সিডনী শুক্রবার, ২২শে অক্টোবর ২০২১, ৬ই কার্তিক ১৪২৮

নয়ামোড় : দেবনাথ সুকান্ত


প্রকাশিত:
২০ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১৪:৪৮

আপডেট:
২২ অক্টোবর ২০২১ ০০:২১

 

প্রথম অধ্যায়
হসপিটালের বেডে বসে ভাবছিলাম, কত দিন হবে? পাঁচ ছয় বছর হতে পারে, বোধহয় ছয় হবে, পুরো ছয় না হলেও সাড়ে পাঁচ তো হয়ে গেছে নিশ্চয়ই।

হসপিটালের জানালায় থেকে চেনা পরিচিত সহরটাও কত নতুন, জল হাওয়া, জল হাওয়ার মানুষ গুলি, কত দূর দেখা যায়, GT রোড ছাড়িয়ে আরও দূর, মাঠের শেষ আকাশের শুরু পর্যন্ত। আরও একটি বিকেল, আমার জীবনের কত বছর পরে এলো। এমনই বিকেলের জন্য সারাটা দিন বসে থাকতাম এক সময়। সেই সব সন্ধ্যা আর এখনকার সন্ধ্যার মধ্যে অবশ্য বিশেষ তফাৎ নেই। মনখারাপের পালা যেন শেষ হতেই চায়না। রাত্রি আসে, অবসন্ন দেহটা চৌকিতে পড়ে যায়। এ সময় কেউ যদি আমার ঘরের টিউব লাইটটা অফ করে দিয়ে যেত, যে কেউ, যে কেউ হতেপারে, মনেহত তার জন্য জান দিতে পারি।

অনেক বেলায় ঘুম থেকে উঠে ঝিম ধরা মাথা নিয়ে আবার আরেকটি সন্ধ্যার জন্য। কেননা ভোর আর বিকেল এ দুটোই যে কোথাও নেই। অবশ্য এটির জন্যই ঘর ছেড়ে এত দূর এসেছিলাম।

দ্বিতীয় অধ্যায় 
"তুই ওকে পাবি না, এখানে বেশী দিন থাকাও তোর হবেনা,"
ঘুরে তাকিয়ে দেখি আরে এতো সেই সাধুবাবা না, পরেশনাথ থেকে ফেরার পথে মধুবনে ট্রেকারে চেপেছিল দেখেছি, কিন্তু ট্রেনে কখন উঠলো। আর আমার পাশেই বা কখন বসল এসে? আমার সঙ্গে হিন্দিতে কথা বলছে।
"কী দেখছিস আমার দিকে, বললাম তো ও মেয়েকে তোর পাওয়া হবেনা। আর রেলের চাকরিটাও তোর হবেনা। তোকে এ কোম্পানিতেই থাকতে হবে আরও কয়েক বছর।"
অবাক তাকিয়ে আছি, কে এই মানুষটি, কী ভাবে জানল এত সব।
"জানি, আমি জান, তোকে দেখে যে কেউ বলতে পারবে, যা পরেশান মুখ খানা করে ঘুরে বেড়াচ্ছিস, যা চাস তাকি তুই পাবি এ পরেশনাথ পাহাড়ে এ জৈন মন্দিরে।"
কি চাই, কেন চাই, যা চাই তা তুমিই বা কিকরে জানলে?
মুখে বললাম না অথচ প্রশ্ন গুলি চোখে করে বসে রইলাম, দেখি তুমি পড়তে পার কিনা। মৃদু হাঁসি ভেসে উঠলো মুখে, চোখের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো
" বললাম না যে কেউ বলতে পারবে তোকে দেখে। তোর চোখে লেখা আছে যে, ও সঙ্গীতা কে তুই পাবি না। সে নাম উচ্চারণ করল, যে নামে পুরো জগৎ আমার। ঝন করে উঠলো, শব্দটা যেন কানের ভিতর। ঠাকুর মন্দিরের বড় কর্তাল হঠাৎ বেজে উঠলে যেমন হয়। আর তার তরঙ্গ সারা শরীর অনুভব করছে। এক ঝলক মানুষটির দিকে তাকিয়ে ট্রেনের জানালার দিকে চোখ ফেরালাম, না: আর যেন বসে থাকা যাবেনা। কে এই মানুষটি, কেন এলো এ জায়গায়? জানে যদি সবতো, কিছু-কি ভাল নেই যা বলা যায়, সমস্ত খারাপ কি বলতে হবে? ওঃ কেন যে আজ বেরিয়ে ছিলাম, অন্য সকল রবিবারের মত অকর্মণ্য হয়ে ১০ টার সময় ঘুম থেকে উঠে T V দেখলেই বা কি ক্ষতি ছিল। কেন যে আসে রবিবার, নিঃসঙ্গ জীবন টাকে আরও নিঃসঙ্গ করে চলে যাওয়ার জন্য বোধহয়, আরও যোর করেই বোধহয় কানের কাছে বলে যায়, দেখ তোমার মত কেউ নেই আর এ সহর জুড়ে। সকলেরই মানুষ আছে কথা বলার, শুধু তোমার নেই। তুমি অনর্থক কল্পনা কর, সারারাত তুমি ভাবতে থাকো যত সব আজে বাজে কথা গুলি। আর এ সাধুবাবা যদি এ মুহূর্তে সবার সামনে সব বলে দেয়। ওঃ ইচ্ছে করছে ট্রেন থেকে নেমে চলে যাই বা উঠে গিয়ে অন্য কোথাও বসি। অথচ আমার চরিত্র বোধহয়, অখাদ্য কেও না বলতে পারিনা, যোর করে গিলে ফেলি, তা নাহলে এখানে পড়ে থাকতে যাব কেন? আর একটি কথা শোনারও ইচ্ছে আমার নেই, একটি বিরক্তি ভরা মুখ নিয়ে বসে রইলাম সামনে।
এ সমস্ত বিশ্বাস করা যতটা কঠিন অবিশ্বাস করাটা ঠিক ততটাই কঠিন হয়। না হলে না বলা অতীত কেউ কি ভাবে জানবে। একটি অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণ আর একটি অন্তর্নিহিত লোভ। "তবে" কি আছে কপালে?
কোনোদিন জানাবে কি, কী আছে যা পাইনি বা পাবো? জানিনা, জানা থাক বা না জানা থাক তবে হালকা লাগছে। খুব হালকা লাগছে শরীর, মন, সব। যেভাবে গিয়েছিলাম সেভাবে আর ফিরছি না। অন্য রকম যেন, পুরোপুরি অন্য এক মানুষ আমি। বোকারো স্টেশনে নেমে স্টেশনের বাইরে এসে দাঁড়িয়ে রয়েছি কিছুক্ষণ। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি শীতে সারাটা সহর যেন কুয়াশার চাদরে ঢেকে নিয়েছে নিজেকে। নিজের যা কিছু সম্পদ। দু একটি মানুষ এদিক ওদিক। অটোতে বসলাম, নয়া-মোড় পর্যন্ত যাব, তারপর co.operative কলোনির ফ্ল্যাটে। নয়া-মোড় যেন আমার জীবনের।
রাতটা কোনো রকম কাটল। সকাল হতে না হতেই আবার সেই ভাবনা।
- কিরে আজ এত খুশি খুশি
সকাল ১০ টায় ভাদুরিদার অফিস আসার সময়, সাড়ে ৯ টা যদিও অফিস খোলার সময় তবুও এটা ব্রাঞ্চ অফিস হেড অফিস কোলকাতায় তাই একটু এদিক ওদিক চলে। ভাদুরিদা sales manager আর আমি service people এ দুজনই মাত্র কোম্পানির employee এ অফিসে বাকি সব কনট্রাকটর লেবার।
প্রশ্নটি অপ্রত্যাশিত অন্তত ভাদুরিদার মুখ থেকে। তাই তাকালাম দু সেকেন্ড বললাম
- কই কিছু নাতো
কি আর বলবো, অন্য চাকরির চেষ্টা করছি সে কথা বলবো নিজেরই বস কে। আর আমার ব্যক্তিগত জীবন! কাজের বাইরে কোনও কথা কোনও দিন হয়নি ভাদুরিদার সাথে। নিজের কথা উনি বলেনও না আর অন্যের কথা শোনারও কোনও আগ্রহ কখনও দেখিনি। এমনই মানুষ কাজের বাইরের পৃথিবীতে অনধিকার আমার। আমিও তাই এত দিন জীবনের প্রিয় বিষয়গুলি কে গোপন রেখেছি গুপ্তধনের মত।
কারণ প্রেম তো শুধু প্রেম নয়, এমনই একটি শব্দ এমনই একটি বিষয় যা কখনো পুরনো হয়না, শুকিয়ে যায়না, আমাদের সাথে চলতেই থাকে। হ্যাঁ কয়েক বছর বাদে অন্য কোনও মেয়ের পাসে শুয়ে হয়তো ভাববো যাকিছু পেয়েছি তাকি এর চেয়েও বড় হতে পারে।
আজ বোকারো স্টিল ভিজিট ছিল, তাই বাইক নিয়ে ঘুরেছি সারাদিন, সারাদিন মনের মধ্যে এসবই চলেছে, কেন, কীভাবে, যদি মেনেও নি যা বলেছে সব সত্যি, তবে এই প্রেমের কী হবে? সেকি এভাবেই গতিহীন জীবনের চাকা ঘোরানোর শক্তি যোগাবে? যেভাবে এত দিন না হওয়া বস্তু গুলিকে সত্যি বলে মনে করে এসেছি।
কোম্পানির কাজে ভাদুরিদা রাঁচি যাবে আগামীকাল, তারই ডাক পেলাম। আগামীকাল আবার পাঠক-দার আসার কথা। পাঠক দা, ভাদুরিদারই সমবয়সী হবে বা হয়তো কয়েক বছরের ছোট, বেঁটেখাটো গোল গাল ফর্সা, ধানবাদে বাড়ি।
- কাল পাঠক আসবে বসিয়ে রাখবিনা, সবগুলি কাজ দেখা করাবি, আর বলবি যাওয়ার আগে যেন রিপোর্ট দিয়ে যায়।
- ঠিক আছে বলে দেব।
পাঠক দা এখানে আমার একমাত্র বন্ধু। পাঠকদার নাম শুনলেই মনটা খুশিতে ভরে ওঠে। এত সহজ সরল মানুষ পাঠক দা।
পাঠকদার কোনও কাজ কোনোদিন আটকায়না সে যেখানেই হোকনা কেন। পাঠকদাকে দেখলেই সবাই কাছে চলে আসে, পাঠকদা লেবারের পুরো গ্যাং নিয়ে যায় আর নিজেই কালো হয়ে ফেরে।

উচ্ছল হাঁসি কিন্তু কোনও শব্দ নেই, দুহাতের সেকল দিয়ে আমার গলা শক্ত করে বাঁধা কিন্তু কোনও বাঁধন নেই। আমার ঠোঁটের কাছে তার কপাল, মুখ নিচু, আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। এক ঝর্ণা যেন বহু উপর থেকে কোনও এক পাথরের উপর আছড়ে পড়তে চায়, পাথর ভেঙে যেতে চায়, পাথর গলে যেতে চায়, ভেসে যেতে চায়। তার সাথে তার চলার সাথে, মোহনার দিকে। কিন্তু পাথর পাথর হয়েই রয়ে গেল। আমার হাত আমার দুহাত, আমার বই, খাতা, আমার জামা কাপড়, গন্ধ, এত এত গন্ধ, কোথা থেকে এলো।
- তাকিয়ে থাকতে থাকতে বুড়ি হয়ে যাবি,
- তবুও তাকিয়ে থাকবো,
- পারবি কদিন, আরতো দুমাস, তারপর, চলে যাব, তখন করবি কি?
- কি করবো দেখতে পাবে।
- দেখবোই না অন্য দিকে তাকিয়ে থাকবো, কত কিছু আছে দেখার।
- হ্যাঁ, দেখো কে করেছে মানা, যত দেখবে তত ভুলবে।
- ভুলবো?
- ভুলতেই তো চাও, চাওনা?

- কি হে সুকান্ত কি ভাবছও বসে বসে,
পাঠক দা পাশে দাঁড়িয়ে বলে। বলা হয়নি যে ঘরে আমি থাকি তার একটি রুম কোম্পানির অফিস, আর ভিতরে আমার থাকার যায়গা, অফিসের কাজে কেউ আসলে আমার সাথেই থাকে। আমার সাথেই রেঁধে খায়।
- কিছু নাতো,
- কিছু না, তবে মুখে এত দুখু দুখু হাসি কেন।
- দুখু দুখু হাসি মানে ?
- মুখে হাসি চোখে জল মানেই কেশ জণ্ডিস আবার কি।
- কোনো কেশ জণ্ডিস নয়, রাত হল ঘুমাবে না।
- ঘুমালে তোমার ভাদুরি দার জন্য রিপোর্ট বানাবে কে ?
- ছাড় আমি বানিয়ে দেবো।
- ছাড়বো না বল কি ভাবছও।
- মৃত্যুহীন ডোর, শব্দহীন, মাত্রাহীন, বুঝলে পাঠক দা, কবে যে এভাবে হারিয়ে গেলাম বুঝতেই পারলাম না।

পাশ কাটালাম এভাবেই, পাশ কাটানোর কায়দায় বুকের কথা বুকেই থেকে গেল, জামাইবাবুর কলিগের মেয়ে ছিল। প্রাণ ছিল আমার, জীবন ছিল হাতের মুঠোয়।
একটি অন্ধকারে আমি দুহাত বাড়িয়ে হাতড়ে চলেছি কিছু, আমার বিশ্বাস কয়েক টুকরো স্মৃতির সাথে গুলে আছে হুইস্কিতে, বরফ যেভাবে গুলে যায়। আর নেমে যাচ্ছি আমি চোরা বালির ভিরত।


তৃতীয় অধ্যায়

বিশ্রামেরও একটা সীমা আছে, অকর্মণ্য বসে থাকাও একদিন বিরক্তিকর হয়ে যায়, বাইরের মানুষের সাথে বাইরের জগতের সাথে কোনোরকম যোগাযোগ ছাড়া ঠায় একটা বিছানার উপর আর কত দিন পারা যায়? প্রথম চার দিন তো একেবারে বেহুঁশ ছিলাম ICU তে, তারপর জ্ঞান এলো, মনে হল যাক এখনও আছি ধরাতে, তারপর ডাক্তার, ওষুধ, টাইমে টাইমে খাওয়া, যোর করে ঘুম, এভাবেও কাটল আরও দুচার দিন, কিন্তু তারপর। একমাত্র চারটে থেকে ছটা visiting hours বাকি সময় টুকু। সে যে কোনও রেহাই দেয়না। সে যে সকাল সন্ধ্যা রাত্রি কোনও জ্ঞান নেই, চলে আসে, আর এই ভুলে ভরা মস্তিষ্ক। প্রতি মুহূর্তে ভাবতে থাকে, সে আসবে কি, যদি আসে, সেকি আমার খবর পেয়েছে। পেয়েছে নিশ্চয়ই, এত বড় খবর সে পেলা না, এ হয় না, অথচ জেনেও এলনা সে।
ভাদুরিদা এসে দেখে গেছে। পাঠক-দা ও ফোন করেছিল অনেক বার। কাজের চাপে আসতে পারেনি। কোম্পানির এখানকার বস এসেছিলেন, group medical insurance থেকে পয়সা পাওয়া যাবে বলে গেছেন। আমার নিজেরও insurance আছে।
শেষ হল হসপিটালের পালা। নবমীর রাতে বাইক এক্সিডেন্ট করে head injury নিয়ে ভরতি হয়েছিলাম, মহকুমা হাসপাতাল থেকে এই বিবেকানন্দ হাসপাতালে আজকাল যাকে বলে super speciality hospital.

শেষ

এক মাস ঘরেই কাটল। তারপর আবার ফোন আসা শুরু, কবে join করতে চাই, কবে join করতে চাই।
এদিক ওদিক করে আরও ১০ দিন কোনও রকম পেরোলো। তারপর অনিচ্ছা সত্ত্বেও join করলাম দুর্গাপুর ব্রাঞ্চ অফিসে। ভেবেছিলাম আমার নিজের জায়গা তো আর নয়, তাই কতটুকু আর কাজ হবে এই যাব আর আসবো। কিন্তু গিয়ে দেখি ব্যাপার পুরো উল্টো। এবং আমার পক্ষে আরও খারাপ। ভাদুরিদার সঙ্গে কথা বললাম। বলল চলে আয়। পরের বিকেলেই হাওড়া রাঁচি ইন্টার সিটি ধরলাম দুর্গাপুর থেকে, রাত ৮ টার মধ্যে আশা করি পৌঁছে যাব। ট্রেনের সফর তো অনেক করেছি কিন্তু এ সফরটা সম্ভবত স্মরণীয় হয়ে থাকার জন্যই শুরু হয়ে ছিল।

আসানসোল, ফাঁকা ট্রেনে এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসেছিলাম আমরা কয়েক জন। আসানসোলে তাও কিছু লোক উঠলো। সিটের থেকে পা নামিয়ে বসতেই হল। ছুটে এসে সামনের সিটে জায়গা রাখলো কেউ, একটা নয় অনেকগুলি। দৌড়াদৌড়ি, ছুটোছুটি, ব্যাগ, রুমাল, যা পেল সামনে তাই দিয়ে জায়গা রাখছে, সঙ্গীতার ছোট বোন সঙ্গে তার বাবা মা ভাই আর সবার পিছনে সে।
সামনে এসে একবার হোঁচট খেল, বোনের আড়ালে লুকোতে চাইল নিজেকে, বোন তো আমাকে দেখে তিন হাত লাফিয়ে উঠেছে। আরে মামা তুমি এখানে। কোথায় যাচ্ছি কেন, কখন, আরও, আরও, আরও। তার বাবার সাথে কথা হল তার মায়ের সাথে, অনেক অনেক কথা, ঘরের কথা বাইরের কথা, চাকরির কথা দেশের কথা, অপ্রয়োজনীয় অবান্তর কথা। বোনের হাঁসি, ঠাট্টা, রাগ, কেন আর আসি না?
এক স্বর্গ আর তার খোঁজ, অন্তহীন জীবন ভর। আরও আরও আরও ভাল কিছু, ভাল যা পাইনি। ব্যথার কোনও দাম, ব্যথার কোনও মূল্য, একটু বেশী মোটা লাগছে কি তাকে, একটু যেন অন্যরকম।
- এর পরের বার আসলে, আমি তোকে আর যেতে দেব না।
- যাব কেন আমার বাড়ি।
- তোর বাড়ি, প্রমাণ দে।
- সময় আসুক, প্রমাণ পাবে।
সময়, তোমার জন্য, তোমার দিকে তাকিয়ে অন্ধকার হাতড়ে চলেছে কেউ। ৬ বছর তো পেরিয়ে দেখা হল। ৬ বছর হয়ে গেছে।
- ঝুটা!
- কে?
- তুমি
- কেন?

কোনও কথা নেই, শুধু জানালা দিয়ে ধু ধু দুপুরের দিকে তাকিয়ে থাকা, ফের তাকানো আমার দিকে, ফের জানালা।
- ঝুটা,
এ ঘর ছেড়ে সে চলে গিয়েছে, আমাকে মিথ্যুক করে দিয়ে।
মিথ্যা এ পথ, মিথ্যা ট্রেন, কোথায় চলেছি কেজানে। একে একে সবার সঙ্গে কথা হল, বোন বাবা মা ভাই, তারপর, একেবারে পিছনে দাঁড়িয়ে ছিল, মুখ বাড়িয়ে বললাম - কিরে কেমন আছিস। এগিয়ে আসতে বাধ্য হল। ন্যাড়া মাথায় তখন সামান্য চুলের গোঁড়া বেরিয়েছে, টুপি পরেছিলাম। নিজে হাতে টুপিটা খুলে নিলো। একবার দেখল অপারেশনের জায়গাটুকু, আবার টুপি পরিয়ে দিল।
কিছুক্ষণ একেবারে নিস্তব্ধ, তারপর চোখ তুলে তাকাল, বলল - তোমার গোঁফ গুলো সাদা হয়ে গেল।
বললাম - কারণ, তুই অনেক মোটা গয়ে গেলি।
হাসল বলল - এত তাড়াতাড়ি কেন join করছো, আরও কিছুদিন কেন ঘরে থাকলে না বা দুর্গাপুর অফিসে।
- ওখানেই আমার সুবিধে বেশী।
- একা থাকা, রেঁধে খাওয়া এসব সুবিধে।
- হ্যাঁ, এসব সুবিধে।
আমার সামনে জায়গা রেখেছিল, কিন্তু বসলো না কেউ এগিয়ে গিয়েছে সকলে। আর দুরে দাঁড়িয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
সে আমার দিকে তাকাল, বলল - হাত বাড়াও,
- কী আছে?
দেখি ব্যগের ভিতর থেকে একটি ছোট করে ভাঁজ করা ১০০ টাকার নোট বার করল, সম্ভবত অনেক দিনের রাখা, আমার হাতে দিয়ে বলল - মেরি প্যাহলী কামাই।
আর দাঁড়াল না এগিয়ে গেল। আমি অর্থ হীন ভালবাসার শব্দগুলির মত টাকা হাতে করে দাঁড়িয়ে রইলাম। টিউশনি করছে, নাকি কোনও হাতের কাজ, নাকি কোনও চাকরি পেল?
আগে থেকে কি লেখা ছিল এসব আসবে একদিন, জীবন থেকে পালিয়ে যেতে, ট্রেন থেকে ঝাঁপিয়ে পড়তে ইচ্ছা করবে। সেই লোকটা কোথায় গেল, সেই পরেশনাথের হিন্দু যোগী, যে বলেছিল পাবেনা কিছু, সেদিন ট্রেন থেকে নামার সময় পকেটে হাত দিয়ে বলেছিলাম - কিছু দেবো বাবা? সে বলেছিল - আমাকে একটু খেতে দিলই হবে।

 

দেবনাথ সুকান্ত



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top