টাকায় বর্তমান বেলুড় মঠের ২২বিঘা জমি কেনা হয়। বেলুড় মঠের জমিতে একসময় জাহাজ সারানো হত। সেই সময়ে জায়গাটি ছিল অসমতল ও বসবাসের অযোগ্য। বাড়িঘর, জমি, পরিকাঠামো বাসযোগ্য হওয়ার পর, এখন থেকে একশ বছর আগে আজকের বেলুড় মঠ সার্বিক রূপে প্রতিষ্ঠিত হয়।
সেদিনের ২২ বিঘে জমি আজ ৩১ একরে প্রসারিত হয়েছে। বিবেকানন্দের ইচ্ছা-অনুযায়ী তাঁর পার্থিব শরীর যেখানে পঞ্চভূতে বিলীন হয়েছিল, সেখানেই তৈরি হয়েছিল ১৯২৪ -এর ২৮শে জানুয়ারি বিবেকানন্দ স্মৃতি মন্দির। বিবেকানন্দের ধ্যানস্তব্ধ মূর্তিটি মন্দিরের পূর্বপ্রান্তের দেওয়ালে মিউরালে অবস্থিত। মন্দিরটি বাংলার সাবেকে ধাঁচের। অনেকটা চলমান রথের মতো। আজ দেশ- বিদেশে ক্রম প্রসারিত। মন্দিরের শৈলীতে সেই রূপটি প্রকাশিত হয়েছে। ধ্যানস্তব্ধ মিউরালে বিবেকানন্দকে দেখলে আমাদের মনে পড়বেই কন্যাকুমারীকার শিলাখণ্ডে ভারত পরিক্রমান্তে তিনদি-তিন রাত অনশনক্লিষ্ট ধ্যানমগ্ন বিবেকানন্দকে। এই পোশাকের সঙ্গে তাঁর সেদিনের পোশাকের মিল ছিল না। সেদিন তাঁর মনে যে প্রশ্ন জেগেছিল তা তিনি কাতর কণ্ঠে উচ্চারণ করেন। আসলে এই উচ্চারণের মধ্যে ছিল মানবমুক্তির বিশেষত ভারত তথা বিশ্ব মানবের মুক্তি পথের অন্বেষণ। পাশ্চাত্য জয় করে তিনি যখন ভারত ভূমিতে পৌঁছেছিলেন তখন তাঁর কণ্ঠটি আর কাতর নয় বজ্রদূপ্ত। অগ্নি স্ফূলিঙ্গ ক্রমাগত কলোম্ব থেকে আলমোড়া -- সমগ্র ভারতবর্ষে তাঁর প্রদত্ত ভাষণে বিচ্ছুরিত হল। ভারতবাসী বিশেষত যুবকদের মধ্যে ফিনিক্স পাখির মতোই সেই অগ্নি স্ফুলিঙ্গ থেকে জন্ম নিল নতুন চেতনা- 'যা আজ ক্রমাগত পরম্পরাগত ভাবে প্রবাহিত হয়ে চলেছে।'


বেলুড় মঠের স্বামী ব্রক্ষানন্দ স্মৃতি মন্দির একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্দির। স্হাপনকাল ১৯২৪ এর ৭ই ফেব্রুয়ারি। শ্রীরামকৃষ্ণের মানসপুত্র ছিলেন স্বামী ব্রহ্মানন্দ। দীর্ঘ দু-দশকের উপর অধ্যক্ষ থাকাকালীন রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের পল্লবিত বিস্তার ঘটেছিল। স্বামী বিবেকানন্দের মৃত্যুর পর লোকহিতার্থে, মানব সেবাযজ্ঞের ঋত্বিক ছিলেন তিনি। উপবিষ্ট পূর্ণাবয়ব মূর্তিটির দিকে তাকালে রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের উন্মেষ পর্বের ইতিহাসের পৃষ্ঠাগুলি উন্মোচিত হয়ে পড়ে। বৈষ্ণবীয় ধাঁচে তৈরি ওই মন্দির। এই মন্দিরের অবস্থানগত একটা বিশেষত্ব হলো, মন্দিরের উত্তর দিকের বারান্দায় দাঁড়ালে রামকৃষ্ণ ভাব- আন্দোলনের মহা পীঠস্থান দক্ষিনেশ্বরে মন্দিরটি দেখা যায়। আমি বিস্মিত হয়েছি  দেখে। সেই সঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণের পুরানো মন্দিরটি আজও স্বমহিমায় বিরাজমান। পথভ্রান্ত ভক্ত- অনুরাগীরা দলে দলে ছুটে যাচ্ছেন প্রণতি জানাত আর অতীতের বর্ণময় ইতিহাসকে স্পর্শ করতে। এই বাড়িটির দোতলায় দক্ষিণ-পূর্ব দিকে স্বামী বিবেকানন্দের সুসজ্জিত বাসগূহ। এই ঘরে স্বামী বিবেকানন্দের ব্যবহৃত সব সামগ্রী সযত্নে সুরক্ষিত। গান্ধীজি থেকে শুরু করে অগণিত দেশ-বিদেশের বিশিষ্ট মানুষ এই ঘরে এসে মাথা নত করে স্বামী বিবেকানন্দকে স্মরণ করেছেন এবং প্রণত জানিয়েছেন নিবিষ্ট চিত্তে।   

বেলুড়মঠের  গুরুত্বপূর্ণ দ্রষ্টব্য স্থানঃ                       

স্বামী বিবেকানন্দের সমাধিস্থল, রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের সমাধিস্থল, আরোগ্য ভবন, আন্তর্জাতিক অতিথি ভবন, মিউজিয়াম, সংগ্রহশালা, ব্রক্ষানন্দ স্মৃতি মন্দির, জগজ্জননী সারদাদেবীর মন্দির, স্বামী বিবেকানন্দ স্মৃতি মন্দির, পুরানো মঠ, প্রশাসনিক ভবন, ত্রাণের কেন্দ্র, রামকৃষ্ণ সংগ্রহ মন্দির, বিবেকানন্দ বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, দাতব্য চিকিৎসা কেন্দ্র ইত্যাদি। 
সন্ন্যাসী স্বামী বিবেকানন্দের মূর্তিগুলি নিয়ে ভক্তজনের দুঃখ অনেক। অনেক সৃষ্টিই যে নিতান্ত হতাশাজনক তা বলতে দ্বিধা নেই। শঙ্করীপ্রসাদ বসু বলতেন, মাথায় একটা পাগড়ি ঝুলিয়ে দিলেই বিবেকানন্দ হয় না। কিন্তু সে নিয়ে দুঃখ করে লাভ নেই, বহু যুগ ধরে ভগবান বুদ্ধও একই ভাবে নিগৃহীত হয়েছিলেন। তিনি ঠিক কেমন দেখতে ছিলেন, কোন শরীরের মায়ামোহে তিনি বিশ্বজনের হৃদয় হরণ করেছিলেন, তা আজ আরও বোঝার উপায় নেই। কালজয়ী শঙ্করাচার্য সে দিক থেকে ভাগ্যবান। স্বামীজির মতো তিনিও অকালে দেহত্যাগ করেছিলেন, কিন্তু এ দেশের পথেঘাটে তিনি বিস্ময়কর ভাবে অনুপস্থিত এবং সে জন্যই বোধহয় বিভিন্ন রচনার মাধ্যমে তিনি বিশিষ্ট জনের হৃদয়ে সদা উপস্থিত আজও।      

বেলুড়মঠে সন্ধ্যা আরতিতে আমার ক্ষণিক অনুভূতি:সাম্প্রতিক বেলুড় মঠের সান্ধ্য কালীন আরতি দেখার  সৌভাগ্য হয়েছিল। তারই  কিছু  চালচিত্র। শতরঙি পেতে বসে আছেন অগণিত ভক্ত ও অনুরাগীরা। এ- এক অন্যভুবন। চারদিকে  শান্ত, অধীর আগ্রহে সবাই বসে আছি শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের দ্যুতিময় মূর্তির সামনে। সামনে সুশৃঙ্খল সারি বদ্ধভাবে বসে আছেন বেলুড়মঠের সন্ন্যাসীরা। কারোর কাছে হারমোনিয়াম, কারো কাছে তবলা কারোর হাতে বীনা । অসাধারণ ভাবগম্ভীর পরিবেশে মনের সমস্ত দীনতা- কালিমা এক লহমায় কোথায় অন্তর্হিত হলো উপলব্ধি করতে পারলাম না। মনের চিত্তচাঞ্চল্য মুহূর্তে দূর হয়ে গেল। মঠের গঠনগত বৈশিষ্ট্য অথবা স্হান মাহাত্ম্য এর কারণ কিনা জানি না। তবে একটা অলৌকিক ঘটনার মুখোমুখি আমি। যা ব্যাখ্যা অতীত বলে আমার মনে হয়েছে। একটা অনির্বচনীয় শিহরণ জাগল মনে- হৃদয়ের মধ্যে। চারিদিক এক অদ্ভুত নরম আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে। একটা স্নিগ্ধতা ছড়িয়ে পড়েছে।

 শেষকথা:  বেলুড়মঠের  রামকৃষ্ণ মিশন ও মঠ ভারতীয় একটি  ধর্মীয় সংগঠন।  এই মঠ ও মিশন বিবেকানন্দ- রামকৃষ্ণ ভাব আন্দোলন বা বেদান্ত আন্দোলন নামক বিশ্বব্যাপী আধ্যাত্মিক আন্দোলনের প্রধান প্রবক্তা। এটি একটি জনকল্যাণমূলক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। ১৮৯৭ সালের ১ মে রামকৃষ্ণ পরমহংসের প্রধান শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠা করেন। মিশন স্বাস্থ্য পরিষেবা, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ত্রাণকার্য, গ্রামোন্নয়ন, আদিবাসী কল্যাণ, বুনিয়াদি ও উচ্চশিক্ষা এবং সংস্কৃতির প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণকরেছে। এটি শতাধিক সংঘবদ্ধ সন্ন্যাসী ও সহস্রাধিক গৃহস্থ শিষ্যের একটি যৌথ উদ্যোগ। রামকৃষ্ণ মিশন কর্মযোগের  ভিত্তিতে কাজকর্ম চালায়।দুর্যোগের সময়ে ত্রাণসামগ্রী বন্টন ও শিক্ষা বিস্তার দুটি সংগঠনের প্রধান কার্যালয় বেলুড় মঠ। পরম পুরুষ  শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের "শিব জ্ঞানে জীব সেবার' মহান শিক্ষার ফলশ্রুতি বেলুড়মঠের রামকৃষ্ণ মঠ ও  মিশন। ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দের ১লা মে স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর সতীর্থদের সহযোগিতায় শুরু রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের নামে এই মহান প্রতিষ্ঠান। ভারতীয় জাতির প্রাণে নবপ্রেরণার জোয়ার এনে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ঈশ্বর  জ্ঞানে  মানব সেবার আদর্শ স্থাপন করেছে। ধর্ম--সেবা- শিক্ষা এই তিনটি  কর্মসূচি নিয়ে রামকৃষ্ণ মিশনের যাত্রা শুরু হয়। যা আজও বজায় রাখতে পেরেছে। হিন্দুধর্ম ও সনাতন ঐতিহ্যের আশ্রয়ে স্থাপিত হলেও এর মধ্যে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মিলন ঘটেছে । ঈশ্বরে বিশ্বাস ও জাতিধর্ম- বর্ণনির্বিশেষে মানব জাতির সেবা ও মানুষ তৈরি আদর্শ নিয়ে প্রতিষ্ঠিত এই মিশনের উদ্দেশ্য গুলো হলো -সর্বধর্মে শ্রদ্ধা, সমাজসেবা আদর্শ, সমগ্র মানব জাতির সেবা। রামকৃষ্ণ মিশনের বিভিন্ন শাখা ছড়িয়ে পড়েছে আমেরিকা, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, বাংলাদেশ, আর্জেন্টিনা, ইতালি, ভুটান, রাশিয়া, নেপাল, নেদারল্যান্ডস  সহ বিভিন্ন দেশে। শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের ও বিবেকানন্দর বানী অনুসরণ করে এই মিশনের সন্ন্যাসীরা ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অনাথ আশ্রম, দাতব্য চিকিৎসালয় স্হাপন এবং দুর্গত মানুষের সাহায্যে কাজ করে জীবে 
 দয়া এবং দরিদ্র নারায়ণ সেবার কর্মযোগে নিয়োজিত আছেন। বেলুড়মঠের প্রবেশের প্রধান দরজা অতিক্রম করে গঙ্গার দিকে এগোলেই ডান দিকের দীর্ঘ এবং সুদৃশ্য দ্বিতল বাড়িটি হলো রামকৃষ্ণ মঠের ও  আশ্রমের প্রধান কার্যালয়। ১৯৯৩ সালের ২২ শে এপ্রিল  নবনির্মিত এই কার্যালয় ভবনটির দ্বারোদ্ঘাটন হয়। ঘড়ি ধরে এখানে নিরন্তর কাজ চলেছে। কাজ করে চলেছেন নিরবচ্ছিন্নভাবে সন্ন্যাসী ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্রক্ষচারীরা। সে কাজ পল্লবিত ধারায় প্রসারিত ভারতবর্ষ ও বহিরভারতে অবস্হিত ১৪০ টি শাখা কেন্দ্র ও তার অন্তর্গত নানা উপকেন্দ্রে। এই সব নানা কেন্দ্রের নানান সমস্যার সমাধান, নতুন নতুন কর্মযজ্ঞের পরিকল্পনা - বাস্তবায়নের প্র্য়াস, ত্রাণ ও পুনর্বাসন বিষয়ে আলোচনা ও পরিকল্পনা- উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে পর্যালোচনা, হিসেব-নিকেশ,

যুবক-যুবতীদের রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের ভাবধারায় এগিয়ে যাওয়ার পথে গাইড লাইন ও সুপরামর্শ দেওয়া এমনই সব জরুরী  হাজারো কাজ। এত সব কাজ চলেছে- তা ভিতরে বা বাহিরে থেকে বোঝার উপায় নেই। সবটাই চলেছে তীব্র গতিতে এবং নীরবে আর দ্যুতি ছড়িয়ে পড়েছে সমগ্র বিশ্বে। অসাধারণ শৃঙ্খলা ও কর্মসংস্কৃতির বন্ধন, এককথায় অনন্য নজির। এত মানুষের উপস্থিতি কিন্তু সুশৃঙ্খলভাবে সামাল দেওয়ার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে  মিশন কর্তৃপক্ষ। বেলুড়মঠের  সার্বিক পরিছন্নতা যা দেখে দৃষ্টি নান্দনিক সুখে উল্লাসিত হয়ে ওঠে। পরিবেশবিদদের পাঠ নেওয়ার পক্ষে যা কিনা একান্ত  জরুরী। অসাধারণ টিম  ওয়ার্ক ও দক্ষ পরিচালনায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে সব ধরনের কাজ, কোথাও বিশৃঙ্খলা নেই। নীরবে  সব কাজ সুচারুভাবে সম্পন্ন হচ্ছে। ভাবলে অবাক হতে হয়। বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়া শুরু করে দিয়েছে মিশন কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে ই-মেল, কম্পিউটার, সেলুলার ফোন, ইলেকট্রনিক রাইট, ইন্টারনেট সহ নানা ধরনের প্রযুক্তি। আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর শিক্ষার সব উপকরণ নিলেও রামকৃষ্ণ- বিবেকানন্দের ভাবাদর্শ, মূল্য বোধ বজায় রাখার উপর  বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করলেন মিশনের স্বামী স্মরণানন্দ মহারাজ। ওনার বক্তব্য "রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশনের শতধা বিকাশের ক্ষেত্রে এটিই বীজ মন্ত্র ও লক্ষ্যে উত্তীর্ণ হওয়ার একমাত্র পথ।" ১২৫  বছরের সুপ্রাচীন বেলুড় মঠ তারাই সাক্ষ্য বহন করে এগিয়ে চলেছে। 

বেলুড় মঠ বিভিন্ন স্বাস্থ্য পরিষেবা, শিক্ষা, নারীকল্যাণ, শ্রমিক ও অনগ্রসর শ্রেণীর স্বার্থে গ্রামোন্নয়ন, ত্রাণ, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতি অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে।রামকৃষ্ণ পরমহংস, সারদা দেবী, স্বামী বিবেকানন্দের জন্ম ও প্রয়াণতিথি, বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও বড়দিন উৎসব উদযাপন করে এই কেন্দ্র। দুর্গাপূজা, বিশেষত মহাষ্টমীর কুমারীপূজা দেখতে এখানে প্রতি বছর প্রচুর জনসমাগম হয়। স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান  হিসেবে  সমগ্র বিশ্বে আজও  প্রথম। দেশের সঙ্কটে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে চলেছে  বেলুড় মঠ ও মিশন। বিশ্বের দরবারে বেলুড়মঠের কর্মযজ্ঞ আজও  প্রশংসনীয়।   

সমাপ্ত

 

ডঃ সুবীর মণ্ডল
পশ্চিম বঙ্গ, ভারত

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top