সিডনী বৃহঃস্পতিবার, ২৩শে সেপ্টেম্বর ২০২১, ৮ই আশ্বিন ১৪২৮

লাইফ অব এ রিক্শ পেইন্টার (পর্ব আঠারো) : কাজী মাহমুদুর রহমান


প্রকাশিত:
২৬ জুলাই ২০২১ ১৪:২৫

আপডেট:
২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১ ২৩:৫৩

 

বাবা হাসপাতালের কেবিনে আছেন। বলা যায় তিনি বহির্জগত থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। আমি, জয়ী মা, বড়দা এবং খলিল চাচা ছাড়া আর কেবিনে প্রবেশ অন্য দর্শনার্থীদের জন্যে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বাবার নিরাপত্তার জন্যে বাইরে পুলিশের সশস্ত্র পাহারা আছে বটে কিন্তু ডাক্তার ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কঠোর নিষেধ আছে এই সংকটময় মুহূর্তে কোনো পুলিশ কর্মকর্তা বাবাকে কোনো প্রকার জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবেন না। ছোটন অথবা বল্টুর মৃত্যু সংবাদও তাকে জানাতে পারবেন না।

বাবাকে দেখাশুনার ভার আমরা পালাক্রমে ভাগ করে নিয়েছি। বড়দা রাতটা বাবার কাছে থাকে। জয়ী মা সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত, আর আমি স্কুল থেকে ফিরে বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত বাবার সেবা ও পরিচর্যা করি। প্রাকৃতিক ক্রিয়াকর্ম ও খাবার সময়টুকু ছাড়া বাবা সর্বক্ষণই প্রায় ঘুমিয়ে থাকেন ওষুধের প্রভাবে। বেডে তাকে সারাক্ষণই চিৎ হয়ে শুয়ে থাকতে হয়। তার নড়াচড়ার বা পার্শ্বপরিবর্তনের কোনো সুযোগ নেই। কারণ তার আহত পা’টি ব্যান্ডেজ মোড়া এবং সামান্য উঁচুতে টানা দিয়ে বাঁধা।

বাবাকে নিয়ে আমাদের এই রুটিনবাঁধা সময়ের মধ্যেই এক দুপুরে উদভ্রান্তের মতো আমাদের বাসায় ছুটে এল শ্যামশ্রী। সে অনেক পরে বড়দার কাছে আমাদের এই মহাবিপর্যয়ের কথা জেনেছে এবং জানার পরই ছুটে এসেছে। জয়ী মা তখন বাসায়, আমি তখন সবেমাত্র স্কুল থেকে ফিরেছি। শ্যামশ্রী এসেই জয়ী মা এবং আমাকে জড়িয়ে ধরে কান্না হায়রে ছোটন দা, তুই যে আমার হাতের লুচি, তরকারি খেতে চেয়েছিলি, তোকে তো আমি কিছুই খাওয়াতে পারলাম না। তুই না খেয়েই চলে গেলি দাদারে আমার। কেন চলে গেলি এভাবে ...

ওর কান্নায় আমরা সবাই কাঁদলাম আবার। জানলাম, শুধু জীবনের নয়, মৃত্যুরও হৃদয় আছে ভালোবাসার।

এক বিকেলে আমি বাবার কেবিনে একা। বাবা তখন জেগে। আমি তখন বাবাকে চামচে করে একটু একটু করে স্যুপ খাইয়ে দিচ্ছি। জয়ী মা হয়তো একটু পরেই বাসা থেকে আসবেন। সেই মুহূর্তে মধ্যবয়সী এক অচেনা দর্শনার্থী প্রবেশ করলেন কেবিনে। কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে এই অচেনা দর্শনার্থীর প্রবেশে আমি বিস্মিত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালাম। ভদ্রলোক আমার বিস্ময় জিজ্ঞাসু দৃষ্টির প্রত্যুত্তরে বললেন, স্যরি মা মনি, আমি তোমাদের অনুমতি ছাড়াই ঢুকে পড়েছি। আমি একজন তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তা। তোমার বাবাকে দু’একটি কথা জিজ্ঞেস করেই চলে যাব। তুমি কি অনুমতি দেবে?

আমি বললাম, অনুমতি ছাড়াই যখন ঢুকে পড়েছেন তখন আর জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতির কী প্রয়োজন? বাবাকে বললাম, বাবা এই ভদ্রলোক একজন পুলিশ কর্মকর্তা। তিনি তোমাকে কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করতে চান বোধহয় সে রাত্রের ঘটনা সম্পর্কে। তুমি কি কিছু বলবে?

 

বাবা বললেন, উনি কী জানতে চান?

পুলিশ অফিসার বললেন, সেদিন রাত্রে যে ছেলেটি আরমানিটোলার মাঠে আপনাকে প্রহার করেছিল সে কি বল্টু?

বাবা বললেন, জি সে বল্টু।

পুলিশ অফিসারের প্রশ্ন, সে মটোর সাইকেলে আপনার কাছে এসেছিল?

- হ্যাঁ।

- তার মাথায় হেলমেট ছিল?

- ছিল।

- তাহলে কী করে বুঝলেন সে বল্টু?

- বল্টু আমার ছাত্র। আরমানিটোলা স্কুলের সবচাইতে বেয়াড়া ছাত্র। আমি তাকে হাড়ে হাড়ে চিনি।

- হেলমেট পরা সে ব্যক্তি তো অন্য কেউ হতে পারে? হতে পারে কোনো ছিনতাইকারী।

বাবা ক্লান্ত কণ্ঠে হাসলেন। বললেন, না, ছিনতাইারীরা জানে এই বৃদ্ধের পকেটে একটা তজবি ছাড়া আর কিছুই থাকে না। আরমানিটোলার মাঠে মটোর সাইকেল নিয়ে যে আমার পথরোধ করেছিল তার অঙ্গভঙ্গি, কণ্ঠস্বর আমার দশ বছর ধরে চেনা।

- বল্টু আপনার পথরোধ করে কী এমন কথা বলেছিল?

বাবা বোধহয় এবার একটু উত্তেজিত হলেন। বললেন, ও এমন কিছু অসভ্য, অশালীন কথা বলেছিল যা আমার পক্ষে সহ্য করা সম্ভব হয়নি।

- তাই আপনি তাকে আপনার হ্যান্ডক্রাচ দিয়ে আক্রমণ করেছিলেন।

- হ্যাঁ। কিন্তু আমি তাকে সরাসরি আঘাত করিনি। আমার হ্যান্ড ক্রাচ দিয়ে তার মটোর সাইকেলের হেড লাইটে আঘাত করেছিলাম।

- সে আপনাকে কী এমন অপমানজনক, অসভ্য কথা বলেছিল যার জন্য তাকে আপনি আক্রমন করলেন?

বাবা আরো উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন, অফিসার, আপনারা সবকিছু জেনে শুনেও আমাকে অবান্তর প্রশ্ন করছেন? নকলের দায়ে তাকে পরীক্ষার হল থেকে আমি বের করে দিয়েছিলাম। আমার ওপর প্রতিশোধ নিতে সে আনন্দময়ী গার্লস স্কুলের সামনে আমার এই কন্যাকে অশ্রাব্য ভাষায় গালি দিয়েছিল, তার ওড়না কেড়ে নিয়েছিল। যে কারণে স্কুল কর্র্তপক্ষ সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে তাকে স্কুল থেকে আজীবনের জন্যে বহিষ্কার করেছিল এবং পুলিশ কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করা হয়েছিল তাকে গ্রেপ্তার করতে। কিন্তু যেহেতু তার পিতা সরকারি দলের প্রভাবশালী নেতা, সে কারণে আপনারা তাকে গ্রেপ্তারের কোনো চেষ্টাই নেননি। আপনাদের নিস্ক্রিয়তার কারণেই সে আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল। তাই সে নির্লজ্জের মতো আরমানিটোলার মাঠের মধ্যে অশ্লীল ভাষায় আমার এই নাবালিকা কন্যাকে বিবাহের প্রস্তাব দিয়েছিল। নতুবা ওকে অপহরণ করে নেবার হুমকি দিয়েছিল। অফিসার আমার এই কন্যাটি যদি আপনার কন্যা হত তাহলে ঐ অবস্থায় আপনি কী করতেন? ঐ দুষ্কৃতিকারী বল্টু কি এতদিন বেঁচে থাকত? সে অবশ্যই মরত। আপনাদের সঙ্গে তথাকথিত বন্দুকযুদ্ধে সঙ্গে সঙ্গেই নিহত হত। কিন্তু তা হয়নি। হবেও না।

পুলিশ কর্মকর্তা কয়েক মুহূর্ত নিশ্চুপ বসে রইলেন। তারপর উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, স্যরি স্যার। আপনাকে বোধহয় কেউ বলেনি বল্টু আর জীবিত নেই। সে যে রাত্রে আপনাকে প্রহার করেছিল সেই রাত্রেই সে তার বাড়ির সামনে নির্মমভাবে নিহত হয়েছে। হি হ্যাজ বিন কিলড।

বাবা ভীষণ আশ্চর্য। এ কী বলছেন? বল্টু নিহত! কে তাকে হত্যা করল?

- আপনার ছেলে ছোটন।

- আমার ছেলে ছোটন! হোয়াট ননসেন্স টক! অসম্ভব আই ডোন্ট বিলিভ। ও ক্যানসার রোগী। ভীষণ দুর্বল। ওর পক্ষে বল্টুর মতো একটা।

পুলিশ অফিসার বাধা দিয়ে শান্ত কণ্ঠেই বললেন, হ্যাঁ তা জানি, ছোটনের ক্যানসার ছিল, ভীষণ দুর্বল ছিল। কিন্তু দুর্বলেরাও কখনো কখনো মারাত্মক হিংস্র বাঘ হয়ে ওঠে। খুনের নেশায় তাকে পেয়ে বসে যখন দ্যাখে তার বোন অপমানিত হচ্ছে, পিতা অপমানিত, আহত হচ্ছে অথচ প্রতিকার নেই। আপনার পুত্র ছোটন তার প্রতিশোধ নেবার স্পৃহাকে অবদমন করতে পারেনি। সে বল্টুকে হত্যার লিপ্সায় বল্টুদের বাড়ির গেটের সামনেই আত্মগোপন করেছিল। রাত এগারোটায় বল্টু যখন তার আড্ডা সেরে বাড়ি ফিরে এসেছিল বন্ধ গেটের সামনে হর্ণ বাজাচ্ছিল তখন ওঁৎ পেতে থাকা ছোটন অতর্কিতে বল্টুর গলায় মাফলার পেঁচিয়ে হ্যাচকা টানে তাকে মাটিতে ফেলে দেয় এবং হাতের ছুরি দিয়ে উপর্যপুরি আঘাতে তাকে হত্যা করে।

আমি ভীষণ ভয়ে থর থর করে কাঁপতে লাগলাম। বাবা চিৎকার করে উঠলেন, আমার ছোটন! আমার ছোটন এখন কোথায়?

পুলিশ অফিসার শূন্যে আঙুল তুলে বললেন, হি ইজ নো মোর। ফোরকান খানের সিকিউরিটি গার্ড সঙ্গে সঙ্গে তাকে গুলি করেছিল। হি ডায়েড অন দ্য স্পট। আ অ্যাম স্যরি স্যার, এই স্যাড নিউজটা আমাকেই বলতে হল।

বলে পুলিশ অফিসার বেরিয়ে গেলেন। আমি কাঁদতে কাঁদতে বাবার বুকের ওপর মাথা রাখলাম।

বাবা চোখ বুজে যেন সান্ত¦না দেবার ভঙ্গিতে আমার মাথায় হাত রাখলেন। আমি বাবার বুক থেকে মাথা উঠালাম। দেখলাম বাবার দু’চোখে পানির নিঃশব্দ ঝর্ণাধারা। বিড়বিড় করে প্রার্থনার ভঙ্গিতে বললেন, ছোটন, ওহ্ মাই সন, আ অ্যাম হ্যাপি টু নো দ্যাট ইউ ডিডন্ট সারেন্ডার টু দ্য ইভিল পাওয়ার লাইক ক্যানসার অর বল্টু। ইউ স্যাক্রিফাইসড ইয়োরসেলফ। ইউ গ্লোরিফায়েড মি, মাই ফ্যামিলি।আ অ্যাম প্রাউড অব ইউ ...। মে আল্লাহ ব্লেস ইউ।

 

পায়ে দু’টি অপারেশনের পর বাবাকে প্রায় দেড়মাস পর হাসপাতাল থেকে রিলিজ করা হল। ডাক্তারের নির্দেশানুযায়ী প্রথমে তাকে হুইল চেয়ারে চলাফেরা করতে হবে। পরে অবস্থার উন্নতি হলে দু’টি ক্রাচে ভর দিয়ে ঘর, বারান্দায় চলাফেরা করতে পারবেন। স্কুল থেকে আপাতত তিন মাসের সবেতন ছুটি মঞ্জুর করা হয়েছে। স্কুলের সকল শিক্ষকদের আন্তরিক সহযোগিতায় কিছু আর্থিক অনুদানও পাওয়া গেছে। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় তা সমুদ্রে বিন্দুমাত্র। হাসপাতালের বকেয়া বিল, ওষুধপত্র, সংসারের যাবতীয় খরচ মেটাতে বড়দা উদয়াস্ত পরিশ্রম করে চলেছে। জয়ী মা কাউকে কিছু না জানিয়ে তার বেশ কিছু গয়নাগাটি বিক্রি করে দিয়েছেন। আমাদের সংসার তখন আঁধার অম্বরে প্রচন্ড ডম্বরু’র ভয়ঙ্কর বাজনা। তবুও আমাদের আশা আর অপেক্ষ। রাত্রি যতই অন্ধকার হোক না কেন সকালের সূর্যটা তো উঠবেই।

প্রায় চারমাস পর বাবা যখন আগের মতোই একটা হ্যান্ড ক্রাচে ভর দিয়ে একা চলবার মতো শারীরিক সক্ষমতা ফিরে পেলেন তখন তিনি আবার স্কুলে জয়েন করলেন। তবে আগের মতো পায়ে হেঁটে স্কুলে যাতায়াত নয়। বড়দা খলির চাচাকে বলে নিজের রিকশাটিই বাবাকে স্কুলে রোজ সকাল, বিকেলে আনা নেওয়া আর প্রয়োজনীয় হাটবাজার করার জন্য একজন রিকশাচালক ঠিক করে দিল। এই বাঁধাধরা সময় ও কাজের বাইরে রিকশাচালক যাত্রী বহন করে যা আয় করবে তা তার। বাবার আপত্তি সত্ত্বেও শারীরিক দুর্বলতার কারণে ব্যবস্থাটি মেনে নিতে বাধ্য হলেন।

ছোটন মারা যাবার পর ওর বিছানা, বইপত্র, কাপড় চোপড় যেমন অবস্থায় রেখে গিয়েছিল তেমন অবস্থায় পড়ে ছিল। একদিন আমি আর জয়ী মা দু’জনে মিলে ছোটনের বিছানা, বইপত্র, সব ছড়ানো ছিটানো স্মৃতিগুলো গুছালাম। বিছানার ময়লা চাদর, বালিশ সব পাল্টালাম। সবকিছু সাজিয়ে রাখলাম নতুন করে তবে আগের মতোই। আমাদের কল্পনা, ভাবনাছোটন যেন বাইরে থেকে এসে তার সাজানো বিছানা দেখে অবাক হবে। মনে মনে আনন্দিত হলেও কৃত্রিম রুষ্ট কন্ঠে বলবে, মা, নাজু তোরা কেন আমার বইপত্র, বিছানা এমন অগোছাল করে রেখেছিস? আমার দরকারি বই, নোট-খাতা কোথায় রাখলি? কোনটা এখন কোথায় খুঁজে পাব?

শ্যামশ্রী দি সেই মুহূর্তে রুচি, তরকারির থালা হাতে হাসতে হাসতে বলবে, ছোটনদা শান্ত হয়ে বসো তো। এসো আমি নিজ হাতে তোমাকে লুচি, তরকারি খাইয়ে দিই।

ছোটনের মুখে উজ্জ্বল হাসি।

কিন্তু আমাদের চোখে নিঃশব্দ অশ্রু। হায়রে ছোটন, তুই যে আমাদের এই সংসারের সবকিছু অগোছাল করে দিয়ে ধবধবে সাদা কাপড়ে সেজেগুঁজে কোন অচেনা পথে, কোন অন্ধকার গুপ্তঘরে শুয়ে আছিস? আঃ সে যে কী কষ্ট তা কি তুই জানিস? তুই কি দেখিস?

ছোটনের ডায়েরির মধ্যে ওর একটা অসমাপ্ত কবিতার খসড়া পেলাম। ওর অসহায়তা, ওর যন্ত্রণাবোধ থেকেই বোধহয় এই কবিতাটি লেখার চেষ্টা করেছিল-

‘আমি চাই
আমার কবিতা হোক অকাল কইরে
উন্মাদ হোক শিষ্ট-অশিষ্ট
সুশীল জ্ঞানী শেয়ালের দল
ধূর্ত বুড়ো হাবড়ার দল
রংবাজ যুবকের দল;
তাদের নখ-দন্তের হিংস্র অস্ত্র নিয়ে প্রবল আক্রোশে
একে অপরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়–ক
পরষ্পরের মাংস ছিঁড়ে খাক;
ওরা মারতে মারতে, মরতে মরতে
ওরা পোড়াতে-পোড়াতে, পুড়তে-পুড়তে
ওরা মরুক
ওরা মরুক
ওরা মরুক।’

কবিতার প্রতিটি লাইনের মতো ছোটনের সব ঘৃণার মানুষ মরেছে, মরছে আর ছোটনও মরেছে আমাদের নিঃস্ব করে।

এক সন্ধ্যায় বাবা মাগরিবের নামাজ শেষে বিছানায় বসে নিঃশব্দে তফসিরে কোরান পড়ছিলেন। বাইরের বন্ধ দরজার খুব সামান্য শব্দে কেউ যেন কড়া নাড়ল। বাবা আমাকে ডাকলেন, নাজু মা, দ্যাখতো কে এলেন?

আমি এসে দরজা খুলতেই যাকে দেখলাম তাকে দেখেই ভীষণ চমকে উঠলাম। ভয়ে দুপা পিছিয়ে এলাম। খোলা দরজার ওপাশে বল্টুর বাবা ফোরকান খান। তবে সঙ্গে আর কেউ নেই। তিনি একাই এসেছেন। তার পরনে লুঙ্গি, পাঞ্জাবি, মাথায় টুপি। মুখে অযত্নে বর্ধিত দাড়ি, গোঁফে আচ্ছন্ন, বিধ্বস্ত চেহারার একটি বিবর্ণ মানুষ। দেহে সেই দাম্ভিকতার চিহ্ন বিন্দুমাত্র নেই।

ফোরকান খান আমার ভয় পাওয়া মুখ দেখে বললেন, মা, আমি তোমার আব্বাজানের সঙ্গে একটু দ্যাখা করতে আসছি। তুমি ভয় পাইয়ো না।

বাবা তার হাতের তাফসিরে কোরান বন্ধ করে বললেন, আসুন ফোরকান সাহেব। নাজু মা তুমি ভিতরে যাও। তোমার মাকে চা দিতে বল।

 

ফোরকান সাহেব ঘরের ভিতরে এসে সালাম দিয়ে বিছানায় বাবার পাশে প্রসারিত পায়ের কাছে বসলেন। বাবা বুঝে উঠতে পারছেন না এতদিন পর ফোরকান সাহেব এই রকম বিধ্বস্ত চেহারায় তার কাছে কেন এসেছেন?

ফোরকান সাহেব হঠাৎ করেই বাবার সেই ভাঙা পা’টা দু’হাতে জড়িয়ে ধরলেন। শোকার্ত কণ্ঠে বললেন, আমি কাবার ঘরে, আল্লাহর দরবারে মাফি মাঙতে যাইতেছি। কিন্তু আল্লার কাছে মাফি মাঙার আগে বড় বেশি দরকার আপনার কাছে মাফি মাঙা। আপনি যদি মাফ না করেন তা হইলে আল্লাও আমারে মাফ করবেন না।

বাবা ভীষণ বিব্রত ফোরকান সাহেবের এই অদ্ভুত আচরণে। তিনি তার পা থেকে ফোরকান সাহেবের হাত সরাতে চেষ্টা করছেন। কিন্তু ফোরকান সাহেব নাছোড় বান্দার মতো তার পা আঁকড়ে আছেন। টপ টপ করে তার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। কান্নাভরা কন্ঠে বলতেই থাকলেন, স্যার, আমি বড় পাপী। টাকা আর ক্ষমতা ছাড়া আমি আর কিচ্ছু বুঝি নাই। ছেলেটা উচ্ছন্নে যাইতেছে, ফেন্সি খাইতেছে, চান্দাবাজি করতাছে সব দেইখ্যাও আমি না দ্যাখার ভান করছি। ভাবছি এইসব উঠতি বয়সের সাময়িক দোষ। পরে ব্যবসা বাণিজ্যের যাঁতাকলে ফেলাইয়া দিমু। সব বাচলামি ঠিক হইয়া যাইব। কিন্তু পরিণামে কী হইল? আমি সর্বস্ব হারাইলাম, আমার পাপে পুত্র হারাইলাম, আপনি সেই পাপের আগুনে আপনার পুত্র হারাইলেন। আপনার যে ক্ষতি হইল সেই ক্ষতি আমি কীভাবে কী উপায়ে পূরণ করতে পারি সেইডা যদি আপনি মন খুইলা কন, আমারে যে শাস্তি দিতে চান তা-ই আমি মাথা পাইতা নিতে চাই।

বাবা বললেন, ফোরকান সাহেব, আপনি অনুতপ্ত। অনেক কষ্ট ভরা মন নিয়ে আমার কাছে এসেছেন, মাফ চাইছেন এইটাই আমার সব ক্ষতির পূরণ। আল্লাহ মঙ্গলময়, তিনি সব জানেন ও দ্যাখেন। তিনি নিশ্চয় আপনাকে ক্ষমা করবেন। এখন আমার পা ছাড়–ন।

আমি ইতোমধ্যেই ফোরকান সাহেবের জন্যে ট্রেতে করে চা আর বিস্কুট নিয়ে এলাম।

ফোরকান সাহেব তার পাঞ্জাবির খুট দিয়ে চোখের পানি মুছে চায়ের কাপ হাতে নিলেন। চায়ের কাপে এক চুমুক দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, মা গো, বল্টু তোমার সাথে যেই অসভ্যতা, যেই পাপ করেছে তার জন্যে আমিও তোমার কাছে মাফি চাই। কও, তুমি আমার মতো নাদান, বেয়াক্কল বুড়া বাপরে মাফ করছ?

আমি অস্ফুট কণ্ঠে কি বললাম তা জানি না। হয়তো মাফ করার কথাই বললাম।

ফোরকান সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, স্যার, কাবার ঘর থেক্যা আল্লায় যদি আমারে জিন্দা ফিরাইয়া আনেন আমি কসম কইরা কইতাছি, আমি এই জিন্দেগিতে আর কুনো ক্ষতি হইতে দিমু না। যদি অনুমতি দেন তা হইলে এই যাবত আপনার চিকিৎসা বাবদ যত টাকা ব্যয় হইছে সব আমি পরিশোধ কইরা দিয়া খোলা মনে আল্লার কাবা ঘরে যাইতে চাই।

বাবা খুব দৃঢ় স্বরে বললেন, না। কারো কাছ থেকেই আমার অর্থ সাহায্যের প্রয়োজন নেই।

ফোরকান সাহেব অনেক মিনতি, অনেক ক্ষমা চেয়ে চলে গেলেন অসহায় ভঙ্গিতে।

আমি ভাবলাম, দেখলাম, মানুষের কী অদ্ভুত বিচিত্র পরিবর্তন।

 [তাইমুরের সাত কাহন]

একটা খেয়ালি শিশুর মতো আচরণে, কিংবা কথার অবাধ্য হলে নাজনিনের অভিমান, বিরক্তি বা বকাবকিতে আমার হাসি পায়। কিন্তু ওর থমথমে মুখভার দেখলে আমার খুব অস্বস্তি হয়, কষ্ট হয়। তাই লালবাগে যাওয়ার ঘটনা নিয়ে ওর মুখ থেকে গম্ভীরতার মেঘ সরাতে আমাকে প্রমিজ করতে হয়েছে আমার বাইরে কোথাও যাবার ইচ্ছে হলে তা নাজনিনকে অবশ্যই বলতে হবে এবং নাজনিনের সঙ্গেই যেতে হবে। তার বিনা অনুমতিতে এই বাড়ির বাইরে আমার কোথাও যাওয়া চলবে না। সারাজীবন আমি মুক্ত পাখির মতো একা একা অনেক উড়ে বেড়িয়েছি। কিন্তু আর নয়। এই বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যেই আমার সীমাবদ্ধ স্বাধীনতা।

লালবাগ থেকে ফেরার পর শারীরিক ও মানসিকভাবে আমি ভীষণ কøান্তিবোধ করেছি। কিন্তু লালবাগ কেন গিয়েছিলাম, কার খোঁজে গিয়েছিলাম তা নিয়ে নাজনিন আমাকে প্রশ্ন করেনি। আমিও কিছু বলতে সাহস পাইনি।

লালবাগে অনেক কিছু আছে, পরী বিবির কবর আছে, অনেক স্মৃতি, ইতিহাস আছে যা কম বেশি সবারই জানা। কিন্তু জানা নেই লালবাগে আমার অন্য একটি ইতিহাস, গোপন স্মৃতির কবর, আমার লুকোনো পাপ, যা শুধু আমিই জানি, অন্য কেউ নয়।

[তাইমুরের পূর্ব কথা]

আবার পিছু পথ হাঁটি পেছনের সময়ের টানে। আমার প্যারিস যাবার বছর খানেক আগের কথা। আমি তখন একুশের নয় তেইশ বছরের যুবক। নানা প্রতিকূল সময়ের ভেতর দিয়ে অলিয়ঁজ ফ্রসেঁজে আমি দু’টি বছর ল্যাঙ্গুয়েজ কোর্সটা কোনোক্রমে বলা যায় কঠিন পরিশ্রমে শেষ করেছি। যদিও আমার চার বছর কোর্সের যাবার ডিপ্লোমাটা নেয়া হয়নি। তথাপি আমি ফ্রেন্স ভাষাটা ফরাসিদের মতোই এখন স্বচ্ছন্দে বলতে পারি, লিখতে পারি। প্রতিটি পরীক্ষাতেই আমি সর্বোচ্চ স্কোর ও ভাষা জ্ঞানের দক্ষতা প্রমান করে আমি অলিয়ঁজ ফ্রসেঁজ এর প্রশংসাপত্র লাভ করেছি। এখন আমি অলিয়ঁজ ফ্রসেঁজে প্রাইমারি লেভেলে খন্ডকালীন শিক্ষক হিসাবে সপ্তাহে দু’দিন কাজ করি, মাঝে মধ্যে ফরাসি দূতাবাস থেকে আমন্ত্রণ পাই দোভাষী হিসাবে, কখনো ট্রান্সসেøটর হিসাবে। রিকশা পেইন্টিং এর কাজ করি কদাচিৎ। খলিল চাচার উপহার দেওয়া রিকশাটা আমি নিজ প্রয়োজনে এখনো চালিয়ে বেড়াই। রিকশার পেছনের ছবিটা এখনো আঁকা হয়নি। এখন আমার ছবি আঁকা আঁকি বিভিন্ন মাধ্যমে ক্যানভাসে, কিংবা মোটা আর্ট পেপারে ছবি আঁকি শ্রমজীবি মানুষের মুখ, শেকড়-বাকড়ের জালের মতো শতবর্ষী বৃদ্ধার মুখ, বাংলাদেশের নদী ও নারীর রূপ, মেহনতি মানুষদের কর্মব্যস্ততা তাদের অবয়ব ও ভালোবাসার চিত্র। এসব ছবি আমি সুযোগ পেলে কখনো আলিয়ঁজ ফ্রসেঁজে, কখনো শিল্পকলা আর্ট গ্যালারিতে প্রদর্শনী করি। যে সব ছবি আলোচিত, প্রশংসিত হয় সেসব ছবি আমি প্রায়ই পাঠাই জুলিয়াঁকে। কখনো কোনো আর্ট কম্পিটিশনে কখনো ফ্রান্সের কোনো আর্ট স্কুলে বা শিল্প একাডেমিতে। লক্ষ্য একটাই যদি আমি ফ্রান্সের কোনো আর্ট স্কুলে ভর্তি হবার সুযোগ পাই, একটা স্কলারশিপ পাই। আলিয়ঁজ ফ্রসেঁজ, ফরাসি দূতাবাসও আমাকে সাহায্য সহযোগিতা করে নানা রকম যোগাযোগ আর ছবি পাঠানোর ব্যাপারে। ছবি প্রেরণের জন্য ধন্যবাদ পাই, প্রশংসা পাই, কিন্তু স্কলারশিপের ব্যাপারে তেমন কোনো সাড়া পাই না। আসলে প্যারিসে লক্ষ লক্ষ ছবি, হাজার হাজার শিল্পীদের ভিড়ে আমি কিংবা আমার ছবি মূল্যহীন, অপাঙ্গতেয় হরিদাস পাল।

 

একথা স্বীকার করতে দ্বিধা নেই ফ্রান্সের যে কোনো আর্ট ইনস্টিটিউটশনে ভর্তি ও স্কলারশিপের ব্যাপারে জুলিয়াঁ আপ্রাণ চেষ্টা করেছে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যোগাযোগ করেছে, আমাকে সম্ভাবনাময় চিত্রশিল্পী হিসাবে আমার প্রেরিত শিল্পকর্মের কিছু ছবি প্রদর্শন, মুদ্রণসহ আমার শিল্প চেতনাবোধ নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী আলোচনা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশ করেছে। কিন্তু সব দেশের মতোই চিত্রকলা শুধু শিল্প নয়, একটা বিশাল বাণিজ্য। সুতরাং আমার মতো অগামগা শিল্পীকে কোনো একাডেমি বা প্রতিষ্ঠান বিনে পয়সায় ভর্তি বা স্কলারশিপ প্রদানের ব্যাপারে অনীহা আর দুঃখ প্রকাশই করে যায়। কিন্তু আমি দুঃখিত হই না, আশাহতও হই না। আমি জানি প্যারিস, স্পেন, ইতালির বিখ্যাত বিখ্যাত শিল্পীরা তাদের জীবদ্দশায় কী অপমান, দারিদ্রের ভেতর দিয়ে জীবন কাটিয়েছেন। তাদের ছবি মূল্যায়িত হয়েছে, লক্ষ লক্ষ ডলারে বিক্রি হয়েছে তাদের মৃত্যুর পর। সেই সৌভাগ্য অর্জনে আমার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই।

একদিন হঠাৎ করেই ফ্রান্সের নিস সিটির ভিলা আরসন আর্ট স্কুল থেকে একটা চিঠি পেলাম। চিঠির বক্তব্য হচ্ছে, মাদাম জুলিয়াঁর সুপারিশক্রমে আমাকে ভিলা আরসন আর্ট স্কুলে ভর্তির অনুমতি দেওয়া হল। তবে আমাকে নিজ খরচে প্যারিসে ও নিস সিটিতে আসতে হবে এবং আর্ট স্কুলের ডরমিটরিতে নিজ ব্যবস্থায় থাকতে হবে। অ্যাডমিশন ফিসহ দুটি সেমিস্টার ফি আমাকে অগ্রিম জমা দিতে হবে। আপাতত আমাকে একটি নির্দিষ্ট পরিমান অর্থের স্কলারশিপ দেওয়া হবে। আমার প্রথম দুটি সেমিস্টারের ফলাফল যদি স্কুল কর্তৃপক্ষের বিবেচনায় উচ্চমানের হয় তবে স্কলারশিপের অর্থের পরিমান বাড়িয়ে দেওয়া হবে। তৃতীয় সেমিস্টারে আমি যদি ব্যতিক্রমধর্মী চিত্রকর্ম দ্বারা শিল্পবোদ্ধাদের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারি তবে বাকি সেমিস্টারগুলির সব কোর্স ফি মওকুফ করে দেওয়া হবে এবং স্কলারশিপের অর্থের পরিমান আরো বাড়িয়ে দেওয়া হবে।

এইসব শর্ত মেনে প্যারিসে যাওয়া আমার পক্ষে অসম্ভব। প্যারিসে যাবার প্লেনভাড়া কোনোক্রমে হয়তো জোগাড় করা সম্ভব হবে কিন্তু অ্যাডমিশন ফি, সেমিস্টার ফি, অন্যান্য আনুসঙ্গিক ব্যয় বহন আমার পক্ষে অসম্ভব। তাছাড়া মা বেঁকে বসেছেন। তিনি ছোটনকে হারিয়েছেন, আমাকে হারাতে চান না। আমি যদি বিদেশে চলে যাই তাহলে আমার ফেরার নিশ্চয়তা কোথায়? বাবা অসুস্থ। আপদে বিপদে এই সংসার কে দেখবে? এইসব দ্বিধা-দ্বন্দ্বে আমি যখন প্যারিস যাবার স্বপ্ন বাতিল করতে বসেছি তখন ঐ আর্ট স্কুল থেকেই আবার একটা চিঠি এল। চিঠিতে জানানো হয়েছে আমার অ্যাডমিশন ফি ও সেমিষ্টার ফিসহ ইতোমধ্যেই আমাকে ঐ স্কুলে ভর্তি করা হয়েছে। দু’মাস পর আমার প্রথম সেমিস্টার শুরু হবে। আমি যেন অবিলম্বে এই চিঠিসহ ভিসার জন্যে ঢাকাস্থ প্যারিস দূতাবাসে আবেদন করি।

আমার মাথায় যেন বজ্রপাত! এটা কীভাবে সম্ভব? অলিয়ঁজ ফ্রসেঁজে খোঁজ নিয়ে জানলাম নিস শহরটি প্যারিস থেকে অনেক দূরে। প্যারি থেকে নিস এ ট্রেনে যেতেই লাগে ছয় ঘন্টা। ঐ স্কুলে অ্যাডমিশন ফি, সেমিস্টার ফিসহ টাকার পরিমান লক্ষাধিক টাকা। এত টাকা কে দিল?

 

প্রশ্নের উত্তর পেতে বেশি দেরি হল না। জুলিয়াঁর একটা চিঠি পেলাম। সে লিখেছে, হে আমার প্রিয় নীল পাখি, তোমাদের পরিবারের ওপর দিয়ে যে ঝড় বয়ে গেছে, তোমার ছোট ভাইয়ের যেভাবে মৃত্যু ঘটেছে তার জন্যে আমি আন্তরিক সমবেদনা প্রকাশ করছি। আমি জানিতুমি এখন মানসিকভাবে ভীষণ বিপর্যস্ত। এই অবস্থায় যদি তুমি শোকের ভেতর বসবাস করতেই থাক তবে তা তোমার ভবিষ্যতের জন্যে ক্ষতিকর, তোমার প্রতিভার অপমৃত্যু। তাই নিস এ ভিলা আর্ট স্কুলে তোমার ভর্তির ব্যবস্থা করেছি। টাকাটা আমিই দিয়ে দিয়েছি বলে আহত হয়ো না বা এটা অন্যভাবে নিয়ো না। এটা তোমাকে ধার হিসাবে দিলাম। যখন তোমার সামর্থ হবে তখন শোধ দিয়ো। আর শোধ না দিলেই বা কী আসে যায়? ভালোবাসার কাছে টাকা তুচ্ছ বলে মনে করি। হে আমার নীল পাখি, তুমি ভিসা নিয়ে আগেই উড়ে চলে এসো। অর্লি এয়ারপোর্টে আমি তোমার জন্যে অপেক্ষা করব। আমি নিজে তোমাকে নিস এ পৌঁছে দেব। যদিও নিস প্যারিস থেকে অনেক দূর, তবুও আমি থাকব তোমার হৃদয়ের কাছাকাছি।

জুলিয়াঁর চিঠিটা ফ্রেন্স ভাষায় নয়। ইংরেজিতে। এটার ভাষা প্রেমপত্রের মতো হলেও আমি চিঠিটা বাবার হাতে দিলাম। তিনি চিঠিটা পড়লেন কিন্তু তার মুখে কোনো ভাবান্তর দেখলাম না। বাবা চিঠিটা মায়ের হাতে দিলেন, মা অশিক্ষিতা নন। তিনি চিঠিটা পড়ার পর কেঁদে কেঁদে অস্থির। বললেন, যেতে চাস যা। ঐ সাদা ডাইনিটা তোকে গিলে খাবে। তুই আর ফিরে আসবি না।

আমি মাকে বললাম, মা আমি যাব কি না সেই সিদ্ধান্তই নিইনি। ফিরে আসা তো পরের কথা।

বাবা বললেন, জয়ী যা হবার তা হয়ে গেছে। ও যদি এখন না যায় তাহলে ঐ বিদেশি মেয়েটার সব টাকা পানিতে যাবে। এটা একটা খুব বাজে একজাম্পল হবে তিমুর জন্যে। ভবিষ্যতে ওর পক্ষে আর সম্ভব হবে না প্যারিসে যাবার। এটা আমাদের পরিবারের জন্যে অপমানজনক।

মা কান্নাভরা কণ্ঠে চিৎকার করে উঠলেন, না, না।
বাবা বললেন, তিমু এতকাল আমাদের জন্যে আত্মত্যাগ করেছে। এবার আমরা কিছু আত্মত্যাগ করি ওর জন্যে।
মা’র তবুও কান্না-না, না। ও চলে গেলে আমরা একা হয়ে যাব।

বাবা বললেন, জয়ী মনে করে দ্যাখো সেই একাত্তরের এক বিকেলের কথাআঠারোকাঠি নদীর পাড়ে তুমি ছিলে একা, নিরাশ্রয়। তোমার পাশে তোমার মা, বাবার মরদেহ। তখন তোমার পাশে কে এসে বসেছিল?
মা বললেন, তুমি।
বাবা বললেন, কে তোমাকে নিয়ে নদী সাঁতরে পার হয়েছিল?
মা বললেন, তুমি।
যুদ্ধে আহত এই মানুষটাকে কে সেবা-শুশ্রুষা করে সুস্থ করে তুলেছিল?
মা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, আমি।
বাবার প্রশ্ন, কেন করেছিলে?
মা চোখ বন্ধ করে বললেন, ভালোবাসতাম বলে।
বাবা বললেন, যুদ্ধ শেষে যখন একা ফিরতে চাইলাম তুমি বাধা দিলে। কী বলেছিলে তুমি মনে পড়ে?
মা উত্তেজিত কণ্ঠে চিৎকার করে উঠলেন, যা বলেছিলাম তা আবার কেন শুনতে চাও? ছেলেমেয়েদের কেন শোনাতে চাও?
বাবা বললেন, আমি শোনাতে চাই তোমার আত্মত্যাগের কথা, মহত্বের কথা, তোমার ভালোবাসার কথা।
মা আরো কান্নায় ভেঙে পড়লেন। কাঁদতে কাঁদতে বললেন, সেই সব বাসি কথা শুনিয়ে কী লাভ? ছোটন চলে গেছে, তিমুও চলে যাবে। কী নিয়ে বাঁচব আমরা?
বাবা বললেন, দুনিয়াতে সবাই এক এক করে চলে যায়, চলে যেতে হয়। কেউ কারো জন্যে অপেক্ষা করতে পারে না। তবুও আয়ু আর আশা এই দুটো জিনিসের সরু সুতোর রেখায় আমরা হয়তো কিছুকাল বেঁচে থাকব। তুমি আমাকে নিয়ে বেঁচে থাকবে। আমরা দু’জনে আমাদের কন্যা নাজুর জন্যে বেঁচে থাকব। নাজুই এখন আমাদের জীবন, আমাদের ভালোবাসা, আমাদের ভবিষ্যৎ।

আমি, বাবা, মা দুজনকেই জড়িয়ে ধরে কান্নাভরা কণ্ঠে চিৎকার করে উঠলাম, মা, বাবা শোনো আমি কোথাও যাব না তোমাদের ছেড়ে। তোমাদের ভালোবাসাই আমার জীবন, আমার ভবিষ্যৎ।

নাজু ছুটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল। ওর চোখে আনন্দের অশ্রু। ঝর ঝর কান্নার সাথে বলল, বড়দা তোকে কোথাও যেতে দেব না। কিছুতেই না।

আমি নিস এর আর্ট স্কুলের প্রিন্সিপালকে একটা চিঠি লিখলাম। তোমাদের খ্যাতনামা আর্ট স্কুলে আমাকে ভর্তি করার জন্যে আমি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ। কিন্তু এই ভর্তির বিষয়টি সম্পূর্ণ আমার অগোচরে করা হয়েছে। অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি যে, আমি সম্প্রতি নানাবিধ সমস্যার সম্মুখিন। এসব সমস্যা উপেক্ষা করে এই মুহূর্তে নিস এ যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। সুতরাং মাদাম জুলিয়াঁ নামে যে চিত্রশিল্পী ও চিত্র সমালোচক আমার অ্যাডমিশন ফি ও সেমিস্টার ফি জমা দিয়েছেন তা তাকে ফেরত দেবার জন্যে অনুরোধ জানাচ্ছি। মাদাম জুলিয়াঁকেও একটি পৃথকপত্রে বিষয়টি জানিয়ে দিচ্ছি। আশা করি, আমার এই অপারগতা তোমরা ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবে।

জুলিয়াঁকে আর একটি পত্রে লিখলাম, প্রিয় জুলিয়াঁ, গত দু’টি বছর ধরে তুমি আমাকে প্যারিসের যে কোনো আর্ট স্কুলে আমার অ্যাডমিশন ও স্কলারশিপের ব্যাপারে যে পরিশ্রম করেছ, তোমাদের পত্র-পত্রিকায় আমাকে যেভাবে হাইলাইট করেছ তার জন্যে আমি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ। তুমি তো জানোই আমাদের পরিবার একটা মহা দুর্যোগের মধ্যে কালাতিপাত করছে। এই দুঃসময়ে তাদেরকে ত্যাগ করে প্যারিস যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আর একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন যে আমাদের উভয়ের মধ্যে যতোই ভালোবাসা বা হৃদ্যতা থাকুক না কেন কারো দান বা ধার গ্রহণ আমার পক্ষে আদৌ সম্ভব নয়। তোমার মহানুভবতা, তোমার ঋণ পরিশোধের সাধ্য আমার নেই। আশা করি তুমি বিষয়টি বুঝবে এবং ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবে। আমার অনুরোধ তুমি অনতিবিলম্বে নিস এর ঐ আর্ট স্কুলের সঙ্গে যোগাযোগ করে আমার অ্যাডমিশন বাতিল করবে এবং তোমার প্রদত্ত সব টাকা ফেরত নেবে। এ বিষয়ে আমি ইতোমধ্যেই নিস এর আর্ট স্কুলকে আমার অপারগতা জানিয়ে দিয়েছি এবং তোমার সমুদয় অর্থ ফেরত দিতে অনুরোধ করেছি।

তোমার ভালোবাসার অযোগ্য এই রিক্শ পেইন্টারকে ক্ষমা করো। কারণ, আমি এখন একটা স্বপ্নহীন মানুষ।

আমার চিঠির উত্তর জুলিয়াঁ দেয়নি।

 

লাইফ অব এ রিকশা পেইন্টার (পর্ব এক)
লাইফ অব এ রিকশা পেইন্টার (পর্ব দুই)
লাইফ অব এ রিকশা পেইন্টার (পর্ব তিন)
লাইফ অব এ রিক্শ পেইন্টার (পর্ব চার)
লাইফ অব এ রিক্শ পেইন্টার (পর্ব পাঁচ)
লাইফ অব এ রিক্শ পেইন্টার (পর্ব ছয়)
লাইফ অব এ রিকশা পেইন্টার (পর্ব সাত)
লাইফ অব এ রিক্শ পেইন্টার (পর্ব আট)
লাইফ অব এ রিক্শ পেইন্টার (পর্ব নয়)
লাইফ অব এ রিক্শ পেইন্টার (পর্ব দশ)
লাইফ অব এ রিক্শ পেইন্টার (পর্ব এগার)
লাইফ অব এ রিক্শ পেইন্টার (পর্ব বার)
লাইফ অব এ রিক্শ পেইন্টার (পর্ব তের)
লাইফ অব এ রিক্শ পেইন্টার (পর্ব চৌদ্দ)
লাইফ অব এ রিক্শ পেইন্টার (পর্ব পনের)
লাইফ অব এ রিক্শ পেইন্টার (পর্ব ষোল)
লাইফ অব এ রিক্শ পেইন্টার (পর্ব সতের)

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top