সিডনী মঙ্গলবার, ১৮ই জানুয়ারী ২০২২, ৪ঠা মাঘ ১৪২৮

স্বপ্নে ভেজা সুইজারল্যান্ড : ডঃ গৌতম সরকার


প্রকাশিত:
১২ জানুয়ারী ২০২২ ১৪:৩২

আপডেট:
১২ জানুয়ারী ২০২২ ১৫:২০

 

যেকোনো ভ্রমণ প্রিয় মানুষের স্বপ্নের ভ্রমণ হল সুইজারল্যান্ড। পাহাড়, লেক, আর দিগন্ত-বিস্তৃত সবুজ, সুন্দর, চোখজুড়ানো শান্ত- সমাহিত প্রকৃতি ছবির বই আর সিনেমার পর্দা থেকে উঠে এসে যখন চর্মচক্ষে প্রতীয়মান হয় তখন নিজেকে রূপকথার এক চরিত্র বলে মনে হয়। সুইজারল্যান্ড ভ্রমণ সাধারণতঃ হ্রদের শহর জুরিখ দিয়েই শুরু হয়। ভ্রমণপর্বের প্রথমে দুয়েকটা দিন এখানে থেকে দেখে নেওয়া যায় জুরিখ হ্রদ এবং তার দুপারে জনজীবনের বিস্তার। এরপর আছে বাহানফস্ট্রাসে শপিং স্ট্রিট, ফ্রাউমুনস্টার চার্চ, গ্রসমুনস্টার চার্চ, সেন্ট পিটার্স চার্চ ইত্যাদি। শহরের এক প্রান্তে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে ৮৭১ মিটার উঁচু পাহারটিলা উয়েটলিবার্গ। ওপর থেকে লেক এবং শহরের দৃশ্য অতি সুন্দর।

এরপর জুরিখ থেকে লুসার্ন হয়ে চলুন আল্পস পর্বতমালার কোলে অবস্থিত পিকচার- পোস্টকার্ড শহর এঞ্জেলবার্গ। উচ্চতা ১০৫০ মিটার। রেল স্টেশনের অদূরেই ১১ শতকের চার্চ বেনেডিকটাইন মনাস্ট্রি। এছাড়াও দ্রষ্টব্যগুলি হলো- ফোক মিউজিয়াম, ট্রুবসে হ্রদ, চিজ ফ্যাক্টরি, ইউজেনিসি হৃদ। গ্রামের প্রতিটা বাঁক থেকে হাতছানি দেবে মাউন্ট তিতলিস হিমশৃঙ্গ। তিন পর্যায়ের কেবলকার সফরে পৌঁছে যান ৩০২০ মিটার উচ্চতার পাহাড়চূড়ায়। মাথার উপর দৃশ্যমান তিতলিস হিমশৃঙ্গ। হিমবাহের কোলে শোভা পাচ্ছে গ্লেসিয়ার এডভেঞ্চার পার্ক। এছাড়া আছে স্নো ব্রিজ, আইসফায়ার চেয়ারলিফ্ট কেবলকার, আর তুষার ভাস্কর্যে সাজানো গ্লেসিয়ার গ্রোটো আইসকেভ। ওয়েদার স্টেশন লাগোয়া ভিউপয়েন্ট থেকে আল্পস পর্বতমালার হিমশৃঙ্গ আর হিমবাহ দর্শন সারা জীবনের সম্পদ হয়ে থাকবে।

সুইজারল্যান্ড ভ্রমণে একটি স্বপ্নসুন্দর জার্নির সাক্ষী হতে চাইলে আপনাকে একটু অন্য পথে লুগানো হয়ে পৌঁছতে হবে সেন্ট মরিসে। দুটি শহরেরই সৌন্দর্য্য অবর্ণনীয়। লুগানো শহরটি গ্লেসিয়াল লেক লুগানোর উত্তরসীমা জুড়ে আর সারা শহরটি ঘিরে আছে ছোটবড় পর্বতমালা। লুগানো থেকে এগিয়ে চলুন সেন্ট মরিস। এখান থেকেই গ্লেসিয়ার এক্সপ্রেসে আপনার স্বপ্নসফর শুরু হবে। সেন্ট মরিস সমুদ্রতল থেকে ৩০০০ মিটার উচ্চ এবং শীতকালীন খেলা সংগঠনের জন্যে পৃথিবী বিখ্যাত। ইতিমধ্যেই এখানে দু-দুবার শীতকালীন অলিম্পিকের আসর বসে গেছে। গ্লেসিয়ার এক্সপ্রেস অন্যতম ধীরগতির গাড়ি, ২৯০ কিলোমিটার পাড়ি দিতে সময় নেয় প্রায় আটঘন্টা। কারণটা আর কিছু নয়, আপনাকে দুপাশের অসম্ভব সুন্দর মনকাড়া দৃশ্যগুলিকে পলে অনুপলে দেখাতে দেখাতে নিয়ে যাবে। মাঝে গাড়ি দাঁড়াবে কয়েকটি স্বপ্নসুন্দর স্টেশনে - চুর, অ্যান্ডারম্যাট, ব্রিগ। তারপর দীর্ঘযাত্রার শেষে পৌঁছে যাবেন ম্যাটারহর্ন পর্বতমালার কোলে লুকিয়ে থাকা অ্যালপাইন গ্রাম জারম্যাটে। এই সমস্ত জায়গাগুলিতেই একদিন- দুদিন করে থাকা যায়। জারম্যাটের উচ্চতা ১৬০০ মিটার, দক্ষিণ সুইজারল্যান্ডের ভ্যালেইস ক্যান্টনমেন্টের অধীন এই অঞ্চলটি স্কিয়িং, ক্লাইম্বিং, এবং হাইকিংয়ের জন্যে বিখ্যাত।

একটা রাত এখানে কাটিয়ে পরের দিন সকাল সকাল রওয়ানা দিন ছবির মতো সুন্দর আরেকটি জনপদ ইন্টারলাকেনের উদ্দেশ্যে। পাহাড় ঘুরে পথ গিয়েছে ব্রিয়েনজারসি আর থুনেরসি হ্রদদ্বয়ের হৃদয়ের মাঝে গড়ে ওঠা ইন্টারলাকেনে। আল্পস পর্বতমালার নিবিড় কোলে অবস্থিত এই শহর এবং আশপাশ ঘোরার জন্যে কয়েকটা দিন হাতে রাখবেন। পায়ে হেঁটে ঘুরে নিন প্রাচীন চার্চ, ১৬ শতকের পুরানো পাড়া, হোহেওয়েগ শপিং স্ট্রিট, ইউংফ্রাউ পার্ক ইত্যাদি। ইন্টারলাকেন থেকে মাউন্টেন রেলে চেপে দেখে নিন পাহাড়ের ওপরে ভিউ পয়েন্ট হার্ডার কুলম, সিনিগ প্ল্যাটে। পরের গন্তব্য ৪০ মিনিটের ট্রেন পথে গ্রিনডেলওয়াল্ড, ১০২ কিলোমিটার পথ। পাহাড়ের গায়ে সবুজ অরণ্যপ্রকৃতি ঘেরা গ্রাম। পাহাড়ি ঢালে সবুজ গাছের চাদর বিছানো, তার ফাঁকে ফাঁকে সমুদ্ধত অ্যালপাইন ফরেস্ট। এখান থেকে রেলযাত্রা শুরু করে পৌঁছতে হবে ইগার পর্বতমালার পাদদেশে ক্লেইনশেডেকে।


তারপর শতবর্ষ প্রাচীন মার্টিন রেলে চড়ে ইয়ুংফ্রাউইয়ক। ইউরোপের সর্বোচ্চ এই রেলপথটি ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের শিরোপা পেয়েছে। ট্রেনযাত্রা শেষ হয় পাহাড়চূড়ায় এসে। এখানে দ্রষ্টব্যগুলি হলো- ইয়ুংফ্রাউ প্যানোরামা শো, স্ফিংস ভিউপয়েন্ট, অ্যালপাইন রিসার্চ সেন্টার, অ্যালিটেসচ হিমবাহ, আইসপ্যালেস কেভ সহ বিখ্যাত হিমশৃঙ্গগুলো। আইসপ্যালেস দেখে লাগোয়া ২৫০ মিটার লম্বা অ্যালপাইন সেনসেশন টানেলে প্রবেশ করুন। এখানে দেখতে পাবেন পর্যটন সংক্রান্ত ছবি ও রঙের আলোর খেলা।

এবার ট্যুরের শেষপ্রান্তে এসে পৌঁছেছেন। ফেরার কথা ভাবতে হবে। যদি জুরিখ এয়ারপোর্ট হয়েই ফেরার পরিকল্পনা থাকে তাহলে ইন্টারলাকেন থেকে ট্রেনপথে চলুন আবার লুসার্ন। আসার সময় লুসার্ন শহরের কিছুই দেখা হয়নি। এবার এখানে এক বা দুরাত থেকে ঘুরে নিন লুসার্ন হ্রদের কোলে সাজানো দৃষ্টিনন্দন শহরটি। পাহাড়ি প্রকৃতির প্রেক্ষাপটে সাজানো হ্রদটিতে সমস্তধরনের জলক্রীড়ার ব্যবস্থা আছে। শহরের দ্রষ্টব্যগুলি হাঁটতে হাঁটতে দেখে নেওয়া যায়। হ্রদের ওপরে রয়েছে ইউরোপের অন্যতম পুরানো কাঠের সেতু চ্যাপেল ব্রিজ। শহরটা একচক্কর ঘোরার জন্যে চড়তে পারেন খেলনা রেলগাড়ির মতো সিটি ট্যুর ট্রেনে। হাঁটাপথে দেখে নিন লায়ন মনুমেন্ট, চার্চ, সুইস ওয়াচ শোরুম। লুসার্ন থেকে ঘুরে আসুন পিলাটুস পাহাড়চূড়া, উচ্চতা ২১২৮ মিটার। গন্ডোলা বা কগহুইল মাউন্টেন ট্রেনে পৌঁছে যান আর পাখির চোখে দেখে নিন আল্পস পর্বতমালার মন ভোলানো প্রাকৃতিক দৃশ্য।

লুসার্ন থেকে জুরিখ ফিরে বাড়ির পথ ধরুন। কয়েকটি কথা- সুইজারল্যান্ড ভ্রমণ করতে গেলে আপনাকে শেনেগন ভিসা বানাতে হবে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৮টি দেশের মধ্যে ২৪টি দেশ ভ্রমণের ছাড়পত্র হলো এই ভিসা। আর আপনি যদি ৩, ৪, ৮ বা ১৫ দিনের জন্যে সুইস রেল পাস কেটে নেন তাহলে আপনি রেলভ্রমণ, বাস ভ্রমণ এবং প্রায় ৪৮০ টি মিউজিয়াম এবং এক্সজিবিশনে ব্যবহার করতে পারবেন। বারবার টিকিট কাটার হ্যাপা পোহাতে হবেনা।

 

গৌতম সরকার
অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর, যোগমায়া দেবী কলেজ, কলকাতা

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top