সিডনী সোমবার, ১২ই এপ্রিল ২০২১, ২৯শে চৈত্র ১৪২৭

লাইফ অব এ রিক্শ পেইন্টার (পর্ব চার) : কাজী মাহমুদুর রহমান


প্রকাশিত:
৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ১২:১৮

আপডেট:
৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ১৪:১৬

 

আমি যেন স্বপ্নভূমি থেকে জেগে উঠলাম। কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লার কণ্ঠে যেন বললাম, ‘আমি কিংবদন্তীর কথা বলছি, আমি আমার পূর্বপুরুষের কথা বলছি।’ এই যে দেখছ ঢাকা মেডিকেল কলেজের একাংশ, ইমারজেন্সি বিভাগ। এটা আগে এমন ছিল না। এই অংশটা ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অংশ। আশেপাশে এত ভবনও ছিল না। আমাদের পিতৃপুরুষের কাছে শুনেছি, ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস পড়ে জেনেছি, এই চত্বরে ছিল একটি আমগাছ। আর ঐ ডান দিকে ছিল ছাত্রদের প্রিয় আড্ডাখানা, প্রিয় মানুষ মধুদার ক্যান্টিন। এই দু’টিই হল আমাদের ভাষা আন্দোলনের সূতিকাগার। এই আমগাছের নিচে দাঁড়িয়ে সেই ১৯৪৮ সাল থেকে আমাদের সেই সময়ের তরুণ ছাত্র নেতারা আগুন ঝরা বক্তৃতা দিতেন। কেন জানো?

একটিমাত্র দাবি এই বাংলার কোটি কোটি মানুষের প্রাণের দাবি রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠি সে দাবি মানেনি। তারা আমাদের ওপর রাষ্ট্রভাষা হিসাবে উর্দু ভাষা চাপিয়ে দিয়েছিল আর প্রতিবাদীদের ওপর চালিয়েছিল জেল, জুলুম, নির্যাতন। এই যে গেটের এখানে দাঁড়িয়ে এখান থেকেই রাজপথে শুরু হয়েছিল প্রতিবাদ আর বিদ্রোহের মিছিল।

মাদাম জুলিয়াঁ, সে এক দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। এত ইতিহাস এখানে এই মুহূর্তে বলা সম্ভব নয়। এসো রিকশায়, চলো যাই ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ এর ভাষা আন্দোলনের রক্তাক্ত ইতিহাসের সেইখানে আমাদের স্মৃতির মিনারে।

আমাদের রিকশা এখন শহীদ মিনারের সামনে। রিকশা থেকে নেমে আমি আর মাদাম জুলিয়াঁ রাত্রির ছায়াচ্ছন্ন শহীদ মিনারের সামনে দাঁড়িয়ে। আমি আপন মনেই আবৃত্তি করলাম শামসুর রাহমানের কবিতার কয়েকটি লাইন,

‘স্বাধীনতা তুমি
শহীদ মিনারে অমর, একুশে ফেব্রুয়ারি উজ্জ্বল সভা
স্বাধীনতা তুমি
পতাকা-শোভিত শ্লোগান-মুখর, ঝাঁঝালো মিছিল।’

জুলিয়াঁ কবিতার ভাষা না বুঝলেও আমার আবেগকে বোধহয় বুঝতে পারলেন। কিন্তু কোনো প্রশ্ন করলেন না। অনুবাদের অনুরোধও করলেন না। তবুও আমি মৃদুস্বরে বললাম, মাদাম জুলিয়াঁ, এখানেই ছাত্র-জনতার মিছিলের ওপর শাসকগোষ্ঠির পুলিশেরা গুলি চালিয়েছিল। গুলিতে নিহত হয়েছিল অনেক ... অনেক ... আমাদের পূর্বপুরুষ .... পিতৃপুরুষ তরুণেরা আমাদের ভাইয়েরা ...
অনেকদিন পর আমার বুকের ভেতর থেকেই বেরিয়ে এলো সেই গান, উজ্জ্বল শব্দাবলি .... ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি ...’
গানটি আমি চিৎকার করে গাইনি, বেসুরেও গাইনি। চতুর্দিকের গাড়ির শব্দের মধ্যেও আমার হৃদয়ের গভীর থেকে উৎসারিত গানটির কথা ও সুরের বিষণ্নতা যেন ছড়িয়ে গেল বাতাসে, মিনারে মিনারে।

আবার আমরা দু’জনে রিকশায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পথে চলতে চলতে মাদাম জুলিয়াঁ বললেন, আমি তোমার প্রার্থনার ভাষা বুঝিনি। কিন্তু প্রার্থনার বিষণ্ন সুর আমার হৃদয়কে ছুঁয়ে গেছে। তোমার কণ্ঠ ভালো।

- ধন্যবাদ।
- তুমি কি নিয়মিত গানের চর্চা কর?
- না।
- কেন?
- আমি যে রং মিস্ত্রি।
- না, তুমি একজন শিল্পী। তুমি শিল্পী বলেই আমি তোমাকে পছন্দ করেছি, বন্ধু হতে চেয়েছি।
- সে জন্যে তোমাকে আরো ধন্যবাদ।

রিকশা যখন নিউমার্কেটের মোড় ঘুরে ধানমন্ডির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে তখন জুলিয়াঁ বললেন, এইসব পথের মতোই জীবনের পথগুলোতেও অনেক মোড়। যানজটের মতো অনেক জট আর জটিলতা সব মানুষের জীবনেই থাকে। কিন্তু তা একটা চ্যালেঞ্জ নিয়ে উৎরে যেতে হয়। আমি তোমাকে একটা কথা বলি। কিছু মনে করো না। যে মানুষটি উঁচু পাহাড়ে উঠবে সে কেন বাঁশের ভারায় দাঁড়িয়ে ছবি আঁকবে? যে পিকাসো, ভ্যানগঁগের মতো শিল্পী হতে চাইবে সে কেন রিকশার পেছনে ছবি এঁকে সময় নষ্ট করতে চাইবে?

- তুমি কী বলতে চাইছ?
- আমার ছোট্ট পরামর্শ, তুমি এখানে আলিয়ঁস ফ্রসেঁজ থেকে ফ্রেন্স ভাষাটা শিখে নাও। সেটা হবে তোমার উত্তরণের প্রথম ধাপ। আমি তোমাকে প্যারির কিছু আর্ট স্কুলের ঠিকানা দেব। তুমি আর্ট পেপারে বা ক্যানভাসে তোমার আঁকা ছবির কিছু নমুনা ওদের পাঠাতে থাকবে, নিয়মিত যোগাযোগ করতে থাকবে। অনেক স্কুল আছে যারা নতুন ট্যালেন্টদের সুযোগ দেয়, স্কলারশিপ দেয়। ভর্তি হবার ব্যপারে, স্কলারশিপের ব্যাপারে আমি বোধহয় তোমাকে কিছুটা সাহায্য করতে পারব। আমি তোমার রিক্শ পেইন্টিং এর উপর একটা সচিত্র প্রতিবেদন তৈরি করে প্রকাশ করব যেটা পড়লে স্কুলগুলো তোমার ব্যাপারে আগ্রহী হতে পারে। তাইমুর, তুমি কি শুনছ আমি তোমাকে কী বলছি?

আমি হা হা করে হেসে উঠলাম। হাসতে হাসতে বললাম, মাদাম আমি এখন পর্যন্ত আমাদের দেশের চট্টগ্রামের উঁচু পাহাড় কেউক্রাডাং পাহাড়ে উঠবার সুযোগই পাইনি। সেই মানুষটাকে তুমি আইফেল টাওয়ারে ওঠার স্বপ্ন দেখাচ্ছ? এতো আমার কাছে আকাশ কুসুম স্বপ্ন!
জুলিয়াঁ বললেন, সব স্বপ্নই আকাশ কুসুম নয়। স্বপ্নটা আমি তোমার মাথায় গেঁথে দিলাম, চোখে গেঁথে দিলাম, পায়ে গেঁথে দিলাম আর এই হাতে ছুঁয়ে দিলাম।
আমার ডান হাতে জুলিয়াঁর জন্যে গিফট বক্স। বাঁ হাতটা জুলিয়াঁর ডান হাতটার সঙ্গে প্রায় মালার মত জড়িয়ে আছে।

জুলিয়াঁ আমার বাঁ হাতটা সজোরে আঁকড়ে রইলেন একটা স্বর্ণলতার মতো আমার ইচ্ছের স্বপ্ন বুননে। আমার হাতের আঙুল ছুঁয়ে প্যারিস পরির সুগন্ধি নিঃশ্বাস যেন সংগীতের মন আমার কানে বেজে উঠল, হে যুবক, কখনো স্বপ্নহীন হয়ো না। স্বপ্নের পাখি হয়ে উড়ে যাও আকাশে। তোমাকে অভ্যর্থনা জানাতে আমি অর্লি এয়ারপোর্টে অপেক্ষা করব।

রিকশা হঠাৎ থমকে গেল। অর্লি এয়ারপোর্টের স্বপ্নটা ভেঙে আমি একটু চমকে তাকালাম। রিকশাটা ধানমন্ডির তিন নম্বর রোডের একটি রেস্ট হাউজের সামনে। জুলিয়াঁ নামলেন রিকশা থেকে। আমি রিকশা থেকে না নেমেই তার হাতে গিফট বক্সটা তুলে দিলাম। হয়তো কিছুটা অভদ্রতা হল।

জুলিয়া প্রশ্ন করলেন, নামবে না?
আমি বললাম, এই রিকশায় আমাকে ফিরে যেতে হবে আরমানিটোলায়। আমি খুব ক্লান্ত। শরীর, কাপড়-চোপড় নোংরা।
- অন্তত এককাপ কফি পান করে যাও। আমি কফি খুব ভালো বানাতে পারি।
- আর একদিন খাব।
- আর একদিন কবে?
- আসব। এই মনে তুমি স্বপ্নবীজ বুনে দিয়েছ। বীজের অঙ্কুরটা দেখতে আসব। এখন বন্নুই শুভ কামনা।
- বন্নুই। শুভরাত্রি।

জুলিয়াঁকে শুভরাত্রি জানিয়ে চলতি রিকশায় বাড়ি ফিরতে ফিরতে আমার মনের মধ্যে হঠাৎ একটা গান গুনগুনিয়ে উঠল,
‘স্বপন পারের ডাক শুনেছি, জেগে তাইতো ভাবি
কেউ কখনো খুঁজে কি পায় স্বপ্নলোকের চাবি ...।’

জানি না জুলিয়াঁর মতো এক সুন্দরী বিদেশিনীর স্পর্শে ও উষ্ণতায় আমার মনে স্বপন পারের হাওয়া ছুঁয়ে গেল কিনা! আমি কি স্বপন পারের প্যারির কথা ভাবছি? জুলিয়াঁর কথা ভাবছি? আমি রিকশায় পায়ের ওপর পা তুলে দিয়ে রাত্রির ঢাকার পথে কোলাহল ছাপিয়ে গেয়ে উঠলাম, স্বপন পারের ডাক শুনেছি...

আমার রিকশাওয়ালা দ্রুত পায়ে প্যাডেল চালাতে চালাতে হাসিমুখে আমার দিকে একবার ফিরে তাকাল। বলল, ছার, আপনের গলাখান বেস মাজাই মনে লয়। এই ছব ভাব-ভাবনার গানতো কহনো হুনি নাই। ছিনেমার গান হুনতে হুনতে হালায় কান পইচ্চা গ্যাছে। ছার, মউজ কইরা গাইতে থাহেন। পথের তামাম মানু হুনুক।
আমি প্রাণানন্দে ঐ একটি গানই বারবার গাইতে গাইতে একসময় পৌঁছে যাই আমাদের আরমানিটোলার মাহুতটুলির বাড়িটায়।
বাড়িতে ঢুকতেই মা জিজ্ঞেস করলেন, তিমু আজকে যে তোর এত দেরি হল?
আমি হেসে বললাম, মাগো, আজ এক বিদেশিনী এসেছিল আমার সাথে দেখা করতে। তাকে রিকশা করে পৌঁছে দিতে গিয়েছিলাম ধানমন্ডিতে।
নাজনিন কৌতূহল আর কৌতূক ভরা চোখে প্রশ্ন করল, বড়দা সত্যি বলছিস? ঐ বিদেশিনীটা কে বলত?
আমি বললাম, ও ফরাসি দেশের মেয়ে, নাম জুলিয়াঁ।
নাজনিনের আবারও প্রশ্ন, ওর বয়স কত?
আমার চাইতে দশ বছরের বড়।

নাজনিনের চোখে উছলে পড়া আনন্দ। মাত্র দশ বছর! বড়দা, ওদের বয়স বুঝা যায় না। আমাদের মতো ওরা কুড়িতেই বুড়ি হয় না। ওরা চির সুন্দরী। বড়দা, প্লিজ তুই একটা বিদেশি বউ এনে দে না খেলা করি।

আমি কৃত্রিম কোপে নাজনিনের কান ধরতে গেলাম। নাজনিন আমার হাত এড়িয়ে মায়ের পেছনে লুকালো। আমি রাগী কণ্ঠে বললাম, পাকনি মেয়ে তুই বড্ডো বেশি ফাজিল হয়েছিস।

নাজনিন মাকে তার ঢাল বানিয়ে বলল, বাঃ আমি কী ফাজলামি করলাম? আমি তো একটা ছড়া বলেছি, ‘এই দাদা তোর পায়ে পড়ি, বউ এনে দে খেলা করি।’
মা নাজনিনকে ধমক দিয়ে বললেন, নাজু ফাজলামি রাখতো। তিমু, যা কাপড় চোপড় ছেড়ে গোছল করে আয়। তোর বাবা টিউশনি থেকে কখন ফিরবে জানি না। তোরা খেয়ে নে।

আমি বললাম, মা আমার একদম ক্ষিদে নেই। ঐ বিদেশিনীকে নিয়ে মিষ্টির দোকানে অনেক কিছু খেয়েছি।
নাজনিন ইঙ্গিতপূর্ণ রসিকতার সুরে বলল, মা, তোমার গুণধর ছেলে অনেক কিছু খেয়ে এসেছে। রসগোল্লা, চমচম... অনেক মিষ্টি...। আচ্ছা বড়দা, চমচম খেয়ে ঐ বিদেশিনীটা কী বলল?

আমি দেখলাম এই মুখ পাতলা কিশোরী বোনটির সঙ্গে আমি কথায় পেরে উঠব না। তাই বললাম, চমচমের স্বাদ নিতে নিতে বিদেশিনী আমাকে প্রশ্ন করল, এই চমচমের মতো মিষ্টি তোমার কোনো বোন আছে?
আমি বললাম, আছে।
সে বলল, কী নাম তার?
আমি বললাম, তার নামও চমচম।
সে বলল, চমচমকে আমায় দেবে?
আমি বললাম, কেন?
জুলিয়াঁ ছড়া কেটে বলল,


‘আমার একটা ভাই আছে নাকটি তার খ্যাঁদা
বুদ্ধিটা তার বেজায় বেশি গাধার মতো হাঁদা
নামটি তার মশিঁয়ে মুলোঁ দেখতে সাদা হুলো
চক্ষু দু’টি কুতকুতে, কান দুটো তার কুলো
চমচমিকে দাও যদি ভাই নিয়ে যাব প্যারি
মুলোঁর সাথে দেব বিয়ে মুড়িয়ে গাউন, শাড়ি।

আমার ছড়া শুনে মা, ছোটন সবাই হেসে উঠল।

নাজনিন এবার রাগের চোটে মায়ের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে আমার বুকে দুমদুম করে কিল মারতে থাকল। আর বলতে থাকল, বড়দা তুই বেশি দুষ্টু, আমার চাইতে বেশি বেশি। তুই বানিয়ে বানিয়ে এতো মিথ্যে কথা বলতে পারিস? আমি ঐ জুলিয়াঁকে জিজ্ঞেস করব, এই যে আমার হবু ভাবি, তুমি কি সত্যিই আমার নামে ছড়া কেটে এইসব বলেছ?

আমি ওর কিলের আঘাত সামলাতে সামলাতে বললাম, জুলিয়াঁকে তুই পাবি কোথায়? তাছাড়া ওতো তোর বাংলাই বুঝবে না।
নাজনিন ওর দুমদাম কিল থামিয়ে বলল, তুমি ওকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে আসবে। আমি ফ্রেন্স জানি না। কিন্তু ইংরেজিতে তো কথা বলতে পারব।
মা যেন আঁতকে উঠলেন নাজুর কথায়। বললেন, না, না। আমাদের এই ভাঙা টিনের চালার ঘরে তাকে নিয়ে আসিস না বাপ।
ছোটন মিটিমিটি হাসছিল। টিপ্পনি কেটে বলল, ক্ষতি কি মা? আমাদের ভাঙা ঘরে চাঁদের আলো একদিন না হয় জ্বলল!

যেন অনেকদিন পর আমাদের ঘরে তুচ্ছ বিষয় নিয়ে হাসির বন্যা। ছোটন এমনিতেই গম্ভীর, হাসে কম। আমার সঙ্গে ও সব সময়েই একটা শ্রদ্ধার দূরত্ব বজায় রেখে চলে। আজ ওর মুখেও হাসি দেখছি। আমার খুব ভালো লাগছে। ছোটন হঠাৎ করে আমাকে জিজ্ঞেস করল, বড়দা, তুমি রিকশায় ফিরে আসতে আসতে তোমার প্রিয় গানটি বোধহয় গেয়েছ?

আমি চমকে উঠলাম ওর কথায়। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালাম। প্রশ্ন করলাম, বলতো কী গান গেয়েছি?
ছোটন মৃদু হাসিতে বলল, আমার অনুমান যদি ভুল না হয় তাহলে, স্বপন পারের ডাক শুনেছি...।
এইটুকু বলে থেমে গেল। কণ্ঠে সুরের মাধুর্য ঢেলে গানটির বাকি অংশ গেয়ে উঠল,

‘চাওয়া পাওয়া বুকের ভিতর না-পাওয়া ফুল ফোটে
দিশেহারা গন্ধে তারি আকাশ ভরে ওঠে
খুঁজে যারে বেড়াই গানে, প্রাণের গভীর অতল পানে
যে জন গেছে নাবি
সেই নিয়েছে চুরি করে স্বপ্নলোকের চাবি।’

আমি যেন বহুকাল পরে ওর কথা শুনলাম, ওর কণ্ঠে গান শুনলাম। বিস্ময়ানন্দে ওকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে বলে উঠলাম, ছোটনরে তুই ঠিক বলেছিস, ঠিক। যে আমাকে স্বপনপারের ডাক দিয়েছে সেই আমার স্বপ্নলোকের চাবি চুরি করে নিয়েছে। আমি জানি না চাবিটা আমি কোনোদিন খুঁজে পাব কি না?

মনে হয় অনেকদিন পর আমার বিকেল, সন্ধে এবং রাতটা কাটল সবার সঙ্গে বেশ হাসি-খুশির আবহাওয়াতে। মা ছাড়া সবার খাওয়া শেষ। বাবা বাইরে থেকে ফিরে আসলেন রাত প্রায় সাড়ে দশটায়। আমাদেরকে খুশি খুশি দেখে তার চোখেও বোধহয় একটু বিস্ময়, মুখে ঈষৎ আলোর আভাস। কিন্তু কিছু বললেন না। প্রাইভেট টিউশনি করবেন নাএই জেদ আর অহংকার থেকে তিনি ইদানিং বেরিয়ে এসেছেন। এই আরমানিটোলাতেই তিনি দশম শ্রেণির দু’টি ছাত্রীকে তাদের বাড়িতে অঙ্ক আর বিজ্ঞান পড়াবার টিউশনি নিয়েছেন। একটি টিউশনি করেন মাগরিবের নামাজের পর, আর একটি টিউশনি এশার নামাজের পর। আমাকে দিবারাত্র পরিশ্রম করতে দেখে তার মনে বোধহয় একটা কষ্ট আর অনুশোচনা বেড়েছে। চেষ্টা করছেন আমাদের সংসার নামক নদীটার বিপদ সংকুল স্রোতে ভেসে যাওয়া নৌকাটার হাল ধরতে।

বাবা নিঃশব্দে তার আহার শেষ করে ঘুমাতে চলে গেলেন তার বাইরের ঘরটাতে। সেটাই তার একটা সাধারণ চৌকির শোবার ঘর, পড়ার ঘর এবং বাইরের মেহমানদের জন্যে আপ্যায়ন বা বসার ঘর। ঘরটাতে খাট-পালংক নেই, সোফাসেট নেই। আছে কয়েকটা বেতের চেয়ার, একটা বেতের ছোট্ট টেবিল, সস্তা কড়ই কাঠের একটা তালাবদ্ধ আলমারি, বইপত্রসহ একটা টেবিল, বাবার নিজের কাপড় চোপড় রাখার একটা আলনা। তবে প্রতি ঘরেই বৈদ্যুতিক পাখা আছে, হলুদ বাতির আলো আছে। এটাই আমাদের একমাত্র শান্তি। যখন ঘনঘন লোডশেডিং হয় তখন হাতপাখা চলে, হ্যারিকেনের আলো জ¦লে। চৈত্র, বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠতে প্রচ- দাবদাহে যখন টিনের চালা তেতে ওঠে, শরীর পোড়াতে থাকে তখন আমরা ভাই-বোনেরা হাততালি দিয়ে শীত-বসন্তের গান গাই। বর্ষায় যখন ঝুমঝুমিয়ে বৃষ্টি পড়ে টিনের চালের ফুটো দিয়ে পানি চুইয়ে পড়ে তখন আমরা হেমন্তের গান গাই।

মাঝখানের ঘরটাতে এক দেয়াল লাগোয়া আমার চৌকির বিছানা, অন্যপ্রান্তের দেয়াল লাগোয়া ছোটনের চৌকির বিছানা। দু’জনের কাপড় চোপড়ের একটা মাত্র আলনা। কিন্তু দু’জনের জন্যে দুটো আলাদা টেবিল আর চেয়ার যার যার বিছানার পাশে। আমার টেবিলের র‌্যাকে বই, বিছানার মাথার কাছে বইপত্র ছড়ানো, ছিটানো। পেইন্টিং বক্স, রং, তুলি, পোস্টার কালারের শিশি, ড্রইং স্কেচের খাতা, রোল করা আর্ট পেপার সবকিছুই টেবিল আর মেঝেয় গড়াগড়ি খায়। ছোটনেরও তার পাঠ্য বইপত্র, খাতা, কলম সবকিছু টেবিল আর বিছানার মধ্যে ছড়াছড়ি। মা বা নাজনিন অতি সাবধানে আমাদের বিছানার চাদর, বালিশের ওয়াড় মাসে দু’একবার পাল্টে দেয়, ঘরের ধুলো-ময়লা ঝাড়– দিয়ে পরিষ্কার করে। কিন্তু আমাদের টেবিল বা বইপত্র গোছগাছ করা স্ট্রিকট্লি ফরবিডেন ফর দেম। কারণ আবর্জনা ভেবে অতীতে তারা আমাদের দু’জনের অনেক প্রয়োজনীয় মূল্যবান কাগজপত্র, উঁইয়ে কাটা বইপত্র ফেলে দিয়েছে।

শেষ প্রান্তের ঘরটাতে মা আর নাজনিন থাকে। তারা আমাদের দু’ভাইয়ের অগোছালো অভ্যাস একদম সহ্য করতে পারে না। সুতরাং তাদের ঘর অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন ও ছিমছাম। সেখানে আমরা ভুলেও উঁকি দিই না।

 

আমাদের দু’ভাইয়ের ঘরে সারারাত ধরে হলুদ বাতি জ¦লে, ছোটনের পড়ার সুবিধের জন্যে একটা টেবিল ল্যাম্পও আছে। ছোটন বিছানায় শুয়ে বা বসে নিঃশব্দে পড়াশুনা করে, শেষ রাতে ঘুমিয়ে যায়। আমি অবশ্য সারারাত জাগি না। ক্লান্তিতে চোখের পাতা বন্ধ হয়ে না আসা পর্যন্ত আমি অলসভাবে যে কোনো বইয়ের পাতায় চোখ বুলিয়ে যাই।

আজ বিছানায় ঘুমোবার প্রস্তুতিতে মাথার কাছ থেকে হাত বাড়িয়ে একটা বই টেনে নিয়েছিলামকাহলিল জিবরানের ‘দি প্রফেট’। এই মিশরীয় কবির কীসব অসাধারণ কথা, কবিতা আর চিত্রকলা! পাতা উল্টোতে উল্টোতে তার একটা কবিতার পঙ্ক্তি যেন আমার বুকের ভেতর বেজে ওঠে ‘আমার গৃহ আমাকে বলে, আমাকে ছেড়ে যেয়ো না, এখানে তোমার অতীত রয়েছে এবং পথ আমাকে বলে, এসো, আমাকে অনুসরণ কর, আমিই তোমার ভবিষ্যৎ। এবং আমি আমার পথ ও ভবিষ্যৎকে বলি, আমার অতীত কিংবা ভবিষ্যৎ নেই। যদি আমি এখানে অবস্থান করি তবে আমার গতি থাকবে এবং অন্যত্র গেলেও আমি গতিশীল। কেবল প্রেম এবং মৃত্যুই সবকিছু বদলে দিতে পারে।’

পড়তে পড়তে আমি ভাবি এইসব মহৎ বাক্যগুলি আমার জীবনে, আমার চিন্তা-চেতনার সঙ্গী কি হতে পারবে? এই গৃহ, এই পরিবার ছেড়ে আমি কোথায়, কোন পথে যাব? কোন ভবিষ্যতের ঠিকানায়?

ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুম এসে যায় জানি না।

 

চলবে

 

লাইফ অব এ রিকশা পেইন্টার (পর্ব এক)
লাইফ অব এ রিকশা পেইন্টার (পর্ব দুই)
লাইফ অব এ রিকশা পেইন্টার (পর্ব তিন)

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top