সিডনী সোমবার, ১২ই এপ্রিল ২০২১, ২৯শে চৈত্র ১৪২৭

লাইফ অব এ রিক্শ পেইন্টার (পর্ব পাঁচ) : কাজী মাহমুদুর রহমান


প্রকাশিত:
১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ১৪:২৫

আপডেট:
১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ১৪:৫৭

 

পাখিদের কিচিরমিচির নয়, মোরগের বাগধ্বনিতে নয় প্রতি সকালে আমার ঘুম ভাঙে মায়ের সুললিত কণ্ঠে কোরআন তেলাওয়াতের শব্দে। আজ তিনি তেলাওয়াত করছেন ‘লাহু মুলকুস সামা-ওয়া-তি অল্ র্আদ্ব; অ ইল্লাহাহি তুরজাউল উমূর। ইয়ূলিজুল্লাইলা ফিন্ নাহারি অ ইয়ূলিজন নাহা-রা ফিল্লাইল; অ হুওয়া আ’লীমুল বিয়া-তিস্বস্বদূর...।’

মায়ের কণ্ঠে এইমাত্র যে আয়াত সংগীতের ধ্বনির মতো উচ্চারিত হচ্ছে তার অর্থটা আমি বোধহয় জানি। অর্থটা এই রকম হবে ‘আসমান ও জমিনের মালিকানা শুধু তারই এবং আল্লাহর দিকে সমুদয় বিষয় প্রত্যাবর্তিত হতে থাকে। তিনিই রাত্রিকে দিবাতে প্রবিষ্ট করান এবং দিবাকে রাত্রিতে প্রবিষ্ট করান। আর তিনি অন্তরের কল্পিত অকল্পিত সব বিষয়েই সুপরিজ্ঞাত রহিয়াছেন।’

বাল্যকাল থেকেই আমরা সব ভাইবোন বাবা ছাড়াই, শুধুমাত্র মা’র কঠোর নির্দেশ আর অনুশাসনে আরবিতে কোরআন বাংলায় মূল অর্থসহ পড়তে শিখেছি। নামাজ, রোজা সবকিছুই আমাদের শিখতে হয়েছে কখনো বাঁধা হুজুরের কাছে, কখনো মায়ের কাছে। বামপন্থি চিন্তাধারার বাবা অতীতে ছিলেন তার আস্তিকতা ও নাস্তিকতার দোলাচলে। মানবকর্ম, মানব কল্যাণই ছিল তার একমাত্র ধর্ম। অন্য কিছুতে নয়। তিনি আমাদেরকে তার চিন্তা, আদর্শ দ্বারা প্রভাবিত করেননি, মায়ের ইচ্ছেতেও কখনো বাধা দেননি। এখন বার্ধক্যে এসে তার দেহ, মনে ঘুণ ধরেছে। বামপন্থী সঙ্গীদের আপোষমূলক মনোভাব, ক্ষমতার লোভ ও বুর্জোয়া মনোবৃত্তি দেখে তিনি তাদের সঙ্গ পরিত্যাগ করেছেন, দলত্যাগ করেছেন। নানারকম হতাশা, অপ্রাপ্তির দুঃখবোধ তাকে গ্রাস করেছে। মনে হয় অন্তরাল থেকে কোনো অদৃশ্য শক্তি যেন তার সকল বিশ্বাসকে ভেঙে-চুরে একটা অন্যরকম মানুষে পরিণত করেছে। তিনি দাড়ি রাখছেন, মসজিদে গিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ছেন, ইংরেজিতে অনুদিত কোরআন নিঃশব্দে পাঠ করছেন। আমার মনে হয় ধর্মকে নয় নিজেকে বুঝতেই, নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করতেই স্রষ্টার কাছে তার এই অসহায় আত্মসমর্পণ।

মা কোরআন তেলাওয়াত করতে থাকেন আর আমি আধো ঘুম আধো জাগরণে যেন স্বপ্নলোকের চাবির সন্ধানে শুয়ে থাকি। রাত্রির ছেঁড়া ছেঁড়া স্বপ্নগুলোকে জোড়া দেবার চেষ্টা করি। কিন্তু সব এলোমেলো হয়ে যায়। বিছানা ছেড়ে উঠতে ইচ্ছে হয় না। বছর খানেক ধরেই আমি নামাজ, রোজা পালনে অনিয়মিত হয়ে পড়েছি। ইচ্ছে হলে পড়ি, ইচ্ছে না হলে পড়ি না। ছোটনও তার অসুস্থতার কারণে কিছুটা অনিয়মিত। রাতভর পড়াশুনার কারণে ও সকালে উঠতে পারে না। মা এ নিয়ে আমাদের দু’জনকে কিছু বলেন না। তবে নাজনিন মায়ের সহসঙ্গী, সবকিছুতেই নিয়মিত।

মা এখন কোরআনের অন্য একটি আয়াত পাঠ করছেন-‘কুল্লু নাফসিন যা য়িকুতুল মাওত, সুম্মা ইলাইনা-তুরজাউন।’ অর্থ প্রতিটি প্রাণীই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করিবে, অতঃপর তোমরা আমারই সকাশে প্রত্যাবর্তিত হইবে।

তেলাওয়াতের শব্দ আর অর্থ যেন আমার মর্মমূলে গিয়ে বিঁধতে থাকে। ছোটনের পা-ুর নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকাই। ওর মুখ রেশমের মতো দাড়ি, গোঁফে ভরে উঠছে ক্রমশ। বিবেকের দংশনে আমি বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ি। প্রাতঃকৃত সেরে ফজরের নামাজটা পড়ি, ছোটনের জন্য নিঃশব্দে প্রার্থনা করি। তারপর ভেতরের টানা বারান্দাটাতে চেয়ার টেনে বসি।

বারান্দা থেকে উঠোনে নামার জন্যে দুই ধাপের ছোট্ট সিঁড়ি। সিঁড়ির দু’পাশে দু’টি গোলাপ গাছ। ছোটনের লাগানো। ও গোলাপ বড় ভালোবাসে। গাছ দু’টির পরিচর্যা নিজেই করে। গাছ দু’টিতে সারা বছরই ফুল ফোটে, উঠোনের শোভা বাড়ায়, আমাদের চোখ ভরায়, মন ভরায়। তারপর  পাপড়িগুলো এমনিতেই ঝরে যায়।

আমি পরম মমতায় গোলাপ কুঁড়িগুলোতে আঙুল ছোঁয়াই ওদের আগামী দিনের ভোরে ফুটে ওঠার আনন্দময় প্রত্যাশায়। উঠোনের অপর প্রান্তে রান্না ঘর, টিউবওয়েল এবং পেয়ারা গাছ, কাগজি লেবুর গাছ আর ছায়াময় বকুল ফুলের গাছ। পেয়ারা গাছের ডালে ডালে চড়ুই পাখিরা খেলা করে, ঝরা বকুলের গন্ধে সারা সকালের ঘর, উঠোন ভরে যায়।  আমি বসে বসে চেয়ে চেয়ে দেখি, বুক ভরে সতেজ নিঃশ্বাস নিই।

এরমধ্যে নাজনিন এককাপ গরম লেবু চা আমার জন্য নিয়ে আসে। চায়ের কাপটা হাতে দিয়ে পেছন থেকে দু’হাতে আমার গলা জড়িয়ে ধরে মাথায় চুমু দেয়। মাথার চুলটা একটু টান দিয়ে দুষ্টুমির ভঙ্গিতে ছুটে পালায়। এটা আমার সাথে ওর নিত্যদিনের ভোরবেলার খেলা। আমি মৃদু হেসে চায়ের কাপে চুমুক দিই। চায়ের সাথে সকালের সকল শব্দ, দৃশ্য, গন্ধ একটা চিত্রময় স্বপ্ন দেখার আমেজে আমি যেন মগ্ন হয়ে থাকি। আরমানিটোলার মাহুতটুলির এই চারচালা পুরাতন টিনের বাড়িটা একটা স্বর্গ বলে মনে হয়।

জুলিয়াঁকে কথা দিয়েছিলাম তার ধানমন্ডি রেস্ট হাউজে এক সন্ধ্যায় যাব কফি পানে। কিন্তু দু’সপ্তাহেরও বেশি সময় চলে গেছে জুলিয়াঁর ওখানে আসা যাওয়া হয়নি বা তার খোঁজ নেওয়াও সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে আমি অবশ্য একটা কাজ করেছি। আলিয়ঁজ ফ্রসেঁজে প্রাইমারি ল্যাংগুয়েজ কোর্সে ভর্তি হয়েছি। প্রাইমারি লেভেল থেকে মিড লেভেল, তারপর সিনিয়র লেভেল সম্পন্ন করতে হয়তো বছর খানেক সময় লাগবে। তা লাগুক। প্যারিসের আর্ট স্কুলের স্কলারশিপ জুটুক বা না জুটুক সে দেশের ভাষাটা মোটামুটি রপ্ত করতে পারলে এই বাংলাদেশেই দোভাষী বা ট্রান্সলেটর হিসাবে একটা সম্মানজনক আয় রোজগারের পথ সৃষ্টি হবে। খুব ভালো রেজাল্ট হলে ফরেন ল্যাংগুয়েজ ইনস্টিটিউট বা আলিয়ঁজ ফ্রসেঁজেই খণ্ডকালীন শিক্ষকতার চাকরি পাওয়া যায় বলে শুনেছি।

আমি সিনেমার ব্যানার আঁকার কাজ ছেড়ে দিয়েছি। কোচিং সেন্টারে শিক্ষকতার কাজটা হাতে রেখেছি সপ্তাহে তিনদিন যে তিনদিন আলিয়ঁজ ফ্রসেঁজে আমার ক্লাস নেই। রিকশা পেইন্টিং এর কাজটা একেবারে ছাড়তে পারিনি খলিল চাচার অনুরোধ ও তার বদান্যতায়। তিনি তার কথা রেখেছেন। আমাকে একটা নতুন রিকশা উপহার দিয়েছেন। এই রিকশায় আমি এখনো কোনো সাজসজ্জা করিনি, কোনো ছবি আঁকিনি। ভেবে রেখেছি আমার রিকশায় সাজসজ্জা হবে ব্যতিক্রম, পেছনের ছবি হবে এমন অন্যরকম যা ঢাকা শহরের হাজার রিকশার  ভিড়ে এই রিকশাটি চেনা যাবে এক মুহূর্তেই। লোকে বলবে, এই রিকশাটি আর কারো নয় শুধু শিল্পী তাইমুরের।

রিকশাটা যেদিন পেলাম সেদিন বিকেলে ছোটন আর নাজনিনকে নিয়ে নিজেই রিকশা চালিয়ে মহানন্দে ঘুরে বেড়িয়েছি ঢাকা শহরের নবাবপুর, গুলিস্তান, রমনায়। ওরা মহাখুশি। এখন সপ্তাহে তিনদিন ধানমন্ডির আলিয়ঁজ ফ্রসেঁজে যাই নিজের রিকশা নিজেই চালিয়ে। আমি রিকশা ভাড়ায় চালাই না। রিকশার পেছনে লাল রঙে, ছোট্ট করে লিখে রেখেছি প্রাইভেট। অনলি ফর তাইমুর।

রাস্তার ট্রাফিক পুলিশ আমাকে কিছু বলে না। কিন্তু আমার বন্ধুরা, পরিচিতজনেরা ভীষণ অবাক হয়। আমাকে কেউ কিছু জিজ্ঞেস না করলেও বাবাকে তাদের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। বাবা কী বলবেন?আক্ষেপের স্বরে শুধু বলেন, আমি শিব গড়তে বাঁদর গড়েছি। বাঁদরটা অতি আনন্দে এখন এডালে ওডালে তার খেয়াল খুশিমতো দোল খায়। রিকশাটা চালাচ্ছে সেই খুশিতেই। আমি আর কী বলব?
শুভানুধ্যায়ীরা আফসোস করেন, আহারে এমন মেধাবী ছেলেটা কি হতে কী হল? না হল ডাক্তার, না ইঞ্জিনিয়ার? এখন হয়েছে রিকশাওয়ালা।
মা’র মুখে এসব কথা শুনে হা হা করে হেসে উঠি। গেয়ে উঠি- রিকশাওয়ালা বেচারা...।

সপ্তাহখানেক পরের ঘটনা।
সকালে সূর্য ওঠার কালে আমি আমাদের বাড়ির বাইরের ভাঙা গেট সংলগ্ন শিউলি গাছটার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম। গাছটার সঙ্গেই শেকল বাঁধা আমার রিকশাটা। ভাবছিলাম এই রিকশাটা কোন পদ্ধতিতে সাজাব? পুরাতন আদি জাপানি বা চীনা রিকশার আদলে নাকি বাংলাদেশি বর্তমান আদলেই? বিদেশি রিকশার আদলে সাজসজ্জা করতে হলে রিকশার কাঠামো, ডিজাইন সবকিছুর পরিবর্তন করতে হবে যা মেলা খরচের ব্যাপার। সুতরাং এই বিলাসী চিন্তার বাস্তবায়ন এখন সম্ভব নয়। মনে মনে বলি, হে আমার প্রিয় বাহন, তুমি এখন যেমন আছ তেমনটাই থাক। তোমার পেছনে কোন নারী, কোনো ভালোবাসার মুখ আমি আঁকব তা ভেবে দেখব।

গলি পথে সামনের দালানকোঠার ফাঁক দিয়ে আমি এখন সূর্যটাকে দেখতে পাচ্ছি। ভোরের নরম আলো আমার চোখে মুখে ছড়িয়ে পড়ছে। আমি হাতটা আধামুঠো করে, মুঠোর ফাঁক দিয়ে দেখতে চেষ্টা করলাম সূর্যটাকে। তারপর যেন বালকের মতো মুঠোয় ভরে নিতে চেষ্টা করলাম একটা কবিতার মতো ‘সূর্যটাকে স্বপ্নের মতো খুব দ্রুত ভরে নাও শক্ত হাতের মুঠোয়, কারণ স্বপ্ন যদি ঝরে যায় জীবনটা হবে ডানাভাঙা পাখির মতো। আর কখনো উড়বে না আকাশে ...।’

সহসা আমার ভাবনা, কবিতায় ছেদ ঘটিয়ে কচ্ছপের মতো পিঠওয়ালা একটা ভোক্সওয়াগন গাড়ি মাহুতটুলির এই গলিপথে আমাদের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। আমাকে অবাক করে গাড়ি থেকে নামলেন চারুকলা ইনস্টিটিউটের সেই অধ্যাপক আমানুল্লাহ কবির। আমাকে গেটের সামনে বাইনোকুলারে সূর্য দেখার ভঙ্গিতে হাত মুঠো করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মৃদু হেসে বললেন, বাড়িটা চিনতে আমার একটুও কষ্ট করতে হয়নি। তুমি, তোমার বাবা এই এলাকার খুব নামকরা মানুষ। তা আমাকে কি বাইরেই দাঁড় করিয়ে রাখবে? ভিতরে বসতে বলবে না?

আমি লজ্জিত কণ্ঠে বললাম, না না, তা কী করে হয়! আসুন স্যার, ভেতরে আসুন।

বাইরের বাবার ঘরটাই আমাদের অতিথি আপ্যায়নের ঘর। বাবা বিছানায় আধশোয়া অবস্থায় খবরের কাগজ পড়ছিলেন। বিছানাটা এলোমেলো, ঘরটাও অগোছালো। বাবা আমার সঙ্গে এমন একজন সুভদ্র পরিপাটি মানুষকে ঘরে ঢুকতে দেখে হাতের কাগজ ফেলে একটা বিস্ময় বিমূঢ় দৃষ্টিতে তাকালেন। ত্রস্ত ও লজ্জিত ভঙ্গিতে নিজের অগোছালো বিছানার কাঁথা চাদর ঠিক করবেন না কি উঠে অতিথিকে সালাম ও স্বাগত জানাবেন তা ঠিক করে বুঝে উঠতে পারলেন না। আমানুল্লাহ কবির স্যারকে কোনোক্রমে সালাম জানিয়ে তাকে বেতের চেয়ারটাতে বসতে অনুরোধ করলেন। আমানুল্লাহ স্যার আমাদের এই অপ্রস্তুত ও বিব্রত ভাবটা কাটাতে হেসে বললেন, স্যার, আমার জন্যে ব্যস্ততার কিছু নেই। আমি দুঃখিত ও লজ্জিত যে কোনো সংবাদ না দিয়েই হঠাৎ করে আপনার বাসায় এসেছি। তবে আসতে বাধ্য হয়েছি আপনার এই গুণধর সুপুত্রটির জন্যে।

আমার জন্যে এই বাসায় ওনার আসা! আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না। বাবাও বোধহয় ঠিক বুঝে উঠতে পারলেন না। তিনি তো অধ্যাপক আমানুল্লাহ কবির স্যারের সম্পর্কে কিছুই জানেন না বা তাকে চেনেন না। তিনি বোকার মতো একবার আমার দিকে আর একবার আমানুল্লাহ কবির স্যারের দিকে তাকালেন কিছুটা প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে।
আমি বাবাকে বললাম, বাবা ইনি ঢাকা আর্ট কলেজের অধ্যাপক, একজন নামী দামি চিত্র শিল্পী। ওনার সঙ্গে সম্প্র্রতি আমার পরিচয় হয়েছিল।
বাবা বললেন, আচ্ছা তাহলে তোমরা কথা বল। আমি ভেতরে যাই। নাজনিনকে বলি চা-নাশতা দিতে।
আমানুল্লাহ স্যার বাধা দিয়ে বললেন, না, না স্যার আপনি যাবেন না। আপনি বসুন। আমি আপনার সঙ্গেই কিছু গল্প করব। আপনার ছেলের সঙ্গে পরে কথা হবে।
বাবা ভদ্রতার খাতিরে নিতান্ত বাধ্য হয়েই বসে থাকলেন। আমার মনে হল বাবার সাথে আমানুল্লাহ স্যারের এই আলাপ-ইচ্ছা একটা গৌরচন্দ্রিকামাত্র। আমানুল্লাহ স্যার বেশ সম্ভ্রমের সাথেই বললেন, শুনেছি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে আপনি এক দুর্ধর্ষ গেরিলা যোদ্ধা ছিলেন।

বাবা মুদু হাসলেন। বললেন, ওটা এখন বিস্মৃত ইতিহাস। বর্তমানটা হচ্ছে আমি আরমানিটোলা হাইস্কুলের অঙ্কের টিচার। ছাত্ররা আড়ালে আবডালে ভ্যাংচায়। বলে, লেংচু মাস্টার।

আমানুল্লাহ স্যার আক্ষেপের সুরে বলেন, ছিঃ ছিঃ এ কী কথা! এটা অন্যায়, ভারি অন্যায়। এটা মুক্তিযুদ্ধের অপমান, মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান। স্কুল অথরিটি শুড টেক ড্রাস্টিক অ্যাকশন এগেনেস্ট দেম দোজ হু আর্টার দিস সর্ট অব ফিলদি ওয়ার্ডস।

বাবা বললেন, আমি কিছু মনে করি না। আমি ল্যাংড়া মানুষ, ল্যাংচায়ে হাঁটি। এটাই সত্য। তাই আমি মান-অপমান নিয়ে ভাবি না।

আমানুল্লাহ স্যার বললেন, স্যার ভাবেন না বলেই আপনাদের মতো সৎ, নির্লোভ মানুষদের এই দশা। স্বৈরতান্ত্রিক কুশাসনে এখন রাজাকার, মুক্তিযোদ্ধা সব ভাই ভাই। সবাই একই নদীর ঘোলাস্রোতে সাঁতার কাটছে। জাল ফেলে রূপোলি ইলিশ, রুই-কাতলা ধরছে। আঙুল ফুলে কলাগাছ হচ্ছে, ব্যাংকের পর ব্যাংক উজাড় হয়ে যাচ্ছে। অথচ আপনি

বাবা হেসে বাধা দিয়ে বললেন, অথচ আমি লেংচুই রয়ে গেলাম।

আমানুল্লাহ স্যার আবার আক্ষেপের স্বরে বললেন, ভেরি স্যাড। না আপনি কিছু করতে পারলেন, না আপনার এই ছেলেটি। এত ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট ছিল অথচ ...

বাবা অধ্যাপককে কথা শেষ করতে দিলেন না। আমাকে অবাক করে দিয়ে বলে উঠলেন, না, না, ওকে এভাবে দোষারোপ করা বোধহয় ঠিক হবে না। সবকিছুর জন্যে দায়ী আমি। আমি দোষ দিই আমার ভাগ্যের, দোষ দিই পিতা হিসাবে আমার অক্ষমতার। আমি আমার সন্তানদের জন্যে গর্বিত। এই আমার এই ছেলেটি তিমুও আমাদের শ্রদ্ধা করে, সংসারটাকে ভালোবাসে। ভাইবোনকে আরো বেশি ভালোবাসে। আই ফিল প্রাউড অব হিম।

বাবার কথায় অনেকদিন পর আমার বুকের ভেতর যেন একটা আনন্দেরমেঘ গুড়গুড়িয়ে ডেকে উঠল। বৃষ্টিজলে আমার চোখের আকাশ যেন ভরে উঠতে চাইল। আমি প্রাণপণে নিজেকে সংবরণ করে মাথা নিচু করে বসে রইলাম।

ইতোমধ্যে নাজনিন ট্রেতে করে চা, বিস্কুট আর ছোট্ট ফুলতোলা কাচের বাটিতে দুধসেমাই নিয়ে এল। সাজিয়ে দিল আমানুল্লাহ স্যারের সামনে বেতের টেবিলের ওপর। তারপর সালাম দিয়ে চলে গেল ভেতরে। বাবা বললেন, অধ্যাপক সহেব, আমি দরিদ্র মানুষ। এই সামান্য চা-নাশতা খেলে আমি আনন্দিত হব।
বাবার কথায় অধ্যাপক সাহেব শুধু চায়ের কাপটা টেনে নিলেন। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললেন, শুনেছি আপনার দুটি ছেলে। আর একটি ছেলে কই?
বাবা বললেন, ও ঘুমাচ্ছে।
অধ্যাপক হাতঘড়ি দেখলেন। এখন বেলা প্রায় সাড়ে আটটা।
বাবা বললেন, ও রাতভর পড়ে। সকালের দিকে একটু ঘুমোয়।

অধ্যাপক সাহেবের এবার আমাকে নিয়ে তার প্রশ্নাবলি। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বললেন, সেই ফরাসি ভদ্রমহিলার সাথে প্রায়ই আমার দেখা হয়। দেখা হলেই তোমার খোঁজ করেন, তোমার কথা জানতে চান। কিন্তু আমি কী বলব? তিনি আমার সঙ্গে তোমাদের বাসায় আসতে চেয়েছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করে তোমাদের বাসায় তার আসাটা তোমাদের জন্যেই এমব্যারাসিং হবে বলে আমি না করেছি।
আমি বললাম, আপনি ঠিকই করেছেন স্যার। এখানে তার হঠাৎ করে আসাটা ঠিক না।
অধ্যাপক রহস্যময় দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন। বললেন, তোমার সম্পর্কে তার একটা অন্যরকম ধারণা। খুব প্রশংসা করেন তোমার। শি ওয়ান্টস টু ডু সামথিং ফর ইউ।
আমি বললাম, তিনি আমার সম্পর্কে কী ভাবেন না ভাবেন তা আমার জানা নেই। তবে শিগগিরই তার সাথে দেখা করব।
অধ্যাপক বললেন, তিনি বোধহয় সামনের সপ্তাহেই প্যারিস চলে যাবেন।
আমি বললাম, তার যাবার আগেই তার সাথে দেখা করতে চেষ্টা করব।
অধ্যাপক সাহেব মৃদু হাসিতে বললেন, হ্যাঁ ভদ্রতার খাতিরে তার সঙ্গে তোমার একবার দেখা করা উচিত। তিনি কী বলতে চান শোনো। তবে আমার একটা কথা, তুমি কি তোমার এইসব রিকশা পেইন্টিং ছাড়াও তোমার ভবিষ্যতের জন্যে, তোমার পরিবারকে সাপোর্ট দেবার জন্যে নতুন কিছু করার চিন্তা-ভাবনা করছ?
- জি, করছি।
- কী করছ?
- জি, রিকশা চালাচ্ছি।

অধ্যাপক মহোদয় আমার কথায় যেন আকাশ থেকে পড়লেন। হতভম্ব দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন কয়েক মুহূর্তে। বিস্মিত কণ্ঠে বললেন,
- রিকশা চালাচ্ছ তুমি! তুমি রিকশাওয়ালা!
- স্যার আপনি যেমন ভোকসওয়াগনওয়ালা, আমিও তেমনি একজন রিকশাওয়ালা। দ্যাট্স এ ডিফারেন্স বিটুইন অ্যান আর্ট কলেজ প্রফেসর অ্যান্ড অ্যান অর্ডিনারি রিক্শপুলার অর রিক্শ পেইন্টার লাইক মি। ঐ যে বাইরে রিকশাটা দেখছেন ওটা আমার ব্যক্তিগত। ওটা আমি নিজেই চালিয়ে আলিয়ঁজ ফ্রসেঁজে ল্যাংগুয়েজ কোর্স করতে যাই। মাঝে মধ্যে মা, ভাইবোনদের নিয়ে ঐ রিকশাতে মহানন্দে ঘুরে বেড়াই।

স্যার আমানুল্লাহ তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে আমার বাইরের আর ভেতরের সবকিছু পড়ার চেষ্টা করলেন। বোধহয় তিনি কিছুটা আহত বোধ করেছেন আমি তাকে ভোকসওয়াগনওয়ালা বলাতে। কিন্তু সেটা তিনি বুঝতে দিলেন না। বললেন, ইফ ইউ থিংক ইউ আর রাইট দেন ইট্স ওকে। কিন্তু আনন্দ উপভোগের মধ্যে ফিউচার ক্যারিয়ারটাও ভাবনার মধ্যে রেখো। জীবনটাকে চিনতে হলে তোমাকে একটা নির্দিষ্ট পথ লক্ষ্য করে এগুতে হবে। তবে তা রিকশায় নয়, আমার মতো সস্তা ভোকসওয়াগনেও নয়। আমি স্বীকার করছি তোমার ট্যালেন্ট আছে, মেধা আছে তবে তা এভাবে নষ্ট করো না। তুমি যদি চাও আমি তোমাকে আর্ট কলেজে ভর্তি করে নিতে পারি।
আমি বললাম, স্যার আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ। আর্ট কলেজে পড়া আমার সাধ্যে কুলোবে না।
কবির স্যার বললেন, আমি স্কলারশিপের ব্যবস্থা করে দেব। দ্যাট উইল হেলপ ইউ এ লট।
- স্যার, সেটা আপনার মহানুভবতা, গ্রেট ম্যাগনানিমিটি অব ইয়োর হার্ট। ঐ সামান্য স্কলারশিপে আমার কিছুই হবে না। আর্ট কলেজে চার বছর ধরে পড়তে হলে আমার বাইরের সব রোজগারপাতি বন্ধ হয়ে যাবে।

কবির স্যার এ ধরণের কথায় বোধহয় খুব বিরক্ত বোধ করলেন। তার এ ধরণের অফার অনেক ভর্তি ইচ্ছুক শিক্ষার্থীর জন্যে একটা লোভনীয় সুযোগ। কিন্তু এই অহংকারী যুবক এ ধরণের আচরণ করছে কেন? ঐ ফরাসি তরুণী জুলিয়াঁর অনুরোধেই তো তার এখানে আসা। কিন্তু এই যুবক জুলিয়াঁকে প্রণয় ফাঁদে ফেলে প্যারি যাবার স্বপ্ন দেখছে কিনা তা তিনি ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না। এসব তুচ্ছ বিষয় নিয়ে তার আর কথা বলতে ভালো লাগছে না। উঠবার আগে তিনি সৌজন্যবশত ফজলুল হাসানকে জিজ্ঞেস করলেন, স্যার আপনি সম্মানিত ব্যক্তি। আপনার মুখেই জানতে চাই আপনি কি তাইমুরের পিতা হিসাবে তার বক্তব্যকে সমর্থন করেন?

ফজলুল হাসান অসহায় কণ্ঠে বললেন, অধ্যাপক সাহেব, এ বিষয়ে আমার অক্ষমতা, দুঃখবোধ অনেক বেশি। ও যা করছে সবকিছুই করছে ওর ছোটভাই ছোটনের চিকিৎসার জন্যে। প্রতিমাসে বিপুল খরচে তার রক্তশোধন করাতে হয়। কারণ আমার ছোটনের ব্লাড ক্যান্সার।

অধ্যাপক আমানুল্লাহ কবির বজ্রাহতের মতো কয়েক মুহূর্ত বসে রইলেন। তারপর ম্লান মুখে নিঃশব্দে উঠে চলে গেলেন।

চলবে

 

লাইফ অব এ রিকশা পেইন্টার (পর্ব এক)
লাইফ অব এ রিকশা পেইন্টার (পর্ব দুই)
লাইফ অব এ রিকশা পেইন্টার (পর্ব তিন)
লাইফ অব এ রিক্শ পেইন্টার (পর্ব চার)

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top