সিডনী বৃহঃস্পতিবার, ২১শে অক্টোবর ২০২১, ৬ই কার্তিক ১৪২৮

শিশু-কিশোরদের আত্মসমালোচনা শিক্ষা : অরুণ বর্মন


প্রকাশিত:
২১ জুন ২০২১ ১৪:১০

আপডেট:
২১ অক্টোবর ২০২১ ২৩:৫৫

ছবিঃ অরুণ বর্মন

 

আত্মসমালোচনা বলতে বুঝায় নিজেই নিজের সমালোচনা করা। সমালোচনার অর্থ ভালো দিক এবং মন্দ দিক নিয়ে আলোচনা। যদি নিজেই নিজের ভালো দিক মন্দ দিকগুলো যাচাই করতে পারা যায় তবে তা থেকে নিজেকে সংশোধনের সুযোগ তৈরি হয়। আত্মার পরিশুদ্ধতা অর্জণের সঠিক পথ অবলম্বন করা সহজ হয়।

আত্মসমালোচনাকে আরবিতে বলা হয় প্রতিনিয়ত আত্মার হিসাব গ্রহণ করা, ইংরেজিতে সেলফ্ ক্রিটিসিজম বা সেলফ্ একাউন্টিবিলিটি। প্রতিনিয়ত নিজের মনকে আয়নার সামনে দাঁড় করানোই আত্মসমালোচনা। আমি কে? আমার এই আমিটাকে খুঁজে বের করাই হলো আত্মসমালোচনা।

প্রতিটা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি হলো, নিজেকে অনেক বড় মনে করা। নিজের করা কাজটিই সঠিক বলে ধরে নেওয়া। মনে বদ্ধমূল ধারণা তৈরি হওয়া যে, আমি নিজে সঠিক বাকিরা ভুল। অন্য কেউ যদি নিজের ভুল ধরিয়েও দেয় বা স়ংশোধনের কথা বলে তখন নিজের আত্ম মর্যদায় আঘাত লাগে। ভাবে আমি এতবড় মাপের একজন মানুষ বা আমি এত বড় মানুষের ছেলে-মেয়ে, আমার বাবার এত টাকা, এত ধনসম্পদ, আর তারা আমারই কিনা ভুল ধরে। এইরূপ ধারণা থেকে নিজে আত্মশ্লাঘায় মশগুল হয়। অপরকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে। আত্মসমালোচনাবিহীন বড়, ছোট, শিশু-কিশোর সবারই মনে এরূপ একটি ভাব প্রতীয়মান হয় যে আমার চেয়ে বেশি আর কেউ জানে না। এর ফলে মনের ভেতর একটা অহংকারী, একরোখা পশুত্ব মনোভাব তৈরি হয়। যার ভবিষ্যৎ ফল হয় ভয়াবহ।

আমাদের মনের মধ্যে দুইটি ষাঁড়ের লড়াই সর্বদা লেগেই আছে। একটি ভালো ষাঁড় যা বিবেক বা বোধ এবং অন্যটি মন্দ ষাঁড় যা অহম বা ইগো। এই দুইয়ের দ্বন্দ্বে প্রথম প্রথম মন্দ ষাঁড়টা জেতে ঠিকই কিন্তু এই দ্বন্দ্বটা অবিরাম চলতে থাকলে একসময় ভালো ষাঁড়ের জয় হবেই হবে। বিবেক নামক ভালো ষাঁড়টি জয়লাভ করতে শিখলে মানুষ তার নিজের কর্তব্যবোধ সম্পর্কে সচেতন হয়। সৎ, বিনয়ী, সহনশীল ও পরমতসহিষ্ণু হয়। তাই প্রয়োজন শুধু এই দ্বন্দ্বটাকে অবিরাম টিকিয়ে রাখা।

যদি আমরা শৈশবকাল থেকেই শিশু-কিশোরদের আত্মসমালোচনা শিক্ষা দিতে পারি তবে একটা পর্যায়ে এসে তারা নিজেদের স্বরূপ চিনতে শিখবে এবং মনুষ্যত্বের আসনে নিজেকে অধিষ্ঠিত করাতে সক্ষম হবে।

 

এখন আমরা জানব কেন শিশু-কিশোরদের আত্মসমালোচনা শিক্ষা দিতে হবে?

১.  নিজেকে মূল্যায়ন করতে শেখাঃ আত্মসমালোচনার ফলে শিশুকাল থেকেই শিশু নিজেকে মূল্যায়ন করতে শিখবে। নিজের ভিতরের ভালোমন্দ যাচাই করতে শিখবে। ফলে মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটবে। চরিত্রের দৃঢ়তা তৈরি হবে।

২. নিজের মধ্যের খারাপটা যাচাই করতে শেখাঃ শিশু কিশোররা তখন বুঝতে শিখবে যে, তার মধ্যে শুধু ভালো দিক নয়, খারাপ দিকও আছে এবং সেগুলো অনুসন্ধান করে পরিত্যাগ করার চেষ্টা করবে।

৩. নিজের ভুল ধরতে ও স্বীকার করতে শেখাঃ শিশু-কিশোররা নিজের ভুলগুলো নিজেরাই ধরতে শিখবে। অথবা কেউ যদি তার ভুল ধরিয়ে দিলে সেটা স্বীকার করার মনোভাব তৈরি হবে।।

৪. নিজেকে সংশোধন করতে শেখাঃ শিশু-কিশোররা নিজের ভুলগুলো নিজেরা স়ংশোধন করতে শিখবে।

৫. মিথ্যাকে না বলতে শেখাঃ জীবনের সবচেয়ে বড় শত্রু মিথ্যা। ভুলক্রমে এমনকি ঠাট্টাচ্ছলেও মিথ্যা বলতে নেই। শিশু-কিশোররা মিথ্যা থেকে দূরে থাকতে শিখবে।

৬. ন্যায়নীতি, সততা ও শিষ্টাচার শেখাঃ শিশু-কিশোররা পরমতসহিষ্ণু হবে এবং ন্যায়নীতি, সততা ও শিষ্টাচারের ভিত্তিতে জীবন গড়তে পারবে।

৭. অন্যের কাজের প্রতি শ্রদ্ধা করতে শেখাঃ শিশু-কিশোররা নিজের কাজের পাশাপাশি অন্যের কাজের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শিখবে। বড়দের সম্মান ও শ্রদ্ধা ও ছোটদের স্নেহ করতে শিখবে। বন্ধুবাৎসল হবে।

৮. জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারাঃ শিশু-কিশোররা নিজেকে যাচাই করে জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণ করতে শিখবে।

৯. চাহিদা ও প্রাপ্তি সম্পর্কে সচেতন হতে পারাঃ

শিশু-কিশোররা নিজেকে মূল্যায়ন করে তার চাহিদা ও প্রাপ্তি সম্পর্কে সচেতন হবে।

১০. স্রষ্টার প্রতি অনুগত হতে শেখাঃ সর্বোপরি শিশু-কিশোররা স্রষ্টার প্রতি অনুগত থাকার মনোভাব তৈরি হবে।

 

আত্মসমালোচনা শিক্ষার পদ্ধতিঃ

১. দিনশেষে নিজেকে আয়নার সামনে নিয়ে আসাঃ  প্রতিদিন কাজ শেষে নিজেকে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে আয়নায় নিজের মনের প্রতিবিম্ব দেখার অভ্যাস গড়ে তোলা। সারাদিন কি কাজ করলাম। ভালো কাজ কি কি করলাম। মন্দ কাজ করলাম কিনা, সারাদিনে কয়টি মিথ্যা বললাম। আগামী দিন মন্দ কাজগুলো আর না করা ও মিথ্যাগুলো এড়িয়ে চলার প্রতিজ্ঞা করা। মনের আয়না যত স্বচ্ছ হবে ব্যক্তিত্ব তত প্রস্ফুটিত হবে।

২.কাজ করার পূর্বে ও পরে মূল্যায়নঃ কোনো কাজ করার পূর্বে নিজের সামর্থ্য যাচাই করা। আমি কাজটি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে পারব কিনা। আবার কজের শেষে মূল্যায়ন করা। কাজটি সঠিকভাবে সম্পন করতে পারলাম কিনা। কি কি ভুল হলো। সেই ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে পরের কাজগুলো আরও সুন্দরভাবে করা।

৩. মিথ্যাকে পরিহারঃ একটি মিথ্যা বলার পর  এই মিথ্যাটি কেন বললাম। এই মিথ্যার দ্বারা কার কি ক্ষতি হতে পারে বা হয়েছে। এমন মিথ্যা পরবর্তীতে এড়িয়ে যাব কিনা। এরূপ চিন্তা করার অভ্যাস গড়ে তোলা।

৩. পরমতসহিষ্ণুতাঃ অপরের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা। নিজে বলার চেয়ে অন্যের কথা শুনার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করে মনকে তৈরি করার অভ্যাস করা। 

৪. আত্মসমীক্ষাঃ আত্মসমীক্ষা অর্থাৎ নিজের কাজের প্রতি যত্নবান হওয়া। নিজের কাজের বিশ্লেষণ করা। প্রতিটা কাজ খুব যত্নের সাথে করা। অতিত ভবিষ্যত না ভেবে বর্তমান যে কাজটি করছি সেটিই মুখ্য। সেটিকেই প্রাধান্য দেওয়া এবং তার ভুলত্রুটি বিশ্লেষণ করাই শ্রেয়। নিজেকে সর্বদাই বিশ্লষণ করতে শেখা।

৫. অপ্রয়োজনীয়তা পরিত্যাগঃ অপ্রয়োজনীয় কাজ, অপ্রয়োজনীয় কথা বলা বা অপ্রয়োজনীয় মিথ্যা বলার অভ্যাস পরিত্যাগ করার মানসিকতা গড়ে তোলা।

৬. হাসতে, হাসাতে বা আনন্দ উচ্ছ্বাস করতে শেখাঃ খুব জোরে হাসি যাকে বলে অট্টহাসি জীবনকে খোলসা করে। আয়ু বৃদ্ধি করে। এরূপ হাসার এবং হাসানোর কৌশল আয়ত্ব করা। হাসির সাথে মনের কলুষতা মুছে যাবে। আনন্দ উচ্ছ্বাসে মন ভরে যাবে। মনে রাখা দরকার, যতক্ষণ হাসি ততক্ষণ ভালো থাকা।

৭. ক্ষমা প্রার্থনা করতেঃ ভুলের জন্য ক্ষমা প্রার্থনার মানসিকতা তৈরি করা। ক্ষমা নিজেকে মহৎ করে। এতে অপরের প্রতি নমনীয়তা ভাব গড়ে উঠে।

৮. সর্বক্ষণ স্রষ্টাকে স্মরণঃ সার্বক্ষণিক স্রষ্টাকে স্মরণ, মনন ও প্রার্থনার অভ্যাস গড়ে তোলা। তাহলে খারাপ কাজের প্রতি একটি ভয় সৃষ্টি হবে এবং একটি দয়ালু মন তৈরি হবে।

 

আত্মসমালোচনা করতে না শিখলেঃ

আত্মসমালোচনা যারা করতে পারে না তারা নিজের ভুল নিজে ধরতে পারে না। কেউ বা কোনো শিশু-কিশোর যদি নিজের ভুল ধরতে না শেখে স়ংশোধনও হতে শেখে না। ফলে সে আত্ম অহংকারী, হিংসুটে, দুর্নীতিবাজ ও নিষ্ঠুর প্রকৃতির মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে।

 

সর্বশেষঃ

নিজের মনের খবর একমাত্র নিজে ছাড়া পৃথিবীর অন্য কেউ জানে না। সুতরাং নিজের মনের বিশ্লেষণ নিজেই করতে হয়। নিজেকে দিয়ে জগৎকে বিচার করতে হয়। অন্যের সাথে যে ঘটনা ঘটছে ঐ ঘটনা যদি আমার সাথে বা আমার নিকটজনের সাথে ঘটতো তাহলে আমি কি করতাম এই বোধটা নিজের ভিতর আনা খুব জরুরি। এরফলে নিজের ভিতরের আমিটা সজাগ হয়। তাকে জানতে পারা যায়।

আমাদের শিশু-কিশোরদের ছোট থেকেই পারিবারিকভাবে আত্মসমালোচনা শিক্ষা দেওয়া খুব জরুরি। আমাদের বাবা-মায়েদের উচিত নিজেদের এবং সন্তানদের আত্মসমালোচনা শিক্ষা দেওয়া। স্কৃল-কলেজে শিক্ষক-শিক্ষিকাদেরও উচিত শিশু-কিশোরদের আত্মসমালোচনা শিখানো। 

আজকের শিশু-কিশোররাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। সুতরাং সুন্দর, সৎ, নির্ভিক মানসিকতা সম্পন্ন, দৃঢ় চরিত্রের মানুষ গড়তে শিশু-কিশোরদের আত্মসমালোচনা শিক্ষা দেওয়ার বিকল্প নেই। আত্মসমালোচনাই পারে একটি সুন্দর শোষণমুক্ত সমাজ ও জাতি গঠন করতে।



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top