সিডনী বৃহঃস্পতিবার, ২১শে অক্টোবর ২০২১, ৬ই কার্তিক ১৪২৮

ভালো আছো, ম্যাকলাস্কিগঞ্জ! (প্রথম পর্ব) : ড. গৌতম সরকার


প্রকাশিত:
৭ অক্টোবর ২০২১ ২০:০৮

আপডেট:
২১ অক্টোবর ২০২১ ২২:৫৪

 

আজ ভোরে ফিরলাম ম্যাকলাস্কি থেকে৷ আবার একবার ভালবাসা ও ভাললাগার ঝুড়ি উপচে উঠল৷ অদ্ভুত একটা মাদকতা, যেটা পঁচিশ বছর পরও একইভাবে এই প্রৌঢ়কে পাগল করে দিয়েছে৷ যদিও এখন পলাশ, শিমুলের তুফানি রং আকাশের বুকে আগুন ধরাচ্ছে না, মহুয়ার মাতালগন্ধ সমস্ত চরাচরকে নেশাতুর করে তুলছেনা, তবে দেখলাম বর্ষণস্নাত, তন্বী, যৌবনে উচ্ছল ম্যাকলাস্কিকে৷ চারদিকে সবুজের সমারোহ, লালমাটির রাঙা পথের নিশিডাক আপনাকে নিয়ে যেতে চাইবে অচেনা আদিবাসী গ্রামের ঠিকানায়, যেখানে মানুষ সভ্য জগতের ভোগসর্বস্ব জীবনধারার পরোয়া না করে বেঁচে আছে প্রকৃতির ধরিত্রীপুত্র-কন্যা হয়ে৷ তারা অভাব কাকে বলে  জানেনা কারণ প্রাচুর্যের সংস্পর্শে তারা কখনও আসেনি৷ দিন কাটে ঘরের কাজ, গবাদি পশুপালন আর কখনও কখনও কোলিয়ারিতে ঠিকে মজুরের কাজ করে৷ পুরুষদের দিন শুরু হয় মহুয়ার বোতলে চুমুক মেরে৷ সবুজ বন, লালমাটির পথ আর দুরে গাঢ় নীল রঙের ছোট বড় টিলাপাহাড় যেন শিল্পীর হাতে আঁকা নিসর্গচিত্র৷  ম্যাকলাস্কির ঐতিহ্য ধরে রেখেছে ১৮-২০টি অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান পরিবার যাদের অবস্থাগতিকে দেশীয়দের মতো জীবনযাপন করতে হয় কিন্তু ধমনীতে সাহেবি রক্ত বয়ে যাওয়া নিয়ে সতর্ক, কেউ কেউ একটু বেশি রকমই সতর্ক৷

ম্যাকলাস্কিতে এই মুহূর্তে থাকার একটাই জায়গা –গর্ডন হাউস৷ শুনলাম একটা গেস্টহাউস তৈরি হচ্ছে কিন্তু সেটার হালহকিকত স্থানীয় লোকেরাও সঠিক ভাবে জানেনা৷ তাই ওখানে গেলে পড়তে হবে ববি গর্ডনের খপ্পরে৷ ভদ্রলোক প্রচন্ড চালাক, বুকিংয়ের সময় আপনাকে অনেক প্রতিশ্রুতি দেবেন, কিন্তু সেগুলো রাখবেন কিনা সেটা ওনার ব্যাপার৷ কিছু বলতে গেলে বা প্রতিশ্রতির কথা মনে করিয়ে দিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করলে উনি বলে উঠবেন " তমিজ সে বাত কিজিয়ে! হাম সব পাহাড়ি আদমি আছি, দিমাক থোড়া গরম হোতা হ্যায়৷ সব ছেড়েছুড়ে চলে যাবো তখন বুঝবে মজা৷” আমরা তো শুনে ত থ…এভাবে যে কোনো হোটেল মালিক কথা বলতে পারেন ধারণা ছিলনা৷ আসলে মি.গর্ডন মানসিকতায় সেই ১৯৩৫ সালে আটকে রয়েছেন৷ ওনার ধারণা ওনার পূর্বপুরুষরা এখনও ভারতবর্ষ শাসন করছে৷ শিক্ষা আর কৃষ্টির অভাবে আজ তাঁকে হোটেল ব্যবসায় নামতে হয়েছে, কিন্তু নিজের রক্ত ও কৌলিন্যের কথা কখনও বিস্মৃত হননা৷ তিনি একথা জানেন যে বোর্ডারদের ফাইফরমাশ খাটবে চাকর-বাকররা মালিক নয়, কিন্তু খরচ বাঁচাতে সব চাকরদের ছুটি দিয়ে দিয়েছেন৷ ওনার রিসর্টে প্রতিটি ঘরে একটা করে ডাবল-শেয়ারিং খাট আছে কিন্তু এছাড়া আর কোনো আসবাবের আশা করবেন না৷ একতলা এবং দোতলার ঘরের কোয়ালিটিতে অনেক তফাত, আর উনি সব পার্টিকেই দোতলায় রুম দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন, আমাদেরও দিয়েছিলেন৷ রিসর্টের প্রতিটি তলায় চারটে করে ঘর আছে, অথচ উনি বুকিংয়ের সময় জানিয়েছিলেন আমাদের দোতলাতে পাঁচটা ঘর বুকিং হয়েছে৷ এখানে আসার পর জুটল ওপরে একটা আর নিচে চারটে ঘর৷ ভাবুন অবস্হাটা! কোনো ঘরে নয় বছরের বেশি বয়সি বাচ্ছা থাকলে ৩০০ টাকা এক্সট্রা চার্জ করছেন, কিন্তু তার জন্য কোনো অতিরিক্ত দ্রব্য বা সেবা (এমনকি একটা অতিরিক্ত বালিশ) উনি কিন্তু দেবেন না৷ শক্তিপুঞ্জ এক্সপ্রেস হাওড়া ছেড়ে ম্যাকলাস্কিগঞ্জে পৌঁছনোর সময় রাত এগারোটা সাড়ে এগারোটায়, কখনও কখনও বারোটা৷ ওই সময় স্টেশনে কোনো অটো বা ট্রেকার থাকেনা৷ সেই সুযোগ নিয়ে উনি আধা, পৌনে এক কিলোমিটার যাত্রার জন্য গাড়ি প্রতি পাঁচশো টাকা ভাড়া ধার্য্য করেন (২০১৫ সালে)৷ শুধু তাই নয়, খাবারদাবারের মানও খুব খারাপ কিন্তু দাম অনেক৷ আসলে আর কোনো থাকার ব্যবস্হার অভাবে উনি সেইসময়ে এলাকায় মনোপলি ব্যবসা চালাচ্ছিলেন।

ছবিঃ লাতেহারের পথ

যাইহোক এই সব পড়ে কেউ যদি ভাবেন বেড়াতে গেলে এগুলো নিয়ে ভাবলে চলেনা তাদের জন্য বলি আপনাদের কিন্তু আরেকটা পরীক্ষা দিতে হবে, সেটা হল- লোডশেডিংয়ে নিজেদের স্হিত রাখা৷ লোডশেডিং চলবে সারাদিন সারারাত ধরে৷ মি. গর্ডন প্রমিস করা সত্বেও জেনারেটর চালাবেন না৷ শুধু দয়া করে জলটা তুলে দেবেন৷ আমি বলতে চাই এরকম পরিস্হিতিতে মহিলা এবং বাচ্ছা নিয়ে ম্যাকলাস্কি ভ্রমণ বেশ কষ্টকর মনে হয়েছিল৷ কিন্তু এতসবের পর ও আমার বিশ্বাস বাঙ্গালী ট্যুরিষ্ট এসবের পরোয়া করেনা, তারা এসব বেড়াতে যাওয়ার অঙ্গ হিসাবে মনে করে৷ তাই বন্ধু আমি ভালো-মন্দ সবটাই বললাম, এখন আপনারা ঠিক করুন যাবেন কি যাবেন না৷ আমার কথা বলতে পারি, আমাকে কিন্তু ম্যাকলাস্কি আরও বেশ কয়েকবার মাতাবেই মাতাবে৷

প্রায় দেড় ঘন্টা লেট করে শক্তিপুঞ্জ এক্সপ্রেস যখন ম্যাকলাস্কিগঞ্জ পৌঁছল তখন রাত ১২: ২0৷ আগের দুটো স্টেশন থেকেই লক্ষ্য করছি আমাদের বগিটি প্লাটফর্ম পাচ্ছে না, তার ওপর প্লাটফর্ম গুলো নিচু, সিঁড়ি দিয়ে নামতে হবে৷ চিন্তা শুরু হলো…. এতগুলো লোক, সঙ্গে বাচ্ছা আছে৷ তারপর এত লটবহর নিয়ে নামব কি করে ! গোটা প্লাটফর্মে কোনো আলো নেই, ঘুটঘুটে অন্ধকার৷ নামার আগে আবার একটি বাচ্ছার শরীর খারাপ হয়ে বমি হতে শুরু হল৷ স্টেশনে গাড়ি থামে মাত্র দুই মিনিট৷ যাই হোক তার মধ্যে সমস্ত কিছু সামলে সবাই মিলে যেখানে নামলাম সেটা রেললাইনের ওপর পাথরে ভরা ঢালু একটা জায়গা, পিছনে খাদ আর সামনে দৈত্যাকার ট্রেন একহাত ব্যবধানে গতি বাড়িয়ে চলতে শুরু করল৷ আমরা নিজেদের, বাচ্ছা, লটবহর সামলে প্রায় প্রাণ হাতে নিয়ে অপেক্ষা করছি কখন ট্রেনটির শেষ কামরা আমাদের পেরিয়ে যায়৷ দূরে দেখি আরেকটি পর্যটক দলের একই অবস্থা, অন্ধকারের মধ্যে সবাই জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে প্রহর গুনছে৷ সবে মাত্র ট্রেনটি বেরিয়েছে, জিনিসপত্র নিয়ে লাইনের ওপর দিয়ে কয়েক পা এগিয়ে একটু সমতল মতো পেয়েছি, ট্রেনটির পিছনের আলো এখনও দেখা যাচ্ছে, ঠিক তখনই সমস্ত অন্তরাত্মা কাঁপিয়ে দিয়ে আমার খেয়াল হল ফোনটা ট্রেনে ফেলে এসেছি, চার্জে বসিয়েছিলাম, টেনশন আর তাড়াহুড়োয় নিতে ভুলে গেছি৷

হা-হুতাশ, শাপ-শাপান্ত (রেলওয়ে অথরিটিকে) আর দায়-অদায় নিয়ে কাটাছেঁড়া করতে করতে এগিয়ে যাই, দূরে আধো আলো আধো অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে মিস্টার গর্ডন, আমাদের আগামী তিনদিনের কান্ডারী৷ তিনিও শুনলেন আমার চূড়ান্ত ক্যাবলামির কথা৷ পিছনের দলও তখন এসে পড়েছে, গর্ডনকে সবাইকে হোটেলে পৌঁছতে হবে তাই ইচ্ছে থাকলেও আমাদের হা-হুতাশে উনি বেশিক্ষণ যোগ দিতে পারলেন না৷  আমার মনের অবস্থা বুঝতেই পারছেন, বেড়ানোর শুরুতেই এরকম একটা বুরবাকের মতো কাজ, তার ওপর বউ সঙ্গে আসেনি, তাই বাড়ি ফিরে আমার কপালে কি আছে ভেবেই চলেছি মেজাজ খিঁচড়ে রয়েছে, মোবাইল বিনা নিজেকে "মণি হারা ফণী" মনে হচ্ছে৷ তাই মনখারাপ নিয়ে প্রথম শিফটেই গর্ডন হাউস পৌঁছে গেলাম৷

  গর্ডন সবাইকে রওয়ানা করে তবেই আসবেন, তাই হোটেলে পৌঁছে বন্ধ ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে আরেক দফা হাহুতাশ শুরু হল, বন্ধুরা আমার ফোনে কল করছে৷ রিং হয়ে যাচ্ছে কিন্তু কেউ ওঠাচ্ছে না৷ সেটাই স্বাভাবিক, এই রাতে সবাই ঘুমোচ্ছে, আর যেখানে মোবাইল তখনও মনের আনন্দে চার্জ খাচ্ছে সেখানে যে ভদ্রমহিলা ঘুমাচ্ছেন তিনি জানেবেন না ওটা আমাদের মোবাইল৷ কারণ ওটা যখন চার্জে লাগানো হয় তখন উনি ঘুমিয়ে পড়েছেন৷

ছবিঃ টিলা পাহাড়ের ঝাড়খন্ড

ইতিমধ্যে অন্যদলটি এসে পৌঁছল, ওই দলের এক ভদ্রলোক আমাদের সব কথা শুনে বললেন, "আপনারা তো একটা ভুল করলেন, নেমেই স্টেশনমাস্টারকে জানালে উনি পরের স্টেশনে ফোন করে দিতেন, ওখানকার স্টেশন মাস্টার ফোনটা নামিয়ে নিতেন৷" আমরা সবাই এই কথা শুনে চৈতন্যে ফিরলাম৷ ছিঃ ছিঃ, এতক্ষণ একথাটা আমাদের কারোর মাথায় আসেনি৷ আসলে আমাদের অবস্থা তখন সেই গরু হারানো মানুষটির মতো৷ সেই একটা গল্প আছে না, 'একটি লোকের গরু হারিয়েছে, খুব পাজল হয়ে উল্টোপাল্টা করছে, ভুলভাল বকছে৷ এটা দেখে তার স্ত্রী বলল –এ কি তুমি এসব কি পাগলের মতো বলছ? তখন সেই ব্যক্তি নিজের স্ত্রীকে বললেন, "গরু হারালে এরকমই হয় মা"৷ আমাদেরও অবস্থা একদম ওই লোকটির মতো হয়ে গিয়েছিল৷ তবে সময় আছে, এখনও কিছু করা যেতে পারে৷ স্টেশন এমন কিছু দূরে নয়, হেঁটে ৭-৮ মিনিট হবে৷ আমি আর রাজা স্টেশন যাওয়া মনস্থ করলাম৷ এমন সময় তৃতীয়বার গাড়ি ফিরল বাকিদের নিয়ে এবং তার সাথে গর্ডনজি৷ ওনাকে বলতে এককথায় আমাদের দুজনকে বাইকে চড়িয়ে স্টেশন নিয়ে গেলেন৷ তবে আমাদের নামিয়ে হোটেলে ফিরতে দিয়ে উনি চলে আসবেন ( কারণ আমার কল্যাণে সবাই বাইরে দাঁড়িয়ে, কাউকেই উনি ঘর দিতে পারেননি ), তবে আশ্বস্ত করলেন কাজ মিটে গেলে আবার উনি আমাদের নিতে আসবেন৷ শুরু থেকে টিপ টিপ করে পড়লেও ততক্ষণ বেশ জোরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে৷ আমি এখানে ভীষণ ভাবে কৃতজ্ঞ গর্ডনজির কাছে, পরে উনি যাই করুন না কেন, এত রাতে বৃষ্টির মধ্যে দু দুবার আমাদের নিয়ে যাওয়া নিয়ে আসা৷ সত্যি আমি চিরকাল ওনার এই হেল্প মনে রাখব৷

ছবিঃ ম্যাকল্যস্কি গঞ্জ স্টেশন

স্টেশনমাস্টারের কাছে যখন পৌঁছলাম তখন উনি বেরিয়ে যাচ্ছেন, আমাদের কথা শুনে আবার উনি ভিতরে ঢুকে আমাদের ডেকে নিলেন, বসতে বললেন (এটাও উল্লেখযোগ্য, আমাদের এখানে এটা ভাবাই যায় না!)৷ ফোন করে জানলেন ট্রেন পরের স্টেশন (টোরি) ছেড়ে গেছে; উনি তার পরের স্টেশনে (লাতেহার) ফোন করে দিলেন, কপালে থাকলে পাওয়া যাবে তবে অপেক্ষা করতে হবে, কারণ ট্রেন লাতেহার পৌঁছনোর পর রেলের লোক নির্দিষ্ট কামরায় গিয়ে দেখবে৷  পাওয়া যাক বা না যাক সেটা জানতে ততক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে৷ ইতিমধ্যে বৃষ্টিতে আপাদমস্তক ভিজে গর্ডনজি এসে পৌঁছেছেন৷ আমার তো খুব খারাপ লাগছে, বার বার স্যরি বলছি,ততবার উনি আমাকে আশ্বস্ত করছেন৷ ততক্ষণ আমরা জেনে গেছি উনি বাচ্ছাদের একটা হস্টেল চালান, ভোর সাড়ে চারটেয় উঠে ব্রেকফাস্ট বানান, বাচ্ছারা ছটার সময় স্কুলবাস ধরে৷ সুতরাং বুঝতেই পারছেন এসব শুনে আমার অপরাধবোধ শতগুণ বেড়ে যাচ্ছে৷ প্রতীক্ষা পর্ব চলল, প্রায় এক ঘন্টা পর সবাইকে চমকে দিয়ে যে ফোনটা এলো তাতে সবার ক্লান্ত, নিদ্রাক্লিষ্ট মুখে চওড়া হাসি দেখা দিল, এমনকি রেলের উপস্থিত কর্মচারিদের মুখেও৷ আমাকে পরের দিন সকালে লাতেহার গিয়ে ফোন কালেক্ট করতে হবে৷ এখানকার রেল কর্মচারীরা যেভাবে হাঁসি মুখে আমাদের সাহায্য করলেন সেই অভিজ্ঞতা সত্যিই আমার সারাজীবনের সঞ্চয় হয়ে থাকবে৷

মোবাইল পর্ব সেরে হোটেলে ফিরলাম তখন রাত দুটো৷ লোডশেডিং চলছে, সবাই জেগে৷ ঘরে ঢুকে বেরিয়ে এলাম, অসম্ভব দুর্গন্ধ৷ বর্ষায় বহুদিন বিছানাপত্র রোদে না দিলে যে দুর্গন্ধ হয় সেই গন্ধ গোটা ঘরকে ভরপুর করে রেখেছে, নিঃশ্বাস নিতে অসুবিধা হচ্ছে৷ মশার উপদ্রবে জানলা দরজাও খোলা যাচ্ছে না৷ তাই ঘরে থাকার থেকে বাইরে থাকাই শ্রেয় মনে হল৷ আলোচনা শুরু হল লাতেহার অভিযান নিয়ে৷ গর্ডন দুটো অপশন দিয়েছে - সকাল পাঁচটার ট্রেন ধরে গিয়ে নটার ট্রেন ধরে ফিরে আসা বা এগারোটার ট্রেন ধরে গিয়ে দুপুর দুটোর ট্রেনে ফেরা৷ প্রথমটা সম্ভব নয় কারণ তাহলে আবার দু ঘণ্টার মধ্যে বেরোতে হবে আর দ্বিতীয়টায় সারাদিন কেটে যাবে যেতে আর আসতে৷ তাহলে এখানে বেড়াবো কখন? অবশেষে ঠিক হল সবাই যাবনা, একটা ছোট গাড়ি ভাড়া করে আমরা চারজন যাবো৷ গর্ডনজির কাছে আগেই খোঁজ নিয়েছিলাম গাড়ি ভাড়া মোটামুটি ১৫০০-১৬০০ টাকা পড়বে৷

বাকি রাতে এক ফোঁটা ঘুম হলনা৷ একদিকে মশার কামড়, অন্যদিকে বিছানা, বালিশ, কম্বল থেকে বেরোনো বিজাতীয় গন্ধ - বাধ্য হয়ে জানলা খুলে দিলাম৷ কিছুক্ষনের মধ্যে পিলপিলিয়ে মশা ঢুকতে শুরু করল; আর পারা গেলনা, আলো জ্বালিয়ে আমি আর সন্দীপ দুজনে মিলে বিছানায় বসে রইলাম৷ ঘরে না আছে কোনো মশারি না কোনো মশা তাড়ানোর ধুপ! সকাল সাড়ে আটটা নাগাদ একটা অল্টো করে মোবাইল উদ্ধার অভিযানে বেরোলাম আমি, সন্দীপ, শর্মিলা আর প্রবীর৷ ছোট্ট শহরটাকে কয়েক মুহূর্তে ছাড়িয়ে বেরিয়ে আসতেই অপূর্ব প্রকৃতি তার সমস্ত সম্ভার নিয়ে আমাদের অভ্যর্থনা জানাল৷ সবুজ জঙ্গল, লাল পাথরের পাহাড় আর ছোট ছোট নদীর বুক চিরে চলে গেছে নিকষ কালো মাখনের মতো রাস্তা৷ গাড়ির গতি বাড়তে শুরু করল, সেই গতির সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়তে লাগলো প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য৷ রাস্তা কখনো কখনো ক্রমাগত ডানদিক বামদিক ঘুরতে ঘুরতে চলেছে, কখনোবা ষোড়শী চঞ্চলা তরুণীর মতো নাচতে নাচতে চড়াই উতরাই পেরিয়ে কুমিরডাঙ্গা খেলতে খেলতে এগোচ্ছে৷ দূরে নীল পাহাড়ের হাতছানি; রাস্তার দুপাশের জমিতে ধান গাছের চারারা হাওয়ার সাথে খুনসুটি জুড়েছে, গমা গাছের বড় বড় ডালগুলি এ ওর গায়ে লুটিয়ে পড়ছে; অদ্ভুত সুন্দর সকাল চারদিকে, তার মধ্যে দিয়ে আমরা এগিয়ে চললাম৷  মাঝে মাঝে একেকটা আদিবাসী গ্রাম আসছে, প্রাতঃকালীন তত্পরতায় তারা দৈনন্দিন জীবনযাত্রায়

সামিল৷ মহিলারা বাড়ীর কাজে ব্যস্ত, পুরুষরা লাঙ্গল বলদ নিয়ে ইতিমধ্যেই জমিতে কাজ শুরু করে দিয়েছে, ছোট ছোট বাচ্ছারা কেউ কেউ স্কুলে যাচ্ছে, কেউ কেউ আবার হাতে পাঁচনবারি নিয়ে শুয়োর তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে; আবার কোথাও কোথাও কোনো এক বৃদ্ধ দড়ির খাটিয়ায় বসে মহুয়ার মৌতাত উপভোগ করছে৷ এই সব দেখতে দেখতে অনেকটা রাস্তা পেরিয়ে এলাম, থামলাম একটা গঞ্জ মতো জায়গায় চা ও জলখাবারের আশায়৷ এখানে জলখাবার মানে কি জানেন তো ? --সামোসা, জিলিপি, আর শুকনো মালপোয়া৷ তাই সই! এরপর এক কাপ ঘন দুধ আর অল্প চিনি মেশানো লাজবাব চা খেয়ে গাড়িতে গিয়ে উঠলাম৷ এখনো ৩০-৩৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে বাকি৷

ছবিঃ জংগল, পাহাড় তরাইয়ের সমন্বয় ভূমি

আবার পথ চলা শুরু হল, এবার ঘন ঘন বসতি আসতে লাগলো, আর দূরের পাহাড়গুলো অনেক কাছে চলে এল৷ মাঝে মাঝে দেখতে পাচ্ছি দিগন্ত ছুঁয়ে কালো ধোঁয়া উড়িয়ে মালগাড়ি চলে যাচ্ছে, হটাৎ হটাৎ করে নাম না জানা কোনো পাখি চমকে দিয়ে গাড়ির ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে৷ এভাবেই দেখতে দেখতে দূরে চোখে পড়ল লাতেহার শহর; দূর থেকে ছবির মতো লাগছে, আড়ে বহরে ম্যাকলাস্কিগঞ্জের চেয়ে অনেক বড় শহর৷  

আবার এক প্রস্থ আবাক হবার পালা৷ ভেবেছিলাম না জানি কি কি ডকুমেন্ট দেখাতে হবে; কত কি প্রশ্নের জবাব দিতে হবে৷ রাত্রের স্টেশন মাস্টার তো থাকবেন না, নতুনজনকে আবার সব ঘটনা নতুন করে বলতে হবে; কত সময় বসে থাকতে হবে; ইত্যাদি ইত্যাদি৷ স্টেশনমাস্টার মশাইয়ের ঘরে ঢুকে দেখি হাসি হাসি মুখে বসে আছেন ৩০-৩২ বছর বয়সের এক ঝকঝকে যুবক৷ প্রথমেই আমাদের সামনের চেয়ারে বসতে বললেন, তারপর মন দিয়ে আমাদের আসার উদ্দেশ্য শুনলেন, ফোনে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিলেন, তারপর আমাদের সাথে গল্প করতে শুরু করে দিলেন৷ আমাদের নাম, কোথা থেকে এসেছি, কেন এসেছি, কোথায় উঠেছি, ইত্যাদি৷

খুব ভালো লাগলো ওনার সঙ্গে কথা বলে, কিছুক্ষন পর একজন এলেন আমার ফোন আর চার্জারটা নিয়ে (চার্জারটা আবার যত্নের সাথে ভাঁজ করে রাবার ব্যান্ড দিয়ে আটকানো)৷ আমরা তো অভিভূত, ধন্যবাদ জানানোর ভাষাও যেন হারিয়ে ফেলেছি৷ তাই কম্পালসারি স্টেটমেন্টে যতটুকু সম্ভব লিখলাম৷ স্টেশনমাস্টার মশাইকে আরেকবার ধন্যবাদ জানিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম৷

লাতেহার স্টেশনটাও খুব সুন্দর৷ দুদিকে পাহাড় ঘেরা ছোট্ট, নির্জন, ছিমছাম একটা স্টেশন, চুপচাপ বসেই কেটে যাবে দিনের অনেকটা সময়৷ ফেরার পথে খুব ভালোলাগা জায়গাগুলোতে নেমে ছবি তোলা হল, হাসি, আড্ডা, কলবল করতে করতে ফেরার পথটা যেন হঠাৎ করে শেষ হয়ে গেল৷ বাকিরা হোটেলে ফিরে গেল আর আমি নেমে গেলাম ম্যাকলাস্কিগঞ্জ স্টেশনের মুখটায়৷ এই গোলমালে আমার তরুন বয়সের প্রেমিকাকেই তো চোখ ভোরে দেখা হয়ে ওঠেনি; আর সেটা দেখতে চাই নিরালায়, নির্জনে, ........একা৷

                                                    (ক্রমশ…….)

 

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top