সিডনী বৃহঃস্পতিবার, ৬ই মে ২০২১, ২৩শে বৈশাখ ১৪২৮

বধির নিরবধি (পর্ব দুই) : আসিফ মেহ্‌দী


প্রকাশিত:
৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১৬:১২

আপডেট:
৬ মে ২০২১ ০৬:৪২

 

(দেশসেরা দুই ফান ম্যাগাজিন ‘উন্মাদ’ ও ‘রস+আলো’তে লেখার সুবাদে আসিফ মেহ্‌দী রম্যলেখক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন আগেই। ‘বেতাল রম্য’ নামের প্রথম বইয়েই তিনি লাভ করেন তুঙ্গস্পর্শী জনপ্রিয়তা। তারপর একে একে প্রকাশিত তাঁর প্রতিটি বইয়ে ব্যঙ্গ আর হাসির সঙ্গে গভীর জীবনবোধের প্রতিফলন ঘটিয়ে তিনি শুধু পাঠকপ্রিয়তাই লাভ করেননি, তাঁর বইগুলো উঠে এসেছে বেস্ট সেলার বইয়ের তালিকায়। সেগুলোর মধ্যে 'বধির নিরবধি', ‘মায়া’, ‘অপ্সরা’, ‘তরু-নৃ’ অন্যতম। এছাড়া এনটিভিতে প্রচারিত তাঁর লেখা নাটক ‘অ্যানালগ ভালোবাসা’-র বিষয়বস্তুর জীবনঘনিষ্ঠতা দর্শকদের হৃদয় ছুঁয়েছে। ‘ন্যানো কাব্য’ নামে একটি বিশেষ কাব্যধারার প্রবর্তক আসিফ মেহ্‌দী কবিতা প্রেমীদের কাছে ন্যানো কবি হিসেবে পরিচিত। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা পঁচিশ।)

পর্ব দুইঃ

রনির মন আজ বিশেষভাবে বিষণ্ন। কেন তার এই বিষণ্নতা ঠিক ধরতে পারছে না; ঠিক যেমন সে ধরতে পারছে না জীবনের লক্ষ্য কী হওয়া উচিত। তবে অচিন-অজানা এক আশংকা মনের আকাশে উঁকি দিচ্ছে। মাঝেমাঝে তার এমনটা হয়। খারাপ কিছু ঘটার আগেই আঁচ করতে পারে। আবার কখনোবা মনে হয়, এটি না আগে ঘটেছিল! অথচ কোনোদিনই তা ঘটেনি। এভাবে অচেনা অতীত আর অদেখা বর্তমানের সঙ্গে রনির মন কোনোভাবে যুক্ত! এ বিষয়গুলো আজব লাগে তার কাছে। হতে পারে, মানুষের শরীর শুধু বর্তমানে থাকলেও তার মন সময়ের ডোমেইনে সামনে-পেছনে ছোটাছুটি করতে পারে। অন্যদের এমন অনুভূতি হয় কিনা, তা রনি কখনো কারও কাছে জানতে চায়নি। এমনকি সবচেয়ে কাছের মানুষ নূপুরের কাছেও না।

রনি বসে আছে উত্তরার রাজলক্ষ্মীর একটি ভূ-গর্ভস্থ রেস্তোরাঁয়। গুলশানের অফিস থেকে দুপুরে বের হয়েছে লাঞ্চ সারতে। চলে এসেছে উত্তরাতে। অফিসের বসকে বলেছে, হঠাৎ তার শরীর খারাপ লাগছে। অনেকদিন ছুটি নেয় না বলে ছুটি পেতে ঝামেলা হয়নি। আজ এই এলাকাতে আসার দুটো কারণ আছে। প্রথমত, স্থিরভাবে একাকী কিছু সময় কাটাতে চায় রনি। নিজের জীবন নিয়ে ভাবতে চায়। হঠাৎ-ই জীবন বড় অদ্ভুত ঠেকছে তার কাছে। কাজের চাপে সুস্থিরভাবে বসাই হচ্ছে না। নিজের শৈশব-কৈশোর-তারুণ্য নিয়ে ভাবা দরকার। বেড়ে ওঠা, গড়ে ওঠা নিয়ে ভাবা দরকার। জীবনের উদ্দেশ্য-বিধেয় নিয়ে ভাবা দরকার। রনির হঠাৎ উপলব্ধি-কেন এই ছুটে চলা, কোথায়ই বা ছুটে চলা, এসব প্রশ্নের উত্তরই তো তার জানা নেই। 

প্রাইভেট ভার্সিটিতে প্রকৌশলে পড়াশুনা করে বছর দুয়েক হলো একটি ভেন্ডর কোম্পানিতে কাজ করছে রনি। এই কোম্পানি মোবাইল প্রতিষ্ঠানগুলোর বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করে। এখানে যেদিন সে যোগদান করেছিল, সেদিনই কাজের জন্য তাকে দেওয়া হয়েছিল একটি ল্যাপটপ; সঙ্গে মোবাইল সেট, টুলস ব্যাগ ও টুলস কেনার জন্য কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা। এ চাকরিতে কী নেই-অসুখে চিকিৎসার সুবিধা, কাজের খাতিরে মোবাইল কোম্পানির টাওয়ারগুলোর লোকেশনে যাওয়ার জন্য গাড়ির ব্যবস্থা, ঢাকার বাইরে কাজে গেলে থাকা-খাওয়ার আয়োজন! জীবনের প্রথম চাকরি পাওয়ার খবরটি রনি প্রথম জানিয়েছিল সবচেয়ে প্রিয় মানুষ নূপুরকে। পরিচিত সবাইকে পরিতৃপ্তি নিয়ে বলেছিল, রাজার হালে থাকার মতো একটা চাকরি সে পেয়ে গেছে! যে যুগে ভালো চাকরি সোনার হরিণের মতো দুর্লভ ব্যাপার, সেই সময়ে এত সুযোগ-সুবিধা আর বেতনের একটি চাকরি পাওয়া আসলেই রাজকীয় প্রাপ্তি।

কিছুদিন হলো রনির মনের পরিবর্তন ঘটেছে। কোনো মোবাইল টাওয়ারের লোকেশনে কাজে গেলেই তার কাঁদতে ইচ্ছা করে। কী করছে এসব সে! জীবনের উদ্দেশ্য কি শুধু এ-ই? একসময়ের রাজকীয় চাকরি ইদানিং তার কাছে মনে হচ্ছে ভৃত্যের মতো! কদিন ধরে এ নিয়ে রনির মন বেশ খারাপ। তবে আজকের বিষণ্নতার কারণ এটি নয় বলেই রনির ধারণা। কেমন যেন অজানা আশংকা আছে আজকের মন খারাপে! কী সেই আসন্ন বিপদ, রনি বোঝার চেষ্টা করছে।

হোটেলটিতে ঢোকার জন্য ফুটপাত থেকে সিঁড়ি মাড়িয়ে ভূ-গর্ভে নামতে হয়। ভূগর্ভস্থ এ হোটেলে বেশ ভিড়। কোণার এক টেবিলে বসেছে রনি। ওয়েটার কাছে এলে নান, কোয়ার্টার পিস চিকেন গ্রিল আর কোক দিতে বলল। পরে কড়া লিকারের হালকা চিনির দুধ চা খাবে। এটিই তার প্রিয় মেন্যু। ওয়েটার অর্ডার নিয়ে চলে গেল। রনি বুঝতে পারছে, একাকী নিজের জীবন নিয়ে ভাবা দরকার। কিন্তু কোথা থেকে সেই ভাবনা শুরু করবে, কীভাবে শুরু করবে-এসব তার জানা নেই। সে শুধু জানে, ‘উপায় নেই’ বলে কিছু নেই। চাকরির একটি প্রশিক্ষণে বলা এই কথাটি রনির হৃদয়ে গেঁথে গেছে। লেগে থাকতে হবে যেকোনো সমাধানের জন্য। একসময় সমাধান মিলবেই।

বিশাল হোটেলজুড়ে লোকজনের পদচারণা, কোলাহল। সেই জনপদের স্রোতে, কলরবের তরঙ্গের মধ্যে বসে রনি ভাবতে থাকে নিজের জীবন নিয়ে; বয়ে চলা সম্পর্ক নিয়ে। তার জীবনে প্রেম আছে। কিন্তু এই প্রেম তাকে দিয়েছে ঘোর নিঃসঙ্গতা, বিভীষণ একাকীত্ব। নূপুর পছন্দ করে না বলে অন্য পরিচিত বন্ধুদের সঙ্গে ধীরেধীরে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে রনি। এমনকি নূপুরের সঙ্গেও সবসময় যোগাযোগের অধিকার তার নেই। কেবল মেয়েটি কল দিলেই কথা বলার সুযোগ হয় রনির। অবশ্য গুরুতর প্রয়োজনে এসএমএস দেওয়ার অধিকারটুকু তার আছে। ব্যস, তারপর রিপ্লাইয়ের অপেক্ষায় প্রহর গোনা।

রনি নূপুরকে ভীষণ ভালোবাসে; অথচ মেয়েটি তাকে বেশ ভালোভাবেই দুশ্চিন্তাযুক্ত রাখে। যেমন-কথা বলতে বলতে হয়তো এমন একটি দোষের কথা শুনিয়ে ফোন রেখে দিল যে সেটি নিয়ে দুশ্চিন্তা করেই কেটে যায় রনির সারাবেলা! গত দুই বছরে রনি ক্রমেই সমাজ-সংসার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। পরিচিতজনদের ছেড়ে আসতে আসতে এখন সে একদম একা। যার কারণে এই বিচ্ছিন্নতা, অবোধ্য মহাজাগতিক কারণে তার প্রতিই রনির অবর্ণনীয় টান! রনি চাকরি পাওয়ার পরই সংসার শুরু করতে চেয়েছিল। কিন্তু নূপুর জানিয়েছিল, তার পরিবার বিয়ের ব্যাপারে ভাবছে না। তাই এতটা অপেক্ষা। রনির পরিবারের সবাই নূপুরের কথা জানলেও নূপুরের পরিবারের কেউ জানে না যে রনি নামের এমন একটি ছেলের অস্তিত্ব আছে এই কোটি মানুষের শহরে।

নান-গ্রিল চলে এসেছে। পেটে ক্ষুধা, অথচ কেন যেন খেতে ইচ্ছা করছে না রনির। মনের অজানা আশংকাটি এখনো কেটে যায়নি। তার বারবারই মনে হচ্ছে, কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে জীবনে! জীবন সম্পর্কে অভিজ্ঞ একজনের সঙ্গে আলোচনা করলে এ বিষয়ে ধারণা পাওয়া যাবে। আজ রনির উত্তরায় আসার দ্বিতীয় কারণ এটিই- ঘাঘু একজনের সঙ্গে দেখা করা। ভার্সিটির বড় ভাই। তাকে ‘দ্য ইনোভেটর’ নামে পরিচিতজনেরা চেনে; ডাকে ‘ইনো ভাই’ বলে। জীবন ও জগৎ নিয়ে তিনি ইনোভেটিভ উপায়ে ভাবেন। ভার্সিটিতে কেউ ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক যেকোনো সমস্যায় পড়লে ছুটত ইনো ভাইয়ের কাছে। তার কাছে প্রতিটি সমস্যার জন্য রয়েছে একটি সুচিন্তিত সমাধান। এক বন্ধুর কাছ থেকে ইনো ভাইয়ের বাসার ঠিকানা আর মোবাইল নম্বর জোগাড় করেছে রনি। তিনি ‘একলা পাখি’র মতো এ শহরে বাস করেন। নিঃসঙ্গ সময় কাটান উত্তরার তেরো নম্বর সেক্টরের একটি বাসায়। প্রকৌশলে পড়ার পর এখন তার সময় কাটে লেখালেখিতে।

খাওয়া সামনে রেখেই ইনো ভাইকে কল দিল রনি। ওপাশ থেকে শোনা গেল সেই পরিচিত কণ্ঠ, ‘হ্যালো।’

‘ভাই, আমি রনি। ইলেকট্রিক্যালের ছাত্র। আপনার দুই ব্যাচ জুনিয়র।’

‘কী খবর তোর রনি? অনেকদিন পর!’ মানুষকে আপন করে নেওয়ার এক অসাধারণ ক্ষমতা আছে ইনো ভাইয়ের। এতদিন পর কথা; অথচ ইনো ভাইয়ের কথা শুনে রনির মনে হচ্ছে তাদের মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ ছিল। ইনো ভাই জুনিয়রদের ‘তুই’ করেই বলেন। কেউ ‘তুই’ বলে সম্বোধন করলে রনির কেন যেন বেশ খারাপ লাগে কিন্তু ইনো ভাই ‘তুই’ করে বললে উল্টো আপন-আপন মনে হয়!

রনি উত্তর দিল, ‘ভাই, আছি মোটামুটি। আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাই। আমি উত্তরাতেই।’

‘আরে, কী সৌভাগ্য! এখন উত্তরার কোথায় তুই?’

‘রাজলক্ষ্মীতে।’

‘ওকে, একটা রিকশা নিয়ে তেরো নম্বর সেক্টরের চৌদ্দ নম্বর রোডে চলে আয়। আমি রাস্তায় দাঁড়াচ্ছি। এখানে আসলেই আমাকে দেখতে পাবি।’

‘ভাই, রাস্তায় দাঁড়াতে হবে না। আমি কাছাকাছি এসে আপনাকে কল দেব।’

‘শিওর? পারবি?’

‘পারব, ভাই। আপনি পাশে থাকলে বিশ্বজয় করতে পারব! একটা বাড়ি খুঁজে বের করা-এ আর এমন কী?’

‘হয়েছে, হয়েছে! চলে আয়।’

‘ওকে, ভাই।’

পেটে ক্ষুধা বোধ করছে রনি। তারপরও তার মনে হচ্ছে, খাওয়া-টাওয়া বাদ দিয়ে ইনো ভাইয়ের কাছে ছুটে চলে যেতে পারলে ভালো হতো। হৃদয়ের জানালা খুলে রনি দেখাতে চায়, তার মনের ভেতরে কী চলছে-কতশত স্মৃতি, প্রীতি, ভীতি বা আশংকার ভিড় সেখানে! রনির বিশেষ বিষণ্নতার গতিপ্রকৃতি ও সেটি থেকে পরিত্রাণের পথও হয়তো বাতলে দিতে পারবেন দ্য ইনোভেটর-ইনো ভাই। তবে পেটের ক্ষুধার কাছে হার মানতেই হয় মানুষকে। খুব দ্রুত খাবার খেয়ে উঠল রনি। বিল চুকিয়ে দৌড়ে উঠল এক রিকশায়। বাইরে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি ঝরছে। রনি রিকশার হুড তুলে দিল। পথে হালকা যানজট। এসব যানজট আর এক মুহূর্ত সহ্য হচ্ছে না তার। জীবনের সঠিক পথের খোঁজে সে এক পিপাসার্ত পথিক।

(চলবে)

 

আসিফ মেহ্‌দী
কথাসাহিত্যিক ও প্রকৌশলী

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top