সিডনী বৃহঃস্পতিবার, ৯ই ডিসেম্বর ২০২১, ২৫শে অগ্রহায়ণ ১৪২৮

রাখীবন্ধন: হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের সম্প্রীতির মহান উৎসব : ডঃ সুবীর মণ্ডল


প্রকাশিত:
২২ আগস্ট ২০২১ ০৮:৫৪

আপডেট:
২২ আগস্ট ২০২১ ০৯:৩১

 

রাখীবন্ধন উৎসব, বা রাখী বা রাখীপূর্ণিমা ভারতের একটি উৎসব। এই উৎসব ভাই ও বোনের মধ্যে প্রীতিবন্ধনের উৎসব। হিন্দু, জৈন ও শিখসহ ভারতীয় সব ধর্মের মানুষ এই উৎসব পালন করে। এই দিন দিদি বা বোনেরা তাদের ভাই বা দাদার হাতে রাখী নামে একটি পবিত্র সুতো বেঁধে দেয়। এই মহান মিলন উৎসবের অন্তরালে লুকিয়ে আছে এক বর্ণময় ইতিহাস যা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ভিতকে খুব মজবুত করার এক শুভ প্রচেষ্টা আজও অব্যাহত রয়েছে।

ভাইয়ের দীর্ঘায়ু, সাফল্য ও সমৃদ্ধির কামনা করেন বোনেরা। পাশাপাশি ভাই নিজের বোনকে নিরাপত্তা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেন। ভাই-বোনের অটুট ভালোবাসার প্রতীক হল রাখী বন্ধন উৎসব। এদিন বোন নিজের ভাইয়ের হাতে রাখী বাঁধেন। ভাইয়ের দীর্ঘায়ু, সাফল্য ও সমৃদ্ধির কামনা করেন বোনেরা। পাশাপাশি ভাইরাও নিজের বোনেদের হাতে রাখি পরিয়ে দেন। হিন্দু পঞ্জিকা অনুযায়ী শ্রাবণ মাসের শুক্ল পক্ষের পূর্ণিমা তিথিতে রাখী বন্ধন উৎসব পালিত হয়। চলতি বছর রবিবার, ২২ অগস্ট রাখীরাখী বন্ধনের শুভক্ষহিন্দু পঞ্জিকা অনুযায়ী ২১ অগস্ট সন্ধে ৩টে ৪৫ মিনিট থেকে শ্রাবণ মাসের পূর্ণিমা শুরু হবে। ২২ অগস্ট ৫টা ৫৮ মিনিট পর্যন্ত পূর্ণিমা থাকবে। উদয়া তিথিতে রাখী বন্ধন উৎসব পালিত হয়। ২২ অগস্ট উদয়া তিথি হওয়ার এদিনই রাখী বন্ধন হবে। রাখী বন্ধনের অপরাহ্নের সময় হল, ১টা ৪৪ মিনিট থেকে ৪টে ২৩।

 

পুরাণের আলোকে রাখীবন্ধন :

মহাভারতে আছে, একটি যুদ্ধের কৃষ্ণের কবজিতে আঘাত লেগে রক্তপাত শুরু হলে পাণ্ডবদের স্ত্রী দ্রৌপদী তাঁর শাড়ির আঁচল খানিকটা ছিঁড়ে কৃষ্ণের হাতে বেঁধে দেন। এতে কৃষ্ণ অভিভূত হয়ে যান। দ্রৌপদী তাঁর অনাত্মীয়া হলেও, তিনি দ্রৌপদীকে নিজের বোন বলে ঘোষণা করেন এবং দ্রৌপদীকে এর প্রতিদান দেবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন। বহু বছর পরে, পাশাখেলায় কৌরবরা দ্রৌপদীকে অপমান করে তাঁর বস্ত্রহরণ করতে গেলে কৃষ্ণ দ্রৌপদীর সম্মান রক্ষা করে সেই প্রতিদান দেন। এইভাবেই রাখীবন্ধনের প্রচলন হয়।

শ্রীকৃষ্ণের দ্বাদশ যাত্রার অন্যতম ঝুলন যাত্রা। দ্বাপর যুগে রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলাকে কেন্দ্র করে ঝুলন উৎসব এর সূচনা হয়েছিল। ঝুলন শব্দটি এসেছে হিন্দির ঝুলা অর্থাৎ দোলনা থেকে।

ঝুলন উৎসব কে ঘিরে রয়েছে নানা আচার-অনুষ্ঠান। তার মধ্যে অন্যতম হল দোলনায় রাধাকৃষ্ণের যুগল মূর্তি স্থাপন করে দোলানো। শ্রাবণ মাসের শুক্লা দ্বাদশী থেকে পূর্ণিমা পর্যন্ত পাঁচ দিন ধরে চলে ঝুলন উৎসব।

শ্রাবণী পূর্ণিমাকে তাই ঝুলন পূর্ণিমাও বলা হয়। রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলার যে যুগল মূর্তি, তাকে কল্পনা করেই বৈষ্ণবদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই উৎসব। মথুরা-বৃন্দাবনে লক্ষ লক্ষ মানুষ এই উৎসবে সামিল হন।

বাংলাতেও ঝুলন উৎসব এর ঐতিহ্য সুপ্রাচীন। বিভিন্ন মঠ মন্দিরে তো বটেই বাড়িতেও ধুমধাম করে ঝুলন উৎসব পালন করা হয়। বহু জায়গায় চলে হরিনাম সংকীর্তন। ঠাকুরকে নানা ধরনের ফল, মিষ্টি, লুচি ও সুজি দিয়ে ভোগ দেওয়া হয়।

ধর্মীয় আচার এর পাশাপাশি সামাজিকভাবেও এই উৎসবের একটা বড় গুরুত্ব রয়েছে। বিশেষ করে ছোটরা নানা ধরনের পুতুল, গাছপালা, নুড়ি পাথর দিয়ে ঝুলন সাজায়। প্রতিটি সাজানোর মধ্যে একটা গল্প থাকে।

সেখানে যেমন শ্রীকৃষ্ণের লীলাকে কেন্দ্র করে নানা গল্প থাকে, যেমন কালিয় দমন, বক রাক্ষস বধ, পুতনা বধ প্রভৃতি তেমনই আবার আধুনিক গ্রাম, শহর, পাহাড়, নদী এসব দিয়েও সাজানোর রীতি রয়েছে।

পাঁচ দিনব্যাপী ঝুলন যাত্রার শেষ দিন হল ঝুলন পূর্ণিমা। ঝুলন পূর্ণিমার আরেক সামাজিক দিক হল রাখিবন্ধন। তাই অনেকে একে রাখি পূর্ণিমা বলেন।

বাংলার ঘরে ঘরে ভাইয়ের হাতে রাখি পরিয়ে দেন বোনরা। আর এই রাখিবন্ধনকে হাতিয়ার করে বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

সালটা ১৯০৫। ১৯ জুলাই ব্রিটিশ ভারতের তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড কার্জন বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাব ঘোষণা করলেন। ব্রিটিশদের মূল লক্ষ্য ছিল বাংলায় যে জাতীয়তাবাদী ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন গড়ে উঠছে বাংলা ভাগের মাধ্যমে তাকে প্রতিহত করা।

এই কাজে তারা ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক বিভাজন কে হাতিয়ার করতে চেয়েছিল। কিন্তু এর ফল হল উল্টো। সময়টা শ্রাবণ মাস। কিছুদিনের মধ্যেই বাংলার ঘরে ঘরে রাখি বন্ধন পালন করবে ভাইবোনেরা।

রবীন্দ্রনাথ এর সুযোগ নিয়ে হিন্দু-মুসলিম দুই সম্প্রদায়ের সম্প্রীতির বার্তা দিতে রাখিবন্ধন কর্মসূচির ডাক দিলেন। কোনও রাজনৈতিক বা বৈপ্লবিক দলের ডাকে নয় একজন কবির ডাকে গোটা বাংলা স্তব্ধ হয়ে গেল।

মূল শোভাযাত্রার পুরোভাগে নেতৃত্ব দিলেন স্বয়ং বিশ্বকবি। তাঁর কণ্ঠে তখন সেই গান বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার বায়ু, বাংলার ফল, পুণ্য হোক, পুণ্য হোক, পুণ্য হোক হে ভগবান। বাংলার ঘরে ঘরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উদ্দেশ্যে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে একে অপরের হাতে রাখি পরিয়ে ভ্রাতৃত্বের বার্তা দিল বাংলা।

 

ইতিহাসের আলোকে রাখীবন্ধন:

ইতিহাসের এক উত্তাল সময়। ১৯০৫-এর ১৯ জুলাই। ব্রিটিশ ভারতের তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড কার্জন বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাব ঘোষণা করলেন। অবিভক্ত বাংলাকে শোষণ করা সমস্যা হয়ে দাঁড়াচ্ছিল ক্রমশ। তাই শুধু এবং শুধু্মাত্র প্রশাসনিক কারণে ইংরেজ শাসকরা ঠিক করলেন, ধর্মের ওপর ভিত্তি করে ভাগ করা হবে বাংলাকে। হিন্দু জনসংখ্যার আধিক্যযুক্ত অঞ্চল আলাদা করা হবে মুসলিম অধ্যুষিত বাংলা থেকে। বাংলার মুসলিমদের এমন মগজ ধোলাই ততক্ষণে হয়ে গেছে, তারা প্রায় খুশি মনেই মেনে নিয়েছে প্রস্তাব।

তখনকার অবিভক্ত বাংলা মানে কিন্তু বাংলা, বিহার, আসাম, শ্রীহট্ট সবটা মিলে। তত দিনে ব্রিটিশ বিরোধী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের আঁতুড়ঘর হয়ে উঠেছে বাংলা। ইংরেজদের উদ্দেশ্য ছিল বাংলাকে ভাগ করে দিয়ে বিদ্রোহের গতি কমিয়ে আনা। অতএব পাশ হয়ে গেল বঙ্গ ভঙ্গের প্রস্তাব। তখন শ্রাবণ মাস। ১৬ আগস্ট। কাকতালীয় ভাবে সেটা ছিল রাখী পূর্ণিমা। হিন্দু ঘরের মেয়েরা তাদের ভাই-এর হাতে পরাবে রাখী। অন্যরকম রাখী বন্ধনের কথা মাথায় এল রবীন্দ্রনাথের। ভাই-বোনের নয়, রাখীবন্ধন হয়ে উঠল হিন্দু-মুসলিমের সম্প্রীতি উৎসব। এ ধর্মের মানুষ ভালোবেসে জড়িয়ে ধরে হাতে রাখী পরিয়ে দিচ্ছে যার হাতে, তার ধর্ম আলাদা। হাতে হাত রেখে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির দিকে ছুঁড়ে দেওয়া হল প্রতীকী প্রতিবাদ। একটা মানুষের ডাকে ধর্ম নির্বিশেষে সারা বাংলা এক হয়েছিল সে দিন। প্রতিবাদের ভাষা, চরিত্র বদলেছে ক্রমশ। দীর্ঘ ৬ বছর পর ১৯১১ সালে ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ রদ করে দেন বাংলা ভাগের প্রস্তাব।


রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও রাখী বন্ধন:

১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ প্রতিরোধ করার জন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রাখী বন্ধন উৎসব পালন করেছিলেন। তিনি কলকাতা, ঢাকা ও সিলেট থেকে হাজার হাজার হিন্দু ও মুসলিম ভাই ও বোন কে আহ্বান করেছিলেন একতার প্রতীক হিসাবে রাখি বন্ধন উৎসব পালন করার জন্য।

সেই সময় দেশে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা চরম পর্যায়ে ছিল। আমরা আজ ২২ শে আগস্ট ২০২১ সালে রাখী বন্ধন উৎসব পালন করতে চলেছি করোনার তৃতীয় ঢেউয়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে । এই উৎসবের অন্তরালে লুকিয়ে আছে এক বর্ণময় ইতিহাস কিন্তু ১০০ বছরেরও বেশি সময় আগে হিন্দু ও মুসলিম এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে একতা আনার জন্য রাখী বন্ধন উৎসব পালন করা হয়েছিল।

উনিশ শতকে আমাদের বাংলায় জাতীয়তাবাদী আন্দোলন চরম পর্যায়ে ছিল যা ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কাছে অপরিমিত ভয়ের কারণ। এই জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে দমন করার জন্য ব্রিটিশ সরকার সিদ্ধান্ত নেয় তারা বাংলাকে দুই ভাগে ভাগ করবে। সেই সময় রবীন্দ্রনাথ সহ গোটা ভারতের বিভিন্ন নেতা এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছিল এবং বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে।

১৯০৫ সালের জুন মাসে লর্ড কার্জন বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত নেয় এবং ১৯০৫ সালের আগস্ট মাসে বঙ্গভঙ্গ জন্য আইন পাশ করা হয়। এই আইন কার্যকরী হয় ১৬ ই অক্টোবর, ১৯০৫।

শ্রাবণ মাসে হিন্দু ভাইবোনদের মধ্যে রাখী বন্ধন উৎসব পালন করা হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হিন্দু-মুসলিমদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব বোধ জাগিয়ে তোলা এবং ব্রিটিশদের বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য সবাইকে রাখী বন্ধন উৎসব পালন করার জন্য আহ্বান করেন। রবীন্দ্রনাথ এই দিনটির উদ্দেশে একটি গান লিখেছিলেন।

"বাংলার মাটি বাংলার জল বাংলার বায়ু বাংলার ফল-
পুণ্য হউক, পুণ্য হউক, পুণ্য হউক হে ভগবান।
বাংলার ঘর, বাংলার হাট, বাংলার বন, বাংলার মাঠ-
পূর্ণ হউক, পূর্ণ হউক, পূর্ণ হউক হে ভগবান।
বাঙালির পণ, বাঙালির আশা, বাঙালির কাজ, বাঙালির ভাষা –
সত্য হউক, সত্য হউক, সত্য হউক হে ভগবান।
বাঙালির প্রাণ, বাঙালির মন, বাঙালির ঘরে যত ভাই বোন –
এক হউক, এক হউক, এক হউক হে ভগবান। "

 

শেষকথাঃ

এক ধর্মীয় আচারকে সামাজিক আন্দোলনের এক হাতিয়ারে পরিণত করলেন রবীন্দ্রনাথ। সেই আন্দোলন সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজ শাসকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ প্রতিরোধ গড়ে তুলল। রবীন্দ্রনাথ রাখির সুতোয় যে সম্প্রীতির বার্তা গেঁথে দিলেন তাকে ধরে রাখার উত্তর দায়িত্ব আগামী প্রজন্মের প্রতিটি বাঙালির।

আর কটা দিন পেরোলেই শ্রাবণ মাসের পূর্ণিমা। ভারতবর্ষের সমস্ত রাজ্যের গ্রাম থেকে শহরের দোকান- বাজার ছেয়ে গেছে রকমারি রাখীতে। রাখী উৎসবে সবাই মেতে উঠবেন বটে, কিন্তু তা কেবল উৎসবমাত্রই হয়ে উঠবে না কি? দামী ও রঙিন রাখীর নিচে ঢাকা পড়ে থাকা সুতোর মতোই, ক্রমশ আমরা হারিয়ে ফেলছি বন্ধনের ধারণা। যে বন্ধন সৌহার্দ্যের। (তথ্যসূত্র আনন্দবাজার পত্রিকার আর্কাইভ থেকে)।

 

ডঃ সুবীর মণ্ডল
লোকগবেষক, প্রাবন্ধিক, রম্যরচনা , ছোটগল্প এবং ভ্রমণকাহিনীর লেখক

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top