সিডনী সোমবার, ১২ই এপ্রিল ২০২১, ২৯শে চৈত্র ১৪২৭

লাইফ অব এ রিকশা পেইন্টার (পর্ব এক) : কাজী মাহমুদুর রহমান


প্রকাশিত:
৯ জানুয়ারী ২০২১ ১৬:২৯

আপডেট:
১৬ জানুয়ারী ২০২১ ১৩:১৬

 

আকাশের পর আকাশ, মেঘের পর মেঘ পেরিয়ে একটা সাইবেরিয়ান বুনো হাঁসের মতো প্লেনটা যখন ঢাকার শাহজালাল এয়ারপোর্টে অবতরণ করল আমি তখন জ্বরঘোরে আচ্ছন্ন, ক্লান্তির শেষ সীমায়। প্যারির অর্লি এয়ারপোর্টের তুলনায় ঢাকার এই এয়ারপোর্ট নিতান্তই অনাকর্ষনীয়। ক্লান্ত পদক্ষেপে প্লেনের সজ্জিত গুহা থেকে বেরিয়ে বিমান বন্দরের অভ্যন্তরের মসৃণ মেঝেই পা রাখতেই আমার বুকের ভেতর জ্বলে উঠল অন্য এক আলো। যেন জন্ম নিল অন্য একটি পাখি যে তার দুর্বল ডানা ঝাপটিয়ে মুহূর্তেই উড়ে যেতে চাইল রাত্রির ঢাকা শহরের আকাশে, বৃক্ষ থেকে বৃক্ষে, রাস্তাগুলোর ধুলো ওড়া অলি-গলিতে, উচ্চকিত শব্দের জনারণ্যে কিংবা লালবাগের প্রাচীন ইতিহাসের নির্জনতায়। যেখানে কেউ একদিন যেন আমাকে শেষবারের মতো বলেছিল, ‘একদিন এমন সময় আবার আসিয়ো তুমি আসিবার ইচ্ছা যদি হয়-পঁচিশ বছর পরে।’

পঁচিশ নয় প্রায় একুশ বছর পর ফিরে এসে উড়ে যাবার জন্যে আমার ডানায় অস্থিরতা থাকলেও এয়ারপোর্টের নানা আনুষ্ঠানিকতা শেষ হতে বড় বিলম্ব হল। ইমিগ্রেশনের ফরেন ডেস্কে কর্তব্যরত অফিসার আমার পাসপোর্ট উল্টে-পাল্টে দেখলেন। আমার পাসপোর্টের ছবি আর আমার বর্তমান চেহারায় অনেক অমিল। অফিসার তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন।

আমার লম্বা সাদা চুল, মুখভর্তি সাদা দাড়ি-গোঁফ, পরনে ছেঁড়া জিন্সের এই অদ্ভুত মানুষটাকে দেখে তিনি ধরেই নিলেন আমি আদতে একটিা হিপ্পি। প্রশ্ন করলেন,

- ইউ তাইমুর হাসান? সন অব ফজলুল হাসান?
- উই। (হ্যাঁ)
- ফ্রেন্স সিটিজেন?
- উই।
- হোয়াট উই উই? নামটাতো বাঙালি। ইংরেজি, বাংলা জানেন?
আমি মাথা ঝাঁকিয়ে বললাম, বাংলায় প্রশ্ন করুন। বাংলায় উত্তর দেব।
- কতদিন পর দেশে ফিরলেন?
- একুশ বছর পর।
- ফ্রান্সে কী করতেন?
- ছবি আঁকাআঁকি, মাস্টারি এইসব।

অফিসার তার চোখের কোণা দিয়ে আরো প্রশ্নে দৃষ্টিবিদ্ধ করতে চাইলেন।

- এতকাল পরে দেশে আসার কারণ?
-বিশ্রাম।
- বিশ্রাম!
- জি বিশ্রাম। আমি একটা বুনো হাঁস। জীবনভর উড়তে উড়তে আমার ডানা এখন ক্লান্ত। আমার কপালে হাত দিয়ে দেখুন আমার খুব জ¦র।

অফিসার গম্ভীরস্বরে বললেন, স্যরি। আমি ডাক্তার নই। আপনার এখন যেটা করা দরকার তা হচ্ছে আপনাকে অন অ্যারাইভাল ভিসা নিতে হবে। অন অ্যারাইভাল ভিসা দেবার ঐ দিকে একটা কাউন্টার আছে। ফি দিয়ে ভিসাটা নিয়ে আসুন।

নির্দিষ্ট কাউন্টারে ভিসা নিতে গিয়ে আরো কিছু প্রশ্নের সম্মুখিন হতে হল। কেন এতকাল পরে দেশে এলাম, আমি ইন্ডিয়ান বাঙালি না বাংলাদেশি বাঙালি, আমি কতদিন এ দেশে থাকব ইত্যাদি নানান প্রশ্ন। শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তির শেষ সীমায় পৌঁছেও আমি ধৈর্যের সাথে সব প্রশ্নের উত্তর দিলাম। আমার বাংলাদেশিত্ব প্রমাণের জন্যে একুশ বছর আগের একটা বাংলাদেশি পুরাতন পাসপোর্টের জীর্ণ ফটোকপি যা আমি এতকাল স্মৃতি হিসেবে রেখে দিয়েছিলাম সেটাই এখন ব্যাগপ্যাক হাতড়ে বের করে দিলাম ওদের হাতে। ইউরোপ, আমেরিকার মতো প্রায় সব দেশেই আমি ভিআইপি ট্রিটমেন্ট পেয়েছি। কিন্তু একদা এই বাংলাদেশের ঘাস মাটির মানুষ হয়েও আমি এখন এক অচেনা আগন্তুক, অ্যান আউটসাইডার। যা হোক, পুরাতন পাসপোর্টের বিবর্ণ কপি দেখে আমার পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হবার পর আমার ভিসা মিলল ছয়মাস মেয়াদি।

আমার কোনো লাগেজ নেই। পিঠে একটা ব্যাগপ্যাক। তাতে সামান্য কিছু কাপড়-চোপড় আর জরুরি ওষুধপত্র। পার্সে আছে কিছু ডলার, ইউরো আর গুটি কয়েক ভিসা কার্ড। কাঁধে ঝুলছে একটা চামড়া আবৃত বেহালা যা আমার প্রিয় সঙ্গী।

সামান্য কিছু ডলার বাংলাদেশি কারেন্সিতে চেঞ্জ করে একটা ট্যাক্সি নিয়ে বের হলাম এয়ারপোর্ট থেকে। এখন গন্তব্যস্থান বনানী। সেখানে আমার একটা ঠিকানা আছে।

এয়ারপোর্ট থেকে বনানীর দূরত্ব বেশি নয়। তবুও অসম্ভব যানজট। পথ যেন শেষ হয় না। গাড়ির ব্যাকসিটে হেলান দিয়ে বন্ধ চোখে অনুভব করার চেষ্টা করতে লাগলাম সংগুপ্ত স্মৃতির ঢেউ। এতকাল পরে ঢাকায় আসছি, যাচ্ছি নাজনিনের বাড়ি। আমাকে আচমকা দেখে ওর প্রতিক্রিয়া কী হবে? আমার অসহায়ত্ব, আমার শূন্যতা কিছুটা পূর্ণ করতে, আমার পাপের বোঝা কিছুটা হালকা করতে ওকে যে আমার বড় বেশি প্রয়োজন।

ট্যাক্সিটা নেমে গেল মৃদু ঝাঁকুনিতে। আমি চোখ মেলে তাকালাম। বনানীর একটা প্রাচীর বেষ্টিত বাড়ির সুদৃশ্য গেটের সম্মুখের রাস্তায় ট্যাক্সিটা। ট্যাক্সি ড্রাইভার বলল, স্যার যে ব্লক, যে রোড, যে বাড়ির নম্বর আপনি বলেছেন, এটাই বোধহয় সেই বাড়ি। আপনি নেমে দেখুন।

আমি আমার ব্যাগপ্যাক আর বেহালাটা নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে নেমপ্লেটে বাড়ির নম্বর আর নাম দেখে নিলে ট্যাক্সি ড্রাইভার চলে গেল। এখন রাত প্রায় এগারোটা। নির্জন আলো-আঁধারি রাস্তায় টহলরত দু’জন পুলিশ। ওদের সন্দেহের চোখের সামনে আমি গেটের বাইরে থেকে কলিং বেলে চাপ দিলাম। বাড়িটা সম্ভবত সিসি ক্যামেরার আওতাধীন। একজন সিকিউরিটি গার্ড গেটের অন্তরাল থেকেই প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল, কে? কাকে চান?

আমি বললাম, এটা মিসেস নাজনিন, আই মিন মিস্টার রাজিব চৌধুরীর বাড়ি?
অন্তরাল থেকে উত্তর এল, হ্যাঁ।
- মিসেসকে বলুন, আমি ওর তিমু ভাই। প্যারিস থেকে এসেছি।
- একটু অপেক্ষা করেন স্যার। ওনাদের জিজ্ঞেস করে পারমিশন নিতে হবে।

আমি গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে রইলাম অনুমতির অপেক্ষায়। ইতোমধ্যে টহলদার দু’জন পুলিশ আমার খুব কাছাকাছি অস্ত্র হাতে সতর্ক দৃষ্টিতে। কারণ আমার কাঁধে ঝুলছে খোল আবৃত ঘুমন্ত বেহালাটি। এটা বেহালা না হয়ে অস্ত্রও হতে পারে। শুনেছি হলিআর্টিজানে টেররিস্টদের ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপের পর পুলিশ নাকি খুব সতর্ক। রাত্রে প্রতিটি পথচারীকে ওরা সন্দেহের চোখে দেখবে এটাই স্বাভাবিক।

প্রহরারত সিকিউরিটি গার্ড স্বয়ংক্রিয় গেট খুলে বেরিয়ে এসে আমাকে সসম্ভ্রমে বলল, আসুন স্যার।

পুলিশদ্বয় তবুও সতর্ক দৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে রইল। ওদেরকে হতাশ করে আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে গেটের ভেতরে প্রবেশ করলাম। ভেতরে প্রশস্ত পথ, দু’ধারে সুসজ্জিত, মৃদু আলোকিত বাগান এবং বাড়িটা। স্থাপত্য কৌশলে প্রকৃতির সঙ্গে হৃদয়ের সংযোগ ঘটিয়ে এই বদ্ধ শহরের বনানীতে নাজনিনের একান্ত এক টুকরো স্বপ্নের অমরাবতি- যে বাড়ির স্বপ্নটাই সে দেখত তার বালিকা জীবনে, মাহুতটুলির পুরাতন ভাঙা টিনের চালের নিচে শুয়ে।

হঠাৎ বাড়ি আর বাগান জুড়ে যেন হাজার তারার আলো জ¦লে উঠল। আমি সিকিউরিটি গার্ডের সঙ্গে কার পার্কিং প্লেসের কাছে আসতে না আসতেই লিফটের দরজা খুলে প্রায় ছুটে বেরিয়ে এল নাজনিন নাইটি পরা অবস্থাতেই। একুশ বছর আগের সেই পনেরো বছরের কিশোরীকে এখন চেনা মুশকিল। গত একুশ বছরে তার দেহে অনেক পরিবর্তন ও যৎসামান্য মেদবৃদ্ধি ঘটলেও চেহারায় এখনো মিষ্টতা বিরাজমান, চেহারায় সৌন্দর্যের সাথে একটা ব্যক্তিত্বের সংযোগ ঘটেছে। নাজনিনের পেছনেই তার স্বামী রাজিব চৌধুরী তার পরনেও নাইট ড্রেস। ওরা বোধহয় শুয়ে পড়েছিল।

নাজনিন সেই পুরাতন মাহুতটুলির কিশোরী বালিকার মতোই আমার দিকে ছুটে এল কিশোরী উচ্ছ্বলতায়। মনে হল ও আমার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়বে। আমিও প্রস্তুত ওকে আমার শূন্য বুকে টেনে নিতে। কিন্তু আমার কাছে এসেও থমকে গেল। একি! এ কাকে দেখছে সে? এই কি তার তিমু ভাইয়া? তার বড় ভালোবাসার বড়দা? কী সুদর্শন ছিল তার এই ভাই! অথচ যে মানুষটি তার সামনে দাঁড়িয়ে সে প্যারিস নাকি অন্য কোনো গ্রহ থেকে এসেছে? পরনে ময়লা ছেঁড়া জিন্স, মাথা, মুখ ভর্তি সাদা চুল, দাড়ি, গোঁফ। এ কে?

আমি হেসে বললাম, নাজু, তুইও আমাকে চিনতে পারছিস না? আমি কি এতই বদলে গেছি?

নাজনিন এবার আমার বুকের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ল। কান্নাভরা কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল, তিমু ভাইয়া... ও আমার বড়দা... এতদিন পরে এলে...

ওর স্বামী রাজিব হতভম্ব দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। নাজনিন কাঁদছে আর দুম দুম করে কিল মারছে আমার বুকে।

এই আবেগ আর কান্না সামাল দেবার মতো বিন্দুমাত্র শক্তি এখন আমার আর নেই। আমার চোখের সামনে সব দৃশ্য, আলো মুছে গিয়ে অন্ধকার নামার আগেই চেতনার শেষ সীমারেখা থেকে শুধুমাত্র বলতে পারলাম,

- নাজু, ই-আ-ত-ইল উনলিত ইচি? জ’ আই বেসৈন দ’উন লিত।

এর বেশি আর কিছু বলতে পারিনি। কারণ, আমি তখন নাজুর শরীরের মধ্যে অচেতন। আসলে আমি বলতে চেয়েছিলাম, নাজু এখানে কোনো বিছানা আছে? আমার একটা বিছানার প্রয়োজন।

জ’ আই বেসৈন দ’ উন লিত
জে ভউক্স দর্মির।

আমি একটা বিছানা চেয়েছিলাম, আমি ঘুমোতে চেয়েছিলাম। আমি এখন নরম, সাদা, উজ্জ¦ল বিছানায়। আমি গভীর স্বপ্নের মতো ঘুমে। ঘুম থেকে যখন অস্পষ্ট চেতনায় ফিরে আসি তখন আমার চারিদিকে সাদা শুনশান নিস্তব্ধতা, অথবা ফিসফাস আওয়াজ। আমার নাক, মুখ জুড়ে অক্সিজেন মাস্ক, শরীর জুরে শেকড়ের মতো নল, শিশিরের মতো ফোঁটায় ফোঁটায় শব্দহীন স্যালাইন ড্রপ। আমি কোথায় ... নাজুর বাসায় নাকি হাসপাতালে?

হাসপাতালেই বোধহয়! বুঝতে পারছি আমি এখন মৃত্যুর অনুভবে। আমার বিছানা ঘিরে সাদা পোশাকধারী নার্সদের মুখ, কখনো ডাক্তারের গম্ভীর মুখ। ওরা আমার চোখ দেখে, নাড়ির গতি মাপে স্টিমারের খালাসীদের মতো নদীর জলে দড়ি ফেলে নদীর গভীরতা মাপে- ... এক বাও মেলে না, দো বাও মেলে না ... অতল নদীতে আমি শুনতে পাই মৃত্যুর সুরেলা গান... মাঝি-মাল্লা, খালাসী কিংবা, ডাক্তার যেন বহুদূর হতে কিছু কথা ছুঁড়ে দেয়... আমি বুঝি না। উত্তর দিই না। আমি আমার নিজস্ব নির্জনতায় ঘুম কিংবা স্বপ্নের নদী জলে ভাসতে থাকি, ডুবতে থাকি... একসময় নদীর পাড়ে উঠে ধুলোমাখা পথে হাঁটতে থাকি। হাঁটতে হাঁটতে ধানক্ষেতের ভেতর দিয়ে সহসা পাখি হয়ে উড়ে যাই। সবুজ বন থেকে বনান্তরে...। তারপর আরো গ্রাম-গঞ্জ পেরিয়ে ইট-কাঠের বিশাল শহরে... যেখানে দু’কাঁধের ডানা খসে যায় আরমানিটোলায়... শাবিস্তান, লায়ন সিনেমার সামনে বাঁশের ভারায় দাঁড়িয়ে আমি এক নবীন তরুণ শিল্পী ছায়াছবির নায়ক নায়িকাদের ছবি আঁকতে থাকি। বংশালে রিকশা মহাজন খলিল সর্দারের রিকশা আস্তানায় আমি রিকশার পেছনে আঁকতে থাকি উত্তম, সুচিত্রা, রাজ্জাক, কবরীকে।

খলিল সর্দার খুব দিলদার আদমি। আমার ছবি আঁকার দারুণ সমঝদার। খুশি হয়েও আমাকে একটা রিকশা উপহার দিয়েছিল। ঐ রিকশার পেছনে আমি কি কারো ছবি এঁকেছিলাম?
এঁকেছিলাম বোধহয়। কিন্তু কার ছবি?
স্মৃতিগুলো এখন ঘন কুয়াশায়। কিছু দেখা যায় না... না সামনে... না পেছনে।

একসময় নাজনিনের দু’টি ব্যাকুল চোখের ছায়া আমার চোখের ওপর প্রতিফলিত হয়। আমি ওকে চিনতে পারি। ও আমার হাতটা ধরে গভীর মমতায়, অভয় ভঙ্গিতে।আমি ক্লান্ত, অস্পষ্ট স্বরে বলি, নাজু আমি আমার রিকশাটার পেছনে কী ছবি এঁকেছিলাম?
আমার দেহে ব্যাধি ও ব্যাধের উল্লাস। রক্তস্রোতে সাঁতার কাটছে নানা অসুখের ঘুণপোকা। প্রায় দু’সপ্তাহ ধরে আমাকে পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হয়েছে। লিভার, কিডনিতে সমস্যা, উচ্চ রক্তচাপজনিত সমস্যা সব ব্যাধি আমার দেহে মাকড়সার মতো জাল বুনে ওঁৎ পেতে বসে আছে।

দুইমাস আগে নিউইয়র্ক ভ্রমণকালে ওখানকার ন্যাশনাল  আর্ট গ্যালারির মধ্যে আমি হঠাৎ করে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলাম। শুভার্থীরা হাসপাতালে আমাকে দ্রুত স্থানান্তরের পর সার্জনরা আমার জীবন রক্ষার্থে আমার ব্লকড হার্টের আর্টারিতে রিং পরিয়ে সাময়িকভাবে আমাকে বিপদমুক্ত করেছিলেন। সার্জনের পরামর্শ ছিল ওপেন হার্ট সার্জারি করা। কিন্তু সঙ্গীবিহীন অবস্থায় বিদেশ বিভূঁইয়ে আমি সে রিস্ক নিতে সাহস পাইনি। এই এতকাল পর আমি প্রথম অনুভব করলাম মানুষের একাকীত্ব, নিঃসঙ্গতা বড় ভয়াবহ, সবচাইতে বড় শত্রু। সেই পুরোনো কথা, পুরোনো প্রবাদ মনে পড়ল-‘এ ব্যাচেলর লিভ্স লাইক এ প্রিন্স বাট ডাইজ লাইক এ  ডগ।’ জীবনে বেঁচে থাকার জন্যে আপদে বিপদে কারো না কারোর ওপর কিছুটা নির্ভর করতেই হয়। কিন্তু আমি এই বয়সে কার উপর নির্ভর করব? প্যারির শিল্পীপল্লি বারবিজনে আমার নিজস্ব ফ্ল্যাট আছে, ছবি আঁকার স্টুডিও আছে, আমার আঁকা প্রচুর ছবি আছে, ব্যাংকে প্রচুর অর্থ আছে। কিন্তু নেই কোনো সঙ্গী, ভালোবাসার একান্ত প্রিয়জন। তবুও নিউইয়র্ক ছেড়ে প্যারির বারবিজনের শিল্পীপল্লিতে আমাকে ফিরে আসতেই হল কিছুটা সুস্থ হবার পর।

ফিরে আসার পর আমার নানা কাজ আর ব্যস্ততা। একান্ত নিজস্ব অবিক্রিত ছবিগুলো বিভিন্ন আর্টশপে চুক্তির ভিত্তিতে বিলি বন্টন করে দিলাম। ব্যাংকে একাউন্টে আমার জমা-খরচের হিসাব নিলাম। গাড়িটা বিক্রি করে দিলাম। ফ্লাটটাও বিক্রি করে দেব। জীবনভর এতো আয়, এত বেহিসেবী ব্যয়ের পরও আমার জমা অর্থের পরিমান কম নয়। কিন্তু কম হচ্ছে আমার সামনের দিনগুলো। আমার সময়। তাই টাকাগুলো সময় থাকতেই নাজনিনকে না জানিয়েই সব ট্রান্সফার করলাম বাংলাদেশে নাজনিনের ব্যাংক একাউন্টে। আমি জানি এই টাকা পেয়ে নাজনিন ক্ষুব্ধ হবে, আমাকে অভিশাপ দেবে। ও একটি টাকাও নিজের জন্যে খরচ করবে না। সব দান করে দেবে কোনো সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার অর্গানাইজেশনে। আগেও সে এমনটাই করেছে।

এখান আমার শেষ সিদ্ধান্ত মৃত্যু ঘুমে শুয়ে থাকার আগেই আমাকে ফিরে যেতে হবে সেইখানে ‘এই পৃথিবীতে এক স্থান আছে সবচেয়ে সুন্দর করুণ, যেখানে সবুজ ডাঙা ভরে আছে মধুকূপী অবিরল’।

 

চলবে

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top